অগ্নিঝরা মার্চের ১৪তম দিন আজ। ১৯৭১ সালের এই দিন অর্থাৎ ১৪ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান শিরোনাম ছিল, ‘উস্কানিমূলক কার্যকলাপ বন্ধ করুন: সামরিক কর্তৃপক্ষের নয়া নির্দেশের জবাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব’। পশ্চিম পাকিস্তানের উর্দুভাষী সামরিক গোষ্ঠীকে উদ্দেশ করে বঙ্গবন্ধু এই বিবৃতি দেন। তবে সামরিক গোষ্ঠীর পাশাপাশি প্রদেশটির রাজনৈতিক দল পিপিপির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোও বাঙালির বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে মেতে ওঠেন।
সেদিন ছিল রবিবার। সকালে ধানমন্ডির বাসভবনে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আসা ন্যাপ নেতা আবদুল ওয়ালী খানের সঙ্গে দীর্ঘ বৈঠক করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। অন্য আওয়ামী লীগ নেতারাও বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। বৈঠক শেষে শেখ মুজিবুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, ‘আমাদের সংগ্রাম স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসেবে বেঁচে থাকার সংগ্রাম। জনগণের সার্বিক স্বাধীনতা অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই সংগ্রাম চলবে।’
এদিন রাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এক বিবৃতিতে সবাইকে অসহযোগ আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ভবিষ্যতের জন্য নতুন দিকনির্দেশনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জনগণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে নির্মূল করা যাবে না। আমরা অজেয়, কারণ আমরা মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত।’
রেসকোর্স ময়দানে ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কার্যত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেছিলেন। আর বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনকে সাফল্যের দিকে এগিয়ে নিতে ১৪ মার্চ জাতিকে ৩৫টি নির্দেশ দেন তিনি।
নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার ‘বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘১৪ মার্চ, ১৯৭১ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ৩৫টি নির্দেশ জারির মাধ্যমে কার্যত: বাংলাদেশের (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) শাসনভার গ্রহণ করেন।’ এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলাপিডিয়ায় বলা হয়, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের এই নির্দেশের পর পূর্ব পাকিস্তানের ওপর থেকে কার্যত পশ্চিম পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হয়ে যায়।’
আগের দিনের জারি করা সামরিক ফরমানের (আদেশ) প্রতিবাদে ঢাকায় মিছিল করেন প্রতিরক্ষা দপ্তরের বেসামরিক কর্মচারীরা। এদিন ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সম্পদ পাচার রোধের অংশ হিসেবে প্রদেশের রাজধানী ঢাকার কয়েকটি স্থানে চেকপোস্ট বসায়। চট্টগ্রাম সংগ্রাম পরিষদ সারা শহরে মিছিল করে। হাজার হাজার মুক্তিকামী মানুষের এই মিছিল ‘জয় বাংলা’ ধ্বনিতে প্রকম্পিত করে সারা চট্টগ্রাম শহর।
জাতীয় লীগ নেতা আতাউর রহমান খান অস্থায়ী সরকার গঠনের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে আহ্বান জানান। এদিকে পাকিস্তানের করাচিতে পিপিপির জুলফিকার আলী ভুট্টো এক সমাবেশে এক পাকিস্তান ও দুই অঞ্চলে দুই দলের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে একটি ‘ফর্মুলা’ প্রস্তাব করেন।
লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘আওয়ামী লীগ: যুদ্ধদিনের কথা ১৯৭১’ গ্রন্থে লিখেছেন, “১৪ মার্চ সিন্ধু প্রদেশের লারকানায় এক জনসভায় তিনি (ভুট্টো) বলেন, সংবিধান তৈরির আগেই যদি ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হয়, তাহলে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের কাছে এবং পশ্চিম পাকিস্তানে পিপলস পার্টির কাছে তা করতে হবে; তারপর ‘সংখ্যাগরিষ্ঠ এই দুটি দলকে’ ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধান তৈরি করতে হবে।”
একই বিষয়ে (ভুট্টোর ফর্মুলা) বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান তার ‘বাংলাদেশের তারিখ’ গ্রন্থে লিখেছেন, “করাচির নিশতার পার্কে আয়োজিত জনসভায় বক্তৃতাকালে ভুট্টো বলেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমানের দাবি মোতাবেক পার্লামেন্টের বাইরে সংবিধান-সংক্রান্ত সমঝোতা ছাড়া ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হলে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানে পৃথকভাবে দুটি সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করা হোক।”
এদিকে পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ও পিপিপির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টোর ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র ক্রমেই বাংলার মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতিতে সারা বাংলাদেশে মানুষ স্বাধিকারের প্রশ্নে ইস্পাত-কঠিন ঐক্য গড়ে তোলে।
শহিদ জননী জাহানারা ইমাম তার ‘একাত্তরের দিনগুলি’ গ্রন্থে লিখেছেন, “বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে ঢাকার কবি সাহিত্যিকরা ‘লেখক সংগ্রাম শিবির’ নামে একটি কমিটি গঠন করেছেন। আহ্বায়ক: হাসান হাফিজুর রহমান। সদস্য: সিকান্দার আবু জাফর, আহমদ শরীফ, শওকত ওসমান, শামসুর রাহমান, বদরুদ্দীন উমর, রণেশ দাশগুপ্ত, সাইয়িদ আতিকুল্লাহ, বোরহানউদ্দীন খান জাহাঙ্গীর, রোকনুজ্জামান খান, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, সুফিয়া কামাল, জহির রায়হান, আবদুল গনি হাজারী এবং আরো অনেকে।’
তিনি আরও লিখেছেন, ‘কমিটি কয়েকদিন আগেই গঠিত হয়েছে, আজ বিকেল পাঁচটায় বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে এক জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হলো। আহমদ শরীফ স্যার সভাপতি। বাংলাদেশের স্বাধিকার আন্দোলনে লেখকদের সংগ্রামী ভূমিকা সম্পর্কে উদ্দীপনাময় বক্তৃতা করলেন রণেশ দাশগুপ্ত, আলাউদ্দিন আল আজাদ, বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর, হাসান হাফিজুর রহমান, রাবেয়া খাতুন, আহমদ ছফা ও আরো কয়েকজন।’
শহিদ জননী জাহানারা ইমাম এই সংগ্রামে নিজের ভূমিকা সম্পর্কে লেখেন, ‘আমি সাহিত্যিকও নই, বক্তাও নই, আমি পেছনের দিকে চেয়ারে বসে বসে শুনলাম আর ভেতরে ভেতরে উদ্দীপ্ত হলাম।’