দখল ও দূষণ রোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এমন বেশ কয়েকটি কম্পোনেন্ট বা উপাদান বাদ দিয়েই বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ১ হাজার ৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্প’ বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে।
উত্তরাঞ্চলীয় জেলা গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার খুলশী থেকে বগুড়ার শেরপুর উপজেলার খানপুর পর্যন্ত এ নদীর ১২৩ কিলোমিটার খননসহ নানা ধরনের উন্নয়নে শিগগিরই কাজ শুরু হবে। একই সঙ্গে এ প্রকল্পে রাখা হয়েছে ইছামতী নদীর ৭২ কিলোমিটার ও গজারিয়া নদীর ৩৫ কিলোমিটার খননসহ অবকাঠামোগত নানা উন্নয়নকাজ।
প্রাচীন নদী করতোয়ার দখল-দূষণ রোধ ও পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক রাখার পাশাপাশি গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার খুলশীতে নির্মিত স্লুইসগেট অপসারণসহ আরও কয়েকটি বিষয়ে প্রতিকার চেয়ে ২০১৫ সালে পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) আদালতে যায়। এতে হাইকোর্ট খুলশীতে নির্মিত স্লুইসগেট অপসারণের পাশাপাশি দখল-দূষণ রোধসহ করতোয়া রক্ষায় সরকারকে বেশ কিছু নির্দেশনা দেন। হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী ওই নির্দেশনার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড করতোয়া রক্ষায় ১০ বছর আগে ২ হাজার ৯৪০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প জমা দেয়। প্রস্তাবিত প্রকল্পে বলা হয়, বগুড়া শহরের ভেতরে দখল রোধে করতোয়া নদীর দুই তীরে এলাকাভেদে ৫ থেকে ৬ মিটার প্রশস্ত ১৩ দশমিক ৫০ কিলোমিটার করে রাস্তা নির্মাণ করা প্রয়োজন। দূষণ রোধে একই সঙ্গে নদীতে তরল বর্জ্য ফেলা বন্ধে দুই পাশে ৩ মিটারেরও বেশি প্রশস্ত ২৭ কিলোমিটার মাস্টার ড্রেন নির্মাণেরও সুপারিশ ছিল। আর শহরের বিভিন্ন ড্রেন দিয়ে আসা তরল বর্জ্য শোধনে ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি ইফলুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (ইটিপি) স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়। হাইকোর্টের অন্তর্বর্তী আদেশের আলোকে প্রকল্প প্রস্তাবে কম্পোনেন্টগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সরকার প্রকল্প ব্যয় কমাতে গিয়ে দখল-দূষণ রোধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ওই সব কম্পোনেন্ট বা উপাদান বাদ দেয়।
প্রকল্প প্রস্তাবের পাশাপাশি পানি উন্নয়ন বোর্ড থেকে পাওয়া তথ্যে দেখা যায়, ১৯৮৮ সালে ভয়াবহ বন্যার পর পানি উন্নয়ন বোর্ড গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জের খুলশীতে তিন ভ্যান্টের একটি স্লুইসগেট তৈরি করলে করতোয়া নদীতে পানির প্রবাহ কমে যায়। দখল আর দূষণে অস্তিত্ব সংকটে পড়ে করতোয়া। স্থানীয় বাসিন্দাদের অনুরোধে ২০১৫ সালে বেলা হাইকোর্টে গেলে বেশ কয়েকটি নির্দেশনা দেন আদালত। সেসব নির্দেশনার আলোকে পানি উন্নয়ন বোর্ড ২ হাজার ৯৪০ কোটি টাকার একটি প্রকল্প দাখিল করে; কিন্তু গত ১৬ জুন অনুমোদন করা হয় ১ হাজার ৯৪ কোটি টাকার সংশোধিত প্রকল্প। প্রকল্প থেকে বাদ দেওয়া হয় শহরে নদীর দুই তীরে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ইটিপি, ওয়াকওয়ে, সম্মিলিত পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো ও প্রস্তাবিত সড়কের একাংশসহ গুরুত্বপূর্ণ অন্তত সাতটি কম্পোনেন্ট।
বগুড়া সার্কেলের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আরিফুর রহমান বলেন, নদীতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করতে খুলশী থেকে খানপুর পর্যন্ত করতোয়া নদীর গভীরতা এলাকাভেদে বাড়ানো হবে বর্তমান সমতল থেকে গড়ে সাড়ে ৩ মিটার। আর প্রশস্ত হবে এলাকাভেদে ৩০ থেকে ৩২ মিটার পর্যন্ত। আরিফুর রহমান বলেন, নদীতে পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক হলে দূষণ আর দখল দুটিই কমবে। একই সঙ্গে সৌন্দর্য বাড়বে করতোয়া নদীর। ঐহিত্যবাহী পুণ্ড্রুনগর বা মহাস্থানগড় এ নদীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে অন্তত আড়াই হাজার বছর আগে। করতোয়া নদী সিস্টেম উন্নয়ন প্রকল্পে রাখা সমন্বিত পানি নিয়ন্ত্রণ অবকাঠামো নির্মাণ করা হলে উজানে প্রায় ২০ কিলোমিটার জমির সেচ যেমন সহজ হবে, তেমনি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অনেকাংশেই স্বাভাবিক থাকবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের তথ্যে বলা হয়েছে, করতোয়া নদীর পানির মান পরীক্ষার জন্য প্রতি মাসে বগুড়া শহরের দত্তবাড়ী, এসপি ঘাট এলাকাসহ চারটি পয়েন্ট থেকে পানি নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। বর্ষায় পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন বেশি পাওয়া গেলেও শুকনো মৌসুমে আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়।
পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় অফিসের উপ-পরিচালক কামরুজ্জামান সরকার বলেন, শুকনো মৌসুমে করতোয়ায় যখন পানির প্রবাহ থাকে না, তখন দ্রবীভূত অক্সিজেন নেমে আসে প্রতি লিটার পানিতে শূন্যের কোঠায়। অথচ জলজ প্রাণী বেঁচে থাকার জন্য প্রতি লিটার পানিতে থাকতে হবে কমপক্ষে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৮ মিলিগ্রাম পর্যন্ত। পানিতে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন না থাকায় জীববৈচিত্র্য হারাচ্ছে করতোয়া। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে কী করতে হবে–এমন প্রশ্নের উত্তরে কামরুজ্জামান বলেন, তরল বর্জ্য সরাসরি নদীতে ফেলা যাবে না। নদীর তীরের তরল ও কঠিন বর্জ্যের সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।