দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় (জবি)। স্কুল থেকে কলেজ, কলেজ থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়া এটি দেশের একমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকায় শিক্ষা বিস্তারে শুরু থেকেই যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ভূমিকা রাখছে তার মধ্যে অন্যতম জবি। বিশ্ববিদ্যালয়টি সংকট-সংগ্রামের ১৯ বছর পার করে ২০এ পা দিয়েছে। নতুন বছরের পদার্পণে জবির নতুন নতুন সফলতার প্রত্যাশা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের৷
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আগে নাম ছিল জগন্নাথ কলেজ। এই নামেই বিংশ শতাব্দীর অধিকাংশ সময় জুড়ে পরিচিত ছিল। ১৮৫৮ সালে দীননাথ সেন, প্রভাতীচরণ রায়, অনাথবন্ধু মল্লিক এবং ব্রজসুন্দর মিত্র ঢাকা ব্রাহ্ম স্কুল নামে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ১৮৭২ সালে এই নাম পরিবর্তন করে জগন্নাথ স্কুল করা হয়। মানিকগঞ্জ জেলার সাটুরিয়া উপজেলার বালিয়াটির জমিদার কিশোরীলাল রায় চৌধুরী তার পিতার নামে জগন্নাথ স্কুল নামকরণ করেন। ১৮৮৪ সালে এটি একটি দ্বিতীয় শ্রেণির কলেজে এবং ১৯০৮ সালে প্রথম শ্রেণির কলেজে রূপান্তরিত হয়।
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে তৎকালীন জগন্নাথ কলেজের স্নাতক কার্যক্রম এবং যথাক্রমে আইএ, আইএসসি কার্যক্রমও বন্ধ করে দেওয়া হয়।
২০০৫ সালে জাতীয় সংসদে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় আইন-২০০৫ পাশের মাধ্যমে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়। ২০০১-২০০২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থীরা জবির প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী। বর্তমানে এই প্রতিষ্ঠানে সাতটি অনুষদ, ৩৮টি বিভাগ ও দুটি ইনস্টিটিউট রয়েছে এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৮ হাজার। নিয়মিত স্নাতক ও স্নাতকোত্তরের শিক্ষার্থী ছাড়াও প্রতিষ্ঠানটিতে ২৬৫ জন এমফিল ও ১৫১ জন পিএইচডির শিক্ষার্থী রয়েছেন। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে ১৫৬ জন অধ্যাপকসহ মোট ৬৮০ জন শিক্ষক এবং ৭৩৮ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী রয়েছেন।
মোট ৭ দশমিক ৫ একর জমিতে প্রতিষ্ঠিত জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। শ্রেণিকক্ষ সংকট, আবাসন সংকটসহ বিভিন্ন সমস্যার সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করছে এখানকার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির ছাত্রীদের জন্য ‘বেগম ফজিলাতুননেছা মুজিব হল’ নামে ১৬ তলাবিশিষ্ট একটিমাত্র হল রয়েছে। যার ধারনক্ষমতা এক হাজার ২০০ জন। ছাত্রদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কোনো হল নেই। তবে নানা ধরনের সংকটকে মোকাবিলা করে ক্রমান্বয়ে সফলতা পাচ্ছে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের আশার আলো বিশ্ববিদ্যালয়টির কেরানীগঞ্জের নতুন ক্যাম্পাস। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে শিক্ষার্থীদের আবাসিক হলের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে কেরানীগঞ্জের তেঘরিয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়টির নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। উন্নত ও আধুনিক ক্যাম্পাসের জন্যে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২০০ একর জমি। ২০১৮ সালের ৩ অক্টোবর জমির চূড়ান্ত অনুমোদন দেয় ভূমি মন্ত্রণালয়। ৯ অক্টোবর নতুন ক্যাম্পাস স্থাপনে ভূমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়নের জন্য প্রকল্প অনুমোদন করে একনেক। তবে এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির ক্যাম্পাস পূর্ণাঙ্গ রূপ পায়নি।
এই প্রতিষ্ঠানটিতে অধ্যয়ন করেছেন দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ। এর মধ্যে অন্যতম, বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, ভাষা শহিদ রফিকউদ্দিন আহমদ, প্রখ্যাত আয়ুর্বেদশাস্ত্র বিশারদ এবং শিক্ষাবিদ আনিসুজ্জামান, ব্রিটিশবিরোধী নৌ-বিদ্রোহী শহিদ মানকুমারী বসু ঠাকুর, সাহিত্যিক শামসুল হক ,অভিনেতা এ টি এম শামসুজ্জামান, লেখক ইমদাদুল হক মিলন, অভিনেতা প্রবীর মিত্র, মুক্তিযোদ্ধা ও সঙ্গীতশিল্পী ফকির আলমগীর, মুক্তিযুদ্ধের শহিদ বুদ্ধিজীবী, কথাসাহিত্যিক ও সাংবাদিক শহিদ সাবের, সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল, কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজুর রহমান, ঔপন্যাসিক আলাউদ্দিন আল আজাদ, কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াসসহ বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।
বিশ্ববিদ্যালয় দিবস উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটির অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী রহমান বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় দেশ এবং দেশের বাইরে গবেষণায় অগ্রণী ভূমিকা রাখুক এই প্রত্যাশা রাখি। নানা ধরনের সংকট আমাদের রয়েছে। তবে আমার বিশ্বাস, সংকট কাটিয়ে দ্রুতই সফলতার পথে এগিয়ে যাবে জবি।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মুনিম বলেন, আমারা আশাবাদী আমাদের প্রিয় প্রতিষ্ঠান তার অতীত ইতিহাসকে স্মরণ করে দ্রুতই সামনে এগিয়ে যাবে।
আজকের এই দিনে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. রেজাউল করিম বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়কে সেন্টার অব এক্সিলেন্ট হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষার্থী, শিক্ষকসহ সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এখানে শিক্ষার্থীরা লেখাপড়া শিখে জ্ঞান অর্জনের মাধ্যমে দেশ ও বিদেশে জবির নাম ছড়িয়ে দেবে।
মুজাহিদ/সুমন বিশ্বাস/অমিয়/