অগ্নিঝরা মার্চের ১৮তম দিন আজ। আগের দুই দিন ১৬ ও ১৭ মার্চ প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে বৈঠক করেন শেখ মুজিবুর রহমান। কিন্তু আজ বৈঠক হবে কি না, তা প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়নি। এ কারণে জনমনে উৎকণ্ঠা সৃষ্টি হয়।
এদিন অনেক বিদেশি সাংবাদিক শেখ মুজিবুর রহমানের বাড়িতে এসেছিলেন। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে আরও সৈন্য আনা হচ্ছে, সে সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু কিছু জানেন কি না- বিদেশি এক সাংবাদিকের এ প্রশ্নের উত্তরে শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘আমার দেশের মাটিতে যা কিছু ঘটছে তার সব খবরই আমি রাখি।’
সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, “মূল অপারেশনাল পরিকল্পনার খসড়া প্রণয়নের জন্য ১৮ মার্চ সকালে জিওসি’র অফিসে মেজর জেনারেল খাদিম হোসেন রাজা ও মেজর জেনারেল রাও ফরমান আলী বৈঠক করেন। তারা এই ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেন, অপারেশন ‘ব্লিৎস’- (অর্থাৎ জনগণের সহযোগিতা) এখন আর প্রাসঙ্গিক নয়। তারা আরো ঐকমত্যে পৌঁছালেন যে, অপারেশন ‘ব্লিৎস’ এর মূল লক্ষ্য (আদর্শ ধারায় সামরিক আইনের প্রয়োগ) নানা ঘটনায় তা ছাড়িয়ে গেছে। এখন যদি কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয় এবং তা যখনই করা হোক- তার লক্ষ্য হবে, মুজিবের ডিফ্যাক্টো শাসনকে উৎখাত এবং সরকারের কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।”
সিদ্দিক সালিক আরও লেখেন, “ওই বৈঠকেই জেনারেল ফরমান হালকা নীল কাগজের অফিসিয়াল প্যাডের ওপর একটি সাধারণ কাঠ পেন্সিল দিয়ে নতুন পরিকল্পনাটি লিপিবদ্ধ করেন। আমি জেনারেল ফরমানের নির্দোষ হাতের মূল পরিকল্পনাটি দেখেছিলাম। পরিকল্পনার দ্বিতীয় অংশটি লিখেন জেনারেল খাদিম। তাতে প্রাপ্য সমর সম্ভারের বণ্টন ও বিভিন্ন ব্রিগেড এবং ইউনিটের কাজ ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। ১৬টি প্যারা সম্বলিত পাঁচ পৃষ্ঠাব্যাপী এই পরিকল্পনার নামকরণ করা হলো ‘অপারেশন সার্চলাইট’।”
মেজর জেনারেল (অব.) খাদিম হোসেন রাজা, তার ‘এ স্ট্রেঞ্জার ইন মাই ওউন কান্ট্রি’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘১৮ মার্চ ১৯৭১-এর সকালে ফরমান (রাও ফরমান আলী) আর আমি আমার অফিসে পরিকল্পনা তৈরি করতে বসলাম। আমি এমন ব্যবস্থা করেছিলাম যেন আমার স্ত্রী আমার বাঙালি এ.ডি.সি-কে কোনো কাজ দিয়ে অফিস থেকে দূরে ব্যস্ত রাখতে পারে। আমি চাইনি তার (এডিসি) মনে কোনো সন্দেহের উদ্রেক হোক। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই আমরা দুজন পরিকল্পনাটির রূপরেখার ব্যাপারে একমত হয়ে গেলাম। তারপর যার যার অংশ লিখতে বসে গেলাম। ফরমান ছিল ঢাকা গ্যারিসনের অপারেশনের দায়িত্বে আর আমি ছিলাম প্রদেশের বাকী সব অংশের অপারেশনের দায়িত্বে। ঢাকার গ্যারিসন কীভাবে অপারেশন চালাবে তা ফরমান লিখে ফেললেন। আমিও বাকি প্রদেশের সৈন্যদের কাজের বিন্যাস করে দিলাম। তারপর ১৮ মার্চ রাতে কমান্ড হাউসে গিয়ে আমরা দুজন পরিকল্পনা জমা দিলাম। পরিকল্পনাটি বিনা বাক্যব্যয়ে গ্রহণ করা হলো।”
এদিকে ১৮ মার্চ দিনভর মিছিলের পর বিভিন্ন পর্যায়ের মানুষ তাদের নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে তার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে এসে জড়ো হন। তারা মুজিবের প্রতি তাদের অকুণ্ঠ সমর্থন জানান। এ সময় শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতাকামী সমবেত জনতার উদ্দেশে সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন।
শেখ মুজিবুর রহমান বলেন, ‘তোমরা চরম প্রস্তুতি নিয়ে ঘরে ঘরে সংগ্রামী দুর্গ গড়ে তোলো। যদি তোমাদের ওপর আঘাত আসে তা প্রতিহত করে শত্রুর ওপর পাল্টা আঘাত হানো।’ জনতাকে চূড়ান্ত লড়াইয়ে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়ে মুজিব বলেন, ‘মুক্তি সংগ্রামের পতাকা আরও ওপরে তুলে ধরো। সাত কোটি শোষিত-বঞ্চিত বাঙালির সার্বিক মুক্তি না আসা পর্যন্ত সংগ্রাম চালিয়ে যাও।’
দিনব্যাপী জনতার মিছিলের পর রাতে সরকারিভাবে ঘোষণা করা হয়, পরদিন অর্থাৎ ১৯ মার্চ বেলা ১১টায় প্রেসিডেন্ট ভবনে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ও আওয়ামী লীগপ্রধান শেখ মুজিবুর রহমানের মধ্যে রাজনৈতিক সংকট নিয়ে তৃতীয় দফা আলোচনা হবে।
এদিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা তেজগাঁও ও মহাখালীতে শ্রমিকদের ট্রাকে হামলা চালায়। সৈন্যরা এই দুই স্থানে নিরস্ত্র আরোহীদের নির্মমভাবে প্রহার করে এবং তাদের টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেয়। এসব ঘটনায় নগরীতে জনসাধারণের মধ্যে মারাত্মক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। রাতে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে আওয়ামী লীগ নেতা সৈয়দ নজরুল ইসলাম সংবাদপত্রে বিবৃতি দেন।
করাচিতে এক সংবাদ সম্মেলনে পিপলস পার্টির প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া শাসনতান্ত্রিক প্রশ্নে আলোচনার জন্য ঢাকায় আসার যে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।’
তবে এদিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ওয়ালী ন্যাপপ্রধান ওয়ালী খান ১ ঘণ্টার রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। সেখানে পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি গাউস বক্স বেজেঞ্জোও ছিলেন। তারা শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি সমর্থন জানান।