ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি), ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি (আইসিটি) বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলামের স্ত্রী ফিরোজা নাজনীনকে বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগে প্রভাষক পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তবে গণমাধ্যমে নানা অনিয়মের অভিযোগ দৃষ্টিগোচর হলে তার নিয়োগপত্র প্রদান স্থগিত রাখা হয়। অভিযোগগুলো ব্যক্তিগতভাবে যাচাই করে দেখার কথা জানিয়েছেন উপাচার্য অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান।
এদিকে অভিযোগের বিষয়গুলো নিয়ে অনুসন্ধান করলে বেশকিছু প্রমাণ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। প্রথম বর্ষে প্রার্থী ফিরোজা নাজনীনের এক কোর্সে ফেইলসহ রেজাল্ট পয়েন্ট হয় ২.৯৩ । ২য় বর্ষে তিনি ৩.৩৫ রেজাল্ট নিয়ে উত্তীর্ণ হন। পরে ৩য় ও ৪র্থ বর্ষে প্রার্থীর বর্তমান স্বামী পরীক্ষা কমিটির সভাপতি হলে তার রেজাল্টে ব্যাপক পরিবর্তন হয়। ৩য় বর্ষে তার রেজাল্ট ৩.৫৭ এবং ৪র্থ বর্ষে ৩.৮৪ হয়। ফলে ৪টি বর্ষের রেজাল্টের গড় দাড়ায় ৩.৪২। পরবর্তীতে প্রার্থী মানোন্নয়ন পরীক্ষা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এ সময় মানোন্নয়ন পরীক্ষার দায়িত্বে ড. জাহিদ ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। মানোন্নয়ন পরীক্ষায় তিনি অভূতপূর্ব রেজাল্ট করেন। মানোন্নয়নের পরে প্রথম বর্ষে রিটেইক ও ২টি মানোন্নয়ন পরীক্ষাসহ রেজাল্ট হয় ৩.৩৮, ২য় বর্ষে ১টি মানোন্নয়নসহ ৩.৪২, ৩য় বর্ষে ১টি মানোন্নয়নসহ ৩.৬৪ ও ৪র্থ বর্ষে ৩.৮৪ । অথচ প্রথমবর্ষে মানোন্নয়ন ছাড়া তার রেজাল্ট ছিল ২.৯৩। তার মাস্টার্সে ফলাফল ছিল ৩.৬৪। রেজাল্টের এমন হেরফের প্রশ্ন ও সন্দেহ তৈরি করেছে।
নিয়োগ বোর্ডের আগে ফিরোজা নাজনীনের স্বামী ও আইসিটি বিভাগের অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম নিয়োগ বোর্ডের এক্সপার্ট ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী ফারহান আহমেদের সঙ্গে কুষ্টিয়ার দিশা টাওয়ারে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকারের বিষয়ে জানতে চাইলে প্রফেসর ড. জাহিদুল ইসলাম বলেন, ”আমি সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছি। মানুষ কি সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে পারে না? আমার ২ বছর আগে থেকেই তার সাথে পরিচয়”।
এদিকে একইস্থানে আইসিটি বিভাগের সভাপতি ও নিয়োগ বোর্ডের সদস্য অধ্যাপক ড. তারেক হাসান আল মাহমুদও গিয়েছিলেন বলে জানা গেছে। এ সাক্ষাৎ নিয়োগ প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে বলে অন্যরা উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
অভিযোগের বিষয়ে অধ্যাপক ড. জাহিদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ফিরোজা নাজনীন ছাত্রী থাকাকালে পরীক্ষা কমিটির সদস্য ছিলাম, তবে বিয়ের পরে কোনো কমিটিতে ছিলাম না এবং তার কোনো ক্লাসও নেইনি।
ফলাফল প্রভাবিত করার অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, পরীক্ষা কমিটিতে একাধিক সদস্য থাকেন এবং একজন শিক্ষক এককভাবে ফলাফল নির্ধারণ করেন না। বরং আমার সঙ্গে বিয়ের কারণে ফিরোজা থিসিস পায়নি এবং মাস্টার্সেও কম নম্বর পেয়েছেন।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নিয়োগ বোর্ডের (এক্সপার্ট) বিশেষজ্ঞ সদস্য অধ্যাপক চৌধুরী ফারহান আহমেদ বলেন, “শুধু ড. জাহিদুল ইসলামের সঙ্গেই নয়, সেদিন আরও অনেক শিক্ষকের সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়েছে। ড. জাহিদের সঙ্গে আমার ২০১৯ সাল থেকে পরিচয়। আমরা গ্রিন ইউনিভার্সিটিতে একসঙ্গে শিক্ষকতা করেছি। এ ছাড়া দুজনই দক্ষিণ কোরিয়া থেকে পিএইচডি করেছি। তাই তার সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়াটা স্বাভাবিক নয় কি? তার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছে, তবে নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে কোনো কথা হয়নি। যারা এ নিয়ে বিতর্ক তৈরির চেষ্টা করছে, তাদের বিষয়েও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতা হওয়া উচিত।”
গত ১৪ মে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৫তম উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব নেন লোকপ্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক ড. একেএম মতিনুর রহমান। দায়িত্ব নিয়েই শিক্ষক সংকট কাটাতে নিয়োগ প্রক্রিয়া শুরু করেন তিনি। এ সময় আওয়ামী আমলের স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে স্বচ্ছ নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দেন। এরই মধ্যে তিনটি বিভাগে চারজন শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। আইসিটি বিভাগে ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফিরোজা নাজনীন বিভাগটির প্রভাষক হিসেবে সিন্ডিকেটে নিয়োগ পেয়েছেন। নতুন প্রশাসনের প্রথম নিয়োগ ঘিরে অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগে অস্বস্তিতে পড়েছে নতুন প্রশাসন। তাই বিষয়টি খতিয়ে দেখতে নিয়োগপত্র স্থগিত করা হয়েছে।
নিয়োগ ঘিরে এ অভিযোগের বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ কে এম মতিনুর রহমান বলেন, যে নিয়োগটির বিষয়ে অভিযোগ উঠেছে সেটি আমি একান্তভাবে যাচাই-বাছাই করে দেখব।
নিয়ামতুল্লাহ/নাঈম