সম্প্রতি দেশের রাজনৈতিক পট পরিবর্তন হয়েছে। শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পর নতুন অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়েছে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে। সেই সরকার কয়েকদিন হলো তাদের ১০০ দিন পূর্ণ করেছে। অনেকেই এ বিষয়ে আলাপ-আলোচনা করছেন। সরকার কী অর্জন করল, কী কী সমস্যার সম্মুখীন হলো- সেসব নিয়ে বিভিন্নজন বিভিন্নরকম কথাবার্তা বলেছেন। বিশেষ করে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক কেমন অগ্রগতি হলো ইত্যাদি। সেখানে প্রথম কথা হচ্ছে- আমাদের বৈদেশিক নীতি বা বহির্বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের বিষয়টি ভালোভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। আমাদের অভ্যন্তরীণ যে অবস্থা তার থেকে বৈশ্বিক সম্পর্কগুলো বিচ্ছিন্ন নয়, বরং ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। অভ্যন্তরীণ প্রশাসনে যে সমস্যাগুলো আছে সেগুলো সবই আমাদের বহিঃসম্পর্ককে বড় আকারে প্রভাবিত করে। সেদিক থেকে আমাদের আগে বুঝতে হবে যে, আমাদের দেশের ভিতরে কী ধরনের সমস্যা হচ্ছে? আমরা আসলে কী চাচ্ছি? কারণ বৈদেশিক নীতিতে আমাদের বেশ কিছু চাহিদা আছে। আমাদের জাতীয় স্বার্থ আছে। বিভিন্ন বন্ধুপ্রতিম দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের মাধ্যমে সেগুলোকে অর্জন করতে হবে। সে লক্ষ্যে সফলতা অর্জনের জন্য চেষ্টা করতে হবে। সুতরাং, আগে আমাদের বুঝতে হবে দেশের ভিতরে কী হচ্ছে?
বর্তমান সরকার অনেককিছু করার চেষ্টা করছে। বিভিন্ন ধরনের সংস্কার কমিশন গঠনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সংস্কারের কথা বলেছে। বস্তুত, যে বিষয়গুলো সরকারের সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য দেওয়া উচিত, সেখানে দৃশ্যত তাদের সাফল্য খুব একটা দৃশ্যমান হচ্ছে না। ফলে মানুষ অস্থির হয়ে পড়ছে। মানুষ অধৈর্য হয়ে পড়ছে। যারা সরকার চালাচ্ছেন তাদের মধ্যেও বিভিন্ন ধরনের অস্থিরতা ও অস্থার অভাব বিরাজ করছে। তাদের কথাবার্তার ভিতর দিয়েও সেটা প্রকাশ পাচ্ছে। সরকারের মূল শক্তি সাধারণ মানুষ এবং তারা গণ-অভ্যুত্থানের পেছনের মূল শক্তি। সেই শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দেশে একটি পরিবর্তন এসেছে। এখন পর্যন্ত জনগণের খুশি হওয়ার মতো তেমন কিছু হয়নি। তারা ক্রমাগত অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তায় ভুগছে। বর্তমানে দেশের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলো হচ্ছে- খাদ্যসামগ্রীসহ দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যের ঊর্ধ্বগতি ও মূল্যস্ফীতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি। সেখানেও মানুষ ভীষণভাবে নিরাশ। বস্তুত, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না বরং অবনতি ঘটছে।
প্রশাসন পরিচালনায় নতুন গতির সঞ্চার হয়নি। সেখানে এক ধরনের স্থবিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। অভ্যাসগতভাবে কিছু কিছু পরিষেবা হয়তো সরকার দিচ্ছে। এটা তাদের দায়িত্ব। কিন্তু যে গতি থাকার কথা, সেরকম কিছু কার্যত দেখা যাচ্ছে না। বিশেষ করে বিচার ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রেও নানান ধরনের স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। সেসব কারণে বর্তমান সরকার অভ্যন্তরীণ বিষয়গুলোতে এগিয়ে যেতে পারছে না। ফলে, বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটা নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। অনেকেই মনে করছেন, অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে তেমন কোনো অগ্রগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। আসলে সরকার মৌলিক সমস্যা সমাধানে অগ্রাধিকার না দিয়ে সংস্কার নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। বেশির ভাগ সংস্কারই সময়সাপেক্ষ ও চলমান প্রক্রিয়া। সংস্কারের মধ্যে কেবল মাত্র নির্বাচনব্যবস্থার উপযুক্ত সংস্কার প্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক সৃষ্টি এবং বিভিন্ন সম্মেলনে অংশগ্রহণ করার ক্ষেত্রে এক ধরনের লোক দেখানো প্রচেষ্টা পরিলক্ষিত হচ্ছে। আমাদের সরকারপ্রধান বিশ্বব্যাপী বিভিন্ন ধরনের শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিচ্ছেন। সরকারের বিভিন্ন স্তরের লোকজন যেমন- প্রধান উপদেষ্টা, পরিবেশবিষয়ক উপদেষ্টা, আইনবিষয়ক উপদেষ্টা- এরা সবাই সম্প্রতি দেশের বাইরে বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন সম্মেলনে যোগদান করেছেন। সেখানেও তাদের কথাবার্তা, তাদের পারফরমেন্স নতুন করে খুব একটা আশাব্যাঞ্জক কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
এখন খুব প্রয়োজন হয়ে পড়েছে- সরকারকে ভালো করে আবার সব বিষয়ে চিন্তা করে দেখার! দেশের অভ্যন্তরীণ যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে সেগুলোর প্রাধিকার নির্ধারণ করে সেই অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। তাহলেই কেবল আমাদের বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্কে নতুন গতি সঞ্চার হবে। তবে একটা কথা বলতেই হবে, আর তা হলো, আমাদের একটি রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে। তার ফলে আমাদের বৈশ্বিক সম্পর্কগুলোর মধ্যেও কিছু পরিবর্তন হয়েছে। আমাদের নতুন সরকার আসার পরই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কে এক ধরনের নতুন গতির সঞ্চার হয়েছে। সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও নির্বাচন সম্পন্ন হলো। এই নির্বাচনে ডোনাল্ড ট্রাম্প জয়ী হয়েছেন। এর ফলে আমাদের সম্পর্কে যে নতুন গতির সঞ্চার হয়েছিল, সেই গতি কিছুটা স্থিমিত হতে পারে। অন্যদিকে ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন আমাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের মানোন্নয়নে সরকার চেষ্টা করছেন। নতুন অন্তর্বর্তী সরকার আসার পরপরই ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের কিছুটা টানাপোড়েন সৃষ্টি হয়েছে। সেই টানাপোড়েনটা কমিয়ে ফেলা যায় কীভাবে, সরকার সেই চেষ্টা করছে এবং আমরা তা দেখতে পাচ্ছি। ভারতের দিক থেকেও চেষ্টা হচ্ছে যে, এই সম্পর্কটা স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা যায় কীভাবে? যদিও খুব বেশি অগ্রগতি এখনো হয়নি। তবে সঠিক পথেই এগোচ্ছে বলে মনে হয়। চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ব্যাপারে বড় রকমের কোনো সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। এই পরিবর্তনের ফলে বড় কোনো চ্যালেঞ্জের সৃষ্টি হয়নি- তবে সেখানে নতুন করে আবার উদ্যোগ নেওয়ার ব্যাপার আছে। আমাদের বড় রকমের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তনের ফলে সবকিছুর মধ্যে নতুন করে শুরু করার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।
সে ক্ষেত্রে একইরকমভাবে অন্যান্য দেশের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতার ব্যাপারেও আলাপ-আলোচনা করে সহযোগিতার কার্যক্রমগুলো নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন আছে। সেদিক বিবেচনায় বর্তমান সরকারে আমাদের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা যথেষ্ট সচেতন রয়েছেন এবং সেভাবেই চেষ্টা করছেন। মনে রাখতে হবে, এটা একটু সময়সাপেক্ষ ব্যাপার। এ ব্যাপারে আমাদেরও কিছুটা সময় দিতে হবে। বিশেষ করে, অভ্যন্তরীণ যে চ্যালেঞ্জগুলো আছে সেগুলো সরকারকে মোকাবিলা করতে সহযোগিতা করতে হবে। সেগুলো মোকাবিলা করার জন্য সরকারকে প্রাধিকার ভিত্তিতে জনগণের মৌলিক চাহিদার বিষয়ে প্রাধান্য দিতে হবে। সুতরাং, স্বাভাবিকভাবেই বিভিন্ন দেশের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতা ও সম্পর্কের ক্ষেত্রে এসব অগ্রাধিকারগুলো মাথায় রেখে কাজ করতে হবে। এসব বিচার-বিশ্লেষণ করে বলা যায়, ১০০ দিন মানে যে বিশাল একটা লম্বা সময়, তা না হলেও এটা খুব কম নয়। অনেকেই সময়টুকু মাইল ফলক হিসেবে ধরেন। সেজন্য এটা নিয়ে অনেক বেশি আলাপ-আলোচনা হয়েছে। আমাদের যে বড় রকমের পরিবর্তন হয়েছে অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে, তার ফলে সরকারকে সম্মিলিতভাবে আরও কিছুদিন সময় দিতেই পারি! সরকার যেন তাদের রোডম্যাপটা ঠিক করতে পারে এবং সে ব্যাপারে ঘোষণা দিতে পারে। তাহলে মানুষ কিছুটা হলেও স্বস্তি বোধ করবে। সে দিনের জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হবে এবং আমরা অপেক্ষা করে আছি! ১০০ দিন পার হওয়ার পর আমাদের প্রধান উপদেষ্টা মহোদয় ভাষণ দিয়েছেন। সেখানে তিনি কিছুটা বলার চেষ্টা করেছেন যে, আমরা কোন দিকে যাচ্ছি। বর্তমানে সরকার কীভাবে কাজ করার চেষ্টা করছে। তিনি যেমন আশার বাণী শুনিয়েছেন, তেমন নিজেরাও যথেষ্ট সন্তুষ্ট মনে হয়। তার এবং অন্যান্য উপদেষ্টার কথায় প্রায়ই নৈরাজ্য, অনিশ্চয়তা ও সন্দেহ প্রকাশ পাচ্ছে। এ ইতিবাচক দিক হচ্ছে নিজেদের দুর্বলতা সম্বন্ধে সরকারের সচেতনতা। সে জন্য আমরা আশান্বিত হতে পারি। সরকার তাদের সমস্যাগুলো বুঝতে পারছে এবং তা সমাধানে সচেষ্ট থাকবে, এটাই সবার প্রত্যাশা।
লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত