একই মায়ের গর্ভ থেকে জন্ম, একই আঙিনায় বেড়ে ওঠা। শৈশব-কৈশোরের কত শত স্মৃতি জড়িয়ে থাকে যে পৈতৃক ভিটায়, সেই চেনা আঙিনাই আজ পরিণত হলো এক রক্তস্নাত যুদ্ধক্ষেত্রে। সম্পত্তির লোভ আর ক্ষণিকের অন্ধ আক্রোশ মুছে দিল আজন্মের ভাইয়ের বাঁধন। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার খুটাখালী ইউনিয়নে গাছ কাটা নিয়ে বিরোধের জেরে আপন ছোট ভাইয়ের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারিয়েছেন বড় ভাই মো. নুরুল ইসলাম (৫৩)।
শুক্রবার (৩ জুলাই) সকাল ১০টায় খুটাখালী ইউনিয়নের দক্ষিণপাড়া এলাকায় এই বুকফাটা ও নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাটি ঘটে। যে পৈতৃক ভিটা একসময় দুই ভাইয়ের মেলবন্ধনের সাক্ষী ছিল, আজ তা-ই রঞ্জিত হলো আপন ভাইয়ের রক্তে।
স্থানীয় ও পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, পৈতৃক জায়গাজমির ভাগ–বাঁটোয়ারা নিয়ে খুটাখালীর পূর্বপাড়ার বাসিন্দা নুরুল ইসলামের সঙ্গে তাঁর ছোট ভাই আবদুর রহিমের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। মনের ভেতর জমে থাকা সেই পারিবারিক ক্ষোভ আজ রূপ নেয় এক ভয়াবহ ট্র্যাজেডিতে।
সকালে দক্ষিণপাড়ার পুরোনো বসতভিটায় গিয়ে আচমকা গাছ কাটতে শুরু করেন ছোট ভাই আবদুর রহিম। পৈতৃক ভিটার গাছ কাটার খবর পেয়ে পূর্বপাড়া থেকে মনস্থির রাখতে পারেননি বড় ভাই নুরুল ইসলাম। রক্তের টানে আর পৈতৃক স্মৃতি রক্ষার্থে দ্রুত ছুটে যান সেই পুরোনো ভিটায়। কিন্তু তিনি হয়তো কল্পনাও করতে পারেননি, এই যাওয়াই হবে তাঁর জীবনের শেষ যাত্রা।
ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর দুই ভাইয়ের মধ্যে শুরু হয় তীব্র বাগ্বিতণ্ডা। একপর্যায়ে ক্ষোভ ও অভিমানে নুরুল ইসলাম নিজেও দুটি গাছ কাটেন। আর এতেই যেন ছোট ভাই আবদুর রহিম ও তাঁর পরিবারের ভেতরের সুপ্ত হিংস্রতা দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই লাঠিসোঁটা ও ধারালো অস্ত্র নিয়ে বড় ভাইয়ের ওপর চড়াও হন আবদুর রহিম ও তাঁর স্বজনরা। চারপাশের আকুতি আর রক্তের সম্পর্ককে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আবদুর রহিম ধারালো অস্ত্র দিয়ে তার বড় ভাই নুরুল ইসলামকে লক্ষ্য করে উপর্যুপরি কোপাতে থাকেন। কোপের পর কোপ বসতে থাকে নুরুল ইসলামের শরীরে আর্তনাদে ভারী হয়ে ওঠে দক্ষিণপাড়ার আকাশ। একপর্যায়ে রক্তাক্ত ও নিথর অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন নুরুল ইসলাম। আর তখনই অপরাধবোধহীন হামলাকারীরা দ্রুত ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।
রক্তের সাগরে ভেসে যাওয়া নুরুল ইসলামকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা করেছিলেন স্থানীয় লোকজন ও স্বজনরা। তাকে উদ্ধার করে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। কিন্তু চিকিৎসকদের সব চেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালে যখন তার মরদেহ পড়েছিল, তখন উপস্থিত স্বজনদের কান্নায় হাসপাতালের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। সামান্য কিছু গাছের জন্য একটা তাজা প্রাণ এভাবে ঝরে যাবে, তা যেন কেউই মেনে নিতে পারছিলেন না।
চকরিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মনির হোসেন বলেন, জায়গাজমি ও গাছ কাটার বিরোধকে কেন্দ্র করে ছোট ভাইয়ের হাতে বড় ভাই খুন হয়েছেন। নিহত ব্যক্তির পিঠে, পায়ে ও গলার নিচে একাধিক মারাত্মক কোপের আঘাত রয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের খবর পেয়ে চকরিয়া থানা পুলিশের একটি দল দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে এবং মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে। পুলিশ জানায়, নিহতের লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ওসি মোহাম্মদ মনির হোসেন আরও জানান, ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত আবদুর রহিম ও তার পরিবারের সদস্যরা পলাতক রয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে নেমেছে এবং এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় থানায় একটি হত্যা মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে।
এসএন/