সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের (১৯২০-৭৫) সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। সেটা যেমন ব্যক্তিগত তেমনি রাজনৈতিক। সোহরাওয়ার্দীকে তিনি ‘লিডার’ বলতেন এবং পথপ্রদর্শক নেতা বলেই মানতেন। রাজনীতিতে প্রবেশের সূচনা থেকেই তিনি সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে ছিলেন এবং সেই সম্পর্কে কোনো বিচ্ছেদ ঘটেনি।…
উনসত্তরের অভ্যুত্থানের ভেতর একটা স্বতঃস্ফূর্ততা ছিল, কিন্তু এর পেছনে যে সাংগঠনিক কাজ ছিল না, তা তো নয়। ছিল এবং বেশ ভালোভাবেই ছিল, যদিও কোনো সংগঠনই ধারাবাহিকভাবে এগোতে পারেনি। সাংগঠনিকভাবে জাতীয়তাবাদীরা ছিলেন, সমাজতন্ত্রীরাও ছিলেন। দ্বন্দ্বটা আসলে দাঁড়িয়েছিল দুই জাতীয়তাবাদের মধ্যেই। একটি জাতীয়তাবাদ পাকিস্তানি, অপরটি বাঙালি। সমাজতন্ত্রীরা চেয়েছিলেন দ্বন্দ্বটাকে নিয়ে যাবেন আরও সামনে, সমাজতন্ত্রের অভিমুখে। সেটা তারা করতে পারেননি।
পটভূমিতে এবং সামনেও তিনজন নেতার বড় ভূমিকা ছিল; এরা হচ্ছেন হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং শেখ মুজিবুর রহমান। এদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ছিল; আবার দ্বন্দ্ব-বিরোধও ছিল। সম্পর্কের বিশেষ কারণ এরা তিনজনই পাকিস্তানের স্বৈরশাসকদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন। এবং এক সময়ে একই রাজনৈতিক সংগঠনের ভেতরে থেকেই কাজ করেছেন। আর দ্বন্দ্বের কারণ তাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও অবস্থানের পার্থক্য। সম্পর্কের প্রসঙ্গে দ্বন্দ্বের বিষয়টা আলোচনা করলে আন্দোলনের গতিপ্রকৃতি ও পরিণতি বুঝতে সুবিধা হবে। কারণ এরা শুধু ব্যক্তিই ছিলেন না, ছিলেন ভিন্ন ভিন্ন তিনটি ধারার প্রতিনিধিও। তিন ধারা আবার দুই ধারাতেও পরিণত হয়েছে, কখনো কখনো।
সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে শেখ মুজিবুর রহমানের (১৯২০-৭৫) সম্পর্ক ছিল ঘনিষ্ঠ। সেটা যেমন ব্যক্তিগত তেমনি রাজনৈতিক। সোহরাওয়ার্দীকে তিনি ‘লিডার’ বলতেন এবং পথপ্রদর্শক নেতা বলেই মানতেন। রাজনীতিতে প্রবেশের সূচনা থেকেই তিনি সোহরাওয়ার্দীর সঙ্গে ছিলেন এবং সেই সম্পর্কে কোনো বিচ্ছেদ ঘটেনি। আগরতলা মামলায় আত্মপক্ষ সমর্থনস্থল জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, ‘১৯৪৯ সালে মরহুম হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে’ আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল। এ উক্তি যে নিতান্ত আপতিক হয় তা নয়, সোহরাওয়ার্দীকেই তিনি তার প্রধান ও প্রথম নেতা বলেই মানতেন। মাঝখানে, সোহরাওয়ার্দী যখন হঠাৎ করেই আইনমন্ত্রীর পদ নিয়ে নিলেন তখন শেখ মুজিব অত্যন্ত ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন এটা সত্য, কিন্তু তাতে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো বিচ্ছেদ ঘটেনি; সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রী হওয়ার এবং নিজে আতাউর রহমান খানের নেতৃত্বে গঠিত পূর্ববঙ্গীয় মন্ত্রিসভার সদস্য হওয়ার পর শেখ মুজিব পুরোপুরি সোহরাওয়ার্দীর পক্ষেই চলে গিয়েছিলেন। বস্তুত, ভাসানী তখন শত্রুপক্ষেই পরিণত। ১৯৫৭ সালের দুর্দান্তরকমের যে কাউন্সিল অধিবেশনে আওয়ামী লীগের দ্বিখণ্ডকরণ চূড়ান্ত হয় তাতে পররাষ্ট্রনীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল প্রধান বিতর্কের বিষয়। ঠিক এর আগের বছরের কাউন্সিল অধিবেশনে পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে যে প্রস্তাব গৃহীত হয় তাতে শেখ মুজিবের পূর্ণ সমর্থন অবশ্যই ছিল; কিন্তু ১৯৫৭-এর অধিবেশনে ওই প্রস্তাবের বিরোধিতায় তিনিই মুখ্য সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। এর কারণ সোহরাওয়ার্দী তখন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর আসন পেয়েছেন এবং জানিয়ে দিয়েছেন যে সিয়াটো সেন্টোতে পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্তির নীতি সমর্থন না পেলে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়াবেন। ১৯৫৬ সালের প্রস্তাবটিতে বলা হয়েছিল: ‘বৈদেশিক রাজনৈতিক সম্পর্ক নির্ধারণের ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের বিরাট দায়িত্ব রহিয়াছে। কোনো বৈদেশিক রাষ্ট্রের লেজুড় হিসেবে না থাকিয়া আমরা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ পররাষ্ট্রনীতির অনুসারী। [...] বর্তমান সরকারের পররাষ্ট্রনীতি পাকিস্তানের সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ সৃষ্টির পরিপন্থি। বিভিন্ন সামরিক চুক্তি, বিশেষত ‘বাগদাদ’ চুক্তিতে অংশগ্রহণ করিয়া পাকিস্তান মুসলিম জাহানের অধিকাংশ রাষ্ট্রের সহানুভূতি হারাইয়াছে। অতএব এই কাউন্সিল এই প্রকারের সকল সামরিক চুক্তির তীব্র নিন্দা ও বিরোধিতা করিতেছে।’
১৯৫৭-এর অধিবেশনে বসে ওই একই কাউন্সিল সম্পূর্ণ উল্টো সিদ্ধান্ত নিল। কাউন্সিলের প্রথম প্রস্তাবটিই ছিল পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক। তাতে বলা হলো যে, ‘পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী কর্তৃক অনুসৃত পররাষ্ট্রনীতির প্রতি পূর্ণ সমর্থন এবং বৈদেশিক রাষ্ট্রসমূহের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠায় তিনি যে সাফল্য অর্জন করেছেন তজ্জন্য তাকে অভিনন্দন জ্ঞান করা হচ্ছে।’
বলা বাহুল্য, এই পররাষ্ট্রনীতি ছিল হুবহু পূর্ববর্তী সরকারেরই পররাষ্ট্রনীতি। ওই অধিবেশনে মওলানা ভাসানী উপস্থিত ছিলেন না। পরে এক সাক্ষাৎকারে তিনি মন্তব্য করেছেন যে, কাউন্সিলের প্রথম দিনের কর্মসূচিতে পররাষ্ট্রনীতি না থাকা সত্ত্বে তার অনুপস্থিতিতে এবং তার সঙ্গে কোনোরূপ আলোচনা না করে ওই ব্যাপারে প্রস্তাব পাস, ওয়ার্কিং কমিটির ৯ সদস্যের পদত্যাগ করার পর পদত্যাগপত্র গ্রহণ ও তদস্থলে নতুন সদস্য নিয়োগ সংক্রান্ত ওয়ার্কিং কমিটির পূর্ব সিদ্ধান্ত কাউন্সিলে অনুমোদন ইত্যাদি সব কাজই যখন সভাপতির পরামর্শ ছাড়াই করা হলো তখন আর সভাপতি পদে তার থাকার দরকারটা কী?
পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ে নতুন প্রস্তাবটি গ্রহণের আগে প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী কাউন্সিল সভায় বক্তৃতা করেন এবং তার বক্তৃতা শেষে প্রবল হর্ষধ্বনির ভেতর প্রস্তাবটি পাস হয়ে যায় এবং সঙ্গে সঙ্গে স্বতঃস্ফূর্ত আওয়াজ ওঠে ‘সোহরাওয়ার্দী জিন্দাবাদ, আওয়ামী লীগ জিন্দাবাদ, পররাষ্ট্রনীতি জিন্দাবাদ’।
এরপরে সামরিক শাসন আসে এবং সোহরাওয়ার্দী ব্যতীত প্রধান নেতাদের প্রায় সবাই গ্রেপ্তার হন। ভাসানী গ্রেপ্তার হন প্রথম দফাতেই এবং মুক্তি পান সবার শেষে, ৪ বছর ২০ দিন পর। যে নেতারা ক্ষমতায় ছিলেন তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ দাঁড় করানো হয়েছিল; ভাসানী তো ক্ষমতার ধারেকাছেও ছিলেন না, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল রাষ্ট্রদ্রোহিতার। সোহরাওয়ার্দীও শেষ পর্যন্ত (১৯৬২ সালে) গ্রেপ্তার হন। তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ ছিল একই রকমের, অর্থাৎ রাষ্ট্রদ্রোহিতার।
পরে আইয়ুবের নতুন শাসনতন্ত্র যখন জারি হয়েছে এবং রাজনৈতিক দলের পুনরুজ্জীবনে অনুমোদন পাওয়া গেছে তখন শেখ মুজিব চেয়েছিলেন আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করবেন। সোহরাওয়ার্দী সেটা চাননি। সে জন্য সোহরাওয়ার্দী যতদিন জীবিত ছিলেন মুজিব ততদিন আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করতে পারেননি। সোহরাওয়ার্দী লিখেছেন যে মুজিব অস্থির হয়ে পড়েছেন, কারণ মুজিবের ধারণা মূল্যবান সময় ও সুযোগ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে; অন্যরা তৎপর হয়ে উঠেছে এবং নতুন প্রজন্ম বিপথগামী হয়ে কমিউনিস্ট শিবিরে ঢুকে পড়বে এমন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
১৯৬৩ সালের শুরুতেই আওয়ামী লীগ পুনরুজ্জীবিত হলো। স্বায়ত্তশাসনের প্রশ্নে এবার কিন্তু মুজিব আর সোহরাওয়ার্দীর অবস্থানে নেই। পুরোপুরি চলে এসেছেন ভাসানীর অবস্থানে। ১৯৬২-এর ডিসেম্বরে গোপন কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তিনি জানিয়েছেন পূর্ববঙ্গকে স্বাধীন করা ছাড়া পরিত্রাণের আর কোনো উপায় তিনি দেখতে পাচ্ছেন না। এরপরে তিনি আগরতলায় যাওয়ার সেই দুঃসাহসিক কাজটি করেছেন। যেটিতে বোঝা যায় তিনি কতটা অস্থির হয়ে পড়েছিলেন স্বাধীনতার প্রশ্নে। লন্ডনেও গেছেন সোহরাওয়ার্দীকে পার্টি পুনরুজ্জীবিত করার আবশ্যকতা বোঝাতে এবং একই সঙ্গে ভারতীয়দের সঙ্গে যোগাযোগ করা যায় কি না সেটা দেখতে। নিজের হাতে ইস্তেহার লিখে ও ছেপে অনুগতদের সাহায্যে বিলি করার উদ্যোগ নিয়েছেন। সেনাছাউনিতে বাঙালি সৈনিকদের বিদ্রোহ প্রচেষ্টাকে উৎসাহিত করেছেন। এরপর তো এসেছে তার ছয় দফা।
কিন্তু তাই বলে তিনি যে তার পূর্বতন আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি মওলানা ভাসানীর সঙ্গে যুক্ত হবেন সেটা ঘটেনি। আসলে মোটেই সম্ভব ছিল না ঘটা। তার কারণ যতই দুঃখী মানুষের দুঃখ ঘোচানোর চেষ্টা করুন না কেন তার পক্ষে সমাজবিপ্লবী হওয়াটা সম্ভব ছিল না। ভাসানী যেভাবে কেবল সমাজতন্ত্রীদেরই নয়, কমিউনিস্টদের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে গিয়েছিলেন মুজিবের পক্ষে তেমনটা হওয়ার কথা নয়, তা তিনি হনও-নি। ১৯৫৪-তে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী মনোনয়নের সময়ে সোহরাওয়ার্দী সতর্ক ছিলেন কমিউনিস্টরা যাতে ঢুকে না পড়ে সে বিষয়ে। আওয়ামী লীগের ভেতরে থেকে তখন কমিউনিস্টরা কাজ করছিলেন; তাদের মনোনয়ন দেওয়ার ব্যাপারে মুজিবের আপত্তি ছিল না, যদিও তাদের তিনি ‘অতিপ্রগতিশীল’ বলে ঠাট্টা করতেন। কিন্তু ন্যাপ গঠনের সময়ে তিনিও কমিউনিজমপন্থিদের তৎপরতার প্রতি বিরূপ হয়ে পড়েন। তখন তিনি রীতিমতো সোহরাওয়ার্দীপন্থি। তাছাড়া সোহরাওয়ার্দীর সাম্রাজ্যবাদঘেঁষা নীতির ব্যাপারে তার যে খুব একটা আপত্তি ছিল তাও নয়। সোহরাওয়ার্দী আরও কিছুদিন রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলে পূর্ববঙ্গের স্বাধীনতার প্রশ্নে মুজিবের সঙ্গে হয়তো লিডারের দ্বন্দ্বই দেখা দিত এবং বাঙালি জাতীয়তাবাদের পক্ষে অবস্থান নিয়ে তিনি হয়তো বেরিয়ে আসতেন, কিন্তু তাই বলে তিনি যে সোহরাওয়ার্দীর বুর্জোয়া নির্বাচনপন্থি ধারার রাজনীতি পরিত্যাগ করতেন এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। পরবর্তী ইতিহাস সেটাই প্রমাণ করেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সোহরাওয়ার্দীর মতোই মুজিবের আস্থাও ছিল দৃঢ়।
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়