ঢাকা ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের প্রতিপক্ষ কে? চোখের জলে শেষ হলো রোনালদোর বিশ্বকাপ অধ্যায় শেষ মুহূর্তের গোলে কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেন, পর্তুগালের বিদায় প্রথমার্ধে গোলশূন্য পর্তুগাল-স্পেন বালোগুনকে আটকাতে পারল না বেলজিয়াম, আবেদন নাকচ ফিফার পর্তুগাল-স্পেনের একাদশ ঘোষণা বালোগুনের পর এবার ওলিসে, ফিফার দ্বারস্থ ফ্রান্স পর্তুগাল-স্পেন ম্যাচে কে জিতবে, সুপারকম্পিউটারের ভবিষ্যদ্বাণী গ্রামসরকার গঠন করলে নেতৃত্ব বিকশিত হবে: মির্জা ফখরুল মিরপুরে অফিসার্স কোয়ার্টারে অগ্নিকাণ্ড, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিস সাভারে এনসিপির সমাবেশে বোমা বিস্ফোরণ আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে ৩ টন জিরা আমদানি ১০ জুলাই পর্যন্ত বান্দরবানের সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টে শুরু গ্র্যান্ড আমেরিকান ফুড ফেস্টিভ্যাল সুনামগঞ্জে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে একই পরিবারের ৩ জনের মৃত্যু নওগাঁয় মানত পূরণে সাঁতরে নদী পার হতে গিয়ে গৃহবধূর মৃত্যু সরিষাবাড়ীতে মাকে বাড়ি থেকে বের করে দিল ছেলে ৪,৮০০ কর্মী ছাঁটাই করছে মাইক্রোসফট আফগানিস্তানের উন্নয়নে নারী-পুরুষ সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন: জাতিসংঘ তুরস্ককে এফ-৩৫ না দিতে যুক্তরাষ্ট্রকে নেতানিয়াহুর আহ্বান জামালপুরে গৃহবধূকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, ৭ জনের মৃত্যুদণ্ড বিশ্বে জাহাজভাঙা শিল্পে শীর্ষস্থান পুনরুদ্ধারে কাজ করছে সরকার: পাটমন্ত্রী তানধান ডিপিটি রিনিউয়েবল ডিভিশনের সৌর ও লিথিয়াম পাওয়ার সলিউশন বিষয়ক প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের সূচনা বাংলাদেশের উন্নয়নে পাশে থাকার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন জাইকা প্রেসিডেন্ট চলতি বছরে সুদানে অন্তত ৩৩০ শিশু হতাহত: জাতিসংঘ জুলাইয়ের প্রথম পাঁচদিনে রেমিট্যান্স প্রবাহ বেড়েছে ৩৮ দশমিক ১ শতাংশ দেশের স্বার্থে সবাইকে আরও দায়িত্বশীল ও সচেতন হতে হবে: প্রধানমন্ত্রী পাহাড়ধসের শঙ্কা: রাঙামাটিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরতে মাইকিং নাটোরে ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের অভিযোগে হিন্দু যুবক কারাগারে প্রেমের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় ৫ম শ্রেণির ছাত্রের বিষপান

একাত্তরের যুদ্ধ মুক্তির, নাকি স্বাধীনতার

প্রকাশ: ২৬ মার্চ ২০২৪, ১১:৫৮ এএম
আপডেট: ২৬ মার্চ ২০২৪, ০২:০৮ পিএম
একাত্তরের যুদ্ধ মুক্তির, নাকি স্বাধীনতার
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। অলংকরণ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

একাত্তরের যুদ্ধ মুক্তির ছিল, নাকি স্বাধীনতার? উভয়েরই। ৭ মার্চের সেই বিখ্যাত জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান দুয়ের কথাই বলেছিলেন; ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ তখন এবং যুদ্ধের পরও এই দুয়ের মধ্যে পার্থক্য করা হয়নি। কিন্তু পার্থক্য নিশ্চয়ই ছিল। নইলে পরে জিয়াউর রহমানের সময়ে সংবিধানে যে পরিবর্তন আনা হয়েছে তাতে ‘মুক্তি’ সরিয়ে নিয়ে সে জায়গায় ‘স্বাধীনতা’ বসানো হলো কেন, কেন প্রয়োজন পড়ল এই সংশোধনের? স্মরণ করা যাক, আমাদের আদি সংবিধানের প্রস্তাবনার শুরুতে, এক নম্বর অনুচ্ছেদেই বলা হয়েছিল, ‘আমরা বাংলাদেশের জনগণ ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের মার্চ মাসের ২৬ তারিখে স্বাধীনতা ঘোষণা করিয়া জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করিয়াছি।’ ১৯৭৮-এ জারি করা এক ফরমানের বলে সংবিধানে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনা হয়েছে। প্রস্তাবনার ওপরে লেখা হয়েছে, ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’ এবং প্রথম অনুচ্ছেদের যেখানে ছিল ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম’-এর কথা, সেখানে তো বদল করে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধ।’ শুধু তাই নয়, এর পরে দ্বিতীয় অনুচ্ছেদে যেখানে অঙ্গীকারের কথা আছে সেখানেও ‘জাতীয় মুক্তিসংগ্রাম’ কেটে বসানো হয়েছে ‘জাতীয় স্বাধীনতার যুদ্ধ’।

সেই সঙ্গে যোগ করা হয়েছে সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থার কথা এবং বাদ দেওয়া হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা। আদি সংবিধানে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার ছিল এবং তার স্থান ছিল জাতীয়তাবাদের পরই। অর্থাৎ প্রথম অঙ্গীকার জাতীয়তাবাদের, দ্বিতীয় অঙ্গীকার সমাজতন্ত্রের। সংশোধনীতে সমাজতন্ত্র বাদ দেওয়া হয়নি সত্য, কিন্তু তাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে সর্বশেষে এবং সমাজতন্ত্র বলতে কী বোঝানো হচ্ছে তাও বলে দেওয়া হয়েছে। সমাজতন্ত্র অর্থ ‘অর্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার।’ আদিতে নাগরিকদের জাতীয়তাবাদ ছিল বাঙালি, সংশোধনের ফলে তা দাঁড়িয়েছে বাংলাদেশি। সংবিধানের দুটি পাঠ ছিল, একটি বাংলা, অপরটি ইংরেজি; বলা হয়েছিল অর্থের ব্যাপারে দুই পাঠের মধ্যে বিরোধ দেখা দিলে বাংলা পাঠই গ্রাহ্য হবে। ১৯৭৮-এর সংশোধনীতে বলা হয়েছে বিরোধের ক্ষেত্রে ইংরেজি পাঠই প্রাধান্য পাবে। সংশোধনগুলো মোটেই পরস্পরবিচ্ছিন্ন নয়; তারা একটি অভিন্ন চিন্তাধারার প্রতিফলন বটে। ওই চিন্তাধারার বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে আছে একেবারে সূচনাতেই, প্রস্তাবনার সংশোধনীতেই যেখানে ‘জাতীয় মুক্তির জন্য ঐতিহাসিক সংগ্রাম’কে রূপান্তরিত করা হয়েছে ‘জাতীয় স্বাধীনতার জন্য ঐতিহাসিক যুদ্ধে’। ব্যাপারটা যত নিরীহ মনে হয় তত নিরীহ নয়। যুদ্ধ একাত্তরের ব্যাপার বটে, কিন্তু সংগ্রামের ইতিহাস অনেক দীর্ঘ, সংগ্রাম একাত্তরে শুরু হয়নি, শেষও হয়নি। ১৯৭৮-এ যারা রাষ্ট্রক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত তারা যুদ্ধটাকেই দেখতে চেয়েছেন। সংগ্রামকে উপেক্ষা করে। যুদ্ধে তারা ছিলেন, সংগ্রামে ছিলেন না। আর মুক্তি ও স্বাধীনতা যে এক নয় তাও তারা খেয়াল করেছেন। মুক্তি অনেক ব্যাপক ও গভীর ব্যাপার। স্বাধীনতা বলতে রাজনৈতিক স্বাধীনতা বোঝানো সম্ভব, কিন্তু মুক্তি বলতে বোঝাবে সার্বিক মুক্তি। হ্যাঁ, স্বাধীনতার জন্য লড়াই হয়েছে একাত্তরে। অবশ্যই। পাকিস্তানি রাষ্ট্রের অধীনতা থেকে বের হয়ে এসে আমরা একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছি। কিন্তু সেটা একমাত্র লক্ষ্য ছিল না। অথবা বলা যায়, মূল লক্ষ্য ছিল অনেক বিস্তৃত। সেটা ছিল জনগণের মুক্তি। যে জন্য রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে জাতীয়তাবাদের পাশাপাশি সমাজতন্ত্রের উল্লেখ করতে হয়েছে, বলতে হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্রের কথা। অঙ্গীকার করতে হয়েছে এ চারটি মূলনীতি প্রতিষ্ঠার। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতা প্রয়োজন ছিল ওই সর্বাত্মক লক্ষ্যে পৌঁছার জন্যই। স্বাধীনতা প্রথম পদক্ষেপ, মুক্তি চূড়ান্ত লক্ষ্য। সংগ্রাম ছিল মুক্তির। 

মুক্তির জন্য সংগ্রামটা দীর্ঘকালের। এ লড়াইয়ে নানা মানুষ এসেছে, সংগঠন এসে যোগ দিয়েছে। সবার ভূমিকা সমান নয়। নানা মাত্রার ও মাপের। কিন্তু সব স্রোত মিলেই বৃহৎ ধারাটি তৈরি। হঠাৎ করে অভ্যুত্থান ঘটেনি। ভুঁইফোড় নয়। একাত্তরে শুরু নয়, শেষও নয়। মুক্তির সংগ্রাম এখনো চলছে এবং চলবে। 

মুক্তিযুদ্ধ ছিল ওই জনগণেরই যুদ্ধ। তারাই লড়েছে। কোনো একটি রণাঙ্গনে নয়, সর্বত্র, সব রণাঙ্গনে; কেবল দেশে নয়, বিদেশেও। বলা হয়েছে, যোদ্ধাদের শতকরা ৮০ জন ছিল কৃষক। এ কোনো অতিরঞ্জন নয়। গ্রামে-গ্রামে, প্রান্তে-প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিল ওই যুদ্ধ। পাকিস্তানি শাসকদের মধ্যে কুটিল যারা তারা আশা করেছিল সংঘর্ষ সীমাবদ্ধ থাকবে। বেছে বেছে হত্যা করা হবে। কট্টর আওয়ামীপন্থি, ছাত্র, পুলিশ, বিদ্রোহী সেনা- এদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখবে হত্যাকাণ্ড। কিন্তু পারেনি, নৃশংস সৈন্যদের লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তারা বাছবিচার করেনি। আর জনগণও বসে থাকেনি। আক্রমণকে তারা কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ওপর আঘাত হিসেবে দেখেনি, দেখেছে তাদের নিজেদের ওপর আক্রমণ হিসেবে। সেভাবেই প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছে। অংশ নিয়েছে যুদ্ধে। ভাষা আন্দোলনের সময়েও এ রকমটাই ঘটেছিল। আন্দোলন শুরু হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায়, প্রথম দিকে সীমাবদ্ধ ছিল সেখানেই। কিন্তু বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে যখন ছাত্রহত্যা ঘটল, তখন আন্দোলন ছড়িয়ে গেল সারা দেশে। ছাত্রহত্যাকে দেশবাসী নিজেদের ওপর আক্রমণ হিসেবেই দেখেছে, অন্য কোনোভাবে নয়। এর আগে পুলিশ ধর্মঘট হয়েছিল। হত্যা করা হয়েছিল বেশ কয়েকজন বাঙালি পুলিশকে, কিন্তু সে ঘটনা বায়ান্নর ঘটনার মতো প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারেনি। এর কারণ হচ্ছে এই যে, পুলিশের সঙ্গে জনগণের বিচ্ছিন্নতা ছিল, ছাত্রের সঙ্গে ছিল না। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন বেগবান ও সফল হয়েছে জনগণের অংশগ্রহণের ফলে। অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলা স্বীকৃতি পেয়েছিল জনগণের কারণে। 

জনগণই পাকিস্তান এনেছিল ভোট দিয়ে ১৯৪৬-এ। তারাই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে চলে গেছে বায়ান্নতে। ১৯৫৪-এর নির্বাচনে স্পষ্ট রায় দিয়েছে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ঊনসত্তরের অভ্যুত্থান জনগণেরই অভ্যুত্থান বটে। মূল লক্ষ্য একটাই, মুক্তি। মুক্তির এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই একাত্তরের যুদ্ধ, যে যুদ্ধে পরাভূত হয়েছিল দুর্ধর্ষ বলে কথিত পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। যুদ্ধের পেছনে যে চেতনা সেটা মুক্তির, যে মুক্তির সংজ্ঞা পাওয়া গেছে রাষ্ট্রীয় মূলনীতিতে। মূলনীতিগুলো যুদ্ধে জনগণের অংশগ্রহণ থেকেই বের হয়ে এসেছে, স্বাভাবিকভাবে। নইলে কারও সাধ্য ছিল না তাদের সংবিধানে অন্তর্ভুক্ত করে; যেমন যুদ্ধের সময়ে ও তার অব্যবহিত পরে কারও সাধ্য ছিল না তাদের অস্বীকৃতি জানায়। শাসনক্ষমতা যখন জনগণের কাছ থেকে দূরে সরে গেল, তখনই সম্ভব হয়েছে মূলনীতির সংশোধন। মুক্তির জায়গায় এসেছে স্বাধীনতা।

মুক্তির-যুদ্ধ ছিল একটা স্বতঃস্ফূর্ত সংগ্রাম। স্বতঃস্ফূর্ততার বহু গুণ ও সীমাবদ্ধতা তার মধ্যে পাওয়া যাবে। প্রধান গুণ হচ্ছে যুদ্ধের শক্তি ও বেগ; প্রধান দুর্বলতা তার সংগঠিত রূপ। যুদ্ধটা সংগঠিত, পরিকল্পিতভাবে শুরু হয়নি, চলেওনি। বিপরীতে পাকিস্তানিরা ছিল অত্যন্ত সুসংগঠিত ও সুসজ্জিত। তাদের ছিল বিদেশি শক্তির সঙ্গে প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। যুদ্ধ যখন শুরু হয় তখন মিত্র বলতে বাঙালির প্রায় কেউই ছিল না। ভারত যে যুক্ত হয়েছে তা আগের কোনো যোগাযোগের কারণে নয়, ঘটনা পরম্পরায়। একে সে প্রতিবেশী, তার ওপর ছিল শরণার্থীর বোঝা। 

এমনকি যারা ছিল নেতৃত্বে সেই আওয়ামী লীগও এ কথা বলেনি যে, যুদ্ধ তারা শুরু করেছে। বলেছে যুদ্ধ তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আওয়ামী লীগ যে ঐক্যবদ্ধ ছিল তাও নয়। সেখানে যেমন তাজউদ্দীন আহমদ ছিলেন, তেমনি ছিলেন খন্দকার মোশতাক আহমদ। তাজউদ্দীন আপসে বিশ্বাসী ছিলেন না, খন্দকার মোশতাক সব সময়ই আপসের পথ খুঁজছিলেন। কিন্তু তাজউদ্দীনের আশপাশে যারা ছিলেন তারাও সবাই যে তার সঙ্গে ছিলেন; তা নয়। বিরোধ ছিল, যে জন্য মুক্তিবাহিনীর সমান্তরালে মুজিব বাহিনী গঠিত হয়েছিল। খন্দকার মোশতাকরা যে শক্তিহীন ছিলেন না তা বোঝা গেছে ১৯৭৫-এর নির্মম হত্যাকাণ্ডে। এও তাৎপর্যহীন নয় যে, তার আগেই মন্ত্রিসভা থেকে তাজউদ্দীন বাদ পড়ে গেছেন, মোশতাক বাদ পড়েননি। যুদ্ধের সময়ে জাতীয় সরকার গঠনের দাবি উঠেছিল। সেটা গৃহীত হয়নি। হওয়ার কথাও নয়। তবে ছাড় হিসেবে একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়েছিল, কিন্তু সেই পরিষদের একটিরও বেশি বৈঠক হয়নি। জাতীয় সরকার গঠনের দাবি স্বাধীনতার পরও তোলা হয়েছিল। গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। 

স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে শত্রু কে ছিল? শত্রু ছিল তারাই যারা জাতীয় মুক্তির বিপক্ষে ছিল। অর্থাৎ আল-বদর, রাজাকারসহ সাম্রাজ্যবাদ ও পুঁজিবাদের সমর্থকরা। দক্ষিণপন্থিরা। শত্রু ছিল তারা যারা মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে মনে করেছে এবং নতুন রাষ্ট্রকে সামনের দিকে এগোতে না দিয়ে পেছন দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছে, বড় পাকিস্তান ভেঙে ছোট পাকিস্তান গড়বে ভেবেছে। ১৯৭৮-এর সাংবিধানিক সংশোধনগুলো দক্ষিণপন্থিদেরই কাজ। এরশাদের সময়ে পুঁজিবাদের পথকে আরও প্রশস্ত করা হয়েছে। রাষ্ট্রীয় ধর্ম প্রবর্তন পশ্চাৎগমনেচ্ছুদের আরেকটি বিজয় চিহ্ন। দুঃখজনক হলেও সত্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনার দাবিদার বর্তমান সরকারের শাসনামলে ওই সব ফরমানকে সাংবিধানিক বৈধতা প্রদান করা হয়েছে। 

কিন্তু শেখ মুজিব এই দক্ষিণপন্থিদের প্রধান শত্রু মনে করেননি। বামপন্থিরা তার মিত্র ছিল না এটা ঠিক, কিন্তু তারা তার জন্য তত বড় শত্রু ছিল না, যত বড় শত্রু ছিল তার আশপাশে লুকিয়ে থাকা দুর্বৃত্তরা। 

যখন বাঙালিদের দাবির মুখে পাকিস্তানিরা ‘এক মানুষ এক ভোট’ নীতি গ্রহণ করতে বাধ্য হয়েছিল। এর আগে ছিল সংখ্যাসাম্য; অর্থাৎ পূর্ববঙ্গের ৫৬ জনকে কেটেছেঁটে সমান করে দেওয়া হয়েছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের ৪৪ জনের। হোসেন শহিদ সোহরাওয়ার্দীকে দিয়েই করানো হয়েছিল ওই কাজ, নইলে পাকিস্তানিরা নিজেরা পারত না। সংখ্যাসাম্য ভেঙে পড়ল যখন, তখন জাতীয় পরিষদের ৩১৩টি আসনের মধ্যে পূর্ববঙ্গকে দিতে হলো ১৬৯টি, পশ্চিম পাকিস্তান পেল ১৪৪টি। আশা করেছিল ভোটের সময়ে বাঙালিকে বিভক্ত করা যাবে। যখন দেখল পারল না, তখন ঝাঁপিয়ে পড়ল গণহত্যায়। 

জনগণ সংগ্রাম করেছে, কিন্তু মুক্তি পায়নি। রাষ্ট্র এখন কতটা স্বাধীন তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা যায়। কিন্তু জাতি যে মুক্ত নয় সেটা সন্দেহাতীত। জাতি বলতে জনগণকেই বোঝায়। সেই জনগণ রাষ্ট্রক্ষমতার ধারেকাছে নেই। দেশে উন্নতি হয়েছে। কিন্তু উন্নতি মানে বড়জোড় ২০ জনের উন্নতি এবং ৮০ জনের অবনতি। ধনী-দরিদ্রের তারতম্য বোঝাতে আকাশপাতালের উপমা অগ্রাহ্য নয়। ওই দুই প্রান্তের মধ্যেই বিভিন্ন স্তরের বিন্যাস। কিন্তু মুক্তির সংগ্রাম চলছে। সরবে নয় নীরবে। তাকে চলতেই হবে, নইলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী, দাঁড়ানোর জায়গা কোথায়? 

লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

রংপুরে ঐতিহাসিক ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস পালিত

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম
রংপুরে ঐতিহাসিক ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস পালিত
ছবি: খবরের কাগজ

রংপুরে ঐতিহাসিক ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও দিবস যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হয়েছে।

শনিবার (২৮ মার্চ) সকালে রংপুর নগরীর নিসবেতগঞ্জে ‘রক্ত গৌরব’ স্মৃতিস্তম্ভে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (সার্বিক) আব্দুল মোতালেব সরকার।

এরপর  রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আমিনুল ইসলাম, রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের কমিশনার মজিদ আলী, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ এনামুল আহসান, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জয়নাল আবেদীন, রংপুর সদর উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা সাইফুল ইসলাম, রংপুর মহানগর মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ড ইউনিটের আহ্বায়ক বীর মুক্তিযোদ্ধা নূর মোহাম্মদ মিয়া ও সদস্যসচিব বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আব্দুস সাত্তারসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তর, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা পুষ্পস্তবক অর্পণ করেন।

পরে শহিদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।

উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ সাধারণ জনগণ বাঁশের লাঠি ও তীর-ধনুক নিয়ে রংপুর ক্যান্টনমেন্ট ঘেরাও করেন। পাকিস্তানি বাহিনীর নির্মম নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে তারা এ কর্মসূচি পালন করেন। সে সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ঘেরাওকারীদের উপরে নির্বিচারে গুলি চালালে শত শত মানুষ শহিদ হন।

সেলিম সরকার/অমিয়/

গোপালগঞ্জে গণহত্যা দিবস পালিত

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬, ০৩:০১ পিএম
গোপালগঞ্জে গণহত্যা দিবস পালিত
ছবি: খবরের কাগজ

শহিদ বুদ্ধিজীবী স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন ও আলোচনা সভার মধ্যে দিয়ে গোপালগঞ্জে গণহত্যা দিবস পালিত হয়েছে।

বুধবার (২৫ মার্চ) সকাল সাড়ে ১০টায় সদর উপজেলা পরিষদের পাশে জয়বাংলা পুকুর পাড়ে নির্মিত বদ্ধভূমির স্মৃতিস্তম্ভে ফুল দিয়ে প্রথমে শ্রদ্ধা জানান জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামান ও পুলিশ প্রশাসনের পক্ষে পুলিশ সুপার মো. হাবিবুল্লাহ।

এরপর জেলা পরিষদের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা শরীফ রফিকউজ্জামানসহ মুক্তিযোদ্ধা, বিএনপি, উপজেলা প্রশাসন বিভিন্ন সরকারী প্রতিষ্ঠান ও সংগঠন স্মৃতি স্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান। পরে শহিদের প্রতি সশস্ত্র সালাম জানিয়ে এক মিনিট নিরবতা পালন ও দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সদর উপজেলা পরিষদের হল রুমে জেলা প্রশাসক মো. আরিফ-উজ-জামানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় বীর মুক্তিযোদ্ধারা, সরকারী কর্মকর্তা, রাজনৈতিক নেতারা ও সাধারন মানুষ অংশ নেন।

আলোচনা সভায় বক্তারা ৭১-এর ২৫ কালো রাতের গণহত্যার স্মৃতিচারণ করে দিবসটির তাৎপয তুলে ধরেন।

এছাড়া, বাদ যোহর জেলাব্যাপী ২৫ মার্চ রাতে নিহতদের স্বরণে বিশেষ মোনাজাত ও প্রার্থণা করা হয়।

অপরদিকে, সকাল ১১ টায় কাশিয়ানী উপজেলা পরিষদের হল রুমে কাশিয়ানী উপজেলা প্রশাসন আয়োজিত গণহত্যা দিবস উপলক্ষে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন- গোপালগঞ্জ-০১ আসনে সংসদ সদস্য এবং বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক সেলিমুজ্জামান সেলিম।

আলোচনা সভায় তিনি বলেন, ২৫ মার্চ স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত ও নৃশংসতম গণহত্যার দিন। এ কালো রাতে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনী ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে বাংলাদেশের নিরস্ত্র স্বাধীনতাকামী মানুষের ওপর ইতিহাসের অন্যতম নৃশংস গণহত্যা চালায়। তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, পিলখানা, রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সহ বিভিন্ন স্থানে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী ও নিরপরাধ মানুষের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায় এবং হত্যা করে।

সেলিমুজ্জামান আরও বলেন, আসুন, আমরা সবাই রাষ্ট্র ও সমাজে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সাম্য মানবিক মর্যাদা সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে শহিদদের আত্মত্যাগের প্রতিদান দেওয়ার চেষ্টা করি। একটি ন্যায়ভিত্তিক উন্নত সমৃদ্ধ স্বনির্ভর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ
করি।’

এ সময় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. শাহিন মিয়ার সভাপতিত্বে উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম মোস্তফা মোল্লা, সাধারণ সম্পাদক শেখ মো. সেলিম, উপজেলা সমবায় কর্মকর্তা মোরাদ আলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

বাদল/রিফাত/

সাতক্ষীরায় গণহত্যা দিবস পালিত

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬, ০২:৫৪ পিএম
সাতক্ষীরায় গণহত্যা দিবস পালিত
ছবি: খবরের কাগজ

সাতক্ষীরায় যথাযোগ্য মর্যাদায় গণহত্যা দিবস পালিত হয়েছে।

বুধবার (২৫ মার্চ) সকালে শহরের সাতক্ষীরা সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় সংলগ্ন বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পণ ও আলোচনা সভার মাধ্যমে দিনটি স্মরণ করা হয়।

সকাল সাড়ে ৯টায় জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহিদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জেলা প্রশাসক আফরোজা আখতার।

এ সময় জেলা প্রশাসন ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বীর মুক্তিযোদ্ধা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।

​শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সকাল ১০টায় জেলা শিল্পকলা একাডেমি প্রাঙ্গণে গণহত্যা দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। 

জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মোস্তাক আহমেদের সভাপতিত্বে সভায় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিথুন সরকার এবং বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সাতক্ষীরা জেলা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার মোশারফ হোসেন মশুসহ স্থানীয় ব্যক্তিরা।

​আলোচনা সভায় বক্তারা ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চালানো ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামক বর্বরোচিত গণহত্যার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, সেদিন ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরস্ত্র হাজার হাজার মানুষকে নির্বিচারে হত্যা করা হয়। 

বক্তারা আরও বলেন, সাতক্ষীরায় প্রাণভয়ে সীমান্তের দিকে পালিয়ে যাওয়া কয়েক শ সাধারণ মানুষ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ে আশ্রয় নিলে সেখানেও পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশের দোসররা চার শতাধিক মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করে।

জাতির সেই বেদনাবিধুর ইতিহাস স্মরণ করে নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার আহ্বান জানান বক্তারা।
  
নাজমুল শাহাদাৎ/অমিয়/

ফেনীতে যথাযোগ্য মর্যাদায় গণহত্যা দিবস পালিত

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬, ০২:৪৭ পিএম
আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২৬, ০৩:০১ পিএম
ফেনীতে যথাযোগ্য মর্যাদায় গণহত্যা দিবস পালিত
ছবি: খবরের কাগজ

ফেনীতে যথাযোগ্য মর্যাদার মধ্য দিয়ে গণহত্যা দিবস পালিত হয়েছে।

বুধবার (২৫ মার্চ) সকালে ১১টার দিকে দিবসটি উপলক্ষে ফেনী সরকারি কলেজ বধ্যভূমিতে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শহিদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

এ সময় ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যাপক জয়নাল আবদিন (ভিপি), জেলা প্রশাসক মনিরা হক এবং ফেনী মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোতালেব প্রথমে বধ্যভূমিতে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা জানান।

পরবর্তীতে জেলা প্রশাসন, পুলিশ প্রশাসন, ফেনী পৌরসভা, জেলা পরিষদসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ একে একে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

অনুষ্ঠানের শেষে শহিদদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।

নিলয়/রিফাত/

গণহত্যার নীরব সাক্ষী কুমিল্লা সেনানিবাস

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬, ১০:২৯ এএম
আপডেট: ২৫ মার্চ ২০২৬, ১০:৩০ এএম
গণহত্যার নীরব সাক্ষী কুমিল্লা সেনানিবাস
ছবি: খব রের কাগজ

১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লা সেনানিবাস ছিল পাকিস্তানি বাহিনীর একটি ভয়ংকর টর্চার সেল। যেখানে নির্বিচারে চালানো হয়েছিল হত্যাযজ্ঞ। শহর ও আশপাশের এলাকা থেকে মুক্তিকামী বাঙালিদের ধরে এনে নির্মমভাবে হত্যা করা হতো। নির্বিচার এসব হত্যাযজ্ঞে পুরো সেনানিবাস এলাকা পরিণত হয় বধ্যভূমিতে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, ৭১-এর ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ‘অপারেশন কিল অ্যান্ড বার্ন’ নামে মানব ইতিহাসের একটি নৃশংস অভিযান চালায় কুমিল্লায়। ৭২ ঘণ্টার কারফিউ জারি করা হয়। রাত ১০টার দিকে সেনানিবাস থেকে অন্তত পাঁচটি দল শহরে প্রবেশ করে পরিকল্পিতভাবে হত্যাযজ্ঞ চালায়।

এই অভিযানে টার্গেট করা হয় শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য, পুলিশ, আনসার, মুজাহিদ বাহিনী, হিন্দু পুরুষ, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের। অনেককে ধরে এনে সেনানিবাসে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। তাদের মধ্যে ভাষা আন্দোলনের নেতা ধীরেন্দ্রনাথ দত্তও ছিলেন। সেই সঙ্গে কুমিল্লা সেনানিবাসে ১৭ জন বাঙালি অফিসার এবং প্রায় ৯১৫ জন অন্যান্য র‌্যাঙ্কের সদস্যকে হত্যা করা হয়।

নারকীয় এই হত্যাযজ্ঞে নেতৃত্ব দেয় পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর তেপ্পান্ন ব্রিগেড গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান লেফটেন্যান্ট কর্নেল ইয়াকুব মালিক, চতুর্থ বেঙ্গল রেজিমেন্টের পাঞ্জাবি কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল খিজির হায়াত খান, ব্রিগেডিয়ার আসলাম, চৌদ্দ এফএফআর ইউনিটের কমান্ডিং অফিসার শাহপুর খান প্রমুখ পাকিস্তানি নরপিশাচরা।

২৭ ও ২৮ মার্চ কুমিল্লা সেনানিবাসে বাঙালি সেনাদের জড়ো করা হয়। এরপর ১৭ জন কর্মকর্তা ও ৯৭৩ জন সেনা সদস্যকে হত্যা করা হয়। পরে তাদের লাশ মাটিচাপা দেওয়া হয়। এসব তথ্য উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক আবুল কাশেম হৃদয়ের ‘অপারেশন কিল অ্যান্ড বার্ন’ গ্রন্থে। এ ছাড়া বধ্যভূমি আবিষ্কারের পর আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও এ ঘটনা প্রকাশ পায়।

যুদ্ধকালীন কুমিল্লা কোতোয়ালি থানা কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল মতিন বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে। শহর থেকে ভাষাসৈনিক ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত, দিগম্বরীতলা এলাকার প্রিয় লাল ঘোষ, অধ্যাপক কাজী বশির ও তার দুই ভাইকে হত্যা করা হয়। জানা-অজানা আরও অনেককে নিয়ে সেখানে হত্যা করা হয়েছে। ২৫ মার্চ তারা প্রথমেই কুমিল্লা পুলিশ লাইন্সে হামলা চালিয়ে অনেক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করে। আবার অনেককে ধরে নিয়ে সেনানিবাসে হত্যা করা হয়।’

তিনি বলেন, ‘২৫ মার্চ রাতেই কুমিল্লায় ক্র্যাকডাউন শুরু হয়। শহরের বিভিন্ন বাসা থেকে মানুষ ধরে নিয়ে নির্যাতন ও হত্যা করা হয়। বাইরে যেসব হত্যাকাণ্ড হয়েছে তা আমরা স্বচক্ষে দেখেছি। কিন্তু ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই সবচেয়ে বেশি হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে।’

মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ও কুমিল্লার বিশিষ্ট সাংবাদিক আবুল কাশেম হৃদয় বলেন, ‘ঢাকার বাইরে প্রথম বড় গণহত্যাগুলোর একটি ছিল কুমিল্লা সেনানিবাসে। কিন্তু ঢাকার বাইরে হওয়ায় বিষয়টি তেমনভাবে আলোচনায় আসেনি। পরে গবেষণায় এর ভয়াবহতা সামনে আসে।