ঢাকা ২ বৈশাখ ১৪৩১, সোমবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

ইশরাক খান

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৪, ১১:৪৪ এএম
ইশরাক খান

যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত বাংলাদেশি তরুণ। পড়াশোনা করছে ক্যালিফোর্নিয়ার স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার সায়েন্সে। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই গোটা আমেরিকা তো বটেই, দুনিয়াজুড়ে হইচই ফেলে দিয়েছে সে। আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই প্রযুক্তি বর্তমান বিশ্বের টেক দুনিয়ায় নতুন অধ্যায়ের সূচনা করেছে। এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে নিজেদের কাজকে কতটা সহজ করা যায় সেটারই একটা বাস্তব উদাহরণ ইশরাক খানের স্টার্ট-আপ ‘কোডেজি’।

যারা কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের মাধ্যমে বিভিন্ন সফটওয়্যার বানিয়ে থাকেন তাদের হাজার হাজার লাইনের কোডিং করতে হয়। এত বিপুল কোডিং করতে গিয়ে ভুল হওয়াটাই স্বাভাবিক। ‘কোডেজি’ প্রোগ্রামিংয়ের এই ভুলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে শুধরে দেয়। কোডেজিকে বলা যায় প্রোগ্রামিংয়ের গ্রামার। ইশরাক খানের এই আবিষ্কারে নড়েচড়ে বসেছে আমেরিকার প্রযুক্তিনির্মাতা প্রতিষ্ঠানগুলো। তাকে নিজেদের প্রতিষ্ঠানের কাজে পেতে বড় বড় প্রস্তাব রাখছে। ২০২১ সালে কোডেজির শুরু। ২০২২ সালের মার্চ মাসে ইশরাক খান প্রায় ৮ লাখ মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ পায় কোডেজিকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য। গত বছরের মার্চ মাসে কোডেজি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরুর পর থেকে মাত্র ছয় মাসের মাথায় প্রায় লক্ষাধিক ব্যবহারকারী পেয়ে যায়। কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের প্রায় ৩০টিরও বেশি ভাষার জন্য কোডেজি ব্যবহার করা যায়। এসব ভাষায় প্রোগ্রামিং করার সময় কোডেজি ভুলগুলো ‘অটো-কারেক্ট’ করে দেয়। ইশরাকের সঙ্গে কাজ করার জন্য এখন দুনিয়ার বড় বড় সফটওয়্যার কোম্পানিগুলো মুখিয়ে আছে। 

ছোটবেলা থেকেই কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। ইশরাকের পরিবার যখন ২০১১ সালে আমেরিকায় পাড়ি জমায় তখন ইশরাকের বয়স মাত্র ১০ বছর। ফ্লোরিডায় বসবাস শুরু করে ইশরাকের পরিবার। হাইস্কুলে পড়া অবস্থায়ই বিভিন্ন প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় নিজের মেধার পরিচয় দিতে শুরু করে। স্কুলে পড়া অবস্থায়ই গুগল আয়োজিত ‘গুগল হ্যাকাথন’ প্রতিযোগিতায় তৃতীয় হয় ইশরাক খান।

ইশরাক চায় কম্পিউটার প্রোগ্রামিংকে সহজ এবং কম শ্রমসাধ্য করে গোটা বিশ্বের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির কাজকে আরও সহজ করে দিতে। বাংলাদেশের ট্রাফিক সিস্টেম এবং আন্ডারগ্রাউন্ড যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে কাজ করতে চায় ইশরাক খান।

জাহ্নবী

পায়ে পায়ে পৃথিবীর পথে

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:২৬ পিএম
পায়ে পায়ে পৃথিবীর পথে

পায়ে পায়ে পৃথিবীর পথে নামলেন সাইফুল ইসলাম শান্ত। ২০২৪ সালের ২২ মার্চ সকালে জাতীয় সংসদ ভবন এলাকা থেকে হেঁটে বিশ্ব ভ্রমণে বের হন তিনি। জাতিসংঘ ঘোষিত ১৯৩টি দেশ ভ্রমণের পরিকল্পনা আছে তার। ঢাকা থেকে হাঁটা শুরু করে যশোর-বেনাপোল সীমান্ত পেরিয়ে যাবেন কলকাতা। এরপর ভারতের ঝাড়খণ্ড, বিহার, উত্তর প্রদেশ হয়ে পৌঁছাবেন দিল্লি। তারপর উজবেকিস্তান। সেখান থেকে মধ্য এশিয়ার তুর্কমেনিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, কাজাখস্তান ঘুরে যাবেন মঙ্গোলিয়া। সেখান থেকে রাশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ইন্দোনেশিয়া, ফিলিপাইন এশিয়ার বাকি দেশগেুলো ঘুরবেন। এশিয়া ঘোরা শেষ করে যাবেন আফ্রিকা। তারপর ইউরোপ। ইউরোপের পর উত্তর আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়া ভ্রমনের পর যাবেন অ্যান্টার্কটিকায়। সেখানেই তাঁর বিশ্ব ভ্রমণের ইতি টানবেন। এবং এ পর্যন্ত তাঁর পরিকল্পনা।

শান্তকে সহায়তা করছে বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন। কেন এই পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণ? জবাবে অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আরেক বিখ্যাত পর্যটক যিনি সত্তরটিরও বেশি দেশ ভ্রমণ করেছেন, তিনি জানান, ‘ভ্রমণের সময় যখন নিজের নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন সব কিছু অনেক বেশি উপভোগ করা যায়। শেখা যায়, জানা যায় অনেক বেশি। হেঁটে ভ্রমণ সব সময়ই আনন্দের। আমাদের দেশে অ্যাডভেঞ্চার ট্রাভেল তুলনামূলক কম হয়। তাই বাংলাদেশ ট্রাভেল রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন দেশের যে কোনো অ্যাডভেঞ্চার ট্রাভেলের পাশে থেকে উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা জোগাতে চায়। আমরা এটাও চাই, কেউ অ্যাডভেঞ্চার ট্রাভেলে আরও আগ্রহী হোক এবং তাঁর ভ্রমণ অভিজ্ঞতা নিয়ে লিখুক। এতে সবাই জানতে পারবে এবং ভ্রমণে অনুপ্রাণিত হবে।’

বিশ্বভ্রমণের চিন্তা কিন্তু অনেক আগে থেকেই ছিল শান্তর। সে কারণে নিজেকে তৈরিও করছিলেন কয়েকবছর ধরে। ২০২২ সালে ৭৫ দিনে বাংলাদেশের ৬৪ জেলার তিন হাজার কিলোমিটার ভ্রমণ করেন পায়ে হেঁটে। এ সময় তিনি প্রতিদিন গড়ে ৪০ থেকে ৪২ কিলোমিটার হেঁটেছিলেন। হাঁটতে হাঁটতেই সচেতনতা তৈরির জন্য তিনি কিছু বিষয়ের উপর জোর দিয়েছিলেন। এগুলোর মধ্যে জীবন বাঁচাতে রক্তদান, প্লাস্টিক ব্যবহারে সতর্কতা এবং বৃক্ষরোপণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরতে চেয়েছিলেন। ওই সময় স্কুলকলেজে গিয়ে এসব নিয়ে কথা বলার ইচ্ছাও ছিল। কিন্তু করোনার কারণে তখন স্কুল-কলেজ বন্ধ ছিল। সে কারণে সচেতনতার কাজটি করতে পারেননি ঠিক মতো। তবে ভ্রমণের সময় প্রতিটি জেলার মাটি সংগ্রহ করেছেন। সেই থেকে তিনি ‘হাঁটাবাবা’ হিসেবে পরিচিতি পান।

এ ছাড়া ওই বছরেই তিনি ৬৪ দিনে ১ হাজার ৫০০ কিলোমিটার হেঁটে বাংলাদেশের ঢাকা থেকে ভারতের সান্দাকফু ও দার্জিলিং ভ্রমণ করেন। তাঁর হাঁটাহাটির শুরু ২০১৬ সাল থেকে। ২০১৮ সালে বান্দরবানের আলীকদম হয়ে বাড়ি ফেরেন ১০০ কিলোমিটার পায়ে হেঁটে।  কিন্তু এই বিশ্বভ্রমণের বিশাল খরচ কিভাবে মেটানো হবে, সেটার কথাও জানিয়েছেন শান্ত। হেঁটে বিশ্বভ্রমণ হলেও থাকা-খাওয়ার জন্য খরচ তো আছে। সেই খরচের টাকা তিনি স্পন্সরের মাধ্যমে জোটাবেন। এবং এর মধ্যেই হাজার খানেক ডলারও পেয়েছেন।

এ ভ্রমণ শেষ করতে তাঁর বারো বছরের বেশি সময় লাগবে। অর্থাৎ তিনি ২২ বছরের তরুণ হিসেবে যাত্রা শুরু করলেন। আর যখন বিশ্বভ্রমণ শেষ হবে তখন তিনি ৩৪ বছরের যুবক হয়ে যাবেন।

শান্তর প্রয়োজনীয় জিনিস থাকবে তার পিঠে থাকা প্রায় ২৫ কেজি ওজনের ব্যাগের মধ্যে। তবে একটা উদ্দেশ্যকে সামনে রেখেই বিশ্বভ্রমণে যাচ্ছেন শান্ত। সেই উদ্দেশ্য সম্পর্কে শান্ত বলেন, ‘আমার এই বিশ্বভ্রমণের স্লোগান হচ্ছে “গাছ বাঁচান, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন কমিয়ে আনুন”। আমাদের দেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং সমগোত্রীয় দেশগুলোর ঝুঁকি মোকাবিলায় সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে আমি এটিকে আমার বিশ্বভ্রমণের প্রতিপাদ্য বিষয় নির্বাচন করেছি। আর তাই ভ্রমণের সময় বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন কমিউনিটি ও স্কুল-কলেজে পরিবেশ রক্ষায় গাছ লাগানো এবং গাছ সংরক্ষণের বিষয়ে সচেতনতার বার্তা পৌঁছে দিতে চাই।’

সাইফুল ইসলামের জন্ম ১৯৯৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর। তার বাবার নাম সিরাজুল ইসলাম এবং মায়ের নাম করুণা বেগম। তাদের তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে সাইফুল মেজো সন্তান। তিনি ঢাকার দনিয়া কলেজ থেকে ভূগোল ও পরিবেশবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করেছেন।

প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণ করেন মো. ওসমান গনি। পশ্চিম পাকিস্তান হয়ে ইরান তারপর দীর্ঘ ৭ বছরে একের পর এক ২২টি দেশ ও ২১ হাজার মাইল পথ পায়ে হেটে সফর করে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন বিশ্ববাসিকে।

 

আর্থার ব্লেসিত

আর্থার ব্লেসিত ছিলেন ধর্মপ্রচারক। পৃথিবীর প্রত্যেক দেশ ও মানুষ বসবাসকারী প্রত্যেক দ্বীপে পা রাখার লক্ষ্য নিয়ে ১৯৬৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর যাত্রা শুরু করেন তিনি। ২০০৮ সালের ১৩ জুন তিনি তার লক্ষ্যে পৌঁছান। গিনেস ওয়ার্ল্ড রেকর্ডে নাম লেখান ‘দীর্ঘ তীর্থ যাত্রী’ হিসেবে। তিনি পিা রাখেন ৩২১টা রাষ্ট্রে, যার মধ্যে দ্বীপ, অঞ্চল এবং এমন দেশও ছিল যেখানে প্রবেশ নিষিদ্ধ এবং প্রায় ৫৪টা এলাকায় যদ্ধ চলছিল। সবমিলিয়ে তিনি ৩৮ বছর, পাঁচ মাস ২০ দিন হেঁটে অতিক্রম করেন ৬৫ হাজার ৩১৯ কিলোমিটার বা ৪০ হাজার ৫৮৭ মাইল পথ।


জাঁ বিলিভিউ

টানা এগার বছর ১ মাস ২৯ দিন হেঁটে ৭৫ হাজার কিলোমিটার বা ৪৭ হাজার মাইল পথ পাড়ি দেন জাঁ বিলিভিউ। ২০০০ সালের ১৮ আগস্ট কানাডার মন্ট্রিয়ল থেকে যাত্রা শুরু করেন তিনি। তাঁর এই হাঁটার লক্ষ্য ছিল শিশুদের জন্য শান্তিপূর্ণ বিশ্ব। উত্তর আমেরিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকা হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকা, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড হয়ে শেষে কানাডায় ফেরেন জাঁ।

টম টুরকিচ

পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণকারী টম টুরকিচ। ২০১৫ সালের ২ এপ্রিল নিউ জার্সির হ্যাডন টাউনশিপের নিজের বাড়ি থেকে যাত্রা শুরু করে ২০২২ সালের ২১ মে যাত্রা শেষ করেন টুরকিচ। সাত বছর ১ মাস ২০ দিনে তিনি ৪৫ হাজার ৬১ কিলোমিটার বা ২৮ হাজার মাইল পথ হেঁটে বাড়ি ফেরেন। একমাত্র অস্ট্রেলিয়া বাদে তিনি সবগুলো মহাদেশে পা রাখেন। ২০১৫ সালের আগস্টে টেক্সাসের অস্টিন থেকে একটি অস্ট্রেলিয়ান শেফার্ড কুকুর তার সঙ্গী হয়। তিনি কুকুরটা নাম রাখেন সাভানাহ। এরপর থেকে টুরকিচের ভ্রমণের পুরো সময়টা সাভানাহ ছিল তার ভ্রমণসঙ্গী। এর মাধ্যমে প্রথম কুকুর হিসেবে বিশ্বভ্রমণের গৌরব অর্জন করে সাভানাহ।


ফিয়োনা ক্যাম্পবেল


পায়ে হেঁটে বিশ্বভ্রমণকারীর মধ্যে তৃতীয় এবং মেয়েদের মধ্যে প্রথম ফিয়োনা ক্যাম্পবেল। ১৯৮৫ সালের ১৭ আগস্ট নিউ ইয়র্ক সিটি থেকে লস অ্যাঞ্জেলেস পর্যন্ত হেঁটে যান। এরপর অসুস্থতার কারণে তিনি যানবাহন ব্যবহার করতে বাধ্য হন। এরপর আবার হাঁটা শুরু করেন। ১৯৮৯ সালে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে পার্থ পর্যন্ত হেঁটে যান। এরপর তিনি আফ্রিকার এ মাথা থেকে ও মাথা অতিক্রম করার জন্য পাড়ি দেন দক্ষিণ আফ্রিকার কেপ টাউন থেকে মরক্কোর ট্যাঙ্গিয়ারস পর্যন্ত। ১৯৯৪ সালের ১৪ অক্টোবর তিনি হাঁটা শেষ করেন। ৯ বছর ১ মাস ২৮ দিন হেঁটে তিনি পাড়ি দেন ৩২ হাজার ১৮৬ কিলোমিটার বা প্রায় ২০ হাজার মাইল পথ।

জাহ্নবী

 

তারুণ্যের ঈদ

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:২২ পিএম
তারুণ্যের ঈদ

ঈদ মানেই খুশি আর আনন্দ। খুশি আর আনন্দ সবচেয়ে বেশি উপভোগ্য হয় তরুণ বয়সে। এ বয়সে পারিবারিক শাসনের রাশ অনেকটাই ঢিলে থাকে অনেক পরিবারে। এই সুযোগটাই কাজে লাগায় উঠতি তরুণরা। আর তা যদি ঈদের সময় হয়, তাহলে তো কথাই নেই।

একটা সময় ঈদের সময় কিশোর আর তরুণরা চলে যেত কোনো অ্যাডভেঞ্চারে। সেই সকালে ঈদের নামাজ পড়ে বাড়িতে এসে পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটাত। তারপর আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে বাড়ি বাড়ি যেত। সেটা কিন্তু যতটা না সৌজন্য রক্ষায় তারচেয়ে বেশি ঈদ সালামি। ঈদ সালামি বিশেষ জরুরি। বিশেষ করে তরুণ বয়সের জন্য। এ বয়সে তো আর বায়না ধরলেই কেউ কিছু কিনে দেবে না। নিজের খরচ নিজেকেই জুটিয়ে নিতে হয়। ঈদ হচ্ছে এই খরচের টাকা তোলার উত্তম সময়। সে কারণে পারতপক্ষে কেউ ঈদ সালামির সম্ভাবনা আছে, এমন বাড়ি এড়িয়ে যেত না। ঈদের দিন বিকেলে বা সন্ধ্যায় তরুণদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা চলত, টাকার অঙ্কে কে কতটা ঈদ সালামির মালিক। তারপর দুই, তিন বা কয়েকবন্ধু মিলে পরিকল্পনা চলত- পরদিন কোথায় এই টাকার শ্রাদ্ধ করা যায়।

নানান প্রস্তাব আসত। সিনেমা। অমুক জায়গায় যাওয়া। কিংবা দূরে কোথাও অচেনা জায়গায়। অথবা দূরের কোনো বন্ধুর বাড়ি। 
দূরে কোথাও যাওয়ার পরিকল্পনা হলে পরদিন ভোরেই রওনা হতে হতো। তারপর তো অ্যাডভেঞ্চার...
এখনকার তরুণরা কি সেই রোমাঞ্চ অনুভব করে?
বেশির ভাগই করে না, তবে কেউ কেউ করে। আর আনন্দ করে অন্যরকমভাবে। হইহুল্লোড়ে কেউ কেউ পাড়া মাতিয়ে রাখে। আগের মতো তরুণদের আড্ডা দিতেও দেখা যায় পাড়ায় পাড়ায়। তবে সে আড্ডা যেন প্রাণহীন, গতিহীন। কারণ একটাই- মোবাইল আসক্তি।
এখন বেশির ভাগ তরুণই মোবাইলে চ্যাটিং করে কিংবা গেম খেলে সময় কাটাতে বেশি পছন্দ করে। ঈদের সময়, যখন আনন্দ করার মোক্ষম একটা উপলক্ষ আসে, তখনো তারা চ্যাটিং বা গেমেই আনন্দ খুঁজে নেয়।
গ্রাম বা শহর, যেকোনো জায়গার তরুণদের অবস্থা প্রায় একই রকম। এর মধ্যেও কিছু তরুণ আনন্দের জন্য অন্য কিছুর অন্বেষণ করে। গ্রামের তরুণরা হয়তো নৌকা ভাড়া করে, বিশেষ করে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। তারপর সেই নৌকায় বিশাল বিশাল সাউন্ডবক্স বসিয়ে নাচ-গান করতে করতে ঘুরতে থাকে নদীপথে।
অন্যদিকে শহুরে তরুণরাও ঠিক একই কাজ করে। তবে শহরে তো আর নৌকা নেই। তারা ভাড়া করে ছোট ট্রাক বা পিক-আপ। যদিও অনেকেই এদের একটি বিশেষ নামে ডাকে। কেউ কেউ আবার দল বেঁধে মোটরসাইকেল নিয়ে পাড়া কাঁপিয়ে বেড়ায়। আর কেউ গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়ে রেস কিংবা লং ড্রাইভে।
কিছু তরুণ আবার এসবের মধ্যে আনন্দ কোথায় আছে- সেটাই খোঁজার চেষ্টা করে। আর একটু রোমান্টিক বা অন্যরকম ভাবনাচিন্তার তরুণরা রিকশায় ঘোরে।
আসলে আনন্দ যে কীসে নির্ধারিত নয়। কেউ নিজে আনন্দ করে আনন্দ পায়, আবার কেউ অন্যের আনন্দ দেখে আনন্দ পায়। কেউ আবার অন্যের আনন্দ তৈরি করে আনন্দিত হয়। দেশের অনেক জায়গায় তরুণরা ঈদের দিন গরিব ও অসহায় মানুষকে একবেলা ভালো খাওয়ানোর চেষ্টা করে নিজেদের উদ্যোগে। অন্যের মধ্যে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দিতেই তারা বেশি আনন্দ পায়। ঈদের দিন দুস্থ ও পথশিশুদের জন্য কোনো কোনো তরুণ আবার দলবেঁধে উদ্যোগ নিয়ে নতুন জামা-কাপড় উপহার দেয়। 
আবার কোনো কোনো তরুণ ঈদে বই উপহার দেয়। ঈদের বই উপহার দেওয়ার রীতিটা বেশ কয়েক বছর ধরেই চলছে বাংলাদেশে। এবং এ ক্ষেত্রেও এগিয়ে আছে তরুণরাই।
ঈদ আনন্দ উদযাপনে আবহাওয়াও একটা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। 
ঋতুভিত্তিক দেশ বাংলাদেশ। ঈদও বছর বছর ঘুরতে ঘুরতে একেক ঋতুতে আসে। আর ঋতুর সঙ্গে ঈদ আনন্দ উদযাপনও হয় একেক রকম। ঋতুবৈচিত্র্যময় এমন ঈদ উদযাপন দুনিয়ার খুব বেশি দেশে কিন্তু নেই। আমাদের তরুণরা ঈদ উদযাপনে বছর বছর নতুন মাত্রা যোগ করে নিঃসন্দেহে।

জাহ্নবী

টিনফ্যাক্ট

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ১২:২১ পিএম
টিনফ্যাক্ট

টিনএজ বয়স হচ্ছে মানুষের জীবনের শৈশব থেকে সাবালক হওয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। দশ বছর মেয়াদী এই ধাপটা শুরু হয় দশ বছর বয়সে আর পূর্ণতা পায় সাধারনত ১৯ বছর বয়সে। এসময় মানুষের বড়বড় শারীরিক, আবেগিক ও মানসিক পরিবর্তন ঘটে। 

ছেলেদের আগে মেয়েদের বয়:সন্ধি শুরু হয়ে যায়। মেয়েদের বয়:সন্ধি সাধারণত আট থেকে ১৪ বছরের মধ্যে শুরু হয়ে যায়। আর ছেলেদের দশ বছরের আগে শুরু হয় না। তবে এটা ব্যক্তি, জেনেটিকস, খাদ্যাভ্যাস ও কায়িক শ্রমের ওপরও নির্ভর করে। ছেলেদের পবির্তনের মধ্যে রয়েছে বগলের তলায় অবাঞ্চিত লোম, কণ্ঠস্বর পরিবর্তন, গুপ্তলোম, দাড়ি-গোঁফের রেখা, পিটুইটারি থলি তৈরি হয়। আর মেয়েদের পিটুইটারি থলি তৈরি, গুপ্ত ও বগলের তলায় লোম গজানোসহ কিছু শারীরিক পরিবর্তন।

টিনএজ বয়সে মানুষের মস্তিষ্ক কাটছাঁট হয়। তার মানে প্রথমবারের মতো মস্তিষ্কের উন্নয়ন ঘটে। আমাদের মস্তিষ্কে এমন অনেককিছুই থাকে যেগুলো আসলে কোনো কাজের নয়। বয়স যত বাড়তে থাকে, ততই অব্যবহৃত তথ্যগুলোর মলিন হতে থাকে এবং একসময় সেগুলোর মৃত্যু ঘটে। অন্যদিকে বহুল ব্যবহৃত তথ্যগুলো আরো শক্তিশালী হয়ে উঠতে থাকে।

জাহ্নবী

আসাদের জয় বাংলা অ্যাওয়ার্ড

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৪, ১১:৪৬ এএম
আসাদের জয় বাংলা অ্যাওয়ার্ড
সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকে জয় বাংলা অ্যাওয়ার্ড নিচ্ছেন আসাদ

ইচ্ছাশক্তি, অটুট লক্ষ্য ও একাগ্রতা- এই তিন গুণের সম্মিলিত শক্তিই পারে মানুষকে যেকোনো প্রতিকূলতা কাটিয়ে সাফল্যের চূড়ান্ত শিখরে পৌঁছে দিতে। যদিও এর সামনে নানা প্রতিবন্ধকতা বাধা হয়ে আসে। কিন্তু এসব প্রতিবন্ধকতাকে বৃদ্ধাঙুলি দেখিয়ে ‘জয়বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড-২০২২’ জয় করেছেন এক স্বপ্নবাজ তরুণ শেখ মোহাম্মদ আতিফ আসাদ। জামালপুর জেলার সরিষাবাড়ী উপজেলার ডোয়াইল ইউনিয়নের হাসড়া মাজালিয়া প্রত্যন্ত গ্রামে জন্ম ও বেড়ে ওঠা আসাদের। বাবা-মা আর সাত ভাইবোনের অভাবের সংসারে তিনি সবার ছোট। পড়াশোনা করছেন জামালপুর সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজে উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগে অনার্স তৃতীয় বর্ষে। পরিবারের অভাব-অনটনের কারণে প্রাইমারি স্কুল থেকে এখন পর্যন্ত ধানকাটা, দিনমজুরি, রং বার্নিশ, রাজমিস্ত্রি, রডমিস্ত্রির কাজ এমনকি ভ্যান চালিয়ে খরচ জোগাচ্ছেন লেখাপড়ার। অনেক সময় মায়ের সঙ্গে নকশিকাঁথায়ও সুই ফুটিয়েছেন। এসব কাজ করে পড়ালেখার পাশাপাশি হাল ধরেছেন পরিবারের। 

অর্থাভাবের এই কষ্টগুলো ছোট থেকেই তার বিবেককে নাড়া দিত। তিনি ভাবতেন সমাজের জন্য শিক্ষার আলো দরকার। কারণ তার মতোই গ্রামের অধিকাংশ মানুষ। অর্থাভাবে লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যেতে দেখেছেন অনেককে। তাদের জন্য  ছোট থেকেই কিছু করার ইচ্ছা ছিল আসাদের। তিনি ভাবেন ভালো কিছু করতে হলে প্রয়োজন যথাযথ জ্ঞানার্জনের। আর জ্ঞানকে বিকশিত করার জন্য বই পড়ার বিকল্প নেই। এর জন্য প্রয়োজন পাঠাগারের। কিন্তু প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে পাঠাগার সুবিধা নেই। আবার টাকা দিয়ে বই কিনে পড়ার সামর্থ্য নেই অনেকের।

যেই ভাবনা সেই কাজ। ২০১৮ সালে প্রতিবেশী এক আপুর দেওয়া ২০টি বই নিয়ে যাত্রা শুরু হয় আসাদের পাঠাগারের।  শুরুতে পাঠাগারটির কোনো নাম না থাকলেও পরবর্তীতে পাঠাগারটির নামকরণ করা হয় বড় ভাই অকালপ্রায়ত মিলনের নামে। ২০টি বই নিয়ে আসাদের শুরু করা পাঠাগারের নামকরণ হয় ‘মিলন স্মৃতি পাঠাগার’। ঘর ভাড়া নিয়ে পাঠাগার পরিচালনা করার টাকা ছিল না তার। যেহেতু শিক্ষার ও জ্ঞানের আলো ছড়ানোই তার মূল লক্ষ্য, সেহেতু অবকাঠামো কোনো বাধা হতে পারে না, এমন চিন্তা থেকেই  নিজের ঘরের বারান্দায় পাটকাঠির বেড়া দিয়ে পাঠাগার শুরু করেন। বইগুলো  সংরক্ষণ করার জন্য বাবার পরামর্শে ঘরে থাকা কাঠ দিয়ে তৈরি করেন নড়বড়ে একটা বুকশেলফ।

আসাদ বলেন, শুরুর দিকে বিভিন্ন লোকের কাছ থেকে চেয়ে দু-একটা করে বই নিয়ে বই সংখ্যা বাড়ানো আর পাঠকদের নতুন বই দেওয়ার চেষ্টা করি। এরপর গ্যাসটন ব্যাটারিজ লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক কে এইচ মালেক স্যার পাঠাগারের এই ভালো কাজ দেখে খুশি হয়ে ১০০ বই উপহার দেন এবং ভিয়েতনামে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ ম্যাম বই কেনার জন্য কিছু টাকা দেন। এতে আমার পাঠাগার সমৃদ্ধ হয়।

সেই থেকে শুরু। সমাজের ছাত্র, শিক্ষক, চাকরিজীবী, প্রবাসী  সবার দেওয়া বই নিয়ে আমার পাঠাগারে বর্তমানে বই সংখ্যা ৮ হাজার। আমি লেখাপড়ার পাশাপাশি বাড়ি বাড়ি গিয়ে বই বিতরণ করি সপ্তাহে দু-তিন দিন। এ ছাড়া কেউ যদি ১০-১৫ কিলোমিটার দূর থেকেও ফোন করে। তাকে সাইকেল চালিয়ে গিয়ে বই দিয়ে আসি। বর্তমানে প্রায় ১ হাজার ৫০০ পাঠক আছেন আমার  পাঠাগারে।  শুরুর দিকে বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হতাম। অনেকে উপহাস করত টিটকারি দিয়ে কথা বলত, এখনো বলে। তাতে আমার কষ্ট লাগত কিন্তু দমে যাইনি। আমার অবসর সময়টুকু মানুষের জন্যই কাজে লাগাচ্ছি এবং সেটা বই দিয়ে আলোকিত করার মাধ্যমে। আমি চাই সমাজে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে পড়ুক।

আসাদ জানান, পাঠাগারের সব বই কুরিয়ারে আসে উপজেলায়। তাকে ৮-১০ কিলোমিটার সাইকেল অথবা ভ্যান চালিয়ে নিয়ে আসতে হয় সেসব বই। আবার কোনো কারণে আসাদ বাড়ি না থাকলে, তার মা পাঠকদের বই দেন এবং বই সংগ্রহ করেন। কারণ  লেখাপড়ার খরচের জন্য তাকে এখনো মাঝে-মাধ্যেই দূরে কোথাও দীর্ঘ  সময় কাজ করতে যেতে হয়। আসাদের ইচ্ছে  নিজ উপজেলা সরিষাবাড়িতে প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হবে বইমেলা। প্রচণ্ড মনোবলের কারণে তার কাছের এক বড় ভাইয়ের সহায়তায় ২০২০ সালের ১৭, ১৮ ও ১৯ জানুয়ারি তিন দিনব্যাপী নিজ উপজেলায় অনুষ্ঠিত হয় বইমেলা।  দেশের অনেক গুণী মানুষ তার বইমেলায় অতিথি হিসেবে আসেন। তার ইচ্ছা ও আত্মবিশ্বাস থেকেই পাঠাগার ও বইমেলা শুরু করা। শুধু তাই নয়, বর্তমানে তিনি আটটি গ্রামভিত্তিক পাঠাগার, চারটি পথ পাঠাগার, পাঁচটি স্টেশন পাঠাগার, একটি শিশু পাঠাগার গড়ে তুলেছেন। আর তার এই ভালো কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ এবং বইপড়া আন্দোলন নিয়ে কাজ করায় আসাদ ‘জয় বাংলা ইয়ুথ অ্যাওয়ার্ড-২০২২’ অর্জন করেন। এ ছাড়া পেয়েছেন আইভিডি বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার অ্যাওয়ার্ড ২০২১, আলোর প্রদীপ সম্মাননা ২০২২, বছরের সেরা নায়ক-২০২২ ইত্যাদি সম্মাননা।

এর মাধ্যমে তিনি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বহু তরুণের মাঝে। টাকার অভাবে পড়ালেখা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়া আসাদ আজ বহু মানুষের অনুপ্রেরণা। বর্তমানে তিনি সফল একজন উদ্যোক্তা ও সমাজের আলোচিত মুখ। আসাদ বলেন, পাঠাগারের জন্য একটা ফাউন্ডেশন ও দুজন ব্যক্তি মিলে একটা ভ্যান কিনে দেন। সেটা পাঠাগারের কাজে ব্যবহারের পাশাপাশি নিজে অবসর সময়ে ভ্যান চালাই। সেটা থেকে গত বছর ৬০ হাজার টাকা ইনকাম করি। যেটা দিয়ে পাঠাগার উন্নয়নের পাশাপাশি কিছু জমিও বন্ধক রেখেছি।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা জানতে চাইলে অদম্য সাহসী স্বপ্নবাজ এই তরুণ বলেন, বই পড়ার আন্দোলন আমার গ্রাম থেকে অন্য গ্রাম এবং সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ুক। প্রত্যেকটি গ্রামেই একটি করে পাঠাগার গড়ে উঠুক। লাখ লাখ পাঠাগারে সারা দেশ ভরে যাক। সবাই বই পড়ুক। বই পড়ার বিকল্প কিছু নেই। তাই বলব বই পড়ো, পড়ো এবং পড়ো। মৃত্যুর আগে হলেও দেখে যেতে চাই সব গ্রামেই একটি করে পাঠাগার হয়েছে। তাতেই আমার মৃত্যু সার্থক হবে।

জাহ্নবী

জীবনের প্রয়োজনে

প্রকাশ: ২৯ মার্চ ২০২৪, ১১:৪১ এএম
জীবনের প্রয়োজনে

দীর্ঘক্ষণ জ্যামে বসে থাকায় বিরক্ত হয়ে একপর্যায়ে বলে উঠলাম,  মামা, আপনি এ রাস্তায় না এসে সামনের ওই গলি ধরে গেলে এতক্ষণ পৌঁছে যেতাম। আপনি বরং রিকশা ঘুরিয়ে ওই গলি দিয়েই চলেন।

এখন সব রাস্তাই ভিড়। কোনদিক যাব কন?

রিকশাওয়ালার এ কথা শুনে হতাশ হয়ে চুপ করে বসে থাকলাম কিছুক্ষণ। পকেট থেকে মোবাইলটা বের করে স্ক্রলিং করে যাচ্ছি। যখন কোনোকিছুতে মন বসে না, বর্ষার আকাশের মতো বিষণ্ণ থাকে মনটা, তখন ফেসবুকিং করেই দিব্যি সময়টা কাটিয়ে দেওয়া যায়। কে কী পোস্ট করল, কোন বন্ধু কার সঙ্গে ঘুরতে গেল, কোন বান্ধবী নতুন শপিং করে স্টোরি দিল সেসবের দিকে আর মনোযোগ থাকে না। সময় কাটনোর জন্যই হয়তো এ এলোপাতাড়ি ফেসবুকিং অন্যতম একটা মাধ্যম হতে পারে।

সকালে ক্লাস করতে গিয়ে হঠাৎ করেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। কারও ফোনকল পেলে মানুষের মাঝে স্বর্গীয় সুখানুভূতি লাভ করে। আবার কারও ফোনকল পেলে বিরক্তিতে মাথা গরম হওয়ার জোগাড়। আমার বেলায় হয়েছে দ্বিতীয়টা। খুব বেশি মাথা গরম না হলেও একটু যে বিরক্ত হয়েছি সেটা অস্বীকার করে পাপের ভাগিদার হওয়ার ইচ্ছে নেই। ইব্রাহিম ভাই ফোন দিয়ে জানতে চাইল ফ্রি আছি কি না। ফুফাতো ভাই অনেকদিন পর ফোন দেওয়ায় মনে একটু আনন্দ পেলাম। ভাবলাম, ভাই হয়তো সিলেট থেকে আমার ক্যাম্পাসে এসে খোঁজ নিচ্ছে আমার। দেখা-সাক্ষাৎ করবে, ভালো লাগবে। শহুরে একলা জীবনে বদ্ধপরিবেশে আপনজনদের কাছে পেলে মনটা আনন্দে নেচে ওঠে। কিন্তু ভাই তার গুরুত্বপূর্ণ কাজের একাংশ আমার ওপর চাপিয়ে দিল। ভাই নিজে বই লেখেন, এডিটিং করেন। সুদূর সিলেট থেকে ঢাকার বাংলাবাজারে এসে পেপারপত্র কেনা, প্রিন্টিং পাবলিকেশন, বাঁধাই করা সবসময় উনার পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাই ছোট ভাই হিসেবে মাঝে মাঝে সে কাজের দায়িত্ব অর্পিত হয় আমার ওপরে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলাবাজার খুব বেশি দূরে না বলে আমাকেই যেতে হয়।

তবে আজ হঠাৎ করেই বিরক্তি চেপে বসল মাথায়। বিরক্তিটা আরও চরম হয়ে উঠল যখন জুয়েল আমার সঙ্গে যেতে অস্বীকার করল। ঢাকা শহরের এই যানজটপূর্ণ পরিবেশ, ধুলাবালি জ্যামের কারণেই একা যেতে ইচ্ছে করছিল না। কিন্তু অসুস্থতার  অজুহাত দেখিয়ে না করে দিল জুয়েল। তাই বাধ্য হয়ে একাই যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। ক্লাস শেষে গোসল, দুপুরের খাবার, নামাজের পরেই বুয়েট ক্যাম্পাসের ভেতর দিয়ে ফুলবাড়ী বাসস্যান্ডের উদ্দেশে সোজা হাঁটা ধরলাম।

এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে সময় কিছুটা গেলেও রিকশা বিন্দুমাত্র চলার কোনো লক্ষণ দেখা গেল না। বাবুবাজার থেকে শাহ পার্কে আসতে যে সময় লাগল, তার থেকেও চার-পাঁচ গুণ বেশি সময় ধরে রিকশা দাঁড়িয়ে আছে পিলারের মতো। জ্যামের গুমোট পরিবেশ আর যানজটের শব্দে মাথায় বোম ফাটার মতো অবস্থা। বিরক্তি এবং অস্থিরতা দূর করতে ভাবলাম রিকশাওয়ালা মামার সঙ্গে একটু গল্প করি। যেটা সচরাচর সব রিকশাওয়ালার সঙ্গেই করা হয় আমার। বিশেষ করে যখন রিকশায় একা যাতায়াত করি। এই প্রান্তিক মানুষের সঙ্গে যতবেশি মেশা যায়, তাদের যত গভীরে যাওয়া যায়, ততই জীবনের মানে বোঝা যায়। জীবনকে উপলব্ধি করা যায় নতুন আঙিকে, নতুন অবয়বে। এই উপেক্ষিত মানুষগুলো সবার কাছে নিজেদের তুলে ধরে না। যদি কেউ তাদের জানতে চায়, বুঝতে চায় তখন এই মানুষগুলো তাদের সবকিছু উন্মুক্ত করেই উপস্থাপন করে। নিজের দুঃখের কাহিনি অন্যের কাছে প্রকাশ করলে যেমন ব্যক্তির দুঃখের কিছুটা হলেও লাঘব হয়, তেমনি শ্রোতাও নতুন করে জীবনকে উপভোগ করতে পারে, নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে নতুন করে। তাই, বিশেষ করে রিকশা-মামাদের সঙ্গে আমার আত্মিক বন্ধনটা একটু বেশি।

মামা, আপনার দেশের বাড়ি কই?
কুষ্টে।

ভাষা শুনে বুঝলাম কুষ্টিয়া। সব মানুষই আঞ্চলিক ভাষায়  নিজের পরিচয় তুলে ধরতে খুশি হয়। এ রিকশাওয়ালাও অন্যের থেকে ব্যতিক্রম নয়। 
বললাম, এ যে আমার পাশের জেলা। আমার বাড়ি ঝিনাইদহে।

মামা একটু কৌতূহল প্রকাশ করে বলল, ঝিনাইদার কনে আপনার বাসা?
মহেশপুর।

আপনার এলাকায় তো প্রায়ই যাই। সেদিনও বারোবাজার গিছিলাম অটো নিয়া।

রিকশা-মামার উপজেলার নাম জানতে চাওয়ায় বলল, তার বাড়ি দৌলতপুর উপজেলায়।

এবার আমার একটু অবাক হওয়ার পালা। জিজ্ঞেস করলাম, মামা আপনার অটো কই আর আপনি গ্রাম ছেড়ে ঢাকায় কেন?

দেখলাম মামার মুখটা মলিন হয়ে গেল। বুঝলাম ভাগ্য তার সঙ্গে খেলা করেছে। মানুষের জীবনে এমন অনেক ঘটনা লুকায়িত থাকে, যা তার বাহ্যিক অবস্থা দেখে বোঝার উপায় নেই। দেখলে বলা যাবে না যে, এই লোকটা সর্বহারা। গ্রামের সর্বস্ব হারিয়ে শহরের উদ্বাস্তু সে। তেমনই এক ভুক্তভোগী এই রিকশা-মামা।

গ্রামে থাকতি অটো চালাতাম। এক রাতি অটো নিয়ে বাড়িতে আসার পথে ডাকাতের খপ্পরে পড়ছিলাম। বলে, গাড়ি দে! না হলি তোক মাইরে ফেলব।
আমি ভাবলাম, গাড়ি নিয়ে যাক নিক। জীবনে বাঁইচে থাকলি গাড়ি কত আসপি। আমি মইরে গেলি আমার বৌ-বাচ্চার কিডা দেখপি, কি হবি তাগার। ডাকাতরা আমাক গাছের সঙ্গে বাঁইধে গাড়ি নিয়ে চইলে গেল।

আমি জানতে চাইলাম, থানায় মামলা করেননি?

মামলা কইরে আর কি হবি! গরিবের জন্যি কি আইন আছে? যার টাকার দেমাগ আছে, আইন তাগের জন্যি। আর মামলা করতিও তো টাকা লাগে, এত টাকা কনে পাব?

আমি ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলাম উনার দিকে। ভাবলাম কিছু বলব। কিন্তু ভাষা খুঁজে পেলাম না।

জ্যামে দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে এবার মামা নিজেও বিরক্ত হয়ে গেল। এবার রিকশা ঘুরিয়ে আমার বলা গলির দিকেই চলতে শুরু করল। এদিকেও ভিড়। তবে তুলনামূলক কম। এবার মামা নিজেই বলতে শুরু করল। বাঁধ ভেঙে গেলে পানির স্রোতকে যেমন আটকে রাখা কঠিন হয়ে যায়, মানুষও তেমন দুঃখ ভাগ করার মানুষ পেলে সবটুকু উগলে দিয়ে বলতে শুরু করে।

আমি পাঁচ-সাত দিন হইলো ঢাকা আইচি। বাড়ি থেইকে আর কি হবি! জমিও নাই যে চাষ করব। আগেও ঢাকায় রিকশা চালাতাম। তাই আবার চলে আলাম। বাড়ি থাকলি পরিবার নিয়ে না খায়া মরা লাগত।

এখানে পরিবারের কেউ নেই?

না, সবাই গিরামে আছে। ঢাকা শহরে যে খরচ। নিজেরই প্যাট চলে না আবার বাড়ির লোকে!!

কে কে আছে আপনার পরিবারে?

তিন মেয়া আছে। সবাইরে বিয়ে দিইচি। এক ছাওয়াল আছে। সে মাদরাসায় সেভেনে পড়ে।

রিকশা কি নিজের মামা, নাকি ভাড়া নিছেন?

মামা একটু শুকনো হাসি হেসে বলল, নিজে রিকশা কোনে পাব কন? ভাড়ায় চালাই। নিজে কিনলিও দুই দিন পর ছিনতাই হয়ে যাবি। গেরেজ থাকি নেওয়া আসি। কাজ শেষে ওকেনেই রাইখে দিই।

অবশেষে আমরা মা-বাবা প্রিন্টিংয়ের সামনে পৌঁছালাম। ভাইও ইতোমধ্যে ফোন করে জানতে চাইল কাজ কতদূর শেষ হয়েছে। কাগজগুলো দোকানে রেখে মামাকে বললাম, চলেন কোথাও বসে চা-টা খাই,
না মামা, আপনে খান। আমার আবার অন্য জাগায় যাওয়া লাগবি।

আমি আর জোর করলাম না। উনার কাছে আমার চায়ের অফার থেকে নতুন যাত্রী ধরা বেশি প্রয়োজন।

পকেটে হাত দিয়ে দেখি টাকা এখনো অতিরিক্ত কিছু আছে। ভাই খরচ বাবদ কিছু বেশি টাকা দিয়েছে আমায় বিরিয়ানি খাওয়ার জন্য। গুনে দেখলাম ৫০০-এ মতো। তাই বড়োলোকি ভাব ধরে রিকশা-মামাকে বললাম আমায় পার্কের বাসস্ট্যান্ডে নামিয়ে দিতে।

সন্ধ্যা প্রায় ঘনিয়ে আসছে। আসরের ওয়াক্ত ইতোমধ্যে কাজা হয়ে গেছে। মাগরিবটা যেন কাজা না হয় তাই দ্রুত পা চালিয়ে বাসে উঠে বসলাম। উদ্দেশ্য হলো (ছাত্রাবাস) মসজিদে মাগরিব নামাজ পড়া। লোকাল হলেও বাসটা মোটামুটি খালি। মাঝামাঝি একটা সিটে বসে পড়লাম। ফোনটা বের করে ফেসবুকিং করে জ্যাম ও ক্লান্তিটা দূর করার চেষ্টা করতে যাচ্ছিলাম। তখনই মনে পড়ে গেল সেই রিকশা-মামার কথা। আসার সময় অবশ্য ভাড়া থেকে অতিরিক্ত আরও ২০ টাকা বেশি দিয়ে আসছি। উনার করুণ দশার জন্য নাকি একজন রিকশাচালক বলে টাকাটা দিলাম তা জানি না। তবে ভাবলাম দেওয়া উচিত।

নিয়তি মানুষকে কোথায় নিয়ে যায়। পরিবেশ, পরিস্থিতি মানুষকে পরিবর্তন হতে শেখায়। নিয়তির কারণেই গ্রামের অটোওয়ালা আজ ঢাকার রিকশাওয়ালা। গ্রামের মেধাবী ছেলেটা শহরের নামমাত্র বেতনের চাকরিওয়ালা। পেটের দায়ে, জীবনের প্রয়োজনে দুটি ভিন্ন শ্রেণির মানুষ একই পথের পথিক। কেউ-বা রিকশা চালিয়ে জীবনের প্রয়োজন মেটায়, কেউ-বা পেপারপত্র বিক্রি, প্রিন্টিং করে।

জীবন এক রহস্যময় পর্দায় ঘেরা। রয়েছে হাজারো স্তর। এই স্তর ভেদ করতে করতে উপস্থিত হয় জীবনের যবনিকাপাতে।

দর্শন বিভাগ 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

জাহ্নবী