বাঙালির অধিকার আদায় না হলে পাকিস্তানকে ‘এক রাখা’ যে সম্ভব নয়, সে কথা এদিন আবারও মনে করিয়ে দেন পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইস্তিকলাল পার্টির সভাপতি এয়ার মার্শাল (অব.) আসগর খান। করাচিতে ১১ মার্চ সংবাদ সম্মেলনে এই উর্দুভাষী নেতা বলেন, ‘আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানই কার্যত এখন বাংলার সরকার। সেখানে সব সরকারি কর্মচারী এবং সচিবরা তার নির্দেশ পালন করছেন। ঢাকায় কেবল সামরিক সদর দপ্তরে পাকিস্তানি পতাকা উড়ছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতার হাতে অবিলম্বে ক্ষমতা ছাড়া না হলে দেশের দুই অংশকে এক রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।’
পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান জুলফিকার আলী ভুট্টো বুঝতে পারছিলেন- অবস্থা তাদের প্রতিকূলে চলে যাচ্ছে। এদিন (১১ মার্চ) শেখ মুজিবুর রহমানকে একটি তারবার্তা পাঠিয়ে সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি সমঝোতার আহ্বান জানান। নিজে সংকট তৈরি করে চতুর ভুট্টো বলেন, ‘উদ্ভূত সাম্প্রতিক ঘটনাবলিতে আমি গভীরভাবে মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছি। আমরা আজ বিরাট সংকটের মুখোমুখি। দেশের ভবিষ্যৎ আজ অনিশ্চিত। এ ব্যাপারে আমাদের উভয়ের অনেক দায়িত্ব রয়েছে। ধ্বংস এড়ানোর জন্য সম্ভাব্য সবকিছুই আমাদের করতে হবে। যেকোনো মূল্যে দেশকে রক্ষা করতেই হবে।’
এদিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) সর্বস্তরের মানুষ পাকিস্তানি শাসকদের সব ধরনের অসহযোগিতা করা অব্যাহত রাখে। হাইকোর্টের বিচারক এবং প্রশাসনের কর্মকর্তাসহ সারা বাংলার সরকারি ও আধা সরকারি প্রতিষ্ঠানের সর্বস্তরের কর্মচারী অফিস বর্জন করেন।
ন্যাপপ্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ১১ মার্চ টাঙ্গাইলের বিন্দুবাসিনী হাইস্কুল মাঠের জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ মার্চ ঘোষিত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রতি পূর্ণ সমর্থন জানান। সাত কোটি বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশ পালন করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান মওলানা ভাসানী।
তিনি বলেন, ‘বাঙালির স্বার্থের প্রশ্নে আপস করার দিন চলে গেছে। এ মুহূর্তে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো বিরোধ থাকা উচিত নয়। জনগণ এখন নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েছে।’
এদিন জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির সহকারী আবাসিক প্রতিনিধি কে উলফ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। বঙ্গবন্ধু তার কাছে পাকিস্তানি সামরিক জান্তার সমরসজ্জায় উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
জনতার বাধার মুখে পড়ে সেনাবাহিনীর রসদ ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রীর স্বাভাবিক সরবরাহ। সিলেটে রেশন নেওয়ার সময় সেনাবাহিনীর একটি কনভয়কে বাধা দেওয়া হয়। যশোরেও এ ধরনের ঘটনা ঘটে। কর্মী না থাকায় দেশের সব আদালত ১১ মার্চ কার্যত অচল হয়ে পড়ে। কুমিল্লা কারাগার থেকে পালাতে গিয়ে এদিন পুলিশের গুলিতে পাঁচ কয়েদি নিহত হন। বরিশাল কেন্দ্রীয় কারাগার ভেঙে ২৪ কয়েদি পালিয়ে যান, গুলিতে নিহত হন দুজন।
গণহত্যার প্রতিবাদে চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশীর পাকিস্তান সরকারের এক চিত্রপ্রদর্শনীতে যোগদানে অস্বীকৃতি জানান। এ দেশের (বাঙালি) চিত্রশিল্পীদেরও সেখানে যোগদানে বিরত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এদিন নিউজপ্রিন্টের অভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের সংবাদপত্রের কলেবর হ্রাস পায়। ডনসহ পত্রিকাগুলো ১৪ পৃষ্ঠার পরিবর্তে মাত্র ৪ পৃষ্ঠা ছাপা হয়। এসব পত্রিকা খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের কাগজ ব্যবহার করত। ১ মার্চ থেকে খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিল থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে চালান বন্ধ রাখা হয়।
একাত্তরের এই দিনে সচিবালয়, মুখ্য সচিবের বাসভবন, প্রধান বিচারপতির বাসভবনসহ সব সরকারি ও আধা সরকারি ভবন এবং বাসভবনে স্বাধীন বাংলার পতাকা উড়তে থাকে।
কবি সুফিয়া কামাল মার্চের এই উত্তাল দিনগুলো গভীর উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় পর্যবেক্ষণ করছিলেন। তার লেখা ‘একাত্তরের ডায়েরী’ গ্রন্থে রয়েছে তারই বর্ণনা। কবি লেখেন, ‘রাত ১১টা: মহিলা পরিষদে শান্তি কমিটি গঠনের প্রস্তাব নেওয়া হলো। সারা আলীর বাড়িতে মিটিংয়ে আরও সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো মহিলা পরিষদ থেকে ১ হাজার টাকা রোকেয়া স্মৃতি কমিটিকে দেওয়া হবে। আজ কাগজে আছে সামরিক রসদ সরবরাহের ব্যবস্থা সুষ্ঠুভাবে না চললে সামরিক আইনে বিশেষভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রাতে হাজারীর বাড়িতে নিয়োগী বাবুর সঙ্গে দেখা হলো, অনেক কথা হলো। অন্তর্দ্বন্দ্বে ভুগছি বলে বললেন, এ অন্তর্দ্বন্দ্বের কি শেষ আছে? বহু যশ, মান আরও ভাগ্যে নাকি আছে। কিন্তু মৃত্যুর চেয়ে কাম্য কি আছে? আজ বসন্ত পূর্ণিমা।’