‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়।’ প্রেম ও দ্রোহের কবি হেলাল হাফিজ ‘নিষিদ্ধ সম্পাদকীয়’ নামের এই কবিতাটি লিখেছিলেন ১৯৬৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারি। ৫৬ বছর আগে পরাধীন দেশে লেখা এই কবিতা এখনো এ দেশের মানুষের মুখে মুখে ফেরে। যা প্রেরণা জুগিয়েছিল ঊনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থান, মহান মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধীসহ প্রগতিশীল সব আন্দোলনে।
দুই বছর পর ১৯৭১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি হেলাল হাফিজ লেখেন ‘দুঃসময়ে আমার যৌবন’ কবিতাটি। ‘মানব জন্মের নামে হবে কলঙ্ক হবে, এ রকম দুঃসময়ে আমি যদি মিছিলে না যাই।’ এই কবিতার প্রথম দুই লাইন থেকে সহজে বোঝা যায় তখনকার দিনগুলো কেমন ছিল। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দেড় মাস আগে কবিতাটি লিখেছিলেন প্রেম ও দ্রোহের কবি। তখন বাংলার আকাশে-বাতাসে প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল শৃঙ্খল থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, অগ্নিঝরা মার্চে এসে যা পেয়েছিল পূর্ণতা। মুক্তি অর্থাৎ স্বাধীনতার জন্য বাঙালির লড়াই ক্রমেই তীব্র হচ্ছিল মার্চের শুরুর দিনগুলোতে।
শহিদজননী জাহানারা ইমাম তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে ১৯৭১ সালের ২ মার্চের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে- ‘আজ হরতাল। সকালে নাশতা খাওয়ার পর সবাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলিফ্যান্ট রোডের মাঝখান দিয়ে খানিকক্ষণ হেঁটে বেড়ালাম। একটাও গাড়ি, রিকশা, স্কুটার, এমনকি সাইকেলও নেই আজ রাস্তায়। রাস্তাটাকে মনে হচ্ছে যেন আমার বাড়ির উঠোন! হরতালের দিনে ফাঁকা রাস্তার মাঝখান দিয়ে হাঁটা আমাদের মতো আরো অনেকেরই বিলাস মনে হয়। পাড়ার অনেকেরই সঙ্গে দেখা হলো। হাঁটতে হাঁটতে নিউ মার্কেটের দিকে চলে গেলাম। কি আশ্চর্য্য! আজকের কাঁচা বাজারও বসেনি। চিরকাল দেখে আসছি হরতাল হলে কাঁচা বাজারটা অন্তত বসে। আজ তা-ও বসেনি। শেখ মুজিবুরসহ সব ছাত্র, শ্রমিক ও রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে যে সর্বত্র যানবাহন, হাট-বাজার, অফিস-আদালত ও কলকারখানায় পূর্ণ হরতালের ডাক দেওয়া হয়েছে, সবাই সেটা মনে-প্রাণে মেনে নিয়েই আজ হরতাল করছে।’
শহিদজননী লেখেন, ‘নিউ মার্কেটের দিক থেকে ফিরে হাঁটতে হাঁটতে আবার উল্টোদিকে গেলাম হাতিরপুল পর্যন্ত। আমাদের সঙ্গে কিটিও হাঁটছে। রাস্তায় লোকেরা ওর সোনালী চুলের দিকে বাঁকা চোখে তাকাচ্ছে। ভাবছি তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাই।’
“বসার ঘরে ঢুকে রুমী ‘আরেক কাপ চা হোক।’ বলেই হাঁক দিল, ‘সুবহা-ন।’ সুবহান এ ঘরে আসতেই আমি বললাম, পাঁচ কাপ চা দিয়ে যাও। সুবহান চা বানিয়ে এনে সেন্টার টেবিলে ট্রে-টা রেখে রুমীকে লক্ষ্য করে বলল, ভাইয়া, তিনটার সমায় পল্টনের মিটিংয়ে যাইবেন? রুমী গম্ভীর গলায় শুধোল, কেন, তুমি যেতে চাও আমাদের সঙ্গে? সুবহান কাঁচুমাচু মুখে বলল, আমায় যদি পারমিশন দ্যান। আমি হাসি চেপে গম্ভীর মুখে বললাম, ‘তাড়াতাড়ি রান্না সারতে পারলে যেতে পারবে। সুবহান কৃতার্থের হাসি হেসে প্রায় দৌড়ে রান্নাঘরে চলে গেল।”
ডায়েরিতে জাহানারা ইমাম ওই দিন আরও লেখেন, ‘আমি খবরের কাগজের দিকে চোখ নামালাম। ঢাকায় যতগুলো ছাত্র, শ্রমিক, রাজনৈতিক দল আছে সবাই আজ মিটিং ডেকেছে। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগ ও ডাকসুর যৌথ উদ্যোগে এগারোটায় বটতলায়, তিনটেয় পল্টন ময়দানে। ন্যাপ এগারোটায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে, বিকেলে পল্টনে। ন্যাপের কর্মসূচির সঙ্গে সমর্থন রয়েছে পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন, ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র, কৃষক সমিতির। বাংলাদেশ জাতীয় লীগের সভা বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে- বিকেল সাড়ে তিনটেয়। নবগঠিত ফরোয়ার্ড স্টুডেন্ট ব্লকের সভাও ঐ বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণেই-বিকেল চারটেয়। সব দলই মিটিং শেষে বিক্ষোভ মিছিল করবে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাতীয় পরিষদ অধিবেশন স্থগিত করে পূর্ব পাকিস্তানে ভিমরুলের চাকে ঢিল ছুড়েছেন ।’
১৯৭১ সালের ২ মার্চের বর্ণনা পাওয়া যায় কবি সুফিয়া কামালের ‘একাত্তরের ডায়েরী’ গ্রন্থেও। তিনি ওই দিন সম্পর্কে লেখেন, ‘রাত ৯টা: আজ রাত ৮টা থেকে সকাল ৭টা পর্যন্ত কারফিউ অর্ডার হয়ে গেল। আমরা ঘরে এলাম ৭টায়। শামীম কাল রাতে অফিসে গেছে, আজও আসতে পারল না, কালকেও পারবে না, পরশু বাড়ী আসবে। শুধু ঢাকায় হরতাল হবার কথা ছিল। কিন্তু প্রদেশের সব জায়গায় আজ হরতাল হলো। কালও হবে। কাল সন্ধ্যা থেকে প্লেন সার্ভিস বন্ধ। ট্রেন চলাচলও বন্ধ। ফার্মগেট এ ইটের ব্যারিকেড ঘিরে দেওয়ার সময় আর্মির গুলিতে একজন মরেছে, ৩ জন আহত হয়েছে। এই মাত্র শোনা গেল নওয়াবপুরে খুব গণ্ডগোল চলছে। দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয় ও ইডেন বিল্ডিং-এর পাকিস্তানি পতাকা নামিয়ে বাংলাদেশের ম্যাপ আঁকা পতাকা উড়িয়েছে। ভাসানী সাহেবের সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের আলাপ-আলোচনা প্রকাশ করা হয়নি। বায়তুল মোকাররম-এ আমেনা বেগমকে জনতা অপমান করেছে বলে জানা গেল। কারফিউ ভেঙে জনতা মিছিল করছে, মরছে।’