শেরপুরে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে গত ১৭ জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত বহু শিক্ষার্থী হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। আহত অনেক শিক্ষার্থী এখনো হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এদিকে হাসপাতালে নানা অনিয়মের চিত্র ধরা পড়েছে শিক্ষার্থীদের তদারকি কার্যক্রমে।
গত ১৭ জুলাই বেলা ৩টার দিকে কোটা সংস্কার দাবিতে আন্দোলনে নামেন শেরপুর জেলার সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এ সময় পুলিশ, আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে শিক্ষার্থীদের দফায় দফায় ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। উভয় পক্ষের মধ্যে ইটপাটকেল নিপেক্ষ শুরু হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ শর্টগানের গুলি ছোড়ে। কাঁদানে গ্যাসের শেল ও সাউন্ড গ্রেনেড নিক্ষেপ করে। এ সময় অন্তত ৫০ জন আহত হন। পরে আহতরা জেলা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা নেন।
এরপর গত ৪ আগস্ট দুপুরে শেরপুর শহরের একাধিক স্থানে আন্দোলনকারী এবং পুলিশ, আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় গুলিবিদ্ধ ও ইটপাটকেলের আঘাতে আহত হন অন্তত ৪০ জন। আহতরা জেলা সদর হাসপাতাল ও ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। তাদের মধ্যে কয়েকজন এখনো সদর হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন।
এদিকে ওই দিনই শহরের তিন আনী বাজার কলেজ মোড় এলাকায় বিক্ষোভের সময় টহলরত প্রশাসনের গাড়ি দ্রুতগতিতে আন্দোলনকারীদের ওপর তুলে দেওয়া হয়। এতে বেশ কয়েকজন আহত হন। পরে তাদের উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে দুজনের মৃত্যু হয়। আর গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান আরেকজন।
নিহতরা হলেন আহ্ছানউল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শহরের বটতলা এলাকার তুষার (২৪), আইটি উদ্যোক্তা সদর উপজেলার চৈতনখিলা এলাকার মাহবুব আলম (২০), ঝিনাইগাতী উপজেলার পাইকুড়া এলাকার সৌরভ (২২), শ্রীবরদী উপজেলার রূপারপাড়া এলাকার সবুজ হাসান (২০) ও জেলা সদরের ভাতশালা এলাকার মিম আক্তার (১৮)।
এ ছাড়া শিক্ষার্থী রাব্বানী, ফরিদ, সুমাইয়াসহ কয়েকজন গুরুতর আহত হন। তাদের ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তারা বর্তমানে সুস্থ রয়েছেন। তবে সদর হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসা নিচ্ছেন সুমন, ফাহিম, সজল মিয়াসহ কয়েকজন। আহত অন্যরা সদর হাসপাতালসহ বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে চিকিৎসা নিয়েছেন।
সবুজ মিয়া নামের আহত এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাকে আহত অবস্থায় প্রথমে সদর হাসপাতালে আনে আমার বন্ধুরা। কিন্তু তারা হাসপাতালে না রেখে কোনোমতে একটু রক্ত পরিষ্কার করে দিয়ে চলে যেতে বলে। পরে বাইরে এলে আবারও রক্ত ঝরতে থাকে। পরে বন্ধুরা বেসরকারি একটি হাসপাতালে ভর্তি করায়। আমি সেখানে দুই দিন ছিলাম।’
আহত আরেক শিক্ষার্থী জুয়েল বলেন, ‘আমি প্রায় ২০ দিন হাসপাতালে ভর্তি ছিলাম। অনেকেই এসেছে, আমার খোঁজ নিয়েছে। হাসপাতাল থেকে আমাকে সবকিছু দিয়েছে, আমার টাকা লাগে নাই। অনেক শিক্ষার্থী ভাই ও বোনরা দেখে গেছে আমাকে। মাঝে মাঝে ডাক্তাররা এসে জিজ্ঞাসা করেছে কেমন লাগছে।’
এদিকে গত ২১ আগস্ট জেলা সদর হাসপাতালে অনিয়ম ও দুর্নীতি রুখে সেবার মান বাড়াতে তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের শিক্ষার্থীরা। তারা দুই সপ্তাহ ধরে হাসপাতালের নানা সমস্যা শনাক্ত করেন। পরে সমস্যাগুলো নিয়ে জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সদর হাসপাতালের মিলনায়তনে আলোচনা করেন।
তদারকি চালানোর সময় শিক্ষার্থীরা সদর হাসপাতালে যেসব সমস্যা পেয়েছেন, সেগুলো হলো রোগীদের নিম্নমানের খাবার পরিবেশন, সরকারি ওষুধ বিতরণে অনিয়ম, প্যাথলজি ল্যাবে পরীক্ষা হওয়ার পরও বাইরে রোগী পাঠানো, আউটডোর ও ইনডোর চিকিৎসাসেবায় অবহেলা, অকেজো হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ মেশিন ঠিক করার উদ্যোগ না নেওয়া, দালালের দৌরাত্ম্য, টাকার বিনিময়ে সার্টিফিকেট বাণিজ্য, হাসপাতালের ভেতরে মাদক সেবন, রোগীদের জিনিসপত্র চুরি ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসকের ঘাটতি।
শিক্ষার্থী ফারহান ফুয়াদ তুহিন বলেন, ‘আমরা পর্যবেক্ষণ করে দেখেছি হাসপাতালে ইন্টার্নদের দিয়ে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হচ্ছে। রান্নাঘরের পরিবেশ স্বাস্থ্য সম্মত না। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ করা হচ্ছে না ও চিকিৎসকরা ঠিক সময় হাসপাতালে আসছেন না। এ ছাড়া অনেক যন্ত্রপাতি হাসপাতালে না থাকায় সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এসব বিষয়ে আমরা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। পাশাপাশি আন্দোলনে আমাদের অনেক শিক্ষার্থী আহত হয়েছিলেন, তাদের অনেকের চিকিৎসাসেবা হাসপাতালে করানো হয়নি নানা কারণে। পরে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে চিকিৎসাসেবা নিতে হয়েছে।’
আরেক শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমরা দেখেছি সদর হাসপাতালে দালালের খপ্পরে পড়ে অনেকেই সর্বস্ব হারাচ্ছেন। সব বিষয় নিয়ে আমরা সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যা সমাধান না হলে প্রয়োজনে আন্দোলনে যাব। এ ছাড়া আহত শিক্ষার্থীরা এখনো হাসপাতালে ভর্তি থেকে চিকিৎসাসেবা নিচ্ছে। আমরা সাফ বলে দিয়েছি চিকিৎসাসেবা যেন ঘাটতি না থাকে।’
সদর হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সেলিম মিয়া বলেন, ‘সদর হাসপাতালে অনেক আহত শিক্ষার্থী এসেছিল। আমরা তাদের সুন্দরভাবে চিকিৎসাসেবা দিয়েছি এবং এখনো দিচ্ছি। কয়েক দিন আগে ছাত্ররা হাসপাতালে এসেছিল আহত শিক্ষার্থীদের দেখতে, তারা খোঁজ-খবর নিয়েছে হাসপাতালে আমরা কী সেবা দিচ্ছি। পরে তারা আমাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছিল। ছাত্ররা অনেক বিষয়ে পরামর্শ দিয়েছে। আমরা সেগুলো নোট করেছি। কিছু বিষয়ে অন্য দপ্তরগুলোকে সংযুক্ত করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে বাজেট প্রয়োজন হবে। হাসপাতালের নিয়ম-শৃঙ্খলা বজায় রাখার পাশাপাশি আন্তরিকতার সঙ্গে সেবা কার্যক্রম পরিচালনা করতে আমরা বদ্ধপরিকর। পাশাপাশি আহত শিক্ষার্থী ও সাধারণ রোগীরা যেন সরকারিভাবে সঠিক চিকিৎসাসেবা পায়, সেজন্য হাসপাতালের সবাইকে নির্দেশনা দেওয়া আছে।’
জেলা সিভিল সার্জন ডা. জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমাদের হাসপাতালে বিছানা বেড়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাজেট ও জনবল বাড়েনি। তারপরও আমরা আমাদের সীমিত বাজেট ও জনবল দিয়ে সেবা দিয়ে যাচ্ছি। আহত শিক্ষার্থীদের সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে চিকিৎসা নিশ্চিত করতে আমি জেলার প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নির্দেশনা দিয়েছি। উপজেলা হাসপাতালে সেভাবেই আহত শিক্ষার্থীদের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে।’