বাংলাদেশের ৯ মাসের মুক্তিযুদ্ধের পর পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর পরাজিত-পূর্ব কমান্ড ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় মুক্তিযুদ্ধের যৌথ কমান্ডের কাছে আত্মসমর্পণ করে। তাদের এই পরাজয়ে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের মাঝে ব্যাপক নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। জনগণের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৭১ সালের ২৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো দেশটির প্রধান বিচারপতি হামুদুর রহমানের নেতৃত্বে একটি কমিশন গঠন করেন। এই কমিশন ‘হামুদুর রহমান কমিশন’ নামে পরিচিত। ১৯৭২ সালের ১২ জুলাই প্রেসিডেন্ট ভুট্টোকে রিপোর্ট জমা দেয় হামুদুর রহমান কমিশন। কমিশন যে সুপারিশগুলো করে, সেখানে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও পূর্বের ঘটনার জন্য পশ্চিম পাকিস্তানি নেতৃত্বের তীব্র সমালোচনার পাশাপাশি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য বলা হয়।
বশীর আল হেলালের উর্দু থেকে অনুবাদ ‘একাত্তরের গণহত্যা: হামুদুর রহমান কমিশনের রিপোর্ট’ গ্রন্থে কমিশনের সুপারিশগুলো রয়েছে। প্রথম সুপারিশে বলা হয়, ‘২৫ মার্চ ১৯৬৯ ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের কাছ থেকে অবৈধভাবে ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে জেনারেল ইয়াহিয়া খানকে ক্ষমতায় আনার অপরাধমূলক চক্রান্তে অংশগ্রহণের জন্য জেনারেল ইয়াহিয়া খান, জেনারেল আবদুল হামিদ খান, লে. জেনারেল এস জি এম এম পিরজাদা, মেজর জেনারেল ওমর, লে. জেনারেল গুল হাসান ও মেজর জেনারেল মিঠার বিরুদ্ধে মোকদ্দমা চালানো যায়। দরকার হলে শক্তি প্রয়োগ করে তা করা যায়। নিজেদের যৌথ উদ্দেশ্যকে জোরদার করার জন্য তারা নির্বাচনের সময় বিশেষ রকমের ফল পাওয়ার উদ্দেশ্যে নিজেদের পরিকল্পনাকে সফল করার প্রক্রিয়ায় হুমকি, প্রলোভন ও ঘুষের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন এবং পরে ৩ মার্চ ১৯৭১ ঢাকায় অনুষ্ঠেয় ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির অধিবেশনে অংশগ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানানোর জন্য কয়েকটি রাজনৈতিক দলকে প্রলোভনও দেখান। তদুপরি তারা একে অপরের সঙ্গে চুক্তি করে পূর্ব পাকিস্তানে এমন অবস্থার সৃষ্টি করেন, যা আইন অমান্য আন্দোলন, আওয়ামী লীগের সশস্ত্র বিদ্রোহ ও পরে পূর্ব পাকিস্তানে আমাদের সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণ এবং আমাদের দেশ ভেঙে যাওয়ার কারণ হয়ে ওঠে।’
একটি অসম যুদ্ধে অস্ত্রশস্ত্রে অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিপক্ষের কাছে পরাজয়ের মাত্র ছয় মাসের মধ্যে পাকিস্তানের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের এমন প্রতিবেদনে ৩ মার্চের ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির অধিবেশন স্থগিতের কয়েকটি কারণ উঠে আসে। হামুদুর রহমান কমিশনের প্রতিবেদন ও সুপারিশে বাংলাদেশের মুক্তিকামী মানুষের আন্দোলন-সংগ্রামের যৌক্তিকতাকে স্বীকার করে নেওয়া হয়। ১৯৭১ সালের ৩ মার্চের অধিবেশন স্থগিত হওয়া এবং পরবর্তী অবস্থা নিয়ে হামুদুর রহমান কমিশন তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার-বিশ্লেষণ করে।
১ মার্চ রেডিওতে ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির অধিবেশন স্থগিত হওয়ার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ, পরের দিন ২ মার্চ ঢাকায় এবং পরের দিন ৩ মার্চ অর্থাৎ ১৯৭১ সালের এই দিনে সারা দেশে স্বতঃস্ফূর্ত হরতাল পালিত হয়। রফিকুল ইসলামের ‘লক্ষ্য প্রাণের বিনিময়ে’ গ্রন্থে ঘটনার বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে- ‘৩রা মার্চ ১৯৭১। সকালের দিকে একটি মিছিল জাতীয়তাবাদী স্লোগান দিতে দিতে চট্টগ্রাম শহরের কেন্দ্রস্থলের দিকে এগিয়ে গেলো। মিছিলটি অবাঙালী অধ্যুষিত অয়্যারলেস কলোনীর কাছে পৌঁছাতেই অজ্ঞাত পরিচয় কিছু লোক মিছিলকারীদের ওপর রাইফেলের গুলিবর্ষণ করলো। এতে কয়েকজন নিহত ও আহত হলো। পার্শ্ববর্তী বাঙালী বস্তিগুলোতে এ সময় আগুন ধরিয়ে দিলে বেশ কয়েকজন জীবন্ত অগ্নিদগ্ধ হলো। মুহূর্তেই এই ঘটনার খবর চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়লো এবং নগরবাসী রোষে ফেটে পড়লো। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির দারুণ অবনতি ঘটলো। বেসামরিক প্রশাসনকে সহযোগিতা করার জন্য ইপিআর তলব করা হলো।’
ঢাকার অবস্থা ছিল আগ্নেয়গিরির মতো। কবি সুফিয়া কামালের ‘একাত্তরের ডায়েরী’ গ্রন্থে তার উল্লেখ রয়েছে। কবি ওই দিন (৩ মার্চ, ১৯৭১) ডায়েরিতে লেখেন, ‘কাল সারা রাত হট্টগোল চলেছে। জিন্নাহ এভেনিউ, নবাবপুরে লুট মারামারি হয়েছে। আজ সকালে কাগজে ৩ জনের মৃত্যু সংবাদ দিল। বিকালে পল্টনে ছাত্রদের শোক সভায় লক্ষ লোকের সমাবেশে শেখ মুজিব নিজের আদেশ প্রচার করেছেন। সমস্ত অফিস কারখানা বন্ধ করে দিতে ব্রিগেডিয়ারকে বলেছেন, সে দেশ রক্ষার জন্য বেতন নিচ্ছে, এখানে জনতার ওপর গুলি না চালিয়ে বর্ডারে গিয়ে দেশ রক্ষার কাজ করুক। সাবাশ! এইত চাই। জনতা উন্মাদ হয়ে স্বাধীন পূর্ব বাংলা করছে। ৭ তারিখ পর্যন্ত হরতাল। সকাল থেকে ২টা পর্যন্ত চলবে। ১০ তারিখ ইয়াহিয়া নাকি ঢাকা এসে সভা ডাকছে, এসেম্বলি বসবে। আজ রাত ১০টা থেকে সকাল ৭টা কারফিউ। ভাসানী সাহেব পলাতক।’