ছাত্র-জনতার আন্দোলনে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর পুলিশের মধ্যে অস্থিরতা দেখা দেয়। আন্দোলন চলাকালে সারা দেশের বিভিন্ন থানায় ভয়াবহ হামলার ঘটনা ঘটে। রাজধানীর অন্তত ৪৭টি থানায় ভাঙচুর, পুলিশের অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট এবং আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। জীবন বাঁচাতে পুলিশ পালিয়ে যায়। হামলার আশঙ্কায় ট্রাফিক পুলিশের সদস্যরা সড়কে দায়িত্ব পালন করা থেকে বিরত থাকেন।
পুলিশ সদর দপ্তর ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) একাধিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে পুলিশের ওপর বড় ধরনের ধকল গেছে। অনেকে দিনের পর দিন রাজপথে আন্দোলন নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করতে বাধ্য হয়েছেন। ওই সময় অঘোষিতভাবে ছুটি বাতিল করা হয়েছিল। জরুরি প্রয়োজন ছাড়া কাউকে ছুটি দেওয়া হতো না। পুলিশের অনেক সদস্য আক্রান্ত হয়েছেন। তাই সরকার পতনের পর পুলিশ সদস্যরা ভয়ে থানায় যেতেন না।
তবে ধীরে ধীরে থানায় ফিরতে শুরু করে পুলিশ। এখন সীমিত আকারে থানা-পুলিশের কার্যক্রম চলছে। পুলিশ এখন সাধারণ ডায়েরির (জিডি) বাইরে মামলাও নিচ্ছে। মামলার তদন্ত সীমিত আকারে শুরু হয়েছে। ৮ আগস্ট শপথ নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের দিকনির্দেশনা বাস্তবায়ন করছে পুলিশ। সরকারের যেসব আদেশ বাস্তবায়ন হচ্ছে না, তা নতুন সরকারের কাছে জবাবদিহি করতে হচ্ছে।
ডিএমপির নতুন কমিশনার মাইনুল হাসান জানান, পুলিশ নতুন উদ্যমে কাজ শুরু করেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর ও ডিএমপির একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সূত্রে জানা গেছে, ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর পুলিশের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা আত্মগোপনে চলে যান। আত্মগোপনে থেকে পুলিশের তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন একটি ভিডিওবার্তা দেন। পরে তাকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এর পর পুলিশের নতুন আইজিপি হিসেবে ময়নুল ইসলামকে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। পরে পরিবর্তন আসে ডিএমপি কমিশনার ও র্যাবের ডিজিসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা পর্যায়ে।
ডিএমপিতে ১১ দফা বদলির ঘটনা ঘটেছে। অনেকেই এখন বদলির অপেক্ষায় আছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিবির একজন ডিসি গত সোমবার দুপুরে জানান, তার বদলির আদেশ হয়নি। তবে তাকে বদলি করা হবে বলে পুলিশ সদর দপ্তর থেকে এক সহকর্মীর মাধ্যমে শুনতে পেয়েছেন। অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কারও চাকরি গেছে। আবার যারা বিগত সময়ে চাকরিচ্যুত হয়েছেন অথবা বঞ্চিত ছিলেন তাদের পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে।
সূত্র জানায়, গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ ছেড়ে ভারতে চলে যান। এর পর পরিবর্তিত পরিস্থিতে ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, এসবির প্রধান মনিরুল ইসলাম, রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি আব্দুল বাতেন, রংপুর মহানগর পুলিশের কমিশনার মনিরুজ্জামান, সিআইডির প্রধান মোহাম্মদ আলী মিয়া, অতিরিক্ত আইজিপি কৃষ্ণপদ রায়, খুলনা মহানগর পুলিশের কমিশনার মোজাম্মেল হক, খুলনা রেঞ্জের সরদার রকিবুল ইসলাম, ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক মীর রেজাউল আলম, ঢাকার পুলিশ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক খন্দকার লুৎফুল কবির, নোয়াখালী পুলিশ ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক চৌধুরী মঞ্জুরুল কবির ও সিআইডির উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক (চলতি দায়িত্ব) মো. ইমাম হোসেনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়।
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সাবেক সরকারের আমলে যাদের চাকরি চলে গিয়েছিল, তাদের পুনর্বহাল করা হয়েছে। তারা হলেন- বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি সারদার সাবেক উপ-পুলিশ মহাপরিদর্শক মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ, অপরাধ তদন্ত বিভাগের সাবেক পুলিশ সুপার ড. মোহাম্মদ নাজমুল করিম খান, রাজশাহী রেঞ্জ ডিআইজি অফিসের সাবেক পুলিশ সুপার মো. আলী হোসেন ফকির, অপরাধ তদন্ত বিভাগের সাবেক পুলিশ সুপার মো. দেলোয়ার হোসেন মিয়া ও টিডিএস, ঢাকার সাবেক পুলিশ সুপার ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান। এদিকে ডিএমর প্রভাবশালী দুই সাবেক কর্মকর্তা ডিবিপ্রধান হারুন অর রশীদ এবং বিপ্লব কুমার সরকার নিজ নিজ কর্মস্থলে যোগ দেননি। পুলিশ সদর দপ্তরের হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (এইচআরএম) সূত্রে জানা গেছে, পুলিশের উপস্থিতি এখন শতভাগ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, নতুন সরকার আসার পর পুলিশের বিভিন্ন বিষয়ে সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। পুলিশের বিভিন্ন প্রশিক্ষণকে কীভাবে আরও উন্নত করা যায় এজন্য তারা চেষ্টা করছেন। মানবিক পুলিশ গড়তে তারা কাজ করে যাচ্ছেন।
গত সোমবার পল্টন থানায় গিয়ে দেখা যায়, গত ৫ আগস্ট থানায় হামলার ক্ষত এখনো রয়ে গেছে। থানায় সীমিত আকারে কার্যক্রম চলছে। ভুক্তভোগীদের জিডি নিচ্ছেন ডিউটি অফিসার। থানায় আসা সুমন নামের একজন বেসরকারি চাকরিজীবী জানান, নাইটেঙ্গেল মোড়ে তার অফিসের আইডি কার্ড হারিয়ে গেছে। এজন্য থানায় জিডি করতে এসেছেন। এ বিষয়ে পল্টন থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এ কে এম সাহাবুদ্দীন শাহীন জানান, থানার কার্যক্রম পুরোদমে চালু হয়েছে।