ঢাকা ২২ আষাঢ় ১৪৩৩, সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
হলিউড স্টুডিওগুলোর এআই ব্যবহারের তথ্য জানতে চায় মিডজার্নি প্রশ্ন ফাঁসের গুজব ছড়ালে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে: ডিসি ফরিদা কক্সবাজারে পাহাড়ধসে ১ জনের মৃত্যু কমলো স্বর্ণের দাম, ভরি কত এখন? শহরে চাপ কমাতে ৪ উপশহর গড়ার প্রস্তাব সিডিএ চেয়ারম্যানের রাঙামাটিতে অবৈধ অটোরিকশা বন্ধে ৭২ ঘণ্টার আল্টিমেটাম ১১ অঞ্চলে ঝড়ের সতর্কতা, নদীবন্দরে ২ নম্বর সতর্ক সংকেত সমন্বয় ও নিঃসরণ অধ্যায়ের ৮টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান ডিসেম্বরে শিক্ষার্থীদের নতুন বই দিতে চায় সরকার: শিক্ষামন্ত্রী পল্লী উন্নয়ন বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান অ্যাজেন্ডা: স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বেরোবি প্রেসক্লাবে আলোচনা সভা ও ফল উৎসব ব্রাজিলের পরাজয়ে অসুস্থ নারীভক্তকে হাসপাতালে নিলেন আর্জেন্টিনা সমর্থক ২৭তম বিসিএসে আরও ৭৭ জনকে নিয়োগ, প্রজ্ঞাপন জারি হিলিতে জাতীয় পল্লী উন্নয়ন দিবস উপলক্ষে র‌্যালি তবে কি রোনালদোকে ভয় পাচ্ছেন স্পেন কোচ? ব্রুনোর পেনাল্টি নেওয়ার ব্যাখ্যা দিলেন আনচেলত্তি চট্টগ্রামে আহত ছাত্রদল নেতা সাইফুদ্দিনের মৃত্যু সিটিজেনস ব্যাংক পিএলসির ৪র্থ বছরে পদার্পণ বাংলা একাডেমিতে শেষ শ্রদ্ধায় সিক্ত অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক পার্বত্য তিন জেলায় বাঙালিদের আয়কর ছাড় ও বন্ধ ঋণ চালুর দাবি নরওয়ে গোলকিপারকে ‘বেকুব’ বলেছিলেন নেইমার প্রশান্ত মহাসাগরে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে চীন ৪০ পাউন্ডে শুরু করে মাসে ৩ লাখ টাকা! ভিন্টেজ পোশাক বিক্রি করে তরুণীর অসাধারণ সাফল্য প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটিতে নগর গবেষণাকেন্দ্র উদ্বোধন বিশ্বকাপ ব্যর্থতার পরও আনচেলত্তির ওপর আস্থা, থাকছেন ২০৩০ পর্যন্ত উত্থানে শেয়ারবাজার ন্যাটো সম্মেলনে ট্রাম্পের সফরের আগে কিয়েভে রুশ হামলা, নিহত ৯ সব হাসপাতালে বাধ্যতামূলকভাবে লেবার রুম স্থাপনের নির্দেশ স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দাশেরকান্দি পয়োশোধনাগার: বাজেট ও মেয়াদ শেষ হলেও প্রকল্প সম্পূর্ণ হয়নি ভেনেজুয়েলায় ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৩৩৪২

রোজ গার্ডেন থেকে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ

প্রকাশ: ২৩ জুন ২০২৪, ১১:৪৬ এএম
রোজ গার্ডেন থেকে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ

আজ ২৩ জুন, আওয়ামী লীগের ৭৫তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ১৯৪৯ সালের এই দিনে পুরান ঢাকার রোজ গার্ডেনে এক ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে জন্ম নেয় দলটি। দীর্ঘ ৭৫ বছর পার করে ৭৬-এ পা দিয়েছে উপমহাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ। রোজ গার্ডেন থেকে বর্তমান ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ- এই দীর্ঘ পথ অতিক্রম করতে গিয়ে যেমন বহু প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করতে হয়েছে আওয়ামী লীগকে, তেমনি দলটির ঝুলিতে জমা হয়েছে অনেক অর্জন। তার মধ্যে সবচেয়ে বড় গৌরবের অর্জন হচ্ছে, এই দেশের স্বাধীনতা। এই অর্জনে এককভাবে নেতৃত্ব দিয়েছে আওয়ামী লীগ।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে আওয়ামী লীগের (পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ) প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে লিখেছেন- ‘কোথাও হল বা জায়গা না পেয়ে শেষ পর্যন্ত কাজী হুমায়ুন বশীর সাহেবের কে এম দাস লেনের রোজ গার্ডেনের বাড়িতে সম্মেলনের কাজ শুরু হয়েছিল।’ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠা প্রসঙ্গে বঙ্গবন্ধু আরও লেখেন- ‘আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে। সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু ম্যানিফেস্টো থাকবে। ভাবলাম, সময় এখনো আসে নাই, তাই যাঁরা বাইরে আছেন তাঁরা চিন্তাভাবনা করেই করেছেন।’

লেখক ও গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ তার ‘আওয়ামী লীগ উত্থানপর্ব ১৯৪৮-১৯৭০’-এ লিখেছেন, ‘মুসলিম লীগ সরকারের ভয়ভীতি, ত্রাস ও নির্যাতনকে উপেক্ষা করে সম্মেলনকে (মুসলিম লীগের কর্মীদের সম্মেলন) সহযোগিতা দিতে অনেক ঢাকাবাসী সাহস পাননি। সম্মেলনের জন্য সরকারি কোনো মিলনায়তন জোগাড় করা যায়নি। এই পরিস্থিতিতে কাজী হুমায়ুন বশীর তাঁর কে এম দাস লেনের বাসভবন রোজ গার্ডেনে সম্মেলন অনুষ্ঠানের প্রস্তাব দেন। সম্মেলনের প্রস্তুতি চলার সময় ভাসানী (মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী) ১৫০ নম্বর মোগলটুলিতে থাকতেন। ১০ জুনের দিকে সংবাদ পাওয়া গেল, সরকার ভাসানীকে গ্রেপ্তারের পরিকল্পনা করছে। খন্দকার মোশতাক আহমদ তখন কাজী বশীরের সঙ্গে পরামর্শ করে শওকত আলীর সহায়তায় ভাসানীর গায়ে কম্বল পেঁচিয়ে তাকে সেই রাতেই ঘোড়ার গাড়িতে করে রোজ গার্ডেনে পৌঁছে দেন। সম্মেলন শেষ না হওয়া পর্যন্ত ভাসানী কাজী বশীরের রোজ গার্ডেনেই ছিলেন।’

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের (পরে আওয়ামী লীগ) প্রতিষ্ঠার বর্ণনা দিতে গিয়ে মহিউদ্দিন আহমদ আরও লেখেন, ‘২৩ জুন (১৯৪৯) বেলা তিনটায় রোজ গার্ডেনের দোতলার হলঘরে সম্মেলন শুরু হয়। সেখানে ২৫০ থেকে ৩০০ কর্মী উপস্থিত হন।’ ১৫০ মোগলটুলি সম্পর্কে মহিউদ্দিন আহমদ তার বইয়ে লেখেন, ‘এখানে বঙ্গীয় মুসলিম লীগের একটি শাখা অফিস ছিল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই শাখা অফিসকে কেন্দ্র করেই বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি সংগঠিত হয়। ঢাকার নবাববাড়িকেন্দ্রিক প্রভাব খর্ব করার ক্ষেত্রে ১৫০ নম্বর মোগলটুলির তরুণদের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।’

‘আওয়ামী লীগ উত্থানপর্ব ১৯৪৮-১৯৭০’ বইয়ে তিনি আরও লেখেন, ‘আতাউর রহমান খান মূল অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। অনেক আলোচনার পর ‘পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ’ নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠনের প্রস্তাব গৃহীত হয়। আওয়ামী লীগ নামটি মওলানা ভাসানীর দেওয়া। ...২৩ তারিখের (২৩ জুন) অধিবেশনের শেষ দিকে মওলানা ভাসানী প্রস্তাব করেন, প্রতিটি জেলা ও প্রতিষ্ঠানের একজন করে প্রতিনিধি নিয়ে সাংগঠনিক কমিটি গঠন করা হোক। এত বড় কমিটি করার ব্যাপারে অনেকেরই আপত্তি ছিল। পরে মওলানা ভাসানীকেই কমিটি করার অনুরোধ জানানো হয়। ভাসানী পরামর্শের জন্য একটি ঘরে ঢোকেন এবং কিছুক্ষণ পর বাইরে এসে ৪০ জন নিয়ে একটি কমিটির প্রস্তাব করেন। প্রস্তাবটির ব্যাপারে সবাই একমত হন। কমিটির কর্মকর্তাদের মধ্যে ছিলেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী (সভাপতি), আতাউর রহমান খান, সাখাওয়াত হোসেন, আলী আহমেদ খান, আলী আমজাদ খান ও আবদুস সালাম খান (সহসভাপতি), শামসুল হক (সাধারণ সম্পাদক), শেখ মুজিবুর রহমান (যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক), খন্দকার মোশতাক আহমদ ও এ কে এম রফিকুল হোসেন (সহসম্পাদক) এবং ইয়ার মোহাম্মদ খান (কোষাধ্যক্ষ)।’

ড. শ্যামলী ঘোষ তার ‘আওয়ামী লীগ ১৯৪৯-১৯৭১’ বইয়ে লিখেছেন, ‘১৯৪৯ সালের গ্রীষ্মের গোড়ার দিকে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম লীগের আন্তঃদলীয় দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। দলের অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের পক্ষপাতী সদস্যরা প্রাদেশিক পরিষদের টাঙ্গাইল আসনের উপনির্বাচনে মুসলিম লীগের দলীয় প্রার্থী খুররম খান পন্নীর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ঢাকার বিশিষ্ট মুসলিম লীগের কর্মী শামসুল হককে মনোনয়ন দান করে। শামসুল হক উল্লেখযোগ্য ভোটের ব্যবধানে পন্নীকে পরাজিত করলে প্রদেশে পরিবর্তনের বিরোধিতাকারীদের নড়বড়ে অবস্থানের মুখোশটি উন্মোচিত হয়ে পড়ে। পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির পরবর্তী ঘটনাগুলো এরই স্বাভাবিক পরিণতি বৈ আর কিছু নয়। ১৯৪৯ সালের জুন মাসে কতিপয় মুসলিম লীগ এমএলএ কর্মী যারা দলীয় প্রভুদের অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপে হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে তারা ঢাকায় দুই দিনব্যাপী সম্মেলনের আয়োজন করে।’

পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়া হয় ১৯৫৫ সালে। এ প্রসঙ্গে ড. শ্যামলী ঘোষ তার বইয়ে উল্লেখ করেন, “১৯৫৫ সালের কাউন্সিল অধিবেশনে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রত্যাহার করা হলে ধর্মবর্ণ নির্বিশেষে সকলের জন্য সদস্যপদ লাভের পথ উন্মুক্ত হয়। ১৯৫৩ সালের জুলাই মাসে কাউন্সিল অধিবেশনে সর্বপ্রথম বিষয়টি উত্থাপিত হলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য ভাসানী কর্তৃক জনমত যাচাই না হওয়া পর্যন্ত প্রশ্নটি অমীমাংসিত থাকে (ছিল)।” পাকিস্তানের শোষণ থেকে মুক্তি অর্থাৎ স্বাধীনতার পর দলটির নাম হয় ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’।

এই দীর্ঘ সময় (৭৫ বছর) পাড়ি দিতে আওয়ামী লীগকে কখনো সহ্য করতে হয়েছে শাসকের রক্তচক্ষু, কখনো দলটির নেতা-কর্মীদের ওপর নেমে এসেছে অসহ্য নির্যাতন। এই দলের প্রাণপুরুষ, বাংলাদেশের স্বাধীনতার স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বেশির ভাগ সময় কাটাতে হয়েছে কারা প্রকোষ্ঠে। এমনকি একাধিকবার তার প্রাণ সংশয়ের উপক্রম হয়েছে। স্বাধীনতার পর জাতির পিতাকে সপরিবারে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। এ সময় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর নিষ্ঠুর নির্যাতন, দমন-পীড়ন আর জেল-জুলুম নেমে আসে। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা প্রবাস থেকে দেশে ফেরার পর আওয়ামী লীগ পুনর্গঠন করেন। শেখ হাসিনার আপসহীন নেতৃত্বে ক্রমে সংগঠিত হতে থাকেন দলটির নেতা-কর্মীরা এবং পঁচাত্তর-পরবর্তী দুঃসময় কাটিয়ে ১৯৯৬ সালে জনগণের রায়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।

কিন্তু তারও আগে এই সংগঠনের প্রাণপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান তার কাজের মধ্য দিয়ে হয়ে ওঠেন বঙ্গবন্ধু ও জাতির পিতা। তিনি (শেখ মুজিবুর রহমান) ১৯৫২ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান। পরের বছর ঢাকার ‘মুকুল’ প্রেক্ষাগৃহে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন বঙ্গবন্ধু। প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাজনৈতিক সংগ্রাম, যুক্তফ্রন্ট গঠন ও ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়সহ বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে পঞ্চাশের দশকেই আওয়ামী লীগ হয়ে ওঠে পূর্ব পাকিস্তানের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল তথা প্রধান রাজনৈতিক শক্তি। তবে প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী রাজনৈতিক মতভিন্নতার জন্য ১৯৫৭ সালে দল ছেড়ে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন।

প্রতিষ্ঠার পর থেকেই প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের ওপর বিশেষ গুরুত্বসহ ৪২ দফা কর্মসূচি গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ। শুরুর দিকে দলটির প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে ছিল- বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি, এক ব্যক্তির এক ভোট, গণতন্ত্র, সংবিধান প্রণয়ন, সংসদীয় পদ্ধতির সরকার, আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন এবং তৎকালীন পাকিস্তানের দুই অঞ্চলের মধ্যে বৈষম্য দূরীকরণ। ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে আওয়ামী মুসলিম লীগ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ১৯৬৬ সালেই (ষষ্ঠ কাউন্সিলে) বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। সাধারণ সম্পাদক হন তাজউদ্দীন আহমদ। সপ্তম ও অষ্টম কাউন্সিলে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক অপরিবর্তিত থাকেন। এভাবে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আওয়ামী লীগ এবং গোটা বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। তার নেতৃত্বে পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশকে স্বাধীন করে মুক্তিকামী মানুষ। এরপর আসে ভয়াল ১৫ আগস্ট। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে নৃশংসভাবে নিহত হন জাতির পিতা। এরপর শুরু হয় ভাগ্যক্রমে বেঁচে থাকা তার (বঙ্গবন্ধুর) দুই কন্যা শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার দীর্ঘ দুরূহ পথ।

কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে ১৯৯৬ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। কিন্তু মাত্র পাঁচ বছর দেশ শাসনের পর ২০০১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হয়। পরবর্তী সময় দেশে রাজনৈতিক সংকটের (সেনাসমর্থিত সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ) পর ২০০৮ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল ভোটে জয়ী হয়ে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পুনরায় সরকার গঠন করে। এরপর ২০১৪, ২০১৮ এবং সর্বশেষ ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হয়ে টানা চতুর্থ মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছে।

সম্মেলন করার জন্য একটি হল ভাড়া পেতে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতারা ১৯৪৯ সালে দ্বারে দ্বারে ঘুরে পেয়েছিলেন রোজ গার্ডেন। এই রোজ গার্ডেনে জন্ম নেওয়া দলটি (আওয়ামী লীগ) এখন উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন একটি রাজনৈতিক দল। দলটি (আওয়ামী লীগ) টানা চতুর্থবারের মতো সরকার গঠন করেছে। এখন সম্মেলন করার জন্য কোনো হল খুঁজে বেড়াতে হয় না। ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৈরি হয়েছে আওয়ামী লীগের সুরম্য ভবন। সেখানে রয়েছে অত্যাধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা। তবে বেশ কিছু সময় ৯১, নবাবপুর রোডেও ছিল আওয়ামী লীগের কার্যালয়। 

১৯৬৪ সালের ২৫ জানুয়ারি আওয়ামী লীগকে পুনরুজ্জীবিত করা হয়। তখন এখানেই (৯১, নবাবপুর রোড) বসতেন দলের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এরপর অস্থায়ীভাবে সদরঘাটের রূপমহল সিনেমা হলের গলিতে কিছুদিন বসে অফিস করেন নেতারা। পরে পুরানা পল্টনের দুই জায়গায় দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের অফিস ছিল। ১৯৮১ সালে দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা দলের দায়িত্ব নিলে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের নতুন ঠিকানা হয় ২৩ বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ।

বিদ্যুৎসংকটে দিশেহারা শেরপুরবাসী

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
বিদ্যুৎসংকটে দিশেহারা শেরপুরবাসী
প্রতীকী ছবি

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শেরপুর জেলাজুড়ে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দিনের পাশাপাশি রাতেও বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে শিশু, বৃদ্ধ আর অসুস্থ রোগীরা। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনে কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও টানা এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সন্ধ্যার পর লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। বৈদ্যুতিক পানির পাম্প বন্ধ থাকায় অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। এদিকে সম্প্রতি চলমান বিশ্বকাপ খেলা দেখার সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগে পল্লি বিদ্যুতের দুটি অফিসে হামলার ঘটনা ঘটেছে।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা সদর, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও নকলা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলছে। কোনো কোনো এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। লোডশেডিংয়ের কারণে সেচকাজ ব্যাহত হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। অন্যদিকে ফ্রিজে রাখা খাদ্যপণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া অনলাইনভিত্তিক কাজ, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং ইন্টারনেটনির্ভর কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

ভোগান্তির বর্ণনা দিয়ে জেলা শহরের নারায়ণপুর মহল্লার বাসিন্দা শামীম আহম্মেদ বলেন, ‘গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পরিবারের সবাই কষ্টে আছি। বিশেষ করে ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে দুর্ভোগের শেষ নেই। আমরা দ্রুত এর সমাধান চাই।’

শ্রীবরদী উপজেলার ভায়াডাঙ্গা এলাকার শিক্ষার্থী আয়েশা বলেন, ‘রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছি না। সামনে পরীক্ষা, কিন্তু এ অবস্থায় প্রস্তুতি নেওয়া খুব কঠিন। সন্ধ্যা থেকেই আমাদের এদিকে বিদ্যুৎ থাকে না।’

একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এইডা কী অবস্থা হইল। দিনেও কারেন্ট থাহে না, রাইতেও না। আমরা এল্লা ঘুমাবারও পাই না। সবজি লাগাইছি পানি দিমু, সেটাও হয়তাছে না। পানি না দিলে সবজির ক্ষতি হবে, আমরা বড় বিপদে আছি।’

ঝিনাইগাতী উপজেলা দিঘীরপাড় এলাকার ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দোকানে ফ্রিজে রাখা ঠাণ্ডা জিনিস নষ্ট অইয়া যায়। কারেন্টের এই অবস্থা থাকলে ব্যবসা কইরা টিক্যা থাকা মুশকিল অইব।’

পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির শেরপুর জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭০ মেগাওয়াট। তবে আমরা গড়ে ৩০-৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছি। ফলে প্রায় ৪০-৪২ মেগাওয়াটের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের পরিমাণ ওঠানামা করে। তবু আমরা গ্রাহকদের ভোগান্তি কমিয়ে চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছি। সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি চলমান বিশ্বকাপ খেলা দেখার সময় বিদ্যুতের লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে পল্লি বিদ্যুতের দুটি অফিসে হামলার ঘটনা ঘটে। আমাদের দোষ কোথায়? আমরা তো সরবরাহ কম পাচ্ছি, সে জন্য পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’

জেলা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গত দুই দিন ধরে কিছুটা উন্নতি হয়ে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় ৭-৮ মেগাওয়াট কম পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ জেলায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ৫৩ মেগাওয়াটের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৪৪-৪৫ মেগাওয়াট। আবার কখনো কখনো ৩৩-৩৪ মেগাওয়াট পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘মূলত জাতীয় গ্রিড থেকে কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় আমরা পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে বাধ্য হই। সরবরাহ যখন বাড়ে তখন লোডশেডিং অনেকটাই কমে যায়। সাময়িক এই ভোগান্তির জন্য আমরা গ্রাহকদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’

বাড়ি যেন এক টুকরো আর্জেন্টিনার ক্যানভাস

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৯ এএম
বাড়ি যেন এক টুকরো আর্জেন্টিনার ক্যানভাস
আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে রাঙানো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মেহেদী হাসান। জয়পুরহাট সদর উপজেলার আউশগাড়া গ্রাম থেকে তোলা/ খবরের কাগজ

গ্রামের সড়ক ধরে সামনে এগোতেই দেখা মিলছে সারি সারি আর্জেন্টিনার পতাকা। আরেকটু যেতেই আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে রাঙানো একটি বাড়ি। দেয়াল, গেট, বারান্দা সবখানেই আকাশি-সাদা রঙের ছোঁয়া। এটি যেন শুধু একটি ইট-সুরকির বাড়ি নয়, বরং এক ফুটবলপ্রেমীর স্বপ্ন ক্যানভাসে আঁকা গল্প। বাড়িটির এক পাশের দেয়ালে আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসির ছবি আঁকা। এসব দেখে মনে হতেই পারে আর্জেন্টিনার কোনো গ্রামের দৃশ্য! ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ আর্জেন্টিনার ফুটবল আর লিওনেল মেসির প্রতি ভালোবাসা থেকেই নিজের বাড়িটিকে এমন রূপ দিয়েছেন জয়পুরহাটের মেহেদী হাসান।

জয়পুরহাট সদর উপজেলার আউশগাড়া গ্রামের এই তরুণের কাছে আর্জেন্টিনা শুধু একটি ফুটবল দল নয়, বরং এটি আবেগের নাম। সেই আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ‘ফুটবলের জাদুকর’ লিওনেল মেসি। প্রিয় দল আর প্রিয় খেলোয়াড়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই নিজের আট শতক জায়গাজুড়ে থাকা বাড়িটিকে আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে সাজিয়েছেন তিনি। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ফুটে উঠেছে আর্জেন্টিনার ফুটবল ঐতিহ্যের ছাপ। শুধু বাড়ির রং নয়, গ্রামের সড়কের মোড় থেকে কয়েক শ গজ দূরে তার বাড়ি পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে লাগিয়েছেন আর্জেন্টিনার পতাকা।

ছোটবেলা থেকেই মেহেদী আর্জেন্টিনার সমর্থক। সময়ের সঙ্গে সেই ভালোবাসা আরও গভীর হয়েছে। বিশেষ করে মেসির প্রতি ভালোবাসা তাকে সব সময় অনুপ্রাণিত করে। মেসির খেলা ও ব্যক্তিত্ব তাকে এত বিমোহিত করেছে যে, প্রায় ২ লাখ টাকা ব্যয়ে নিজের পুরো বাড়ি আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে রং করেছেন। ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায় প্রিয় দলকে ঘিরে এমন আয়োজন নজর কেড়েছে জেলার মানুষের। তাই সেই বাড়ি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ফুটবলপ্রেমীরা। 

জেলা সদরের খনজনপুর গ্রামের মারজান হোসেন বাড়িটি দেখতে এসে তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘জয়পুরহাটে এ রকম পতাকার আদলে বাড়িতে রং করা আগে কখনো দেখিনি। তাই মেহেদীর বাড়িটি দেখতে এসেছি। তিনি আর্জেন্টিনার একজন ভক্ত। নিজের জেলায় এমন উদ্যোগ দেখে খুবই আনন্দ লাগছে।’

এলাকাবাসী জানান, এ গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ আর্জেন্টিনার সমর্থক। তাই মেহেদী হাসানের এই কাজ গ্রামবাসীর বিশ্বকাপের আনন্দ আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সদরের দুর্গাদহ গ্রামের মামুন হোসেন ফেসবুকের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার পতাকার মতো বাড়ি রং করার বিষয়টি জানতে পেরে দেখতে আসেন। তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনার ভক্ত বলে এই বাড়িটি না দেখে থাকতে পারলাম না।’

মেহেদীর এই আয়োজনে খুশি তার পরিবারের সদস্যরাও। তার স্ত্রী পাপড়ী আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামীর মতো আমিও আর্জেন্টিনার সমর্থক। আমার স্বামীর এই কাজ আমার ভালোই লাগছে।’

মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমি ও আমার পরিবারের সবাই আর্জেন্টিনার সমর্থক। মেসিকে আমার খুবই পছন্দ। এ ছাড়া ম্যারোডোনা ও ডি মারিয়ার মতো খেলোয়াড় আর্জেন্টিনায় খেলেছে। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা মার্জিতভাবে ফুটবল খেলে। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই বাড়িটি দেখতে আসায় আমার অনেক ভালো লাগছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে আমার বাড়িতে বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করেছি, সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও করা আছে।’

বিশ্বকাপে এবারের আসরে আর্জেন্টিনার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দিন গুনছেন মেহেদী হাসান। তাই আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন প্রিয় দল বিশ্বকাপ জিতলে খাসি জবাই করে এলাকাবাসীকে আপ্যায়ন করবেন। ফুটবল বিশ্বকাপের আমেজ শেষ হয়ে যাবে কিছুদিন পর, কিন্তু ফুটবলপ্রেম আর মেসির প্রতি ভালোবাসার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে এই ব্যতিক্রমী বাড়িটি।

ভালোবাসা বটমূলে

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২২ পিএম
ভালোবাসা বটমূলে
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

ভোর ৫টায় মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতেই শমীকের ঘুম ভেঙে গেল। ডানপাশে টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে দেখে স্ক্রিনে তার বন্ধু চন্দন রায়ের নাম।
‘কীরে শমীক, ঘুম ভেঙেছে? আজ পয়লা বৈশাখ, মনে আছে তো?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে। আমি ৬টার আগেই বটমূলে পৌঁছাতে চাই। তুই সময়মতো রমনা পার্কের প্রধান গেটে গিয়ে অপেক্ষা করবি, আমরা একসঙ্গে ভেতরে যাব।’
‘ঠিক আছে দোস্ত, আজ সারা দিন আমরা একসঙ্গে কাটাব। বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখব, গান শুনব। তার পর যাব চারুকলায়, মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখব, ওদের সঙ্গে হাঁটব।’
‘তার পর আমরা যাব ধানমন্ডি লেকের পাড়ে, ওখানে নববর্ষের অনেক অনুষ্ঠান হয়। খাওয়াদাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থাও থাকে। আজ দুপুরের খাওয়া ওখানেই হবে।’
‘সবই ঠিক আছে, সবই হবে। কিন্তু তোর গার্লফ্রেন্ড চৈতি আজকের দিনে আমাদের সঙ্গে থাকবে না, এটা ভাবতেও আমার খারাপ লাগছে। আগে প্রতিটি পয়লা বৈশাখে আমরা তিনজন একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম, কত আনন্দ করতাম। হঠাৎ তোদের কী হলো? তোরা আড়ি দিলি কেন?’
‘আমি তো আড়ি দিইনি, ওই দিয়েছে। মেয়েটা বড় সেনসিটিভ, ওর আঁকা পেইন্টিং নিয়ে ঠাট্টা করে কিছু একটা বলতেই ও রেগে গেল, কথা বন্ধ করে দিল। তিন মাস হয়ে গেল আমাকে ফোন করে না, ফোন ধরে না। দেখা হলে কথাও বলে না।’
‘ঠিক আছে, আজ যদি চৈতিকে বটমূলে পাই, আমি কথা বলব ওর সঙ্গে। আড়ি ভাঙিয়ে তোদের ভাব করিয়ে দেব। চিন্তা করিস না। এখন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে যা। ৬টার মধ্যেই বটমূলে পৌঁছতে হবে।’ 

২.
শমীক মাহমুদ ও চন্দন রায় দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র। তৃতীয় বর্ষ অনার্সে ওরা পড়ছে। শমীক থাকে শহীদুল্লাহ হলে, জগন্নাথ হলে থাকে চন্দন। ওরা এইচএসসি পাস করেছে একই সঙ্গে ঢাকা কলেজ থেকে। সেখানে হোস্টেলে থেকেছে একই রুমে। শুরু থেকেই ওদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব। শমীক কবিতা লেখে স্কুলজীবন থেকেই। এখন তার কবিতা প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়। কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বন্ধু চন্দন কবিতা না লিখলেও শমীককে কাব্যচর্চায় উৎসাহ দেয়। 
শমীক ও চন্দন দুজনেই চিত্রশিল্পের অনুরাগী। চারুকলা ইনস্টিটিউটে কোনো প্রদর্শনী থাকলে ওরা যাবেই। এ কারণেই চারুকলায় তাদের যাতায়াত ছিল। এমনি এক চিত্র প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে ওদের পরিচয় হয়ে গেল ফাইন আর্টস বিভাগের ছাত্রী চৈতি রহমানের সঙ্গে। চারুকলা চিত্রশিল্প নিয়ে কথা বলতে বলতে ওদের সম্পর্ক, আরও ঘনিষ্ঠ হলো। শমীক কবিতা লেখে জেনে চৈতি খুশি হলো। সেও কবিতা পছন্দ করে, মাঝেমধ্যে লিখেও ফেলে। 
ওদের প্রায়ই দেখা যায় টিএসসি অথবা মধুর রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে, চা খাচ্ছে। কখনো ওরা বেইলি রোডের কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসে। শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানেও যায়, নাটক দেখে। এভাবে দিন গড়িয়ে যায়, ওদের লেখাপড়াও এগিয়ে চলে। 
চন্দন একদিন বুঝতে পারে শমীক ও চৈতির সম্পর্কটা বন্ধুত্বের পর্যায় ছেড়ে আরও কিছুটা এগিয়ে গেছে। চৈতির প্রতি চন্দনের দুর্বলতা ছিল ঠিকই, কিন্তু সে বাস্তববাদী। বাস্তবকেই মেনে নেয় চন্দন। নিজেকে সে গুটিয়ে নিতে থাকে ওদের কাছ থেকে। মনে মনে বলে, ‘সত্য যে বড়ই কঠিন/ সে কখনো করে না বঞ্চনা/ তাই কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’ 
কিন্তু শমীকের কাছে ধরা পড়ে যায় চন্দন। শমীক তাকে সরাসরি প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে তোর? তুই আমাদের কাছ থেকে দূরে থাকিস কেন?’
‘দূরে কোথায়, তোদের কাছেই তো থাকি। আমাকে ডাকলেই পাওয়া যায়।’
‘তা পাওয়া যায়, কিন্তু ডাকতে হবে কেন? আমরা তিনজন একসঙ্গে ছিলাম, এক সঙ্গেই থাকতে চাই। কিন্তু তুই একটু দূরে সরে গেছিস। কেন বুঝতে পারছি না। তাই জানতে চেয়েছি কী হয়েছে।’
এবার চন্দন হেসে ফেলে। শমীকের পিঠে হাত রেখে বলে, ‘কিছুই হয়নি দোস্ত, সব ঠিক আছে। আমি তোকে খুব ভালোবাসি, সব সময় তোর ভালোটাই আমি চাই। তাই তোর পথ থেকে একটু সরে দাঁড়ালাম। তোরা দুজন এগিয়ে যা। আমি তোদের পাশে না হলেও ঠিক পেছনে আছি।’ 
‘না, আমি তোকে আমার পাশেই চাই। আমরা তিনজন আগের মতোই একসঙ্গে থাকব, একসঙ্গে ঘুরে বেড়াব। একজনকে পাওয়ার জন্য তোকে আমি হারাতে চাই না চন্দন।’
‘বোকার মতো কথা বলছিস শমীক। আমি তো হারিয়ে যাচ্ছি না। তোদের সঙ্গেই থাকব। আমি শুধু তোদের দুজনকে স্থায়ীভাবে এক করে দিতে চাই। তোর আর চৈতির জুটিটা চমৎকার হবে। একজন কবি, আরেকজন শিল্পী, তোদের দুজনেরই কাজ অনেক সুন্দর হবে, সৃষ্টিশীলতা অনেক বাড়বে।’

৩.
সেদিন বাংলা নববর্ষ-পয়লা বৈশাখ। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল। ভোর ৬টার মধ্যেই শমীক পৌঁছে যায় রমনা পার্কের প্রধান গেটে। গিয়ে দেখে চন্দন আগেই এসেছে সেখানে।
‘শুভ নববর্ষ শমীক। তোকে অনেক ধন্যবাদ, সময়মতো এসেছিস। হালকা নীল রঙের পাঞ্জাবি পরেছিস, তোকে খুব মানিয়েছে।’
‘শুভ নববর্ষ চন্দন। হ্যাঁ, এই পাঞ্জাবিটা আমার খুব পছন্দের। গত বছর নববর্ষে চৈতি উপহার দিয়েছিল। একবার ভাবলাম এটা আর পরব না। তার পরেই মনটা কেমন হয়ে গেল। এটাই পরে ফেললাম।’
‘খুব ভালো করেছিস। তোকে এই পাঞ্জাবি পরা দেখলে চৈতির মনটাও নরম হয়ে যাবে। তোদের মান-অভিমানের মীমাংসা আজই করে ফেলব। চল বটমূলের দিকে যাই। দেখি চৈতি এসেছে কি না।’
ওরা দুজন মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে থাকে। তখন ঘড়িতে সোয়া ৬টা। নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ এসে গেছে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে। নবীন-প্রবীণ সব বয়সী মানুষ আসছেন রমনায়, অনেক দম্পতির সঙ্গে তাদের শিশু সন্তানও আছে। 
রমনার প্রাঙ্গণে জনতার ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। বেশির ভাগ পুরুষের পরনে পাঞ্জাবি-সাদা অথবা রঙিন। মেয়েরা প্রায় সবাই লালপাড় সাদা শাড়ি পরেছে। চুলে কানের পাশে অথবা খোঁপায় ফুল গুঁজেছে অনেকেই। অল্পবয়সী মেয়েরা ফুলের রিং মাথায় দিয়ে হাসি-উল্লাসে মেতেছে। তরুণ-তরুণীদের জটলা এখানে-ওখানে। সকালের নরম রোদ আর স্নিগ্ধ বাতাস, আনন্দ-মুখর মানুষের সমাবেশ আর বর্ষবরণের গান, রমনার প্রাঙ্গণকে নতুন রূপে সাজিয়েছে। 
‘এটাই বাঙালির বর্ষবরণ। এক সময় পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন হতো শুধু গ্রামাঞ্চলে, এখন এটা এসে গেছে শহরে, নগরে। ঢাকা মহানগরীতে নববর্ষের অনুষ্ঠান বেশি হয়। তাই না শমীক?’
‘ঠিকই বলেছিস চন্দন। পাকিস্তানি শাসনামলে ওরা বলত পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ উদ্‌যাপন এ দেশের সংস্কৃতি নয়, ওটা ভারতীয় সংস্কৃতি। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঘোষণা করলেন, পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন করতে দেওয়া হবে না। ফলটা কী হলো? বাঙালিরা খেপে গিয়ে আরও বেশি করে নববর্ষ উদ্‌যাপন করতে থাকে। রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান শুরু হয় ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। প্রতি পয়লা বৈশাখে ছায়ানটের অনুষ্ঠান এখনো চলছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু একবার বন্ধ ছিল।’
চন্দন লক্ষ করে শমীক যখন কথা বলছে, তার চোখ এদিকে-ওদিকে কাকে যেন খুঁজছে। বোঝা গেল শমীকের চোখ খুঁজছে চৈতিকে। চন্দন চুপ করে থাকে, কিছু বলার তো নেই। যে করেই হোক আজ চৈতিকে খুঁজে বের করতেই হবে। 
হঠাৎ চন্দনের সামনে এসে দাঁড়ায় ওদের সহপাঠী অপর্ণা বড়ুয়া। অপর্ণা হেসে বলে, ‘শুভ নববর্ষ। তা তোমরা দুজন কেন, আরেকজন কোথায়?’
‘কার কথা বলছ অপর্ণা?’ শমীক জানতে চায়।
‘ন্যাকা। কিছুই বোঝ না? চৈতি কোথায়? তোমাদের সঙ্গে নেই কেন?’
‘চৈতি এখনো আসেনি, আসবে।’
‘আসবে বলছ কেন? ও তো এসে গেছে। বটমূলে অনুষ্ঠানের ডানদিকে দাঁড়িয়ে গান শুনছে। লালপাড়, সাদা শাড়ি, কপালে লালটিপ, ওকে কী সুন্দরই না লাগছে। বেচারা একা দাঁড়িয়ে আছে। তোমরা ওর কাছে যাও।’
চন্দন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। শমীকের হাত ধরে বলে, ‘চলো দোস্ত বটমূলে যাই। চৈতি তোর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।’
‘তুই যা। ওকে আমার কাছে আসতে বল।’
‘ঢং করিস না তো। ওটা মেয়েদের মানায়, পুরুষদের নয়। চল আমার সঙ্গে।’ 
শমীকের হাত ধরে চন্দন এগিয়ে যায় বটমূলের দিকে। তখন সকাল ৮টা বাজতে কিছু সময় বাকি। বহু মানুষ বিশাল বটগাছের ছায়ায় বসে গান শুনছে-বর্ষবরণের গান। বটমূলে নিচ থেকে ওপরে, সারি সারি কাঠের বেঞ্চ দিয়ে তৈরি বিরাট মঞ্চে বসে ছায়ানটের শিল্পীরা গান গাইছে। শিল্পীদের মধ্যে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, সবাই আছে। এরা সবাই ছায়ানটের শিক্ষার্থী। একই রঙের পোশাক পরেছে। 
বটমূলে মঞ্চের ঠিক বিপরীত দিকে এসে দাঁড়ায় শমীক ও চন্দন। ওদের সামনেই বিপুল সংখ্যক শ্রোতা মাঠে বসে গান উপভোগ করছে। মাঠের একপাশে উঁচু প্লাটফর্মে বিটিভির ক্যামেরা দিয়ে অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার চলছে। 
চন্দনের চোখ হঠাৎ গেল ডানদিকে। সে দেখে চৈতি দাঁড়িয়ে আছে আরও অনেক মানুষের সঙ্গে। তাকিয়ে আছে এই দিকে। লালপাড় সাদা শাড়িতে ওকে অপূর্ব লাগছে। 
‘শমীক, ওই দ্যাখ তোর চৈতি, এদিকেই তাকিয়ে আছে। যা ওর কাছে।’
শমীক যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই বিকট শব্দে একটা বিস্ফোরণ। একটি শক্তিশালী বোমা ফেটেছে বসে থাকা শ্রোতাদের মাঝখানে। ধোঁয়া, বারুদের গন্ধ, আহত মানুষের আর্তনাদ। শিল্পীদের গান থেমে গেছে। মানুষের হুড়োহুড়ি, সবাই ছুটে যাচ্ছে যে যেদিকে পারে। পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী, সবাই যাচ্ছে আহতদের উদ্ধার করতে। 
কিছুক্ষণ পরেই আর একটি বোমা ফাটল একই জায়গায়। শমীক যখন কোনোদিকে যাবে ভাবছে, ঠিক তখনই তাকে কেউ জড়িয়ে ধরল সামনের দিক থেকে। শমীক দেখে একজন নারী তাকে জড়িয়ে ধরেছে। তার চুলের গন্ধ আর দেহের স্পর্শে শমীক বুঝতে পারে এ তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয়বান্ধবী চৈতি। ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। শমীক ওকে শক্ত করে ধরে রাখে। 
‘ভয় নেই চৈতি। আমি তো আছি তোমার সঙ্গে। চলো আমরা এখান থেকে অন্যদিকে যাই।’

নববর্ষের উৎসব: উৎস থেকে নিরন্তর

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
নববর্ষের উৎসব: উৎস থেকে নিরন্তর
ছবি: খবরের কাগজ

বাঙালির উৎসবের আয়োজনে সামর্থ্যের চেয়ে অতিশয়োক্তি থাকে বৈকি। জাতি হিসেবে এ ধারা আমাদের উৎসবমুখর বললে বাড়িয়ে বলা হবে না বোধকরি।

উৎসব মানেই আনন্দ, হইহুল্লোর, খাওয়াদাওয়া, বেড়ানো- কত কী। বাঙালির জীবনে ঈদ, পূজা ও বাংলা নববর্ষ বড় উৎসব। ঈদ ও পূজা ধর্মীয় উৎসব হলেও বাংলা নববর্ষ সব ধর্মের মানুষ উদ্‌যাপন করে এ জন্য এ উৎসব সর্বজনীন। একসময় গ্রাম বাংলায় নববর্ষকে ঘিরে গ্রামের মেলা, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, ঘুড়ি ওড়ানোসহ নানা আয়োজনে নববর্ষকে কেন্দ্র করে আনন্দের ধুম পড়ে যেত। স্মৃতির খাতার পাতা উল্টিয়ে আজও উঁকি দেয় ছোটবেলার গ্রামের মেলার কাঁচাগোল্লা, গরমজিলিপি, খাজা, মাটির পুতুল, ঘোড়াসহ হরেক রকম জিনিস। নাগরদোলার দোল যেন আজও মনে দোলা দেয়। নববর্ষের মেলার মাটির খেলনা ছোটবেলায় যজ্ঞের ধন মনে হতো। সময় বদলে নববর্ষের উৎসব ভিন্ন আঙ্গিকে রূপ নিয়েছে। সরকার বাংলা নববর্ষে সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি একটি উৎসব ভাতা প্রদান করায় বাংলা নববর্ষের আয়োজনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। 

প্রতি বর্ষের সমাপ্তে বাংলা নববর্ষ হাজির হচ্ছে বৃহৎ পরিসরে বাঙালির জীবনে। বাংলা নববর্ষ দিনদিন পরিসর বৃদ্ধি করে রং ছড়াচ্ছে। মানুষের গায়ের জামা থেকে শুরু করে মঙ্গল শোভাযাত্রার পাপেটের রং ও বৈচিত্র্যে ভরপুর। উৎসবের আমেজে বাঙালি নববর্ষে সাজায় নিজেকে নতুন কাপড়ের মোড়কে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে বাঙালিয়ানাকে ধারণ করে আমরা জীবনের চলার পথের নতুন আনন্দ খুঁজে পাই। যদিও সারা বছরে নববর্ষের বাঙালিয়ানার রক্ষক আমরা থাকি না। তবু নববর্ষ জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে এক সর্বজনীন উৎসব। বাঙালির মহামিলনের একটি উপলক্ষ। 

বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস পাঠ মত-মতান্তরে ভরপুর। বাংলা নববর্ষের প্রচলন- এমনকি ছায়ানটের নববর্ষের উদ্‌যাপনের সূচনার ইতিহাস নিয়েও মত-মতান্তর রয়েছে। কবে, কোথায়, কে বা কারা করেছিলেন এরূপ প্রশ্ন ছুড়লে বাংলা নববর্ষের উৎপত্তির ইতিহাস তর্কের বেড়াজালে জড়িয়ে যায়। আর যারা এসব বিষয় নিয়ে চর্চা করেন তারা সমাধানে পৌঁছনোর চেয়ে নিজের শক্ত বা নরম-যুক্তি যাই হোক না কেন- সেই অবস্থানেই থিতু হয়ে থাকতে চান। বাংলা নববর্ষের প্রবর্তনের ইতিহাসে অনেকের নাম এলেও সবচেয়ে আলোচিত ও প্রচলিত নামটি হচ্ছে মুঘল সম্রাট জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবরের। মুঘলরা মুসলিম হিসেবে রাজ্য শাসন অনুসরণ করত হিজরি সন অনুযায়ী। হিজরি সন চান্দ্র সন। সমস্যা হচ্ছে হিজরি সন সৌরবর্ষের চেয়ে ১০-১১ দিন ছোট। ফলে গাণিতিক হিসেবে তিন বছর অন্তর সৌর সনের চেয়ে হিজরি সন এক মাস এগিয়ে আসে, এভাবে আকবরের সিংহাসন আরহণের সময় ১৫৫৬ খ্রি. থেকে শুরু করে মোট ২৯ বছর রাজত্বকালে প্রচলিত শতাব্দের সঙ্গে হিজরি সনের সময় তারতম্য ঘটেছিল ৯ মাসের।

আরেকটি বড় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল খাজনা আদায় নিয়ে। কারণ মুঘলরা হিজরি সনের অনুসারী হয়ে রাজ্য পরিচালনা করলেও হিজরি সনের মাসগুলো মৌসুম ঋতুকেন্দ্রিক ছিল না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ফসল কাটার সময় নির্দিষ্ট করে খজনা আদায়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের অর্থনীতি ছিল কৃষিভিত্তিক। তখনকার জনজীবন মূলত কৃষির আবহে চলত। কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ে সুবিধার জন্য আকবর তারিখ-ই-ইলাহি সন বলে নতুন সন চালু করেছিলেন। মূলত আকবরের আদেশে দরবারের সেরা পণ্ডিত জ্যোতিষ শাস্ত্রবিদ আমির ফাতেহ উল্লাহ্ সিরাজি বাংলা সনের উদ্ভাবন করেন। ফাতেহ উল্লাহ সিরাজি আকবরের সিংহাসনে আরোহণের তারিখ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৫৫৬ খ্রি.-কে ভিত্তি ধরে সন গণনা শুরু করেন। সেই থেকে বাংলা সনের পথচলা। একটি বিষয় বলে রাখা উচিত আকবরের প্রচলিত সর্বজনীন নতুন ধর্ম ‘দ্বিন-ই-ইলাহি’ ও তারিখ-ই-ইলাহির সময়কাল অভিন্ন। কালের আবর্তে দীন-ই-ইলাহি পথ চলতে না পারলেও আকবরের নির্দেশে ফতেহ উল্লাহ্ সিরাজি প্রবর্তিত বাংলা সনকে কার্যকর করেছিলেন আকবরের সজ্ঞা ও প্রজ্ঞায় ঋদ্ধ অর্থ উপদেষ্টা টোডরমল। তিনি ১৫৮৫ খ্রি. ১০ মার্চ ইলাহি সনের কার্যকরণ ঘটান। এ সময় থেকে বাংলায় খাজনা আদায়ে বাংলা সন গণনা করা হয়। উল্লেখ্য, বাংলা সন প্রবর্তনের আগে হিসাব সমন্বয়ের কাজটি জটিল ছিল। কারণ উপমহাদেশে শতাব্দসহ হিসাব ছিল সৌর বর্ষ। কিন্তু হিন্দু-মুসলিম বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি চন্দ্র মাসের হিসাবে মান্য করা হতো। সৌরবর্ষ যেহেতু হিসাবের নিক্তিতে তিন বছর অন্তর এক মাস এগিয়ে যেত তাই হিসাবের সুবিধার্থে প্রতি তিন বছর অন্তর প্রাচীন আরবি রীতির মতো এক মাস নামমন্ত্র হিসাবে সংযোগ করে বাদ দেওয়া হতো। গোঁজামিলের এ পদ্ধতির নাম ছিল ‘সাবনমিতি’। 

চন্দ্রমাস ও সৌরবর্ষের ব্যবহারের প্রাচীন রীতির একটি সমন্বয় ও সরলীকরণের মানসেই আকবর বাংলা সনের প্রচলন করেছিলেন। সৌরবর্ষ ও চন্দ্রবর্ষের সমন্বয়ে বাংলা সন ও মাসে সৌর ও চন্দ্রের রেশ বয়ে যায়। যেমন বিশাখা নক্ষত্রের আদলে নাম বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠা নক্ষত্রের আদলে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া নক্ষত্রের আদলে আষাঢ়, শ্রবণা নক্ষত্রের আদলে শ্রাবণ, ভাদ্রপদা নক্ষত্রের নামের আদলে ভাদ্র, অশ্বিনী নক্ষত্রের আদলে আশ্বিন, কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে কার্তিক, আমন থেকে অগ্রহায়ণ, পুষ্য নক্ষত্র থেকে পৌষ, মঘা নক্ষত্রের আদলে মাঘ, ফাগুনী নক্ষত্র থেকে ফাগুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র।

ওপরের বর্ণনা তো গেল আকবর অখ্যান। কিন্তু বাংলা সনের ব্যুৎপত্তির উৎসে আকবরের নাম ছাড়া তো আরও কিছু নাম, স্থান ও সময়ের সংযোগ রয়েছে। বাংলা সনের হিসাবের সূত্রপাতে আকবরের পাশে পেরেক ঠুকে নাম আছে- রাজা শশাঙ্ক তিব্বতের রাজা রিস্প্রভ-সন, বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্, মুর্শিদ কুলি খাঁসহ আরও অনেকের নাম। তবে বাংলা সন প্রবর্তক হিসেবে মহামতি আকবরের পাল্লাই ভারী। আকবর ছিলেন সুন্নি মুসলিম। তার জাতিসত্তার ঐতিহ্য ছিল তুর্কি আতর মাখা। জাতিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে মুঘলরা ছিল ইন্দো-পারসিক। শাসক হিসেবে আকবর বিচক্ষণ ছিলেন। তার আমলেই মুঘল রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয়েছিল। তিনি সৌর ও চন্দ্রবর্ষের সমন্বয় করে প্রজাদের ফসল তোলার সময় বর্ষের গণনা শুরু করেছিলেন সুদূরপ্রসারী ধ্যান ও ধারণা থেকে। তিনি দিব্যদৃষ্টিতে বুঝেছিলেন প্রজাদের আর্থিক সচ্ছলতার সময় খাজনা আদায় সুবিধাজনক। আকবরের বাংলা সনে প্রজাদের খাজনা নবায়নের পাশাপাশি বাংলায় বাংলা সনের শুরুতে ব্যবসায়ীদের হালখাতা প্রচলন ধীরে ধীরে রেওয়াজে পরিণত হয়। তবে বাঙালি সমাজে নববর্ষকে নাগরিক মোড়কে নানা রঙে উৎসবের ডামাডোলে গ্রহণের রেওয়াজ সাম্প্রতিক। বাঙালির জীবনের বিশেষত ঢাকার নাগরিক সমাজে নববর্ষ বরণের প্রসঙ্গ এলেই প্রভাতে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ সংগীতের কথা আসে। ছায়ানটের বর্ষবরণে শুরুর সময়ে ১৯৬৪, ১৯৬৫, ১৯৬৭ সালের দাবি আছে। তবে ড. সন্জিদা খাতুনের লেখার তথ্য হলো, ‘১৯৬৭ সালের ১৫ এপ্রিল শনিবার ছিল পয়লা বৈশাখ। অবজারভার ১৪ তারিখের কাগজে নতুন বছরকে আবাহন করেছে- welcome pahela Baishakh শিরোনামে। সে বছর দেশের নানা অঞ্চল থেকে বর্ষবরণের খবর আসে ঢাকায়। প্রত্যুষে ছায়ানটের অনুষ্ঠান, এ বছরেই প্রথম রমনার বটমূলে। 

অবজারভার পত্রিকা পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনের ছবি ছাপে। এতে দেখা যায় হার্মোনিয়ামে আছে শাহীন আক্তার, তানপুরা বাজিয়ে গান গাইছেন মাহমুদুর রহমান মাহমুদ (বেনু)। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৬৭ সালের নববর্ষে শহিদ মিনার থেকে প্রভাতফেরি শুরু করেছিল।’

পয়লা বৈশাখে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎসবের আয়োজন নগরের গণ্ডি পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে নববর্ষে যে বাঙালিয়ানা পরিচয়ে প্রকাশিত- আমরা সারা বছর সেই ভাবনা ও চর্চা থেকে দূরে থাকি। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রার মঙ্গল কামনায় মানুষের ঢল আমাকেও তাড়িত করে। কিন্তু প্রতিদিন আটপৌঢ়ে বাঙালি জীবনচর্চার মেলবন্ধন থেকে আমাদের সরে যাওয়া কাঙ্ক্ষিত নয়। মাঝে মাঝে সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনে সরকার কিছু নির্দেশনাও জারি করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই দূরে থাকে। আমরা বাংলা দিন তারিখ এমনকি অনেক সময় মাসের নামও মনে রাখি না। 

শুধুই নববর্ষে বাঙালির হাজার বছরের লৌকিক আচারকে প্রতীকীরূপে ধারণ ও পালন করা নববর্ষের তাৎপর্য হতে পারে না। নববর্ষের নানা রঙের সঙ্গে মিশে আছে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। ধর্ম ও সংস্কৃতিভেদে আমাদের জাতিগত ইতিহাসের পথ পরিক্রমণের সমন্বয়সূত্র। নববর্ষের নব আভায় আমাদের প্রাচীন ইতিহাসের শিকড়ের অনুসন্ধান প্রয়োজন।

বাংলা নববর্ষের উৎসবের পরিবর্তনে আমাদের গ্রামবাংলার নববর্ষের মেলাগুলোর রূপান্তর সবচেয়ে বেশি। গ্রাম্য নববর্ষের মেলায় কিছুদিন আগেও বাতাসা, কদমা, চিনির সাজ, জিলাপি, তিলের খাজা, গজা, ঝুরি, ইত্যাদি ছিল অন্যতম উপকরণ। এ ছাড়া গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় সব উপকরণ যেমন- চাষের লাঙল, জোঁয়াল, মই, ডালা, ঢেঁকি, চালুন, কুলা, শীতলপাটি ইত্যাদি পাওয়া যেত। এখন গ্রাম্য মেলায় শহরের জিনিসপত্র বেশি দেখা যায়। লোকজ বাংলার গ্রাম্য মেলার উপকরণগুলো আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

গ্রাম্য মেলাগুলোর চিরায়ত রূপ পরিবর্তন বৈশাখী নববর্ষের রূপের সঙ্গে বড়ই অপরিচিত। বাঙালির বর্ষবরণের অসাম্প্রদায়িক চেতনার খবর ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। এখন শুধু চর্চা ও চেতনায় প্রয়োজন বাঙালিয়ানা ধারণ ও লালন করার বছরব্যাপী প্রত্যয়ের। তবেই আমাদের পথচলায় প্রকাশ পাবে নববর্ষের বাঙালির জাতিসত্তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের।

নববর্ষের উৎসবের শেকড়ের সন্ধান যেমন ছিল একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির নবায়ন ও নিরন্তর যাত্রার উপলক্ষ ছিল আজ নববর্ষের উৎসবের মোড়কি রূপ আরও ঝকমকে হয়েছে- কিন্তু কমেছে ভূমিজ সংস্কৃতির কর্ষণের উত্তাপ। তাই আজও মনোজমিনে হারিয়ে খুঁজি শৈশবের নববর্ষের ‘মদনার মার’ মেলার কাঁচাগোল্লা ও মাটির খেলনা।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

বাংলাদেশ অপূর্ব ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের প্রকৃতির রূপ-রসের বদল ঘটে। হাজার বছর ধরে চক্রাকারে এ বদল ঘটে আসছে। কীভাবে এবং কেমন করে এ বদল ঘটে- তার স্বরূপটি ধরা আছে আমাদের হাজার বছরের সাহিত্য ও সংগীতে। বাংলা সাহিত্যের পাঠক মাত্রই তা জানেন। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতির চালচিত্র ছিটাফোঁটা থাকলেও মধ্যযুগের সাহিত্যে বিধৃত হয়েছে। কালকেতু উপাখ্যানে ফুল্লরার বারোমাস্যায় সব ঋতুরই বিবরণ আছে। বৈষ্ণব-পদাবলিতে ঋতুবদলের সঙ্গে প্রকৃতির রূপের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। রাধার প্রেমানুভূতির নানামাত্রিক প্রকাশও অনেকটা ঋতুসাপেক্ষ। বাংলা আধুনিক সাহিত্যে মানব জীবনের অনুষঙ্গে এ দেশের ঋতু ও প্রকৃতির উপস্থিতি কোনো কোনো সাহিত্যিক অবিস্মরণীয় করে রেখেছেন; এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জসীম উদদীন, বন্দে আলী মিয়া প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। এমনকি তিরিশোত্তর আধুনিক কবিদের মুখ্যজন জীবনানন্দ দাশ হেমন্ত ঋতুকে বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী করে গেছেন।

রবীন্দ্রনাথ তার নানাবিধ সৃজনকর্মে- বিশেষত কাব্য, নাটক, ছোটগল্প, সংগীত, চিঠিপত্র ইত্যাদি রচনায় বাংলার ঋতুভিত্তিক প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্য চিত্রিত রেখেছেন। তিনি গীতবিতানের গানগুলোর বিষয়ভিত্তিক যে বিন্যাস করেছেন তাতে প্রকৃতি পর্যায়ের ২৮৩টি গান আছে। এ ছাড়া গীতবিতানের প্রেম ও প্রকৃতি পর্যায়ের গান এবং  গীতিনাট্যের কিছু গানেও প্রকৃতির প্রসঙ্গ লক্ষণীয়। 

রবীন্দ্রনাথ রচিত, আমাদের বাল্যকালে স্কুলপাঠ্য, সেই অবিস্মরণীয় (সহজপাঠ, প্রথম ভাগ, প্রকাশকাল: বৈশাখ ১৩৩৭) কবিতা ‘আমাদের ছোট নদী’। এর প্রথম দুটি পঙ্‌ক্তি বাঙালি-পড়ুয়া মাত্রই স্মরণ করতে পারেন: ‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে,/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’ কবিতাটির দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিতেই ‘বৈশাখ’ মাসের উল্লেখ আছে। এ কবিতায় বৈশাখের প্রকৃতি-পরিবেশ কবি পঙ্‌ক্তিবদ্ধ করেছেন। বৈশাখের রুক্ষতা, দাবদাহ, প্রায় জলশূন্য হাঁটুজলের নদী এবং এরকম অনুষঙ্গে যে জঙ্গম মানবজীবন তারই চালচিত্র রয়েছে রচনাটিতে। বাঙালি কিশোর-কিশোরীর চিরকালীন দুরন্ত ছেলেবেলার চিত্র পাই বৈশাখের হাঁটুজলের নদীর বিবরণে: ‘তীরে তীরে ছেলেমেয়ে নাহিবার কালে/ গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।/ সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে/ আঁচলে ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।’

বাংলা নববর্ষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা ‘নববর্ষে’। কবিতাটি চিত্রা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত। এর রচনাকাল পয়লা বৈশাখ ১৩০১। প্রত্যক্ষভাবে বৈশাখের কথা উল্লেখ না করলেও মূলত বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে (বৈশাখের প্রথম দিন) কবির উপলব্ধি কী তা অভিব্যক্ত হয়েছে এভাবে: ‘আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন/ করিলাম নত।/ বন্ধু হও, শত্রু হও,/ যেখানে যে কেহ রও,/ ক্ষমা করো আজিকার মতো/ পুরাতন বর্ষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।’ কিন্তু নববর্ষের শুভলগ্নটি কবির কাছে আনন্দবেদনা মিশ্রিত: ‘এসো এসো নতুন দিবস/ ভরিলাম পুণ্য অশ্রুজলে/ আজিকার মঙ্গলকলস।’ 

রবীন্দ্রনাথের কল্পনা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘বৈশাখ’ শিরোনামের কবিতাটি বেশ জনপ্রিয়। রচনাকাল ১৩০৬। বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান এ কবিতাপাঠ ছাড়া যেন সম্পন্ন হয় না। বাংলা মাসগুলোর মধ্যে বৈশাখ মাসের যে স্বতন্ত্রতা রয়েছে তা এ কবিতা পাঠে সুস্পষ্ট হয়। বৈশাখ দিয়ে বাংলা নববর্ষের সূচনা। এ মাসটির বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।/ ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,/ তপ্তঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল/ কারে দাও ডাক/ হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।’ বৈশাখ যে রুদ্র কালবৈশাখী নিয়ে আসে তার ভয়ংকর রুদ্ররূপ রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেন: ‘কী ভীষ্ম অদৃশ্য নৃত্যে মাতি উঠে মধ্যাহ্ন-আকাশে/ নিঃশব্দ প্রখর/ ছায়ামূর্তি তব অনুচর!’ কেবল তো ঝড়ঝঞ্ঝা নয়, বৈশাখের তীব্র দাবদাহও রয়েছে। কবি বৈশাখের মধ্যে প্রবল শক্তির উন্মত্ততাও প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাকে আবাহন করছেন: ‘দুঃখ সুখ আশা ও নৈরাশ/ তোমার ফুৎকারক্ষুব্ধ ধুলা-সম উড়ুক গগনে...।’ বৈশাখের শুধু শক্তিমত্ততা প্রত্যক্ষণ নয়, কবির প্রত্যাশা: ‘হে বৈরাগী করো শান্তি পাঠ/ উদার উদাস কণ্ঠ যাক ছুটে দক্ষিণে ও বামে,/... পূর্ণ করি মাঠ।/ হে বৈরাগী করো শান্তি পাঠ।’

বৈশাখ কেবল ‘ভৈরব’ ও ‘রুদ্র’ রূপের জন্য কবির কাছে আগ্রহের মাস নয়। এ মাসেই তার জন্মের শুভক্ষণ। তাই পঁচিশে বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন কবিতা লিখেছেন তেমনি অবিস্মরণীয় গানও রচনা করেন। কবিতাটি পূরবী কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘পঁচিশে বৈশাখ’ (রচনা ২৫ বৈশাখ ১৩২৯)। জন্মদিন নিয়ে কবির উচ্ছ্বাস-আনন্দ এবং কৌতূহল: ‘রাত্রি হল ভোর।/ আজি মোর/ জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,/ প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি/ হাতে করে আনি/ দ্বারে আসি দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।’  কবি উপলব্ধি করেন তার জন্ম দিবসটি ‘নানা বেশে ফিরে আসে ধরণীর পরে’। তাই দিবসটির একটিমাত্র তাৎপর্য নয়। প্রতি বছর ফিরে আসা ‘পঁচিশে বৈশাখ’ চির এক নতুনকে নিয়ে এসে কবির জন্মদিনকে ভিন্নতর তাৎপর্য দেয়। তিনি লক্ষ করেন: ‘এই দিন এলো আজ প্রাতে/ যে অনন্ত সমুদ্রের শঙ্খ নিয়ে হাতে,/ তাহার নির্ঘোষ বাজে/ ঘন ঘন মোর বক্ষোমাঝে।/ জন্ম-মরণের দিগ্বলয়-চক্ররেখা জীবনেরে দিয়েছিল ঘের,/ সে আজি মিলাল।’ জন্ম-মৃত্যুর অনিবার্যতা জীবনকে রুদ্ধ করেছিল- তা নতুন জন্মদিনের কাছে পরাভূত হলো। আর তখন নতুন এক পঁচিশে বৈশাখ ‘শুভ্র আলো/ কালের বাঁশরি হতে উচ্ছ্বসি যেন রে/ শূন্য দিল ভরে।’ প্রতিবার পঁচিশে বৈশাখ কবির কাছে ফিরে এসে কেবল তার শূন্যতা দূর করে তা নয়, পূর্ণতাও দান করে ‘শুভ্র আলো’ দিয়ে। জন্মদিনে কবির উপলব্ধি: ‘আলোকের অসীম সঙ্গীতে/ চিত্ত মোর ঝংকারিছে সুরে সুরে রণিত তন্ত্রীতে।’

বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশকিছু গানও রচনা করেছেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটি হলো: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো।’ বৈশাখকে আবাহন করে এ গান রচনা করেন ২০ ফাল্গুন ১৩৩৩ শান্তিনিকেতনে। মূলত শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই কবি ঋতুভিত্তিক আনুষ্ঠানিক-সংগীত রচনা শুরু করেন। সারা বছরজুড়ে শান্তিনিকেতনে ঋতুভিত্তিক উৎসবের সূচনা হয়। এর মধ্যে নববর্ষবরণ, বর্ষামঙ্গল, পৌষ মেলা ও উৎসব, শারদোৎসব এবং বসন্ত উৎসব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বৃক্ষরোপণ ও হলকর্ষণ উৎসব এবং কবির জন্মদিন উপলক্ষে পঁচিশে বৈশাখ উদ্‌যাপনও ছিল। ঋতু-অনুষ্ঠানের জন্যই রবীন্দ্রনাথ বৈশাখ নিয়ে কিছু গান রচনা করেন। ‘এসো হে বৈশাখ’ গানে বৈশাখকে মঙ্গলসূচক বার্তা নিয়ে আসার আহ্বান কবির: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো/ তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।’ বৈশাখের যে রুদ্রতা, রুক্ষতা এবং শক্তির উগ্রতা- তার মধ্যেও কবি কল্যাণ লক্ষ করেন: ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জ্বরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ বৈশাখ প্রলয়ের শাঁখ বাজিয়ে জীবনের ‘মায়ার কুজ্ঝটিজাল’কে ছিন্ন করবে- তবেই তো আসবে জীবনে নতুন ও শুভ বার্তা।

বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের আরও কয়েকটি গান যেমন: ‘ওই বুঝি কালবৈশাখী’, ‘বৈশাখ হে মৌনী তাপস কোন অতলের বাণী’, ‘নমো নমো হে বৈরাগী’, ‘হৃদয় আমার, ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে’, ‘বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া আসে মৃদুমন্দ’, ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে’ ইত্যাদি। এ ছাড়া বৈশাখ বা গ্রীষ্ম ঋতুর বিশেষত্ব নিয়ে কিছু গান রচিত হয়েছে; এতে বৈশাখের প্রখরতা, শুষ্কতা, ‘দুঃসহ তাপ বহ্নি’, ‘রুদ্রবাণী’ ইত্যাদি প্রকাশ পেয়েছে। ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে’ গানটিতে কবি নিজেকে ‘বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন’-এর সঙ্গে উপমায়িত করেন। এরকম আরেকটি গান: ‘প্রখর তপনতাপে, আকাশ তৃষায় কাঁপে, বায়ু করে হাহাকার।’ প্রকৃতির মধ্যে আকাশের তৃষ্ণা, বায়ুর হাহাকার ইত্যাদি বিদ্যমান। কিন্তু এই তৃষ্ণা ও হাহাকার কবির নিজেরই- তা তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে তবেই উপলব্ধি করতে পারেন।

রবীন্দ্রনাথ যেমনটি নিজের জন্মদিন ‘পঁচিশে বৈশাখ’ উপলক্ষে কবিতা রচনা করেন, তেমনই নিজের জন্মদিনের গানও লিখেছেন। বিখ্যাত গানটি: ‘হে নূতন,/ দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।’ কবির মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ২৩ বৈশাখ ১৩৪৮-এ গানটি রচিত। তার জীবদ্দশায় শেষ জন্মদিনে গানটি গাওয়া হয়। দেশ-বিদেশে উদ্‌যাপিত রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন এ গান ছাড়া সম্পূর্ণতা পায় না। এ গানের অবিস্মরণীয় ভাবৈশ্বর্য লক্ষণীয়। নিজের জন্মদিনের প্রসঙ্গ গানটিতে উল্লেখ থাকলেও তা রচনাকৌশলের কারণে ব্যক্তি প্রসঙ্গ ছাপিয়ে নৈর্ব্যক্তিক হয়ে উঠেছে: ‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়/ ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।... চির নূতনেরে দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।’ এ গানে প্রতিটি মানবশিশুর জন্মকে স্বাগত জানানো হয়েছে। এভাবে সসীম জীবনের মধ্যে অসীমের প্রকাশঘটান কবি। নিজের জন্মদিনের শুভক্ষণের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ প্রতিটি মানবশিশুর জন্মের চির নতুনত্ব খুঁজে পেয়েছেন। 

রবীন্দ্রনাথ বাংলার ষড়ঋতু ও বারো মাসের অনুষঙ্গ নিয়ে কিছু না কিছু লিখেছেন। সঙ্গত কারণেই বৈশাখ নিয়েও কবির সবিশেষ কৌতূহল ছিল। মানবচরিত্র এবং মানস গঠনে প্রকৃতি-প্রতিবেশ ও পরিবেশের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশ ও পরিবেশের যে পরিবর্তন ঘটে তার প্রভাব কোনো সংবেদনশীল মানুষ এড়িয়ে যেতে পারে না। রবীন্দ্রনাথও তা এড়াতে পারেননি। আমরা তার বিবিধ রচনায় প্রতিবেশ-পরিবেশের অনুষঙ্গে নানা তাৎপর্যে ঋতুকথন লক্ষ করি। তেমনি ‘বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন’ অথবা ‘বৈশাখ হে মৌন তাপস’ এমন শিল্পিত করে বৈশাখ-বন্দনা আমাদের প্রকৃতির আরও নৈকট্যে নিয়ে যায়।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া