তিশার জগৎটা ছিল আঁকার খাতা আর রং পেনসিলে ভরা। সে যা ভাবত, তাই এঁকে ফেলত—উড়ন্ত পাখি, হাসিমুখো ফুল, মেঘের বাড়ি, আরও কত কী।
একদিন দাদুর পুরোনো বাক্স ঘাঁটতে গিয়ে তিশা একটা অদ্ভুত সুন্দর কলম খুঁজে পেল। কলমটা চকচকে কাঠের তৈরি আর তার ডগায় ছোট্ট একটা রুপালি তারা জ্বলজ্বল করছে। তিশা ভাবল, বাহ্, এটা দিয়ে দারুণ আঁকা হবে।
সে কলমটা দিয়ে একটা ছোট্ট প্রজাপতি আঁকল। যেই না আঁকা শেষ হয়েছে, এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটল। খাতার প্রজাপতিটা হঠাৎ ডানা ঝাপটে জীবন্ত হয়ে উঠল। একটু পাখা নেড়ে, ফুরফুর করে উড়ে গিয়ে বসে পড়ল তিশার নাগের ডগায়।
তিশা তো অবাক! চোখ বড় বড় করে বলল, এ কী! তুমি সত্যি সত্যি উড়ছ?
প্রজাপতিটা মাথা নেড়ে সায় দিল। তিশা বুঝল, এটা কোনো সাধারণ কলম নয়, এটা জাদুর কলম।
আনন্দে সে লাফিয়ে উঠল। এবার সে কী আঁকবে? ভাবতে ভাবতে সে তার খুব প্রিয় একটা জিনিস আঁকল—একটা টুকটুকে লাল, রসাল আপেল।
যেই না আঁকা শেষ, খাতা থেকে সত্যিকারের একটা আপেল গড়িয়ে পড়ল তার কোলের ওপর। তিশা এক কামড় দিয়ে দেখল, কী মিষ্টি।
এবার তার মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি এল। সে একটা ছোট্ট আর লেজঝোলা কাঠবিড়ালীর ছবি আঁকল। সঙ্গে সঙ্গে খাতা থেকে বেরিয়ে এল একটা তুলতুলে নরম কাঠবিড়ালী। সে তিড়িংবিড়িং করে লাফিয়ে তিশার কাঁধে চড়ে বসল আর কিচকিচ করে বলল, আমার নাম কুটুস। চলো, আজ আমরা অভিযানে যাব।
তিশা তো মহাখুশি। কথা বলা বন্ধু পেয়ে তার আনন্দ আর ধরে না। কিন্তু অভিযানে যাবে কী করে?
তখনই তার মাথায় বুদ্ধি এল। সে জাদুর কলম দিয়ে মস্ত বড় একটা উড়ন্ত গালিচা এঁকে ফেলল। নীল রঙের সেই গালিচায় সোনালি সুতার কাজ করা। আঁকা শেষ হতেই গালিচাটা খাতা থেকে বেরিয়ে ঘরের মেঝেতে বিছিয়ে গেল আর একটু কেঁপে উঠে বুঝিয়ে দিল যে সে উড়ার জন্য তৈরি।
তিশা আর কুটুস লাফিয়ে গালিচায় চড়ে বসল। চেঁচিয়ে বলল, চলো, মেঘের দেশে।
উড়ন্ত গালিচাটা জানালা দিয়ে সাঁই করে বেরিয়ে গেল। তারা নরম মেঘের ভেতর দিয়ে উড়তে লাগল। উড়তে উড়তে পৌঁছাল এমন এক জায়গায়, যেখানে পাহাড়গুলো সব আইসক্রিমের তৈরি আর নদী দিয়ে বয়ে চলেছে চকলেটের স্রোত। সেখানে ললিপপের গাছ আর ক্যান্ডির ফুল ফুটে আছে।
তারা সেখানে নেমে খুব মজা করল। চকলেটের নদীতে পা ডুবিয়ে বসল, স্ট্রবেরি আইসক্রিমের পাহাড় থেকে পিছলে নামল। কুটুস তো একটা জেলি-বিন পাহাড়ের ওপর বসে মনের সুখে বাদাম ভেবে জেলি খেতে লাগল।
হঠাৎ তিশা দেখল, কিছু ছোট ছোট পাখি মুখ গোমড়া করে বসে আছে।
তিশা জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? তোমাদের মন খারাপ কেন?
একটা পাখি বলল, আমাদের খিদে পেয়েছে। কিন্তু এই মিষ্টির রাজ্যে আমাদের খাওয়ার মতো কোনো ফল নেই।
শুনে তিশার খুব মায়া হলো। সে তার জাদুর কলমটা বের করল। তারপর এঁকে ফেলল পাকা পেঁপে, আতা আর রসালো পাকা আমের গাছ। গাছগুলো সত্যি হয়ে উঠতেই পাখিরা খুশিতে কিচিরমিচির করে ফল খেতে শুরু করল আর আনন্দে গান গাইতে লাগল। পাখিদের খুশি দেখে তিশার মনটা ভরে গেল।
অনেক মজা করে সূর্য ডোবার আগে তিশা আর কুটুস তাদের উড়ন্ত গালিচায় চড়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল। ঠিক তার ঘরের জানালায় নামার সঙ্গে সঙ্গেই কলমের ডগার রুপালি তারাটা নিভে গেল আর গালিচাটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। কুটুসও লাফ দিয়ে একটা গাছে উঠে গেলো আর যাওয়ার আগে তিশাকে টাটা জানিয়ে গেল।