চট্টগ্রামের প্রায় প্রতিটি উপজেলায় গরুর লাম্পি স্কিন ডিজিজ (এলএসডি) ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিদিনই এই রোগে আক্রান্ত হয়ে একাধিক গরু মারা যাওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। এতে খামারিরা পড়েছেন বিপাকে। জেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের কাছে ভ্যাকসিন না থাকায় সংকট আরও বেড়েছে। বিকল্প হিসেবে অনেক খামারি কবিরাজি চিকিৎসা করাতে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঈদুল আজহার পর থেকে জেলার বিভিন্ন এলাকায় এ রোগ ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। রোগটিতে বাছুর বেশি আক্রান্ত হয়, তবে একাধিক গরু এ রোগে অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জেলার সাতকানিয়া, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, ফটিকছড়ি উপজেলায় গত কয়েক মাসে শতাধিক গরু-বাছুরের মৃত্যু হয়েছে বলে স্থানীয়দের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। রোগাক্রান্ত গবাদিপশু নিয়ে স্থানীয় লোকজন প্রতিদিন উপজেলা প্রাণিসম্পদ হাসপাতালে ভিড় করছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের ভাষ্য মতে, এটি মূলত ভাইরাসজনিত রোগ। পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাব, অস্বাভাবিক গরম ও মশা-মাছির বংশ বিস্তারের মাধ্যমে এই রোগটি ছড়িয়ে পড়েছে। আক্রান্ত গরুর প্রথমে জ্বর আসে। শরীরের তাপমাত্রা বেড়ে যায়। তারপর শরীরের কয়েক জায়গায় ছোট ছোট গুটি উঠতে থাকে, যা ধীরে ধীরে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। মাথা, ঘাড় ও পায়ে গুটি বেশি দেখা যায়। এ সময় গরুর মুখ দিয়ে লালা পড়ে। খাবারে অনীহা দেখা দেওয়ায় গরু দুর্বল হয়ে যায়।
আক্রান্ত পশুর শরীরের বিভিন্ন জায়গায় চামড়া পিণ্ড আকৃতি ধারণ করে। লোম উঠে যায়, ক্ষত সৃষ্টি হয়। কিডনির ওপর এ রোগের প্রভাব পড়ায় গবাদিপশু মারা যায়। এ রোগে আক্রান্ত পশুর মাংস মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর।
সাতকানিয়া উপজেলার বাসিন্দা আবদুর রহমান জানান, হঠাৎ করে তার একটি বাছুরের পুরো শরীরে গুটি ওঠে। বিষয়টি দেখে তিনি আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। পরে জানতে পারেন বাছুরটি লাম্পি স্কিন ডিজিজে (এলএসডি) আক্রান্ত। প্রথমে স্থানীয় পশু চিকিৎসকের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া হয়। রোগ না সারায় এখন কবিরাজি চিকিৎসা দিচ্ছেন।
একই উপজেলার শাহ আলম জানান, কিছুদিন আগে তার বাছুরের এ রোগ দেখা দেয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই পুরো শরীর গুটিতে ভরে যায়। ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে যাওয়া বাছুরটি এক সময় মারা যায়। লোহাগাড়া উপজেলার বাসিন্দা নবী হোসেন বলেন, ‘আমার একটি গরু কিছুদিন আগে এলএসডি রোগে আক্রান্ত হয়েছিল। তাৎক্ষণিক উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের পরামর্শে গরুটিকে চিকিৎসা দেওয়ার পর সুস্থ হয়ে ওঠে।’
সাতকানিয়া উপজেলা উপসহকারী প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা (সম্প্রসারণ) শরৎ বড়ুয়া বলেন, ‘আক্রান্ত গবাদিপশুকে ভুল চিকিৎসা দেওয়া ও অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করায় পশু মৃত্যুর হার বেড়েছে। এ ছাড়া গ্রামাঞ্চলে গরুর মালিক ও খামারিদের ভুল বুঝিয়ে সরকারি ভ্যাকসিনের পরিবর্তে বেসরকারি ভ্যাকসিন দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় ভ্যাকসিন দিতে গিয়ে আমরা বাধার সম্মুখীন হচ্ছি।’
উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মিজানুর রহমান বলেন, এটি ভাইরাসজনিত রোগ। মশা, মাছি, আঠালির মাধ্যমে এ রোগটি দ্রুত এক প্রাণী থেকে অন্য প্রাণীতে ছড়ায়। এরই মধ্যে বিভিন্ন এলাকায় এ রোগটি গবাদিপশুর মাঝে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে রোগ পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। উপজেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তর ও ভেটেরিনারি হাসপাতালে নিয়মিত এ রোগের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. এ কে এম হুমায়ুন কবির বলেন, ‘সময়মতো ভ্যাকসিন দিলে এ রোগে গরুর আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা থাকে না। তবে খামারি এবং কৃষক সচেতনতার অভাবে ভ্যাকসিন ঠিকভাবে প্রয়োগ করেন না। একটি দেওয়ার ২৮ দিন পর আবারও আরেকটি ডোজ দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। স্বাস্থ্যবান গরুকে এই টিকা সবচেয়ে ভালো সুরক্ষা দেয়। তবে রোগাক্রান্ত হওয়ার শুরুর দিকে চিকিৎসা করাতে পারলে গরু সুস্থ হয়ে ওঠে। এই রোগে আক্রান্ত বাছুর সবচেয়ে বেশি মারা যায়। গত জুন মাসে চট্টগ্রাম বিভাগে ৯৪২টি গরু আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ১৭টি।’
ভ্যাকসিন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘দেশের মাত্র একটি প্রতিষ্ঠানে এই ভ্যাকসিন তৈরি হয়। চাহিদার তুলনায় উৎপাদন অপ্রতুল। তাই এই মুহূর্তে তাদের কাছে ভ্যাকসিন নেই। ঢাকায় ভ্যাকসিনের জন্য চিঠি পাঠানো হয়েছে। আসার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলা পর্যায়ে বিতরণ করা হবে।’
চট্টগ্রাম জেলা ডেইরি ফার্মারস অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মালিক মোহাম্মদ ওমর খবরের কাগজকে বলেন, ‘লাম্পি স্কিন ডিজিজ এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এই রোগের জন্য কিছু বেসরকারি কোম্পানির টিকা বাজারে পাওয়া যায়। তবে সেগুলোর দাম এত বেশি যে, বাণিজ্যিক খামার ছাড়া কেউ কিনতে পারেন না। এলএসডির কারণে প্রচুর গরু, বাছুর মারা যাচ্ছে।
কিছু গরুর গর্ভপাত হচ্ছে।’ এলডিডিপি প্রজেক্টের মাধ্যমে জরুরি ভিত্তিতে ভ্যাকসিন আমদানি করে সরবরাহের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এই রোগের কারণে যদি দেশে গরুর সংখ্যাই কমে যায় তাহলে লাইভস্টক অ্যান্ড ডেইরি ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবে।’