ঢাকা ১৮ ফাল্গুন ১৪৩০, শনিবার, ০২ মার্চ ২০২৪
Khaborer Kagoj

‘ইনশাআল্লাহ’ না বলে সুলাইমান (আ.) যে ভুল করেছিলেন

প্রকাশ: ৩০ নভেম্বর ২০২৩, ০৬:৩০ পিএম
‘ইনশাআল্লাহ’ না বলে সুলাইমান (আ.) যে ভুল করেছিলেন
শিল্পীর তুলিতে আঁকা ইনশাআল্লাহর ক্যালিগ্রাফি। ইন্টারনেট

সুলাইমান (আ.) একবার বললেন, আমি আজ রাতে ১০০ স্ত্রীর সঙ্গে রাত্রি যাপন করব। অন্য বর্ণনায় এসেছে, তিনি বলেছেন, আমি আজ রাতে নব্বই জন স্ত্রীর সঙ্গে রাত্রি যাপন করব, অর্থাৎ তাদের প্রত্যেকের সঙ্গেই স্ত্রীসুলভ আচরণ করব। এবং প্রত্যেক স্ত্রীকে একজন করে তেজোদীপ্ত সন্তান দান করব এবং তারা প্রত্যেকে বড় হয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবে। 

 

সব কথাই বললেন; কিন্তু সুলাইমান (আ.) এসব সংকল্প ব্যক্ত করার পর ইনশাআল্লাহ বলতে ভুলে গেলেন বা তিনি এসব কথা বলার পর ভুলে ইনশাআল্লাহ বলেননি।

 

এরপর তিনি তার প্রতিজ্ঞামতো সে রাতে ১০০ জন মতান্তরে ৯০ জন স্ত্রীর সঙ্গে রাত্রি যাপন করলেন। কিন্তু শুধু একজন স্ত্রী ছাড়া আর কোনো স্ত্রী গর্ভধারণে সক্ষম হলো না। যে স্ত্রী গর্ভধারণ করেছিলেন তিনিও কাঠবাঁকা সন্তান প্রসব করলেন। 

 

মুহাদ্দিসরা কাঠবাঁকা বা অর্ধাঙ্গ সন্তানের ব্যাখ্যায় বলেছেন, সুলাইমান (আ.) যেমন সন্তান আশা করেছিলেন, তেমন সন্তান জন্ম দিতে সক্ষম হননি তার সেই স্ত্রী। 

 

এ ব্যাপারে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘আমি সুলাইমানকে পরীক্ষা করেছি। তার সিংহাসনের ওপর একটি দেহ বসিয়ে দিয়েছি।’ (সুরা সাদ, আয়াত : ৩৪)

 

এরপর সুলাইমান (আ.) তার ভুল বুঝতে পারলেন এবং আল্লাহতায়ালার কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করলেন। তিনি উপলব্ধি করতে সক্ষম হলেন যে তিনি প্রতিজ্ঞা করেছেন ঠিকই, কিন্তু আল্লাহতায়ালার নির্দেশ মেনে ইনশাআল্লাহ বলেননি। কারণ আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন, ‘তোমরা কোনো বিষয়ে এভাবে বলো না যে, আমি আগামীকাল ওটা করব; বরং ইনশাআল্লাহ যুক্ত করে বলো।’ (সুরা কাহাফ, আয়াত : ২৩-২৪) 

 

পবিত্র কোরআনের আয়াতে সুলাইমান (আ.)-এর এ ঘটনার ইঙ্গিত রয়েছে। সুলাইমান (আ.) তার নিজের ভুল বুঝতে পারলেন এবং উপলব্ধি করলেন, যদি তিনি সেদিন এ প্রতিজ্ঞা করার পর ইনশাআল্লাহ বলতেন, তা হলে তার প্রত্যেক স্ত্রীর ঘরেই এমন পুত্রসন্তান দান করতেন আল্লাহতায়ালাযারা প্রত্যেকেই আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে সক্ষম হতো। 

 

হাদিসের এ ঘটনাটি বিখ্যাত সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বর্ণনা করেছেন। (বুখারি, হাদিস: ৬২৬৩, ৬৩৪১, ৬৬৩৯, ৬৭২০; মুসলিম, হাদিস: ১৬৫৪) 

 

সুলাইমান (আ.)-এর বিবির সংখ্যার ব্যাপারে একাধিক বর্ণনা পাওয়া যায়। কোনো কোনো বর্ণনায় এসেছে তার ৭০ জন স্ত্রী ছিল। কোনো বর্ণনায় এসেছে, ৯০ জন এবং কোনো বর্ণনায় এসেছে ৯৯ বা ১০০ জন। ইসলাম আগমনপূর্ব দুনিয়ায় প্রায় সব ধর্মে একজন পুরুষের জন্য একাধিক স্ত্রী রাখার বিষয়টি বৈধ ছিল। (কাসাসুল হাদিস, ড. মোস্তফা মুরাদ আজহারি, মাকতাবাতুশ সুন্না, পৃষ্ঠা: ১৩২) 

 

কোনো কোনো মুহাদ্দিস এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.) সুলাইমান (আ.)-এর স্ত্রীর সংখ্যা আধিক্য বোঝানোর জন্য বলেছেন।

 

লেখক : আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক

 

ইসলামের অনুপম সৌন্দর্য আদবকেতা

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৪, ০৬:৩০ পিএম
ইসলামের অনুপম সৌন্দর্য আদবকেতা
ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহীত প্রতীকী ছবি

ইসলামে সৌজন্যবোধ ও সুন্দর আচরণের বেশ কদর রয়েছে। সুন্দর ব্যবহার বা সৌজন্যবোধের মাধ্যমে অজানা-অচেনা মানুষও হয়ে যেতে পারে কাছের; গড়ে উঠতে পারে হৃদয়ের বন্ধন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই উত্তম চরিত্র, ভালো ব্যবহার ও পরিমিত ব্যয় বা মধ্যপন্থা অবলম্বন করা নবুয়তের পঁচিশ ভাগের এক ভাগ।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৪৭৭৬)

কোরআনে সৌজন্যবোধের বিভিন্ন দিক বর্ণিত হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহর রহমতেই আপনি তাদের জন্য কোমল হৃদয় হয়েছেন, পক্ষান্তরে আপনি যদি রূঢ় ও কঠিন হৃদয় হতেন, তাহলে তারা আপনার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত। কাজেই আপনি তাদের ক্ষমা করে দিন এবং তাদের জন্য মাগফিরাত কামনা করুন।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯)

ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য আদবকেতা। সারা পৃথিবীতে ইসলাম বিজয় লাভ করার অন্যতম ব্যাপার ছিল মুসলমানদের সুন্দর আচরণ। এখানে কয়েকটি আচরণের কথা তুলে ধরা হলো—

আগে সালাম দেওয়া: আগে আগে সালাম দেওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) ছোটদেরও আগে সালাম দিতেন। আনাস (রা.) বলেন, ‘এক দিন আমি রাসুল (সা.)-এর খেদমতে ছিলাম। খেদমত শেষে রাসুল (সা.) দ্বিপ্রহরের বিশ্রাম করবেন ভেবে খেলার মাঠে বেরিয়ে পড়ি। সেখানে দাঁড়িয়ে খেলা দেখছিলাম। এমন সময় হঠাৎ রাসুল (সা.) এসে বালকদের সালাম দিলেন, যারা খেলাধুলা করছিল।’ (মুসনাদে আহমদ, হাদিস: ১৩০২২)

হাসিমুখে কথা বলা: প্রাণের প্রাবল্যে ছড়িয়ে দেওয়া হাসি বা ব্যবহার একজন মানুষের সবচেয়ে বড় সম্পদ। একটু হাসি অনেক প্রতিকূল পরিস্থিতিকে সহজ করে দেয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ভালো কাজকেই তুচ্ছ মনে করবে না, এমনকি তা যদি তোমার ভাইয়ের সঙ্গে হাসিমুখে সাক্ষাৎ করার বিষয়ও হয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৬২৬)

সম্মান করা: সবার প্রতি সম্মানসূচক আচরণ করতে হবে। কাউকে অবহেলা করা যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ছোটদের প্রতি দয়া করে না এবং বড়দের প্রতি সম্মান করে না, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৩৫৬)

বিনয় ও মমতার সঙ্গে কথা বলা: আন্তরিক বিনয় সব সৎগুণের উৎস। যে যত বিনয়ী হবেন, সে তত মানুষের কাছে যেতে পারবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ আমার কছে এ মর্মে অহি নাজিল করেছেন যে, তোমরা বিনয় অবলম্বন করে চলো। অতএব, কেউ কারও ওপর গর্ব করবে না, কেউ কারও ওপর বাড়াবাড়ি করবে না।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৮৬৫)

খাওয়ার শুরুতে আল্লাহর নাম নেওয়া: উমর ইবনে আবু সালামা (রা.) বলেন, ‘‘একবার খাবার সময় রাসুল (সা.) আমাকে বললেন, শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলো, ডান হাত দ্বারা আহার করো এবং তোমার কাছ থেকে খাও।’’ (রিয়াদুস সালেহিন, হাদিস: ৭৩২) 

কম কথা বলা ভালো: আল্লাহ মানুষকে দুটো কান এবং একটি মুখ দিয়েছেন। অতএব শুনতে হবে বেশি এবং বলতে হবে কম। তাই বলার আগে সচেতন হোন—কখন, কাকে কী বলছেন। কথা বলার চেয়ে শোনার প্রতি বেশি মনোযোগী হোন। উদ্দেশ্যহীন ও অনর্থক আচরণ-উচ্চারণ পরিহার করা ঈমানের দাবি ও ইসলামের অন্যতম সৌন্দর্য। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অর্থহীন কথাবার্তা ও কাজকর্ম থেকে নিজের আঁচল বাঁচিয়ে চলা ইসলামের অন্যতম শোভা ও সৌন্দর্য।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২৩১৭)

আল্লাহ প্রদত্ত এবং রাসুল (সা.) নির্দেশিত প্রতিটি শিষ্টাচার মানবজীবনকে করে তোলে সুন্দর এবং অর্থবহ। সুসভ্য জাতি হিসেবে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়ানোর জন্য সামাজিক শিষ্টাচার রপ্ত না করে উপায় নেই। 

লেখক: খতিব, বাগবাড়ি জামে মসজিদ, গাবতলী

সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য সুসংবাদ

প্রকাশ: ০২ মার্চ ২০২৪, ০৮:৩০ এএম
সৎ ব্যবসায়ীদের জন্য সুসংবাদ
বিজনেস মিটিংরত মুসলিম। ছবি : ইন্টারনেট

জীবিকা নির্বাহের অন্যতম মাধ্যম ব্যবসা-বাণিজ্য। কোরআন ও সুন্নাহের নীতিমালা অনুসরণ করে ব্যবসা করলে সেটা ইবাদতও বটে। কেননা হাদিসে হালাল পন্থায় জীবিকা অন্বেষণ করা ফরজ করা হয়েছে। তাই হালাল পদ্ধতিতে ব্যবসা করাটাও ইবাদতের অংশ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) ব্যবসায়ীদের অসাধু পন্থা অবলম্বন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। হাদিসে আছে, ‘ব্যবসায়ীদের কিয়ামত দিবসে পাপাচারী ও অপরাধী হিসেবে উঠানো হবে। তবে যারা আল্লাহকে ভয় করে, সততা অবলম্বন করে তারা নয়। (তিরমিজি, হাদিস: ১২১০) তিনি আরও বলেন, ‘যে ধোঁকা দেয় সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ (মুসলিম, হাদিস: ১০২)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অনুতপ্ত হয়ে কোনো মুসলিম ক্রেতা থেকে তার বিক্রীত পণ্য ফেরত নেবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিবসে তার ভুল-ভ্রান্তিগুলো ক্ষমা করে দেবেন।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৩৪৬০) রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘সত্যবাদী আমানতদার ব্যবসায়ীর হাশর হবে নবি, সিদ্দিক, শহিদ এবং আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের সঙ্গে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১২০৯) 

সৎ ব্যবসায়ীদের একটি ভালো গুণ হলো, তারা ক্রেতাদের সহজ শর্ত দিয়ে পণ্য বিক্রি করে। ক্রেতাকে মানসম্মত পণ্য ক্রয় করতে সহযোগিতা করে এবং লেনদেন সহজ করে। যৌক্তিক কারণে কেউ পণ্য ফেরত দিতে চাইলে বিক্রীত পণ্য ফেরত নেয়। একে অপরকে ঠকানোর ব্যাপারে মহান আল্লাহকে ভয় করে। এতে তাদের ব্যবসায় বরকত হয়। কারণ এ ধরনের ব্যবসায়ীর জন্য রাসুল (সা.) দোয়া করেছেন। জাবের বিন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি বিক্রয়কালে উদারচিত্ত, ক্রয়কালেও উদারচিত্ত এবং পাওনা আদায়ের তাগাদায়ও উদারচিত্ত—আল্লাহ সেই বান্দার প্রতি দয়া করেন।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২২০৩)

লেখক: ছড়াকার ও মাদরাসা শিক্ষক

শয়তানের বিরুদ্ধে মুমিনের প্রথম বিজয় ফজরের নামাজ

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪, ০৬:৩০ পিএম
শয়তানের বিরুদ্ধে মুমিনের প্রথম বিজয় ফজরের নামাজ
নামাজরত মুসল্লির ছবি । ইন্টারনেট

ফজর নামাজ আদায়ের মাধ্যমে শয়তানের বিরুদ্ধে প্রথম জয়লাভ করে মুমিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যখন তোমাদের কেউ নিদ্রা যায়, তখন তার গ্রীবাদেশে শয়তান তিনটি করে গিঁট বেঁধে দেয়; প্রত্যেক গিঁটে সে এই বলে মন্ত্র পড়ে যে, ‘তোমার সামনে রয়েছে দীর্ঘ রাত, অতএব তুমি ঘুমাও।’ অতঃপর যদি সে জেগে উঠে আল্লাহর জিকির করে, তা হলে একটি গিঁট খুলে যায়। তার পর যদি অজু করে, তবে তার আর একটি গিঁট খুলে যায়। তারপর যদি নামাজ পড়ে, তা হলে সমস্ত গিঁট খুলে যায়। আর তার প্রভাত হয় স্ফূর্তি ও ভালো মনে। অন্যথায় সে সকালে ওঠে কলুষিত মনে ও অলসতা নিয়ে।” (বুখারি, হাদিস : ১১৪২)

ফজর নামাজের জন্য জেগে ওঠা অনেকের পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবে এ কষ্ট মুনাফিকদের জন্য। দুর্বল ঈমানের মানুষও শয়তানের কাছে নত হয়ে অলসতা করে ঘুম থেকে উঠতে চায় না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মুনাফিকদের জন্য ফজর এবং ইশার নামাজের চেয়ে কষ্টকর আর কিছু নেই।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ৫৪৪) আল্লাহর খাঁটি ও দৃঢ় ঈমানের অধিকারী বান্দারা আল্লাহর আদেশ পালনে সর্বদা তৎপর থাকে, তা যত কষ্টই হোক না আর যেমন পরিস্থিতিই হোক না কেন। শায়খ বদর বিন নাদের আল মিশারি বলেন, ‘আপনি যদি ফজরের নামাজের জন্য ঘুম থেকে জাগতে না পারেন, তা হলে নিজের জীবনের দিকে তাকান এবং জলদি সংশোধন করুন। কেননা আল্লাহতায়ালা ফজর নামাজের জন্য শুধু তাঁর প্রিয় বান্দাদেরকেই জাগ্রত করান। ঠিক এজন্যই মুনাফিকদের জন্য ফজরের সালাত এত কঠিন।’ মুমিন জীবনের জন্য ফজর নামাজ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষ যদি ফজর এবং ইশার নামাজের গুরুত্ব বুঝতে পারত, তা হলে তারা হামাগুঁড়ি দিয়ে হলেও উভয় নামাজে উপস্থিত হতো।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৫৭) আফসোস, মানুষ শারীরিক সামর্থ্য ও ফজরের ফজিলত জানার পরও আলস্যে গা ভাসিয়ে দেয়। শয়তানের কাছে নতিস্বীকার করে। আল্লাহ ফজরের নামাজকে এত বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন যে, তিনি ‘ফজর’ নামেই পবিত্র কোরআনে পূর্ণাঙ্গ একটা সুরা নাজিল করেছেন এবং এর নেয়ামত তুলে ধরেছেন। আল্লাহ সেখানে শপথ করে বলেন, ‘শপথ সুবহে সাদিকের!’ (সুরা ফজর, আয়াত: ১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ফজরের সালাত আদায় করল, সে আল্লাহর জিম্মায় চলে গেল। অতএব আল্লাহ যেন তার জিম্মার ব্যাপারে তোমাদের কোনোরূপ অভিযুক্ত না করেন।’ (তিরমিজি, হাদিস: ২১৮৪) প্রতিটি মুসলমানের আজীবন লালিত স্বপ্ন থাকে জান্নাতে যাওয়ার। ফজর নামাজ আদায়ের মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। আবু জুহাইর উমারা ইবনে রুয়াইবা (রা.) বলেন, “আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, ‘যে ব্যক্তি সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের পূর্বে (ফজর ও আসরের ওয়াক্ত) নামাজ আদায় করবে, সে কখনো জাহান্নামে প্রবেশ করবে না।” (মুসলিম, হাদিস : ৬৩৪) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “প্রতি রাতের শেষ তৃতীয়াংশে আমাদের মর্যাদাবান বারাকাতপূর্ণ রব দুনিয়ার আকাশে নেমে আসেন এবং বলেন, ‘যে আমাকে ডাকবে আমি তার ডাকে সাড়া দেব। যে আমার কাছে কিছু প্রার্থনা করবে আমি তাকে তা দান করব। যে আমার কাছে ক্ষমা চাইবে, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। তারপর তিনি হাত বাড়িয়ে দেন এবং বলেন, কে আছে যে এমন সত্তাকে ঋণ দেবে, যিনি ফকির নন; না অত্যাচারী। সকাল পর্যন্ত এ কথা বলতে থাকেন।” (বুখারি, হাদিস : ১১৪৫)

লেখক : শিক্ষার্থী, দর্শন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ১০ বৈশিষ্ট্য

প্রকাশ: ০১ মার্চ ২০২৪, ০৮:৪৪ এএম
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর ১০ বৈশিষ্ট্য
মসজিদে নববির সবুজ গম্বুজ। ছবি : সংগৃহীত

আল্লাহতায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে এমন কিছু গুণ ও বৈশিষ্ট্য দান করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি স্বতন্ত্র মর্যাদায় উন্নীত হয়ে মানবজাতির সকলকে ছাড়িয়ে স্বমহিমায় উদ্ভাসিত হয়েছেন। এই গুণ ও বৈশিষ্ট্যগুলো জগতের সব সৃষ্টি ও নবি-রাসুলদের ওপর তাঁর মর্যাদা এবং শ্রেষ্ঠত্বের দলিল। এখানে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর স্বতন্ত্র ১০টি বৈশিষ্ট্যের কথা তুলে ধরা হলো—

১.  রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ঈমান আনয়ন : পৃথিবীতে যত নবি-রাসুল এসেছেন, প্রত্যেকের কাছ থেকে আল্লাহতায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ঈমান আনা এবং তাঁকে সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি নিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আর আল্লাহ যখন নবিদের কাছ থেকে অঙ্গীকার গ্রহণ করলেন যে, আমি যা কিছু তোমাদের দান করেছি কিতাব ও জ্ঞান, অতঃপর তোমাদের কাছে কোনো রাসুল আসেন তোমাদের কিতাবকে সত্য বলে দেওয়ার জন্য, তখন সে রাসুলের প্রতি ঈমান আনয়ন করবে ও তাঁকে সাহায্য করবে।’ (সুরা আলে ইমরান, ৮১)

২.  চিরন্তন মুজেজা কোরআন : রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে চিরন্তন মুজেজা কোরআন প্রদান করা হয়েছে। এই মুজেজা চিরকালের। মহান আল্লাহ কোরআন অবতীর্ণ করে একে সংরক্ষণের দায়িত্ব নিজে নিয়েছেন। এর আগে নবি-রাসুলদের ওপর যেসব ধর্মগ্রন্থ অবতীর্ণ হয়েছিল, সেগুলো বিকৃত, পরিবর্তিত ও রহিত হয়ে গেছে। কিন্তু কোরআনের মধ্যে কোনো বিকৃতি, পরিবর্তন বা এর কোনো কিছু রহিত হয়নি। আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আমিই কোরআন নাজিল করেছি আর অবশ্যই আমি তার সংরক্ষক।’ (সুরা হিজর, ৯)

৩. বিশ্ববাসীর রাসুল : রাসুলুল্লাহ (সা.) ছাড়া যেসব নবি-রাসুল পৃথিবীতে এসেছেন, তারা সবাই নির্দিষ্ট জাতি, গোষ্ঠী বা সম্প্রদায়ের হেদায়েতের জন্য এসেছেন। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) পৃথিবীর সব জাতির জন্য প্রেরিত হয়েছেন। তাঁর নবুয়তকাল থেকে নিয়ে কেয়ামত পর্যন্ত যত জাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় পৃথিবীতে আসবে, তিনি সবার নবি ও রাসুল। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি আপনাকে সমগ্র মানবজাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।’ (সুরা সাবা, ২৮) 

৪. আল্লাহর দরবারে নিমন্ত্রণ : আল্লাহতায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে নিজ দরবারে নিমন্ত্রণ জানিয়ে নিজের নিদর্শনাবলি দেখিয়ে সম্মানিত করেছেন। এটা অন্য কোনো নবি-রাসুল বা মানুষের ক্ষেত্রে ঘটেনি। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘পবিত্র ও মহীয়ান তিনি, যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের বেলা ভ্রমণ করিয়েছেন মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত, যার চারপাশকে আমি কল্যাণময় করেছি। তাঁকে আমার নিদর্শনাবলি দেখানোর জন্য, তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বদ্রষ্টা।’ (সুরা বনি ইসরাইল, ১) 

৫. গুণ ও বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে সম্বোধন : মহাগ্রন্থ কোরআনে আল্লাহতায়ালা অনেক নবি-রাসুলকে তাদের নাম ধরে সম্বোধন করেছেন। কিন্তু তিনি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সম্মান ও মর্যাদা প্রকাশার্থে তাঁর শ্রেষ্ঠতম দুটি গুণ ‘নবি’ ও ‘রাসুল’ বলে সম্বোধন করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘হে নবি! আমি আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করেছি।’ (সুরা আহজাব, ৪৫) আল্লাহতায়ালা আরেক জায়গায় বলেন, ‘হে রাসুল! পৌঁছে দিন আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আপনার প্রতি যা অবতীর্ণ হয়েছে।’ (সুরা মায়েদা, ৬৭)

৬. প্রশংসিত স্থানে অধিষ্ঠিতকরণ : আল্লাহতায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে জান্নাতে এমন এক মর্যাদাপূর্ণ স্থানে অধিষ্ঠিত করবেন, যেখানে তাঁর বান্দাদের মধ্য থেকে আর কেউ অধিষ্ঠিত হতে পারবে না। এ স্থানকে আরবিতে ‘মাকামে মাহমুদ’ (প্রশংসিত স্থান) বলা হয়। আল্লাহ বলেন, ‘আর রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ পড়ো, ওটা তোমার জন্য নফল, শীঘ্রই তোমার প্রতিপালক তোমাকে প্রশংসিত স্থানে উন্নীত করবেন।’ (সুরা বনি ইসরাইল, ৭৯) 

৭. ক্ষমার ঘোষণা প্রদান : আল্লাহতায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পূর্বাপরের সব গুনাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘নিশ্চয় আমি আপনার জন্যে এমন একটা ফায়সালা করে দিয়েছি, যা সুস্পষ্ট। যাতে আল্লাহ আপনার অতীত ও ভবিষ্যৎ ত্রুটিসমূহ মার্জনা করে দেন এবং আপনার প্রতি তার নেয়ামত পূর্ণ করেন ও আপনাকে সরল পথে পরিচালিত করেন।’ (সুরা ফাতহ, ১-২)

৮. মর্যাদাপূর্ণ উসিলা প্রদান : পরকালে আল্লাহ রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে মর্যাদাপূর্ণ উসিলা প্রদান করবেন। এই উসিলার মাধ্যমে যারা প্রার্থনা করবেন, তাদের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শাফায়াত অবধারিত হবে। হাদিসে এসেছে, ‘...আমার জন্য আল্লাহর কাছে উসিলা প্রার্থনা করো। কেননা উসিলা জান্নাতের একটি সম্মানজনক স্থান। এটা আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে একজনকেই দেওয়া হবে। আমি আশা করি, আমিই হব সে বান্দা। যে আল্লাহর কাছে আমার জন্য উসিলা প্রার্থনা করবে, তার জন্য আমার শাফায়াত ওয়াজিব হয়ে যাবে।’ (মুসলিম, হাদিস : ৭৩৫)

৯. সুপারিশ করার যোগ্যতম মহামানব : কেয়ামতের অবস্থা অত্যন্ত ভয়াবহ ও বিভীষিকাময় হবে। মানুষ সুপারিশের জন্য বিভিন্ন নবি-রাসুলের কাছে ছুটবে। কেউ সুপারিশে রাজি হবেন না। শুধু রাসুলুল্লাহ (সা.) সুপারিশ করার জন্য সম্মত হবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি তখন আল্লাহর আরশের নিচে এসে সেজদায় পড়ে কান্নাকাটি করতে থাকব। (আল্লাহ যেন আমাকে সুপারিশ করার অনুমতি দেন)। অতঃপর আল্লাহর পক্ষ থেকে বলা হবে, আপনি মাথা উঠান, আপনার প্রার্থনা কবুল করা হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) মাথা উঠিয়ে বলবেন, হে আমার রব! আপনি আমার উম্মতকে ক্ষমা করুন। আল্লাহতায়ালা বলবেন, হে আমার প্রিয় নবি! আমার নিরপরাধ বান্দাদের বেহেশতের ডানদিকের দরজা দিয়ে প্রবেশ করান। অন্য দরজা দিয়েও ইচ্ছা করলে প্রবেশ করাতে পারেন।’ (বুখারি, হাদিস :  ৪৭১২)

১০. সর্বশেষ নবি ও রাসুল : অন্য নবি-রাসুলের আগমনের পর নবি-রাসুলের আগমনের ধারা অব্যাহত ছিল। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পর আর কোনো নবি-রাসুল আগমন করবেন না। তিনি সর্বশেষ নবি ও রাসুল। তাঁর মাধ্যমে নবুওয়াত ও রিসালাতের পরিসমাপ্তি ঘটেছে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘মুহাম্মাদ তোমাদের কোনো ব্যক্তির পিতা নন; বরং তিনি আল্লাহর রাসুল ও শেষ নবি। আল্লাহ সব বিষয়ে জ্ঞাত।’ (সুরা আহজাব, ৪০) 

লেখক : শিক্ষক, জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগ চকবাজার

জমি বন্ধক রাখা বা দেওয়া কি জায়েজ?

প্রকাশ: ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০৬:৩০ পিএম
জমি বন্ধক রাখা বা দেওয়া কি জায়েজ?
প্রতীকী ছবি

আমাদের কাছে প্রায়ই মানুষ জীবনঘনিষ্ঠ বিভিন্ন মাসয়ালার উত্তর জানতে চান। বিভিন্ন সমস্যার সমাধান চান। যেমন একজন জানতে চেয়েছেন, দেশে প্রচলিত প্রথা হিসেবে এক ব্যক্তি এক বিঘা জমি এক লাখ টাকার বিনিময়ে বন্ধক নিয়েছেন। যখন জমিওয়ালা পূর্ণ এক লাখ টাকা ফেরত দেবে তখন বন্ধকওয়ালা জমি ছেড়ে দেবে। এদিকে যতদিন বন্ধকওয়ালা টাকা ফেরত না পাবে, ততদিন সে জমি চাষাবাদ করে ফসল ভোগ করবে। তবে সে প্রতি বছর খাজনার টাকা জমিওয়ালাকে দিয়ে দেবে। এ নিয়মে জমি বন্ধক রাখা বা দেওয়া শরিয়তে জায়েজ হবে কি না? 

উল্লিখিত পদ্ধতিতে জমি বন্ধক রাখা শরিয়তসম্মত নয়। এভাবে কাউকে টাকা দিয়ে বন্ধকি জমি ভোগ করা সুদের অন্তর্ভুক্ত। তাই এ ধরনের লেনদেন করা যাবে না। এমনকি জমি ভোগ করা বাবদ খাজনার টাকা দিলেও প্রশ্নোক্ত চুক্তি বৈধ হবে না। এই চুক্তি বাতিল করা আবশ্যক।

শরিয়ত সমর্থিত পন্থায় অন্যের জমি ভোগ করতে চাইলে ঋণ প্রদান ও বিনিময়ে বন্ধক হিসেবে জমি গ্রহণের চুক্তি না করে শুরু থেকেই পত্তন বা ভাড়া চুক্তি করতে হবে। এক্ষেত্রে জমির মালিকের একত্রে বেশি টাকার প্রয়োজন হলে জমির ভাড়া ধার্য করে একসঙ্গে কয়েক বছরের জন্য জমি ভাড়া দেবে এবং অগ্রিম ভাড়া নিয়ে নেবে। 

যেমন কারও ১ লাখ টাকার প্রয়োজন, এক বিঘা জমির বার্ষিক ভাড়া হয় ১০ হাজার টাকা। তখন সে ১০ বছরের জন্য জমিটি ভাড়া দিয়ে অগ্রিম ১ লাখ টাকা ভাড়া হিসেবে নিতে পারবে। এরপর যে কয় বছর অর্থদাতা জমি ভোগ করবে সে কয় বছরের ভাড়া ওই টাকা থেকে কাটা হবে। ১০ বছরের আগে জমি ফেরত দিলে আনুপাতিক হারে অবশিষ্ট টাকা জমিওয়ালা ভাড়া গ্রহীতাকে ফেরত দিয়ে দেবে। 

আর কেউ যদি আগে থেকে ভাড়াচুক্তি না করে বন্ধকি চুক্তি করে, তবে সেক্ষেত্রে অর্থদাতা বন্ধকি জমি থেকে উপকৃত হতে চাইলে, আগের বন্ধকি চুক্তি বাতিল করে নতুনভাবে ভাড়াচুক্তিতে আবদ্ধ হতে হবে। তবে এক্ষেত্রে জমির ভাড়া যুক্তিযুক্ত হতে হবে। এলাকার এই মানের জমির ভাড়া সাধারণত যে পরিমাণ, তার সমান বা কাছাকাছি হতে হবে। অর্থাৎ নামমাত্র ভাড়া ধরা চলবে না; বরং তা বাস্তবসম্মত হতে হবে। (মাজমাউল আনহুর, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ২৭৩; জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া, কিরমানি, পৃষ্ঠা: ৫০৭; রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৪৮২)

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক