বুশরার বয়স এখন সাত। কিন্তু অবাক করা ব্যাপার হলো, ওর এখনো কোনো দুধদাঁত পড়েনি। স্কুলে সহপাঠীরা এ নিয়ে হাসাহাসি করে। বলে, তোমার দাঁতগুলো তো সেই ছোটদের মতোই রয়ে গেছে, বুশরা!
এ নিয়ে বাবা-মাও একটু চিন্তায় থাকেন। অন্য বাচ্চাদের দাঁত একে একে পড়ে নতুন দাঁত গজাচ্ছে, অথচ বুশরার দাঁতগুলো এখনো একেবারে শক্তপোক্ত।
একদিন দাঁত ব্রাশ করার সময় বুশরা টের পেল, ওর মুখের নিচের পাটির মাঝখানের একটা দাঁত আস্তে আস্তে নড়ছে! সে অবাক হয়ে আয়নার সামনে গিয়ে দেখে দেখে দাঁত নাড়াল। সত্যিই দাঁতটা নড়ছে।
প্রথমে অবাক, তারপর ভয়, তারপর আনন্দ। তিনটা অনুভূতিই একসঙ্গে বুকের ভেতর কাঁপুনি ধরিয়ে দিল ওর।
— মা! আমার দাঁত নড়ছে!
বুশরা দৌড়ে গিয়ে মাকে দাঁত নড়ার সংবাদ জানাল।
মা খুশি হয়ে বললেন, অসাধারণ! খুব ভালো খবর। এখন এই দাঁত নড়িয়ে ফেলে দিলে ক’দিন পরই সুন্দর নতুন দাঁত গজাবে।
শুনে বাবা হেসে বললেন, দাঁত পড়া মানেই কিন্তু তুমি বড় হয়ে যাচ্ছ, বুশরা।
রাতের খাবার খাওয়ার পর দাঁতটা আরও নড়বড়ে হয়ে উঠল। কিন্তু ভয়ও ওর মনের মধ্যে কিলবিল করছিল। দাঁতটা পড়ে গেলে কি খুব ব্যথা করবে? আবার যদি অনেক রক্ত পড়ে যায়? এসব ভাবতে ভাবতে বুশরা একটু যেন কেঁদেই ফেলল।
মা ওকে কোলে নিয়ে অভয় দিয়ে বললেন, ভয় নেই মা, দাঁত পড়া খুব স্বাভাবিক। আমাদের সবারই তোমার মতো ছোট থাকতে দাঁত পড়েছে। এখনকার এই দাঁত পড়ে যে দাঁত ওঠে, সেটা আরও চিকন আর সুন্দর হয়। আর তুমি কি জানো, দাঁতটা নিয়ে যদি তোমার বালিশের নিচে রাখো, তা হলে দাঁতের পরি সেটা নিয়ে যাবে। তার বদলে রেখে যাবে সুন্দর একটা উপহার, যা তুমি পছন্দ করো।
— দাঁতের পরি? আমি তো এই পরির কথা কখনো শুনিনি মা! দাঁতের পরি সত্যিই আসবে মা?
বুশরা বিস্ময় নিয়ে মাকে জিজ্ঞেস করল।
মা মিষ্টি হেসে উত্তর দিলেন, অবশ্যই আসবে। তুমিও রাখো, দেখবে এসে যাবে দাঁতের পরি।
দুদিন বাদেই দাঁতটা আরও নড়বড়ে হয়ে গেল। সেটাকে ধরে আরও একটু নাড়াতেই হঠাৎ ‘টক’ করে দাঁত খুলে পড়ল মুখের মধ্যে।
বুশরা দাঁত হাতে নিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। এ দাঁতটাই তো এতদিন ওর সঙ্গে ছিল। হাসির সময়, খাওয়ার সময়, কথা বলার সময় এই দাঁতটাই তো ওকে সহযোগিতা করেছে। দাঁতটা হাতে নিয়ে ওর মনে হলো, যেন সে এক পুরোনো বন্ধুকে বিদায় দিতে যাচ্ছে!
এরপর গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠল, মা! মা! দেখো দেখো, আমার দাঁতটা পড়ে গেছে!
মা খুশি হলেন। বুশরার দাঁত ফেলতে তেমন বেশি জোরজবরদস্তি করতে হলো না। তিনি দাঁতটা ধুয়ে সাদা কাগজে মুড়ে বুশরার বালিশের নিচে রেখে দিলেন। তার পর বললেন, তুমি ঘুমিয়ে গেলে দাঁতের পরি আসবে। সকালে ঘুম ভাঙলে দেখবে তুমি উপহার পেয়ে গেছ।
এই বলে মা বুশরার কপালে চুমু খেয়ে ঘরের আলো নিভিয়ে দিলেন।
বালিশে মাথা রাখলেও ওর ঘুম আসছে না কিছুতেই। সে কল্পনা করতে লাগল দাঁতের পরিকে- সে কেমন হবে দেখতে? সে কি ঝিকিমিকি ডানাওয়ালা? নাকি ছোট্টমোট্ট কোনো পরি, যাকে হাতের মুঠোয় ধরে রাখা যায়? নাকি ভয়ংকর কোনো দানবের মতো?
এসব হাবিজাবি ভাবতে ভাবতে ক্লান্ত হয়ে সে ঘুমের মধ্যে তলিয়ে গেল।
ভোরবেলা পাখির ডাক শুনে বুশরার ঘুম ভাঙল। মুহূর্তেই মনে পড়ল তার দাঁতের কথা। মনে পড়ল পরি আর উপহারের কথাও! সে আর দেরি করল না। তাড়াতাড়ি বালিশ উল্টে ফেলল।
ওমা! চমকে উঠল বুশরা। কাগজে মোড়ানো দাঁতের জায়গায় রাখা আছে নতুন চকচকে একটা মাউথ অর্গান। যা ওর খুব পছন্দের খেলনা। সঙ্গে একটা ছোট্ট কাগজ।
সেখানে লেখা, শাবাশ বুশরা! তুমি সাহসী মেয়ে। খুব তাড়াতাড়ি তুমি তোমার নতুন দাঁত পেয়ে যাবে।
বুশরা আনন্দে চিৎকার করে উঠল, মা! বাবা! দাঁতের পরি সত্যিই এসেছিল! দেখো না, আমাকে সে মাউথ অর্গান উপহার দিয়ে গেছে!
বুশরার আনন্দ দেখে ওর মা-বাবা কেবল মুখ টিপে হাসলেন। কিছু বললেন না।
সেদিন স্কুলে গিয়ে সে বন্ধুদের গর্ব করে বলল, দেখো আমার দাঁত পড়ে গেছে! রাতের বেলা দাঁতের পরি এসে আমাকে উপহারও দিয়ে গেছে।
বন্ধুরা হিংসা আর বিস্ময় নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। কেউ বলল, আরে! আমাদেরও তো দাঁত পড়েছে। কই, দাঁতের পরি আমাদের তো কিছু দেয়নি!
বুশরা মুচকি হেসে উত্তর দিল, হয়তো তোমরা দাঁতের পরির কথা ঠিকমতো বিশ্বাসই করোনি, তাই তোমরা উপহার পাওনি!
সেদিন থেকে বুশরার কাছে দাঁত পড়াটা আর ভয় নয়, বরং আনন্দের ব্যাপার হয়ে গেল। যখনই তার দাঁত একটু একটু নড়ে, বুশরা তখন মনে মনে খুশি হয়, আহা! দাঁতের পরি আবার আসবে।
দাঁত পড়া আর নতুন দাঁত ওঠার এই ছোট্ট অভিজ্ঞতাই বুশরাকে শিখিয়ে দিল, বড় হওয়া মানে শুধু বয়স বাড়া নয়, বরং সাহসী হয়ে ওঠা।