সবুজ মাঠটা পেরিয়ে বিশাল এক ঝিল। টলটলে জল। বেগুনিফুলের কচুরিপানা ছুটে বেড়াচ্ছে। সেই ঝিলের মাঝে একদল হাঁসছানা। টলটলে জলে সাঁতরায়। ছুটে যায়। দাপাদাপি করে।
কত্ত মজা! ঝিলের পাড়েই হাঁসছানাদের বাড়ি। ঝিলের পাড়ে মোটা গাছের গুঁড়ি। একটা খোঁড়ল সেই গাছের গুঁড়িতে। মা হাঁস আর হাঁসছানারা এখানেই বাস করে।
সকালে যখন সূয্যিমামা উঁকি দেয় ঠিক তখনই হাঁসছানারা খোঁড়ল বাড়ি থেকে টুপ টুপ করে ঝিলের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুরু হয় ছানাদের আনন্দময় খেলা। ঝিলের পাড় থেকে মা হাঁস ছড়া কাটে আর হাসে-
টলটলে নির্মল ঝিলের পানি
হাঁসছানা খেলবে একটু খানি।
সকাল গড়িয়ে দেখো বিকেলবেলা
তবু হয় না শেষ ডুবোডুবি খেলা।
মা হাঁস দূর থেকে দেখে আর হাসে। এই ছানারা একদিন বড় হবে সেদিনই তার দুঃখের দিন শেষ হবে। কিন্তু পদে পদে যে হাঁসছানাদের বিপদ! একদিনকার ঘটনা। সকাল থেকেই কাদের যেন আনাগোনা।
খোঁড়লবাড়ির আশপাশে। টের পেয়ে গেল হাঁস। খোঁড়ল থেকে খুব সাবধানে মাথা বের করে উঁকি দেয়। সর্বনাশ! একটা বাঘডাশ! বাঘের মতো ডোরাকাটা। তবে শেয়ালের মতো চুরির স্বভাব। চুপি চুপি খোঁড়লের আশপাশে উঁকিঝুঁকি মারছে।
হাঁসটা ওড়াল দিয়ে ঠিক বাঘডাশের সামনে এসে দাঁড়াল। বলল, এই তুই কেরে? কী চাস? রাগে হাঁসের গায়ের পালক দাঁড়িয়ে গেল। হাঁসের সাহস দেখে বাঘডাশ গেল ভয় পেয়ে।
বলল, কিছু না, খালাম্মা, আমি ওদের সঙ্গে খেলতে এসেছি। কদিন ধরেই দেখছি ওরা একা একা খেলছে- অতি বিনয়ের সঙ্গে বলল বাঘডাশ। হাঁসটা বাঘডাশের চালাকি বুঝতে পারল।
ওর সঙ্গে খেলতে দিলেই ছানাদের কামড়ে ধরে দেবে দৌড়। এটা করা যাবে না। বেশ দৃঢ়তার সঙ্গে হাঁসটা বলল, ওরা এখন খেলবে না, বসে হোমওয়ার্ক করছে। খেলার সময় নেই। এখন যাও তো বাপু, শুধু শুধু ঝামেলা করো না!
বাঘডাশ মানে মানে কেটে পড়ে। সে জানে খোঁড়লবাড়ির পাশেই এক সজারুর বসবাস। লম্বা কাঁটা সজারুর। বেশি বাড়াবাড়ি করলে সেই কাঁটা দেবে ঢুকিয়ে।
পেট ফুড়ে বেরিয়ে যাবে। তাই বাঘডাশটা সেখানে থাকতে সাহস পেল না। লেজ গুটিয়ে চলে এলো। এদিকে হাঁসটা ঝিলের পানিতে ছানাদের সাঁতার শেখায়, খাবার খেতে শেখায়। কখন কী বিপদ হতে পারে সেটা বলে।
আর বলে, ছানারা, তোমরা সব সময় একসঙ্গে চলবে। তোমার একে অপরকে সহযোগিতা করবে। কখনো কেউ কাউকে ভুলে যাবে না।
আরেকদিনের ঘটনা। হাঁসছানারা ঝিলের পানিতে ডোবাডুবি খেলছিল। হাঁসছানা ঝিনু পিনুর সঙ্গে একটা ভোঁদরছানাও ছিল। দারুণ ডোবাডুবি করতে পারে ভোঁদরছানা, নাম তার ভুলি। এখনই সে ছোট ছোট মাছ ধরতে পারে।
মাঝে মধ্যে ঝিনু পিনুকেও মাছ দেয়। খোঁড়লবাড়ি থেকে আড়মোড়া দিয়ে ওঠে পড়ে মা হাঁস। ভুলিকে দেখে খুশি হয়। যাক তার ছানাদের একজন সঙ্গী হলো!
হঠাৎ চুপি চুপি সেখানে হাজির এক খেঁকশিয়াল। এই বনের সবচেয়ে পাজি শেয়াল এটা। সবাইকে সে জ্বালিয়ে মারে।
খেঁকশেয়ালকে দেখে ফেলে ভুলি। সে ঝিনু পিনুকে সাবধান করে দেয়। ঝিলের ঠিক মাঝখানে ঝিনু পিনু চলে আসে। এদিকে খোঁড়লবাড়ি থেকে মা হাঁসও পাজি শেয়ালকে দেখে ফেলে।
‘সজারু দাদা, তুমি কোথায়?’ বলে জোরে চিৎকার দেয় মা হাঁস। আর যায় কোথায় ঝোঁপঝাড় ভেঙে সজারু এগিয়ে আসে। বলে, ওরে পাজি তুই এখানেও হানা দিয়েছিস।
দাঁড়া, তোকে দেখাচ্ছি মজা- বলেই ধারালো কাঁটা দিয়ে সামনে দাঁড়ালো সজারু। খেঁকশেয়াল দেখল ভারি মুশকিল। খোঁড়লবাড়ির হাঁসটা একা না। তার অনেক বন্ধু আছে। একদিনের কথা। মনের আনন্দে সাঁতার কাটছিল ঝিুন পিনু আর ভুলি।
কোনো দিকে খেয়ালই ছিল না ওদের। হঠাৎ পাখা ঝাঁপটানোর আওয়াজ শুনে সামনে তাকাল। দেখল ঝিলের একপাশে কলমিলতার ঝোঁপ। সঙ্গে কিছু কচুরিপানা।
কয়েকদিন আগেও ছিল না। তাহলে কে আনল? একটু পরই পাখা ঝাঁপটানোর শব্দ পেল। এ তো দেখি জলকাক উড়ে যাচ্ছে। ভুলি বলল, চল তো ওদিকে যাই, দেখি ব্যাপারখানা কী? তিন বন্ধু গিয়ে হাজির।
গিয়ে দেখে অবাক ব্যাপার। কলমিলতার ঝোঁপে বাসা বানিয়েছে জলময়ূরী। আবার দুটো ডিমও পেড়েছে দেখি। খুশিতে ঝিনু পিনু প্যাক প্যাক করে উঠল।
আর তখনই জলময়ূরীটা উড়ে এসে বসল। জলময়ূরীকে দেখেই ঝিনু পিনু ছড়া কাটতে লাগল-
কলমিলতার ঝোপে জলময়ূরের বাসা
ডিম পেড়েছে চারটা মনে কত আশা।
ক‘দিন পরেই বের হবে তুলতুলে সব ছানা
আপাতত ঝোঁপের কাছে আসতে সবার মানা।
বাহ্, দারুণ ছড়া কাটতে পার তোমরা। তা তোমাদের বাড়ি কোথায় বাছা? মিষ্টি হেসে জলময়ূরী জানতে চায়। ওই যে হোথা, খোঁড়লবাড়ি। ওখানেই আমাদের বাসা।
ঝিনু পাখা নাড়িয়ে কথাটা বলল। আর তোমার বাড়ি? ভুলিকে জিজ্ঞেস করে জলময়ূর। এই বন পেরিয়ে ছোট একটা ডোবা। সেখানেই আমার বাসা।
আমি মাঝে মধ্যে বন্ধুদের সঙ্গে এখানে খেলতে আসি। ঝিনু আর পিনু আমার বন্ধু। তোমাদের কথা শুনে খুব ভালো লাগল, বলল জলময়ূরী।
তোমরা একটু খেয়াল রেখো তো বাপু। আমার ছানারা আর ক‘দিন পরেই বের হয়ে আসবে। তখন নতুন বন্ধু পাবে তোমরা।
আজ আকাশটা খুব পরিষ্কার।
ঝিলের পানিতে নেমে পড়েছে সবাই। মা হাঁসও আজ সঙ্গে আছে। কলমিলতার ঝোঁপে জলময়ূরীর ছানারাও বড় হচ্ছে। লম্বা লম্বা পা ফেলে জলপদ্মের পাতায় পাতায় হেঁটে বেড়ায় জলময়ূরীর ছানারা। ঝিনু পিনুর নতুন বন্ধু।
তারপর আর কি! মা হাঁস, হাঁসছানারা, ভুলি, জলময়ূরী আর তার ছানারা মিলেমিশে সেই ঝিলের পাড়ে বাস করতে লাগল।
কলি