সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার অপরিহার্য। সংবিধান সংস্কার, নির্বাচন ব্যবস্থাপনা, পুলিশ প্রশাসন, জনপ্রশাসন, বিচার প্রশাসন ও দুর্নীতি দমন কমিশনের সংস্কার করা বিশেষ প্রয়োজন। এ জন্য ছয়টি কমিশন গঠন করা হয়েছে। কমিশন গঠনের মাধ্যমে কীভাবে সংস্কার করা যায় তা নিয়ে খবরের কাগজকে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন বিশিষ্ট রাষ্ট্রচিন্তক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। তার সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন খবরের কাগজের সিনিয়র সহসম্পাদক সানজিদ সকাল
খবরের কাগজ: গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ফিরিয়ে আনতে সংবিধান সংস্কারের প্রয়োজন আছে বলে কি আপনি মনে করেন?
ড. আবুল কাসেম ফজলুল হক: জাতীয় সংসদ থাকলে তার মাধ্যমে সংবিধান সংস্কার করা যাবে। সংবিধানের যদি অনেক সংস্কার করতে হয় তাহলে গণভোটের মাধ্যমে পরিবর্তন করতে হবে। সংবিধানের কোনো ধারা ইচ্ছা করলেই সংসদ পরিবর্তন করতে পারে না, সে ক্ষেত্রে গণভোটের প্রয়োজন হয়। সরকারের ক্ষমতা থাকলেই সংবিধানের এতবেশি পরিবর্তন করা ঠিক নয়। সে ক্ষেত্রে তারা পরবর্তী সরকারের জন্য সংবিধান সংস্কারের পরামর্শ দিতে পারে। তবে সংবিধান সংস্কার করা দরকার। সংবিধানের ১১টি অধ্যায়ের প্রত্যেকটিতে পরিবর্তন দরকার। রাষ্ট্রীয় আদর্শ সাংবিধানে যেভাবে লেখা আছে- একদিকে ধর্ম নিরপেক্ষতা, অন্যদিকে রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। এই দুই আদর্শ এক দেশে কীভাবে সম্ভব? রাষ্ট্রের মূল অবকাঠামো গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এতকিছু থাকার কী দরকার। শুধু একটা জিনিস থাকবে তা হলো- গণতন্ত্র। ইউরোপের কোনো সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা নেই। তাহলে আমরা কেন সেই নিরপেক্ষতা নিয়ে বিবাদের সৃষ্টি করি। বাংলাদেশের সংবিধান সবার জন্য গ্রহণযোগ্য করতে হবে। ভারতের জওহরলাল নেহরু বহুবার ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছেন, কিন্তু তিনি সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা রাখেননি। ধর্মনিরপেক্ষতা এমন একটা জিনিস, যা নিয়ে তর্ক করতে যাওয়া মানেই পরাজিত হওয়া। ইন্দিরা গান্ধী তার শাসনের শেষদিকে এসে ধর্মনিরপেক্ষতা সংবিধানে সংযুক্ত করেন। বাংলাদেশ ও ভারতের প্রেক্ষাপট ভিন্ন। বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় আদর্শের ক্ষেত্রেও সংস্কার করা বিশেষ জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান সংস্কারের জন্য পরামর্শ দিতে পারে, কিন্তু সংশোধন করতে পারে না। কারণ এই সরকার নির্বাচিত সরকার নয়। সংবিধানের যতটা সংশোধন করা হলে নির্বাচন করা যাবে ততটুকু করা উচিত। এর অতিরিক্ত করাটা রাষ্ট্রের জন্য ভালো হবে না।
খবরের কাগজ: গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দেশে গণতন্ত্র বজায় রাখতে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা দরকার বলে কি আপনি মনে করেন? গণমাধ্যমের সংস্কারের জন্য কী করা প্রয়োজন?
ড. আবুল কাসেম ফজলুল হক: পৃথিবীর কোনো রাষ্ট্রেই গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নেই। রাষ্ট্রীয় সংবিধানের বাইরেও বিভিন্ন আইনকানুন দিয়ে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি আবার স্বাধীনতাও দেওয়া হয়। গণমাধ্যমের সম্ভবপর স্বাধীনতা যাতে খর্ব না হয়, সেভাবে গণমাধ্যমের বিধিবিধান প্রণয়ন করা উচিত। গণমাধ্যমকেও রাষ্ট্রের সংবিধান মেনে চলতে হবে। কোনো কোনো সময় সংবিধানের বাইরে গিয়েও গণমাধ্যমের চলতে হয়, তার পরও রাষ্ট্রের কথা চিন্তা করেই প্রচার করতে হবে। গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের বিধিবিধান বিশ্বের বিভিন্ন দেশেই আছে। সে কারণেই আমরা গণমাধ্যমের প্রকৃত স্বাধীনতা আশা করতে পারি না। রাষ্ট্রক্ষমতায় গিয়ে যারা গণমাধ্যমের অপব্যবহার করে জনস্বার্থ বা জাতীয় স্বার্থকে নষ্ট করে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এসব বিষয় নিয়ে সাংবাদিকদের বিশ্লেষণমূলক লেখা লিখতে হবে। জনগণের স্বার্থে গণমাধ্যমের কাজ করতে হবে। আমাদের দেশে যেহেতু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দাঁড়ায়নি, ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতাকে হরণ করা হচ্ছে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকার এমন কিছু করবে না যাতে পরবর্তীতে আবার আন্দোলন শুরু হয়। গণমাধ্যমের সংস্কারের জন্য তার প্রস্তাব করতে পারে, যা পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার এসে তা পরিবর্তন করবে।
খবরের কাগজ: ভোটের গণতন্ত্রের জন্য নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার সংস্কার প্রয়োজন বলে কি আপনি মনে করেন?
ড. আবুল কাসেম ফজলুল হক: বর্তমান নির্বাচন পদ্ধতিতে নির্বাচন দেওয়ার মতো পরিস্থিতি নেই। নির্বাচনি ব্যবস্থাপনাকে অবশ্যই গণতান্ত্রিকভাবে ঢেলে সাজাতে হবে। ভোটকেন্দ্র স্বচ্ছ করতে হবে। নির্বাচনি কাউন্সিলের ভোট গণনার সময় প্রত্যেক দলের উপস্থিতি থাকতে হবে। সেসব প্রধিনিধির নির্বাচনে ভোট দেওয়া ও নেওয়া থেকে শুরু করে ভোট গণনা পর্যন্ত থাকতে হবে। সরকারি কর্মকর্তাদের পাশাপাশি প্রার্থীর যারা প্রতিনিধি থাকবে তাদের সবার স্বাক্ষর থাকতে হবে। আইয়ুব খানের আমল থেকে শুরু করে শেখ মুজিব পর্যন্ত সব প্রতিনিধির স্বাক্ষর নেওয়ার প্রচলন ছিল। কিন্তু বিগত সরকার সে নির্বাচনি ব্যবস্থাকে ভেঙে দিয়েছে। শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল বিএনপিকে নির্বাচনে আসতে না দেওয়া। দমনপীড়নের মাধ্যমে সব রাজনৈতিক দলকে সক্রিয় হতে না দেওয়া। ফলে গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচন হয়নি। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন একেবারেই কারচুপির মাধ্যমে হয়েছে। নির্বাচনগুলো হওয়া উচিত ছিল গণতান্ত্রিকভাবে। কারণ ভোট হলো জনগণের অধিকার। কোনো নায্য অধিকার হরণ করলে তার ধ্বংস অনিবার্য। বিধায় নির্বাচন ব্যবস্থাকে গণতান্ত্রিক উপায়ে করতে হবে। এসব জায়গায় অবশ্যই সংস্কার করতে হবে।
খবরের কাগজ: পুলিশ প্রশাসন ভেঙে পড়েছে। পুলিশ বাহিনীর মনোবল ফিরিয়ে আনতে কীভাবে সংস্কার করা প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
ড. আবুল কাসেম ফজলুল হক: গত কয়েক বছরে পুলিশ প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুলিশের সেপাই থেকে শুরু করে আইজি পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকার তার দলীয় লোকদের নিয়োগ দিয়েছে। এ কারণেই বিএনপি পুলিশদের ‘গোপালি’ বলে আখ্যা দিয়েছে। যদিও সব পুলিশ গোপালি নয়। এই কথার মধ্যেও মিথ্যা বিরাজ করছে। মিথ্যা কথা যদি অবাধে চলতে থাকে, তাহলে মিথ্যাও একদিন সত্যতে পরিণত হয়। মানুষ সেটাই বিশ্বাস করে। এতে পুলিশের প্রতি মানুশের অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। পুলিশ তখন মানুষের আস্থার জায়গায় আর রইল না। সে জন্য পুলিশ নিয়োগের ক্ষেত্রে অবশ্যই স্বচ্ছতা আনতে হবে। গত জুলাই মাসের শেষ সপ্তাহে এবং আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহে সাধারণ ছাত্ররা যে আন্দোলন করেছে, পুলিশ ছাত্রদের ওপর নির্মমভাবে গুলি করেছে। ছাত্ররা পুলিশের ওপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছে এবং তাদের নিষ্ঠুরতার কারণেই পুলিশকে তারা মারতে বাধ্য হয়। এটা জাতীর জন্য খুবই দুঃখজনক। এখন পুলিশেরও মনোবল ভেঙে গেছে। পুলিশ থানায় যেতে চায় না এবং ভয় পাচ্ছে। পুলিশের মধ্যে মনোবল দৃঢ় করতে হবে। পুলিশ সংস্কারের জন্য আইনকানুন, বিধিবিধান পরিবর্তন করতে হবে। অবশ্যই স্বচ্ছ ও অভিজ্ঞ লোকদের নিয়ে কমিটি গঠন করে পুলিশ প্রশাসন সংস্কার করতে হবে।
খবরের কাগজ: রাষ্ট্র ও জনপ্রসাশনের সংস্কারে কীভাবে চ্যালেঞ্জ সামলাবে অন্তর্বর্তী সরকার? জনপ্রসাশনের সংস্কারে কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন বলে আপনি মনে করেন?
ড. আবুল কাসেম ফজলুল হক: বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থাকে সামনে নিয়ে জনপ্রশাসনের সংস্কার করতে হবে। সব সংস্কারের ক্ষেত্রেই দেশের চিন্তা মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। কোনো পক্ষ বা স্বার্থ থাকবে না। ইউনিয়ন থেকে শুরু করে সচিবালয় পর্যন্ত জনগণের স্বার্থে সংস্কার করতে হবে। দেশের আর্থিক উন্নয়ন না ঘটলে জনপ্রশাসনের সংস্কার সম্ভব নয়। দেশে যদি স্বৈরাচারী সরকার নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসে, তাহলে দেশের প্রশাসন খারাপের দিকে যায়। আমদের দেশে বিগত সরকারের আমলে সেটাই হয়ে আসছে। জনপ্রশাসন সুষ্ঠু করতে হলে সরকারের সদিচ্ছা থাকতে হয়। দেশের প্রশাসন ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে দেশ ভেঙে পড়ে। তাই জনপ্রশাসনের প্রতিটি স্তরে সংস্কার করতে হবে।
খবরের কাগজ: দুর্নীতিতে বাংলাদেশ সবসময় বিশ্ব জরিপে সেরা তালিকায় থাকে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে ঢেলে সাজানোর জন্য কীভাবে সংস্কার করা যায় বলে আপনি মনে করেন?
ড. আবুল কাসেম ফজলুল হক: দুর্নীতি দমন কমিশন অনেক আগে গঠন করা হলেও তা কার্যকর হয়েছে অনেক পরে। বাস্তবে কার্যকর হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের আমলে। শেখ হাসিনা সরকার যে ১৫ বছরের ওপরে ক্ষমতায় থেকেছে তার নানা কারণ রয়েছে। অধিকাংশই বলছেন, শেখ হাসিনা স্বৈরাচারী ছিলেন। এটা আংশিক হলেও সত্য। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় টিকে থাকার অন্যতম কারণ হলো দুর্নীতি দমন কমিশনকে সক্রিয় রাখা এবং তার ইচ্ছামতো কমিশনকে কাজে লাগানো। শেখ হাসিনা সরকার থাকাকালীন দুর্নীতি দমন কমিশনকে প্রশাসনিক ও ব্যবসায়িক কাজে লাগিয়েছে। অনেকে টাকা আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করেছে। কালো টাকাকে সাদা করতে দিয়েছে। এভাবে শেখ হাসিনা সরকার দুর্নীতি দমন কমিশনকে ব্যবহার করেছে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে আগে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীনভাবে কাজ করতে দিতে হবে। সরকার প্রভাব বিস্তার করলে দুর্নীতি দমন কমিশন কখনোই দুর্নীতি দূর করতে পারবে না। দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বচ্ছ হতে হবে এবং সংস্কারের জন্য কিছু বিধিবিধান থাকতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশনকে স্বাধীন কমিশন হিসেবে কাজ করতে দিতে হবে। জনগণের স্বার্থে অভিজ্ঞ লোক বসিয়ে কমিশনকে ঢেলে সাজাতে হবে।
খবরের কাগজ: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কি আমাদের দেশে আছে? বিচারব্যবস্থার সংস্কার কীভাবে করা সম্ভব বলে আপনি মনে করেন?
ড. আবুল কাসেম ফজলুল হক: বিচার বিভাগের স্বাধীনতা না থাকলে সে দেশ ভেঙে পড়ে। বিগত ১৬ বছরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট শেখ হাসিনা সরকারের হয়ে কাজ করেছে। ফলে অনেক বিচারকাজে আইনের বাইরে গিয়ে সরকারের পক্ষে রায় দিতে হয়েছে। তাহলে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা থাকল কোথায়? বিচার বিভাগের স্বাধীনতা না থাকলে সে দেশের মানুষ কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে? যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা বিচার বিভাগকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করে। এখন যারা ক্ষমতায় এসেছে তারাও ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে। আগস্ট মাসে ঢালাওভাবে যে মামলাগুলো করা হয়েছিল তা কোনো আইন না মেনেই খারিজ করে দেওয়া হয়েছে। এটাও ঠিক হয়নি। জনগণের মধ্যে এক ধরনের প্রশ্ন রয়ে গেছে। তারাও বিচার বিভাগকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করল। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াও যথেচ্ছভাবে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করেছে। সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্ট সরকারের পক্ষে মামলা নেয় এবং রায় দেয়। এগুলো জনগণ ভালো চোখে দেখেনি। শেখ মুজিব বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন কিনা; তা যাচাইবাচাই করার দায়িত্ব সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের ওপর দেওয়া ঠিক হয়নি। যেটা সত্য তার বিরুদ্ধে গিয়ে কেউ রায় দিতে পারে না। কারণ দেশের জনগণ প্রকৃত সত্য ঘটনা জানে। বিধায় বিচার বিভাগকে আইনের গতিতে ও বিবেক দিয়ে ন্যায়ের পক্ষে রায় দিতে হবে। তা না হলে জনগণ বিচার বিভাগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
খবরের কাগজ: খবরের কাগজকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
ড. আবুল কাসেম ফজলুল হক: খবরের কাগজকেও অনেক ধন্যবাদ।