১৩ মার্চ, ১৯৭১। দ্রুতযান ট্রেনে ঢাকা থেকে চলছি ময়মনসিংহের পথে। লক্ষ্য, ময়মনসিংহ ইপিআর হেডকোয়ার্টার। ওটা দখল করে নিতে হবে প্রথমেই। জেলা হেডকোয়ার্টার আমার গ্রামের বাড়ি থেকে মাত্র এক মাইল দূরে।
২৫ মার্চ রাতের এত সব ঘটনার কিছুই আমরা সে রাতে জানতে পারিনি। আমার আব্বা আলহাজ এম এ ওয়াদুদ ২৬ মার্চ ভোরে দ্রুত বাড়িতে ফিরে এসে আমাকে ডাকতে শুরু করলেন, ‘হামিদ তুই এখনো ঘুমিয়ে আছিস। ওদিকে ঢাকায় ছাত্রদের, পুলিশ, ইপিআরদের সব মেরে ফেলল। আর তুই ঘুমাচ্ছিস?’
আমি পোশাক পাল্টে সাইকেল নিয়ে সোজা চলে এলাম ইপিআর ক্যাম্প এলাকায়। ক্যাম্পের দুই দিকে মূল সড়কের পাশের গাছ কেটে রাস্তায় ফেলে ব্যারিকেড তৈরির কাজ শুরু করে দেওয়া হলো।
ফিরে এলাম খাগডহর বাজারে। এখানে লোকসমাগম বাড়ছে। কেউ একজন বলে উঠল, ইপিআর ক্যাম্পের ভেতরে বাংলাদেশের পতাকা ওড়াতে হবে। তখন সব দোকানেই বাঁশের মাথায় একটা করে পতাকা ওড়ানো। সেই সবুজ ও লালের মাঝে হলুদ মানচিত্র আঁকা পতাকা। একটা দোকান থেকে বাঁশসহ পতাকা খুলে নিয়ে রওনা দিলাম ইপিআর ক্যাম্পের দিকে।
আমার সঙ্গে কুড়ি-পঁচিশজন যুবক। আমি হাঁটছি সবার আগে। প্রায় দেড় শ গজ পথ পাড়ি দিয়ে দাঁড়ালাম ইপিআর ক্যাম্পের গেটে। পেছনে তাকিয়ে দেখি কেউ নেই। আমার পাশে একজন মাত্র কিশোর দাঁড়িয়ে। মনের ভেতরে জেদ চেপে বসেছে, ভেতরে ঢুকবই। আমি আর সেই কিশোর পতাকা হাতে ভেতরে এগিয়ে চলছি।
প্রায় পঞ্চাশ গজ দূরে পতাকাস্ট্যান্ড। বিভিন্ন স্থানে অস্ত্রসহ সৈন্যরা পাহারা দিচ্ছে। ছাদে বসানো এলএমজি। সবার চোখ আমাদের দিকে। পাকিস্তানের পতাকাস্ট্যান্ডের সামনে একজন সেন্ট্রি অস্ত্রসহ দাঁড়িয়ে। সেখানে মেজর নুরুল ইসলাম আমাদের ভেতরে নিয়ে গেলেন। টেবিলে আমার সামনে ক্যাপ্টেন কমর আব্বাস। টেবিলের ডান পাশে বসে মেজর নুরুল ইসলাম, তার পাশে লে. মান্নান। আলোচনা ক্রমে উত্তপ্ত হচ্ছে। আমাদের বলা হলো, আমরা যেন পতাকা নিয়ে ফেরত যাই। আমি শর্ত দিলাম ফেরত যেতে পারি, তবে পাকিস্তানের পতাকা নামাতে হবে। তুমুল বাদানুবাদের পরে যখন বেরিয়ে এলাম, তখন দেখলাম পাকিস্তানের পতাকা স্ট্যান্ডে নেই। তার পাশে আরেকটি স্ট্যান্ডে ইপিআরের পতাকা উড়ছে।
২৬ মার্চ সন্ধ্যায় আমাদের ইপিআর ক্যাম্প আক্রমণ সফল হলো না। কিন্তু ২৭ মার্চ মধ্যরাতের আক্রমণের পর সারা রাত যুদ্ধ চলল। ২৮ মার্চ বেলা ১১টায় বাঙালি ইপিআর বাহিনীর অংশগ্রহণে আমরা জয়লাভ করলাম। ২৬ মার্চ সকালে যে পতাকাস্ট্যান্ড থেকে পাকিস্তানের পতাকা নামিয়ে এসেছিলাম, ২৮ মার্চ সকালে সেখানে আমরা বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালাম।
বীর মুক্তিযোদ্ধা, সহসভাপতি সেক্টর কমান্ডার্স ফোরাম
‘ফিরে দেখা একাত্তর’ বই অবলম্বনে