অগ্নিঝরা মার্চের ২০তম দিন আজ। ১৯৭১ সালের ২০ মার্চ দৈনিক ইত্তেফাকের প্রধান দুটি খবরের একটি ছিল ‘জয়দেবপুরে জনতায়-সেনাবাহিনীতে সংঘর্ষ: অন্যূন ৩ জন নিহত, সান্ধ্য আইন জারি’। অপরটি ছিল জয়দেবপুরে জনতার ওপর আক্রমণ প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের প্রধান বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নিন্দা জ্ঞাপনের খবর, ‘ইহাই কি তবে সেনাবাহিনীকে ব্যারাকে ফিরাইয়া লওয়ার নমুনা!’
পুরো মার্চ মাসের মতো এদিনও (২০ মার্চ) মুক্তিপাগল মানুষের দৃপ্ত পদচারণে উত্তাল ছিল রাজধানী ঢাকা। মিছিলের নগরী ঢাকায় জনতা একটির পর একটি মিছিল নিয়ে যায় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। সেখানে শপথ গ্রহণ শেষে একের পর এক শোভাযাত্রা বের হয় শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির বাসভবনের উদ্দেশে। সেখানে বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘মুক্তিপাগল সাড়ে সাত কোটি বাঙালির চূড়ান্ত বিজয়কে পৃথিবীর কোনো শক্তিই রুখতে পারবে না। বাংলাদেশের মানুষের সার্বিক মুক্তি অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত এই আন্দোলন চলবে।’
১৯৭১ সালের ২০ মার্চ প্রেসিডেন্ট ভবনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের মধ্যে চতুর্থ দফা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে তার ছয়জন শীর্ষস্থানীয় সহকর্মী উপস্থিত ছিলেন। প্রায় সোয়া ২ ঘণ্টা আলোচনা শেষে শেখ মুজিবুর রহমান দেশি-বিদেশি সাংবাদিকদের বলেন, ‘আলোচনায় কিছুটা অগ্রগতি হয়েছে।’ যদিও ভেতরে ভেতরে উর্দুভাষী পাক সেনা কমান্ডাররা তাদের সামরিক শক্তি প্রয়োগের প্রস্তুতি এদিন সম্পন্ন করে।
সিদ্দিক সালিক তার ‘উইটনেস টু সারেন্ডার’ গ্রন্থে লিখেছেন, “২০ মার্চ বিকেলে ফ্ল্যাগ হাউসে জেনারেল হামিদ ও লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খানের সামনে হাতে লেখা পরিকল্পনাটি পড়া হলো। দুজনেই পরিকল্পনাটির প্রধান প্রধান আধেয় অনুমোদন করলেন। কিন্তু জেনারেল হামিদ বাঙালি সৈন্যদের নিরস্ত্রকরণের ধারাটি বাতিল করে দেন। কেননা তার মতে, ‘এই ধারাটি বিশ্বের একটি অন্যতম চমৎকার সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করবে।’ তিনি অবশ্য আধা-সামরিক বাহিনী যেমন, পূর্ব পাকিস্তান রাইফেল্স ও পুলিশ বাহিনীকে নিরস্ত্রকরণ অনুমোদন করলেন। মাত্র একটি প্রশ্ন করলেন তিনি। ‘বিভিন্ন কাজের জন্য সেনা বণ্টনের পর রিজার্ভ সৈন্য কি তোমাদের হাতে থাকবে?’ ‘না স্যার’ দ্রুত জবাব দিলেন জিওসি।”
তিনি (সিদ্দিক সালিক) আরও লিখেছেন, “পরে প্রেসিডেন্ট পরিকল্পনার একটি মৌলধারা বাতিল করে দেন। নির্ধারিত তারিখে আওয়ামী লীগ নেতাদের গ্রেফতার করতে হবে- এই বিষয়টি তিনি মেনে নেন না।’ প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘রাজনৈতিক সমঝোতার ওপর জনগণের আস্থাকে আমি নির্মূল করতে পারি না। গণতন্ত্রের প্রতি একজন বিশ্বাসঘাতক হিসেবে আমি ইতিহাসে চিহ্নিত হতে চাই না।’ তার হুবহু এই কথাগুলো ওই বৈঠকে উপস্থিত এক ব্যক্তি আমাকে বলেন। অবশ্য বিভিন্ন ব্রিগেড ও ব্যাটালিয়নগুলোর বণ্টনকৃত কাজ ও দায়িত্ব পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত রইল।”
সিরাজুল আলম খান তার ‘আমি সিরাজুল আলম খান: একটি রাজনৈতিক জীবনালেখ্য’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘২০ মার্চ থেকে ঘটনাপ্রবাহ দ্রুতগতিতে এবং ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হতে শুরু করে। মিটিং-মিছিলভিত্তিক অপ্রয়োজনীয় ও অযথেষ্ট হয়ে পড়ছিল। জনগণ নিজেরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলতে আরম্ভ করলো পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে। গাজীপুর, টঙ্গী, চট্টগ্রাম, সৈয়দপুর এসব স্থানে পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত শুরু হলো।’
এদিকে এদিন করাচিতে পাকিস্তান পিপলস পার্টির (পিপিপি) নেতা জুলফিকার আলী ভুট্টো সাংবাদিকদের জানান, তিনি প্রেসিডেন্টের (ইয়াহিয়া খান) আমন্ত্রণে সন্তোষজনক জবাব পেয়ে ঢাকা যাচ্ছেন।
একই দিন সকালে করাচি থেকে ঢাকায় আসেন সুপ্রিম কোর্টের প্রখ্যাত আইনজীবী ও আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম কৌঁসুলি এ কে ব্রোহি।