বঙ্গভবন প্রাঙ্গণে একটি নাগরিক সম্মেলনে মিলিত হন ইন্দিরা গান্ধী। প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চের পেছনে রাখা ছিল তিনটি শাপলা ফুল। বাংলার জাতীয় ফুল শাপলা। ক্রীড়া সংস্থার কয়েকটি মেয়ে সামনে এগিয়ে আসে। প্রত্যেকের হাতে ছিল একটি করে কুলো। তাতে লেখা একটি করে অক্ষর। তারা একসঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়াতে ফুটে ওঠে একটি বাক্য- ভারত-বাংলা মৈত্রী অক্ষয় হোক। এরপর বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা দুটি মেয়ে ইন্দিরা গান্ধীর গলায় মালা পরিয়ে দেয়। জাতীয় সংগীতের পর বেজে ওঠে বাঁশিতে ভাটিয়ালি সুর। ঢাকার নাগরিকরা শ্রীমতি গান্ধীকে উপহার দেন নদীমাতৃক বাংলাদেশের জীবনযাত্রার প্রতীক রূপের নৌকা।…
ভাই মুজিবের আবদার/অনুরোধ রক্ষা করতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তার জন্মদিনে দুই দিনের ঢাকা সফরে গিয়েছিলেন ১৭ মার্চ ১৯৭২-এ। কথা ছিল, তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে ঢাকায় রাষ্ট্রপতি ভবন পর্যন্ত খোলা জিপে ভাইবোন যাবেন। কিন্তু আগের দিন, ১৬ মার্চ দিল্লি থেকে ঢাকায় খবর দেওয়া হয় এই কর্মসূচি বাতিল করতে। কারণ দিল্লির গোয়েন্দারা খবর পান তাদের দুজনকে একসঙ্গে পাকিস্তানি গুপ্তচর বাহিনী খতম করার পরিকল্পনা নিয়েছে। সঙ্গে সঙ্গে ভারতীয় গোয়েন্দারা ঢাকাকে অনুরোধ করে খোলা জিপে না গিয়ে হেলিকপ্টারে ইন্দিরা গান্ধীকে ঢাকা রাষ্ট্রপতি ভবনে নিয়ে যাওয়া হোক।
তার আগে তেজগাঁও বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধু, বেগম মুজিব ও তার ছেলেমেয়েরা উপস্থিত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি ভবনে পৌঁছানোর ১৫ মিনিটের মধ্যে জাতির জনকের পরিবারের সবাই সেখানে পৌঁছে যান। সেখানেই ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর স্বাস্থ্য ও মঙ্গলকামনা করে কেক কাটেন। বাইরে তখন এমআর আখতার মুকুল আর আমি ছাড়া কেউ ছিল না। শেখ কামাল একটি ট্রেতে করে কেক নিয়ে এসে আমাদের দিলেন। ইন্দিরার ওই সফরে ঢাকা ও দিল্লির মধ্যে একগুচ্ছ চুক্তি হয়েছিল। সেই চুক্তির প্রথম লাইনে ছিল বাংলাদেশ আক্রান্ত হলে ভারত সবরকম সাহায্যে এগিয়ে আসবে।
এই চুক্তির তিন বছরের মাথায় ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যা করে জিয়া-খোন্দকার জুটি একতরফাভাবে বাতিল করে দেয়। সেদিন ভারতের হাইকমিশনার সমর সেন কলকাতায় ছিলেন। তিন দিন পর তিনি সড়কপথে ঢাকা গিয়ে সোজা চলে যান রাষ্ট্রপতি ভবনে। সেখানে তার জন্য অপেক্ষা করছিলেন মুজিব হত্যার দুই খলনায়ক জিয়া এবং খোন্দকার মোস্তাক আহমেদ। খোন্দকার সমর সেনকে বলেন, আমরা ভারত সরকারের কাছে এই নতুন সরকারের স্বীকৃতি চেয়েছি। সমর সেনের মুখে শোনা- মোস্তাকের অনুরোধ শুনে তিনি সঙ্গে সঙ্গে তা প্রত্যাখ্যান করে বলেন, আমাদের সঙ্গে যে ২৫ বছরের চুক্তি আছে, তা আপনারা কেন বাতিল করেছেন? আগে সে চুক্তি বহাল করুন। তারপর আপনাদের অনুরোধ আমরা ভেবে দেখব।
এই নিয়ে তাদের মধ্যে দেড় ঘণ্টা কথা কাটাকাটি চলে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার কৈফিয়ত চান সমর বাবু। খোন্দকার কিছু সময়ের জন্য উঠে গিয়ে জিয়া ও অন্যান্য সামরিক কর্তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেন। পরে তিনি জানান, তারা পুরনো চুক্তি নতুন করে বহাল করতে প্রস্তুত। ঝানু কূটনীতিক সমর সেন তাতে রাজি হলেন না। তিনি এই বক্তব্য লিখিতভাবে চাইলেন। লিখিত চিঠি হাতে পাওয়ার পর সমর সেন বললেন, এই চিঠি আমি দিল্লিতে পাঠাব। সিদ্ধান্ত নেবে দিল্লি। যাই হোক, আজ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন। এবার দেখা যাক ইন্দিরা গান্ধীর দুই দিনের সফরে কী কী ঘটেছিল।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ঢাকা ত্যাগের আগে একটি যুক্ত ঘোষণাপত্রে সই করেন। তাতে ছিল জাতীয়, আন্তর্জাতিক, ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী, সহযোগিতা ইত্যাদি প্রসঙ্গ। দুই প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছিলেন, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ভুট্টো কি তার আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে পারেন। তাহলে ভারত ও বাংলাদেশ তার ডাকে সাড়া দেবে। কোনোরকম পূর্ব শর্ত ছাড়াই ভারত ও বাংলাদেশ পাকিস্তানের সঙ্গে কথা বলতে চেয়েছিল। কিন্তু ভুট্টোর তরফে সেদিন কোনো সাড়াশব্দ আসেনি। সেখানে ঠিক হয়, বাংলাদেশ যাতে রাষ্ট্রপুঞ্জ এবং জোটবহির্ভূত দেশগুলোর সদস্যপদ পায় তার জন্য ভারত চেষ্টা করবে। বাংলাদেশের এক মুখপাত্র বলেছিলেন, আমাদের লক্ষ্য জোট নিরপেক্ষতা, শান্তি, স্বাধীনতা ইত্যাদি।
অন্যদিকে ভারতের মুখপাত্র জানিয়েছিলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কের ওপর জোর দিচ্ছে ভারত। নদীবক্ষে উভয় প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনা হয়েছে। সেদিন ভারত ও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীরা দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত বাণিজ্য শুরু করার ব্যাপারে একমত হন। স্থির হয় বাংলাদেশের তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী এসআর সিদ্দিকি শিগগিরই দিল্লি সফর করবেন। সে সময় বাণিজ্য-সংক্রান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হবে। নদীবক্ষে বৈঠকে ইন্দিরা গান্ধী এবং বঙ্গবন্ধু বাণিজ্য ও দুই দেশের মধ্যে পণ্য চলাচলের বিষয়েও সম্মত হয়েছিলেন। একই সঙ্গে স্থির হয়, বাংলাদেশ সরকার চাইলে ভারত থেকে বেসরকারি বিনিয়োগও চাইতে পারে।
সেদিন সকাল থেকেই ইন্দিরা আর মুজিবের ঠিকানা ছিল শীতলক্ষ্যা ও মেঘনা। সকাল ৮টা ৩০ মিনিট থেকে দুপুর ২টা ১৫ মিনিট পর্যন্ত দুই প্রধানমন্ত্রী প্রমোদতরী ‘ইনভেস্টিগেটরে’ করে কয়েক মাইল নদী পথে পরিক্রমা করেন। নৈস্বর্গিক প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখা তাদের উদ্দেশ্য ছিল না। এই ভ্রমণের ফাঁকে ফাঁকে দুই প্রধানমন্ত্রী এবং সরকারি অফিসারদের মধ্যে হয়েছে নানা বিষয়ে আলোচনা। ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে শুভেচ্ছা জানানোর জন্য শীতলক্ষ্যা নদীর দুই পাড়ে হাজার হাজার লোক দাঁড়িয়ে ছিলেন।শ্রীমতি গান্ধীকে দেখা মাত্রই জনতা সোল্লাসে চেঁচিয়ে ওঠে। স্লোগান ওঠে- ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী অমর হোক। শ্রীমতি গান্ধী জিন্দাবাদ। জয় বাংলা, জয় ভারত। প্রধানমন্ত্রীর লঞ্চের পেছনেই ছিল সাংবাদিকদের লঞ্চ। পাথ ফাইন্ডার। সেটি ছেড়েছিল ঠাকুরগঞ্জ জেটি থেকে। ইন্দিরা গান্ধী ঢাকা থেকে এসে পৌঁছেছিলেন হেলিকপ্টারে। তারপর এসে ওঠেন ইনভেস্টিগেটরে। নারায়ণগঞ্জ জেটির দুপারে লোক ভেঙে পড়েছিল। ওপারে নবীগঞ্জের ঘাটে বিপুল জনতা।
চাঁদপুরের দিকে এগোনোর সময় মাথার ওপর চলে আসে সূর্য। শীতলক্ষ্যা-মেঘনার জলে কে যেন মুহূর্তে সোনা গলে দিয়েছিল। দুই পাড়ে নোঙর করা স্টিমার, অজস্র মানুষের মাথা, সাদা বোট ভর্তি মানুষ। ধীরে ধীরে জনপদ চোখের আড়ালে চলে গেল। সকাল ৯টা নাগাদ স্টিমার পৌঁছল শীতলক্ষ্যা-বুড়িগঙ্গার সঙ্গমে। ডানদিকে সবুজ গালিচাপাতা চর জেগেছে। সূর্য লুকিয়েছে হালকা মেঘের আড়ালে। দূরে সোনার ফসলে ভরে গেছে খেত। সেই ছিল সোনার বাংলা? রূপসী বাংলা! বঙ্গবন্ধু ইন্দিরা গান্ধীর সামনে তুলে ধরলেন নদীমাতৃক বাংলাদেশের মানচিত্র। সেই সময়ই ঠিক হয়েছিল ১৯৭২-৭৩ সালে ভারত বাংলাদেশকে ২০০ কোটি টাকা সহায়তা দেবে।
ঢাকা ত্যাগ করার আগে ইন্দিরা গান্ধী মুজিব মন্ত্রিসভার মন্ত্রীদের জন্য কিছু উপহার নিয়ে গিয়েছিলেন। এই উপহার ছিল বেনারস থেকে খুব ভালোমানের শাড়ি। এক এক করে বঙ্গবন্ধু মন্ত্রীদের নাম ডাকছেন আর তারা এসে ইন্দিরার হাত থেকে উপহার গ্রহণ করছেন। যখন তিনি খাদ্যমন্ত্রী ফনী মজুমদারের নাম ডাকলেন, বঙ্গবন্ধু একগাল হেসে বললেন, ম্যাডাম, ফনীদা ব্রিটিশদের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করেছেন। বিয়ে করার সময় পাননি। ফনীদা চিরকুমার। ওর শাড়িটা জহুরউদ্দিনকে দিয়ে দিন। ওর দুটো বউ। আমরা সবাই সে দৃশ্য দেখে হো হো করে হেসেছিলাম।
বঙ্গভবন প্রাঙ্গণে একটি নাগরিক সম্মেলনে মিলিত হন ইন্দিরা গান্ধী। প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চের পেছনে রাখা ছিল তিনটি শাপলা ফুল। বাংলার জাতীয় ফুল শাপলা। ক্রীড়া সংস্থার কয়েকটি মেয়ে সামনে এগিয়ে আসে। প্রত্যেকের হাতে ছিল একটি করে কুলো। তাতে লেখা একটি করে অক্ষর। তারা একসঙ্গে পাশাপাশি দাঁড়াতে ফুটে ওঠে একটি বাক্য- ভারত-বাংলা মৈত্রী অক্ষয় হোক। এরপর বাসন্তী রঙের শাড়ি পরা দুটি মেয়ে ইন্দিরা গান্ধীর গলায় মালা পরিয়ে দেয়। জাতীয় সংগীতের পর বেজে ওঠে বাঁশিতে ভাটিয়ালি সুর। ঢাকার নাগরিকরা শ্রীমতি গান্ধীকে উপহার দেন নদীমাতৃক বাংলাদেশের জীবনযাত্রার প্রতীক রূপের নৌকা।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক