রাজনীতি-বিজ্ঞানের ভাষায় শাসনব্যবস্থার বিন্যাসে রাষ্ট্র শাসনের প্রকৃতিগত বিশ্লেষণে বাংলাদেশ একটি ‘এককেন্দ্রিক’ রাষ্ট্র। তাই যুক্তরাষ্ট্রীয় বা ফেডারেল সরকারের আদলে এখানে কোনো রাজ্য বা প্রদেশ নেই। কিন্তু শাসন সুবিধার জন্য শাসনব্যবস্থার বিন্যাসে সৃষ্টি করা হয়েছে নানা অঞ্চলকেন্দ্রিক ‘শাসনকেন্দ্র’। এই আঞ্চলিক শাসনকেন্দ্রগুলোকে সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশে ‘প্রশাসনিক একক’ (Administrative Unit) বলা হয়। দেখা যায় ওপর থেকে নিচে বিভাগ, জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন, পৌরসভা, সিটি করপোরেশনগুলোকে আইনের মাধ্যমে প্রশাসনিক একক ঘোষণা করা হয়েছে। এসব একক এক-একটি শাসনকেন্দ্র। বাংলদেশের সংবিধান এসব শাসনকেন্দ্রের দায়িত্ব রাজনৈতিকভাবে নির্বাহের জন্য সৃষ্টি করেছে নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান। নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের অধীনে আনয়ন করা হয়েছে স্ব স্ব প্রশাসনিক একককে পদায়িত প্রজাতন্ত্রের সব নির্বাহী দায়িত্বে নিয়োজিত জন-আধিকারিক (Public servant)-গণকে এবং তাদের স্ব স্ব সংস্থাসমূহকে। সাংবিধানিকভাবে এটিই বাংলাদেশের স্থানীয় স্ব-শাসন কাঠামো। বাস্তবে সংবিধানসম্মত সে কাঠামো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ফলে স্থানীয় শাসনাঙ্গন হয়ে উঠেছে নৈরাজ্যপূর্ণ। জনস্বার্থ এখানে উপেক্ষিত, গোষ্ঠী ও কোটারি স্বার্থই প্রধান্য বিস্তার করে চলেছে।
স্থানীয় শাসন কাঠামোর স্বরূপ
বাংলাদেশে একটি স্থানীয় স্ব-শাসন কাঠামো বিভাগ ও জেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত কাঠামোগতভাবে (Structurally) সুগঠিত। কিন্তু কার্যক্রমগতভাবে (functionally) নানারকমভাবে অসঙ্গতিপূর্ণ। এ অসঙ্গতিগুলোই এ দেশের স্থানীয় শাসনব্যবস্থাকে পদে পদে বাধাগ্রস্ত করছে। এখানে প্রতিটি এককে কাঠামো ও কার্যক্রমগতভাবে একটি দ্বৈত শাসনব্যবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। বিভাগ ছাড়া প্রতিটি স্তর বা এককে একটি নির্বাচিত স্থানীয় সরকার এবং পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের নানা মন্ত্রণালয়, বিভাগ এবং দপ্তর-অধিদপ্তরের অধস্তন এক-একটি অনুবিভাগ। যেমন- উপজেলা পর্যায়ের এককে সাধারণ প্রশাসন, নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, প্রাণিসম্পদ, সমাজসেবা, প্রকৌশল, পুলিশ, আনসার-ভিডিপি, ভূমি প্রশাসন, ভূমি নিবন্ধন, সমবায়, পল্লি উন্নয়ন ইত্যাদি মিলিয়ে প্রায় ২৩ থেকে ৩০টি অনুদপ্তর। একই রকমভাবে ইউনিয়ন পর্যায়ে রয়েছে নয়টি মন্ত্রণালয়ের ১৩টি দপ্তরের প্রায় শতাধিক সরাসরি সরকারি বেতনভুক কর্মচারী। উপজেলা ও ইউনিয়ন মিলিয়ে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের নানা স্তরের স্থানীয় কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা উপজেলাভেদে ১৬০০ থেকে ১৮০০। পাশাপাশি উপজেলায় নির্বাচিত যে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান তার নাম উপজেলা পরিষদ এবং অনুরূপভাবে ইউনিয়নে রয়েছে নির্বাচিত ইউনিয়ন পরিষদ। এদের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা এক থেকে দুই জন। জেলা পর্যায়ে সরকারের সব মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের ‘জেলা দপ্তর’ রয়েছে। উপজেলা ও ইউনিয়নের মতো রয়েছে একটি নির্বাচিত জেলা পরিষদ। কিন্তু জেলা পর্যায়ের সরকারি দপ্তরগুলো জেলা পরিষদের সঙ্গে সম্পর্কবিহীন। বিভাগীয় পর্যায়েও সাধারণ প্রশাসন ছাড়াও রয়েছে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের প্রায় ২৭টি অধস্তন দপ্তর। এখানে কোনো নির্বাচিত স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান নেই।
দ্বৈত শাসনের রূপ ও ধরন
তিনটি প্রশাসনিক এককে মন্ত্রণালয় ও নানা দপ্তরের যেসব কর্মকর্তা-কর্মচারী, তারা মূলত তাদের স্ব স্ব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে স্থানীয়ভাবে কাজকর্ম করে থাকেন। ইউনিয়ন ও জেলায় নির্বাচিত পরিষদের সঙ্গে সরকারি কর্ম সম্পাদনকারী দপ্তরগুলোর কার্যকর কোনো সংস্রব নেই। উপজেলা পরিষদ আইনে ১৮টি সরকারি দপ্তরকে পরিষদে ন্যস্ত করে একটি বিধান করা হয়, তা এখন আইনে থাকলেও বাস্তবে আর কার্যকর নয়। দৃশ্যত এ তিনটি স্তরের এককে একটি দ্বৈতশাসন ব্যবস্থা বিরাজমান। একদিকে নির্বাচিত স্থানীয় পরিষদগুলোর শাসন, অপরদিকে সনাতনী বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের কর্মকর্তাদের শাসন। এটিকে প্রশাসনিক পরিভাষায় বলা হয় ‘প্রশাসন’। যেমন- উপজেলা প্রশাসন, জেলা প্রশাসন ইত্যাদি। তবে এ শব্দগুচ্ছের আইনগত ভিত্তি যদিও দুর্বল, কিন্তু চর্চাটি দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে এবং নির্বাচিত প্ৰতিষ্ঠানকে উপেক্ষার সংস্কৃতি কায়েমি রূপ পেয়ে যাচ্ছে। যেন রেললাইনের দুটি সরু ধাতব পথ, চিরদিন পাশাপাশি তবু একে অপরের সঙ্গে মেশে না। এ দ্বৈত ব্যবস্থাটি দৃষ্টিগ্রাহ্য ও দৃষ্টিকটু। কিন্তু শুধু দ্বৈত শাসন বললেও এখানে সমস্যার সম্পূর্ণটি বলা হয় না। এখানে আরও অদৃশ্য অনেক শাসন সুতা ও সূত্র রয়েছে।
স্থানীয় শাসন ও সেবার অদৃশ্য সুতা ও সূত্র
দৃশ্যমান দ্বৈতশাসনের পর যুক্ত হয় আরও দৃশ্য-অদৃশ্য কতিপয় অঙুলির ইশারা ও নির্দেশনা। যাকে চলতি প্রশাসনিক চর্চায় বলা হয় ‘ওপরের নির্দেশ'। সে নির্দেশ উপেক্ষার কোনো অবকাশ কারও থাকে না। সেটি স্থানীয় সরকার বা স্থানীয় প্রশাসন, যার কথাই বলুন। দেশের সংশ্লিষ্ট এলাকার (অধুনা বিলুপ্ত) জাতীয় সংসদ সদস্য সে রকম একজন ওপরওয়ালা। তিনি যখন যা নির্দেশ, আদেশ ও অনুরোধ করতেন আইনকানুন পাশে সরিয়ে রেখে তা প্রতিপালিত হতো। তার সঙ্গে যুক্ত হতো ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের কিছু আদেশ, নির্দেশ ও অনুরোধ। তারাও এ অধিকারের একটি অনানুষ্ঠানিক স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। প্রশাসন বিশেষত, সাধারণ প্রশাসন, পুলিশ ও সেবা সরবরাহের সব দপ্তর সে আদেশ, নির্দেশ ও অনুরোধ ইচ্ছা-অনিচ্ছায় গ্রহণ করতেন।
এখানে প্রশাসনের যে ‘অনুরোধের আসর’ বা আছর, তা কিন্তু সব সময় বিনা পয়সায় হতো বা হয়, তা নয়। এখানে বিস্তর টাকা-পয়সার লেনদেন আছে। এখানে ছোট-বড় টেন্ডার, সরবরাহ থেকে সামাজিক নিরাপত্তা তহবিলের সহায়তা সব কিছুর একটি অদৃশ্য লেনদেনের নিয়ম আছে। সেই অলিখিত নিয়মাবলি লিখিত সরকারি আদেশের চেয়ে অনেক বেশি কার্যকর।
সমাধান সূত্র কী হতে পারে?
সহজ ও সরল সমাধান সূত্র হবে সংবিধান নির্দেশিত পথে ‘দ্বৈততা, ত্রৈততা ও বহুগম্যতার চির অবসান। একীভূত ও সমন্বিত একটি স্থানীয় শাসনব্যবস্থার প্রচলন। প্রশাসনিক এককের সব স্তরে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সরকারি কর্মকর্তাদের একটি সমন্বিত শাসন-কাঠামো পুনর্গঠন জরুরি। ওপরের সরকারি আদেশে নয়, অংশগ্রহণমূলক স্থানীয় পরিকল্পনার অধীনে সব স্থানীয় সম্পদ ও সরকারি সম্পদ কাজে লাগানো হবে। সব সরকারি দপ্তরের স্থানীয় জবাবদিহি নিশ্চিত হবে। সে জন্য স্থানীয় সরকারব্যবস্থা ও সনাতনী প্রশাসনের বর্তমান বিন্যাসকে পরিবর্তন করে স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নতুন একীভূত একটি কাঠামো সৃষ্টি করতে হবে। যার কিছু নমুনা ভারতীয় সংবিধানের ৭৩তম সংশোধনীতে পাওয়া যেতে পারে। বাংলাদেশ এ লক্ষ্যে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘স্থানীয় শাসন কমিশন’ করে সে কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে পারে। এ বিষয়ে একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার জাতি আশা করে।
ইতোমধ্যে নানামুখী রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য ছয়টি কমিশন কাজ শুরু করেছে। অন্ততঃ তিনটি কমিশন যথা- সংবিধান, জনপ্রশাসন ও নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন স্থানীয় সরকার ও মাঠ প্রশাসনের সম্পর্কিত স্থানীয় পর্যায়ে নির্বাচনের বিষয়গুলোর ওপর বাস্তবসম্মত সুপারিশ প্রণয়ন করতে পারে। তবে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সংস্কার পৃথক ও স্বাধীন একটি কমিশনের দাবীদার।
(বিকেন্দ্রয়ন ধারণার আলোকে প্রশাসন, নির্বাচন, বিচার ও স্থানীয় সরকার ও শাসন সংস্কারের বিস্তারিত আলোচনার জন্য লেখকের ‘সংস্কার সংলাপঃ সূচনাসূত্র’ (২০২৩) গ্রন্থিক কর্তৃক প্রকাশিত বইটি এবং প্রথমা ও BIGD , Brac University এর যৌথ প্রকাশনা Reform Agenda for Local Governance(২০১৬) দেখা যেতে পারে।)
লেখক: অধ্যাপক ও স্থানীয় শাসন বিশেষজ্ঞ
tofailahmed.info