ঢাকা ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
এনসিপির সমাবেশে হামলায় জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হবে: আইনমন্ত্রী স্বেচ্ছাচারিতার অবসান, জবাবদিহিতা ফিরেছে: সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী প্রস্তাবিত বিলে বিএমইউ-এর চিকিৎসা ব্যয় বাড়ার শঙ্কা বিরোধীদলীয় নেতার প্রশ্নফাঁস ও অনলাইন জালিয়াতি রোধে সংসদে বিল পাস ভারতীয় চিকিৎসায় শ্রবণশক্তি ফিরে পাচ্ছে বাংলাদেশি শিশু জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নে শিক্ষা, গবেষণা ও সুশাসনকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখার আহ্বান অর্থনীতিবিদ ও শিক্ষাবিদদের জামালপুরে আইন কর্মকর্তার অফিস থেকে দেশীয় আগ্নেয়াস্ত্র ও মাদক উদ্ধার ঈশ্বরগঞ্জে একরাতে ১০ গরু চুরি, আতঙ্কে কৃষক মুক্তির আগেই বিতর্ক থানচিতে ফিরেছে শতাধিক পর্যটক, পথে আরও ১৮ জন ইবি ছাত্রশক্তির কমিটিকে ‘হাইব্রিড পকেট কমিটি’ দাবি দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ প্রায় ৩৮ বিলিয়ন ডলার ধৈর্যই আমাদের জয়ের চাবিকাঠি:  স্পেনের কোচ দে লা ফুয়েন্তে জবি শিক্ষার্থীদের সঙ্গে স্থানীয়দের সংঘর্ষ, সাংবাদিকসহ আহত ১৩ বিরতি ভেঙে ফিরছেন বুবলি নামাজের শেষ মুহূর্তের এক মহামূল্যবান সুযোগ তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে সমীক্ষা সম্পন্ন: পানিসম্পদ মন্ত্রী কলকাতার নন্দনে নন্দিত বাংলাদেশের ‘সম্পর্ক’ মহাকালের পটে এক ঋজু পদচ্ছাপ: আবুল কাসেম ফজলুল হক ও বাঙালির মননবিশ্বের বিবর্তন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ৫৪ গবেষকের পিএইচডি-এমফিল ডিগ্রি অর্জন এআই অ্যান্ড ডেটা সায়েন্সে বিএসসি ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রাম চালু করল আইএসইউ মির্জা শরফউদ্দীন বেগ (রহ.)-এর স্মরণে বরিশালে দোয়া মাহফিল মৃত্যুর আগ পর্যন্ত আক্ষেপ থেকেই যাবে! যাত্রীসেবায় আরও যত্নশীল হোক রেলওয়ে বাজেট প্রবৃদ্ধির প্রত্যাশা নাকি সংস্কারের হারানো সুযোগ ঢলে ভাসছে চকরিয়া-পেকুয়া, পাহাড়ধসে শিশুর মৃত্যু ‘বিড়ালের অভিশাপে’ বিশ্বকাপ থেকে ছিটকে গেছে ব্রাজিল রাঙামাটিতে পাহাড়ধস ও ভূমিধসের শঙ্কা, প্রস্তুত ৪৪ আশ্রয়কেন্দ্র মেসি ও সালাহর সামনে রেকর্ডের হাতছানি জয়পুরহাটে ট্রাক-অটোরিকশা মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ৫

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সিকি শতাব্দীর কথা

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৫, ০২:১২ পিএম
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সিকি শতাব্দীর কথা
প্রচ্ছদ: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের শুরুতে হিন্দু শিক্ষকের সংখ্যাধিক্য থাকলেও তারা স্বীয় সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন না। ছিলেন শিক্ষক ও মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানের অব্যাহত প্রবাহের সম্ভব হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ শ্রেণি চরিত্রের জন্য। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিঃসমাজেও প্রসারিত হয়েছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অনুশীলনের দৃষ্টি ছিল ইহজাগতিক এবং অঙ্গীকার ছিল ধর্মকে ব্যক্তিগত আচার ও বিশ্বাসের ব্যাপার হিসেবে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণ থেকে বিরত রাখা। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কৌলিন্যবোধ বড় প্রভাবক ছিল।...

শতকের পথ পরিক্রমণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে বড় অর্জন হচ্ছে এ বিদ্যাপীঠ জাতীয় জীবনের প্রায় সব ঘটনাপ্রবাহের অংশীজন হতে পেরেছে। শুধু একটি বিদ্যাপীঠ নয়, জাতির গতি-প্রকৃতির যেন আঁতুড়ঘর এ প্রতিষ্ঠান। অনেকেই বিশ্বাস করতে চান ‘Dhaka University is a state With in the state’। এই বিশ্বাস নিয়ে অনেকের মধ্যে তৃপ্তির ঢেকুর থাকলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক অবস্থান এখনো কাম্যমানের নয়। তবে যাত্রাপথের প্রথম সিকি শতাব্দীর অর্জন এখনো আমাদের স্বস্তির বার্তা দেয়।  

বঙ্গভঙ্গ রদপর্বে পূর্ববঙ্গের মুসলমানদের ক্ষতি কিছুটা নিবারণ করতে ব্রিটিশরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকে লর্ড লিটনের ভাষায় ‘বাংলা ভাগ রদের এক উজ্জ্বল রাজকীয় ক্ষতিপূরণ’ মনে করেন। লর্ড হার্ডিঞ্জের ভাষায়- রাজকীয় ছাড় হিসেবে উল্লেখ করেন। ঢাকার নবাব স্যার সলিমূল্লাহ ও ধনবাড়ীর নবাব ও বাংলার শিক্ষামন্ত্রী নওয়াব আলী চৌধুরীর নেতৃত্বে পূর্ববঙ্গের নেতা শেরেবাংলা ফজলুল হকের যৌথ প্রয়াসে নানা দ্যুতিয়ালির মাধ্যমে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আলোর পথ দেখে ১৯২১ সালের পয়লা জুলাই। 

পূর্ববঙ্গের নাগরিক সমাজের জাগরণের ফলে ব্রিটিশ সরকারের দীর্ঘমেয়াদি বোঝাপড়ার ফসল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। শুরুতে হিন্দু-মুসলিমদের মধ্যে সৌহার্দ্য রক্ষা করে একটি অসাম্প্রদায়িক চালচিত্রে চলার পথ মসৃণ না হলেও অনেকাংশে সফল হয়েছিল প্রথম পর্যায়ের প্রশাসন। অক্সফোর্ডের আদলে হলগুলোকে কলেজের মতো ইউনিট বিবেচনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আধুনিকতার ছাপ নিয়েই যাত্রা করে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্ট, এক্সিকিউটিভ কাউন্সিলে উপমহাদেশের জ্ঞানী-গুণীদের সন্নিবেশ ঘটিয়ে একটি সুদূরপ্রসারী ও বড় পটভূমি ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য প্রেরণাদায়ী। এ জন্যই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে বলা হতো ‘অক্সফোর্ড অব দ্য ইস্ট’।

মুক্তবুদ্ধির চর্চা, বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন, পূর্ববাংলার উচ্চশিক্ষার প্যারাডাইমকে পালটে দিয়েছিল এ প্রতিষ্ঠান। পুরাতন পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ, বির্তক প্রতিযোগিতা, তাৎপর্যপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ, মৌলিক গবেষণাকর্ম, ছাত্র সংসদ, সাহিত্য কর্মকাণ্ড- সবমিলিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় একটি গতিময় প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে। রবীন্দ্র-নজরুল-শরৎ-সুভাষ বসু প্রমুখ বরেণ্যজনের আগমনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পায় সঞ্জিবনী শক্তি। যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাকলগ্নের আত্মসমীক্ষা করা হয় তবে অবলোকন করা যায়, বিদ্যায়তনিক স্বাধীনতা বা একাডেমিক ফ্রিডম অনেকটাই ছিল। অর্থাৎ শিক্ষা দেওয়ার স্বাধীনতা ও জ্ঞানার্জনের স্বাধীনতা। 

যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার অঙ্কুরলগ্নে বিরোধিতা তেতিয়ে ওঠে পশ্চিম ও পূর্ববঙ্গের হিন্দু বুদ্ধিজীবীদের পক্ষ থেকে। এ বিরোধিতা মূলত স্বার্থহানির বিরোধিতা। কারণ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে যে কৌলিন্য তৈরি হয়েছিল তা ক্ষতি হবে। পূর্ববঙ্গের মুসলিম শ্রেণির শিক্ষার অগ্রসর হলে হিন্দুদের প্রভাব কমে যাবে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আয় কমে যাবে, সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাবও কমে যাবে। বলে রাখা প্রয়োজন, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম ছাত্রদের প্রবেশাধিকারের সুযোগ সীমিত ছিল। এ বিরোধিতার মূল কুশীলব ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। পূর্ববঙ্গের এলিট হিন্দু সমাজ কিছু ব্যতিক্রম বাদে নিজেদের শ্রেণি কৌলিন্য অটুট রাখতে অবধারিতভাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার বিপরীত প্রান্তে দাঁড়ায়। 

যে নাথান কমিটির সুপারিশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিকাঠামো তৈরি হয়েছিল তা ছিল সুষম।

নাথান কমিটি ২৬টি অধ্যায়বিশিষ্ট একটি প্রতিবেদন সরকারের কাছে পেশ করে। এই ২৫টি অধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক বিষয় এবং ২৬তম অধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আর্থিক বিষয়-সংক্রান্ত। 

উল্লেখ্য, নাথান কমিশন ছাড়াও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯১৭ সালের ৬ জানুয়ারি ভারত সরকার উচ্চশিক্ষা বিস্তারে মাইকেল স্যাডলারের নেতৃত্বে একটি উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন কমিশন গঠন করে বিদ্যালয়ের কর্মসূচি নির্ধারণের জন্য। স্যাডলার কমিশন নামে খ্যাত এ কমিশনের রিপোর্টে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হয়। রিপোর্টে বলা হয়, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা ধারণক্ষমতার অধিক, তাই ঢাকায় একটি শিক্ষাঙ্গন ও আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন। এ বিশ্ববিদ্যালয় হবে স্বায়ত্তশাসিত। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বৈশিষ্ট্য হবে শিক্ষণ ও আবাসিকধর্মী।

উপমহাদেশের উচ্চশিক্ষা বিষয়ে এক অবিস্মরণীয় দলিল হলো স্যাডলার কমিশনের বিশাল রিপোর্টটি। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের পূর্ববর্তী ৬০ বছরের কার্যক্রম, দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা ও অর্জন পর্যালোচনা করে স্যাডলার কমিশন বাংলার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষাকে মূলগতবাবে ত্রুটিপূর্ণ বলে মন্তব্য করেছিল। কারণ, ওই শিক্ষা এমন একটি উচ্চশিক্ষিত শ্রেণি তৈরি করেছে, যারা পশ্চিমের শিল্প-সাহিত্য, দর্শন, বিজ্ঞান প্রভৃতি সম্পর্কে জ্ঞানার্জন করলেও, তারা সমাজ ও জীবনবিচ্ছিন্ন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ত্রুটি-বিচ্যুতি পরিমার্জন-পূর্বক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকৌশলের যোজনা হয়েছিল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগঠিত কাঠামো নির্ধিারিত হলে প্রথমে উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান স্যার ফিলিপ জোসেফ হার্টগ (কার্যকাল: ১৯২০-১৯২৫) তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের আগে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। কোষাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পান আইসিএস অফিসার জে এইচ লিন্ডসে এবং রেজিস্ট্রার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় ঢাকার নবাব পরিবারের সদস্য ও বেঙ্গল সিভিল সার্ভিসের সদস্য খান বাহাদুর নাজির উদ্দিনকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপনের প্রকল্প পরিচালক ছিলেন এইচ ই স্টেপলটন ও স্থপতি ছিলেন গ্যারেথ।  

১৯২১ সালের ১ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে তিনটি অনুষদ (কলা, বিজ্ঞান, আইন), তিনটি হল, (মুসলিম হল, ঢাকা হল, জগন্নাথ হল) ১২টি বিভাগ, ৬০ জন শিক্ষক ও ৮৭৭ জন ছাত্র সহযোগে পাতশাহী (বর্তমান শাহবাগ) ও রমণীয় রমণায় কমবেশি ৬০০ একর জমি বঙ্গবঙ্গের রদের ফলে এ অঞ্চলে অবস্থিত পরিত্যক্ত ভবন ও অট্টালিকা নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা।

ভাইস চ্যান্সেলর ফিলিপ হার্টগ খুব দূরদর্শী ছিলেন। ভারতের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষক ঢাকা শহরের মতো একটা মফস্বল শহরে নিয়ে আসতে হলে বেতন বৃদ্ধিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়া দরকার। হার্টগ সেই পথেই অগ্রসর হন। প্রারাম্ভে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে বেশি ছিল। এর ফলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কয়েকজন শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে যোগদান করেন। এর ফলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বন্দ্ব-ফ্যাসাদ বাড়তে থাকে। সূচনাপর্বে যুক্ত হয়েছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, অধ্যাপক সত্যেন্দ্রনাথ বোস, জ্ঞান ঘোষ, রমেশ চন্দ্র মজুমদার, নরেশচন্দ্র সেন গুপ্ত, হরিদাস ভট্টাচার্য প্রমুখ। আরও এসেছিলেন মোহিতলাল মজুমদার ও চারুচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়। এদের স্নাতকোত্তর ডিগ্রি ছিল না। কিন্তু তারা ছিলেন উচ্চমানের শিক্ষক ও গবেষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক কার্যক্রমের শুরুতে হিন্দু শিক্ষকের সংখ্যাধিক্য থাকলেও তারা স্বীয় সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন না। ছিলেন শিক্ষক ও মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞানের অব্যাহত প্রবাহের সম্ভব হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষ শ্রেণি চরিত্রের জন্য। বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিঃসমাজেও প্রসারিত হয়েছিল। 

বিশ্ববিদ্যালয়ের সব অনুশীলনের দৃষ্টি ছিল ইহজাগতিক এবং অঙ্গীকার ছিল ধর্মকে ব্যক্তিগত আচার ও বিশ্বাসের ব্যাপার হিসেবে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় ধর্মীয় পরিচয় গ্রহণ থেকে বিরত রাখা। এ ক্ষেত্রে শিক্ষকদের কৌলিন্যবোধ বড় প্রভাবক ছিল।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এক সময় বিশ্বের খ্যাতনামা শিক্ষকদের ইনভাইট করে আনা হতো। এ কার্যক্রমে পরবর্তীতে যুক্ত হন অধ্যাপক নিউম্যান, ত্র্যামি জেরালিন্ড স্টকের মতো বিদেশি শিক্ষক। বিদেশি শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য পরর্বতীতে নির্মিত হয়েছিল ইন্টারন্যাশনাল হল। 

সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মৌলিক উদ্দেশ্য ছিল-পূর্ববঙ্গের মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভারতের একটি স্বশাসিত আদর্শ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যে প্রতিষ্ঠান কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর চাপ কমাবে বলে কর্তৃপক্ষ মান্য করতেন। 

শুরুতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম একযুগ এ আন্দোলন জোরালো ছিল। ১৯২৬ সালের শুরু হওয়া ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ এবং ১৯৩৯ সালে ঢাকা শহরে সৃজিত ‘প্রগতি লেখক আন্দোলন’ এই পর্বে মাইলফলক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক এ আন্দোলনের প্রাণসঞ্জিবনী।   

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ববাংলার উচ্চশিক্ষার প্যারাডাইমকে পালটে দিয়েছিল। এর আগে মধ্যযুগে এখানকার মুসলিম সুলতান এবং সুবেদাররা এ এলাকার মুসলিমদের উচ্চশিক্ষার জন্য কয়েকটি বড় মাদ্রাসা বা জামিয়া স্থাপন করেছিলেন। যেমন গৌড়, লখনৌতি, দারসবাড়ি, বাঘা, সোনারগাঁও ইত্যাদি উত্তর-পশ্চিম ও মধ্যবঙ্গে স্থাপিত বড় মাদ্রাসাসমূহ। এসব মাদ্রাসায় তখনকার দারসে নিজামি কারিকুলাম ও সিলেবাসসহ ইউনানি চিকিৎসাবিদ্যাও পড়ানো হতো। তবে একথা ঠিক যে, এ মাদ্রাসাশিক্ষা ও জ্ঞানতত্ত্বে কোরআন ও সুন্নাহর একটা কেন্দ্রীয় ভূমিকা থাকত। ফলে এসব উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান একটি ইসলামিকতার প্যারাডাইমে গড়ে উঠেছিল। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে পূর্ববঙ্গের সমাজে পশ্চিম আধুনিক লিবারেল হিউম্যানিস্ট প্যারাডাইমেই সংযুক্ততা তৈরি হয়।  

রাজা কালী নারায়ণ বৃত্তি মেধাবী শিক্ষার্থীদের স্বীকৃতির একটি মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একেবারে গোড়ার ও প্রাথমিক বিকাশপর্বে। দেশের প্রথম উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সৌরভ ছড়িয়েছে চারদিকে। 

তৎসময়ে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স কোর্স দুই বছর মেয়াদের হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রাগ্রসর চিন্তা নিয়ে অনার্স কোর্স চালু করে তিন বছর মেয়াদি। এ বিষয়টি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কর্যক্রমের ইতিবাচক দিক। 

বলে রাখা প্রয়োজন, ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছিল কিন্তু ১৯০৪ অব্দি সেখানে স্নাতকোত্তর পড়ানো হতো না। তখন এমএ পড়ানো হতো কলেজে কলেজে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় প্রথম কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতকোত্তর পড়ানোর রীতি চালু করলেন। অবশ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ ক্ষেত্রে অগ্রগামী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যাত্রাকাল থেকেই স্নাতকোত্তর পর্যায়ে পড়ানো হয়। 

প্রথমপর্বে পাঠদানের জন্য লেকচার থিয়েটার, ক্লাসরুম, গ্রন্থাগার, গবেষণাগার, পরীক্ষার হল এবং মিউজিয়াম সুপারিশ করা হয়। অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীর পাঠদানের জন্য লেকচার থিয়েটার এবং সীমিতসংখ্যক শিক্ষাার্থীর জন্য লেকচার এবং টিউটোরিয়াল কক্ষ ব্যবহার করা হতো। স্নাতক (জুনিয়র) পর্যায়ে কলেজসমূহ পাঠদান করবে। স্নাতক (সিনিয়র) পর্যায়ে মেধাবী শিক্ষার্থীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকরা পাঠদান করবেন। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন ধরনের গ্রন্থাগারের প্রস্তাব দেওয়া হয়- (১) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, (২) সেমিনার গ্রন্থাগার ও (৩) কলেজসমূহে কলেজ গ্রন্থাগার।    
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাথমিক পর্বের শিক্ষা কার্যক্রমে প্রথম ভর্তির পর কিছুকালের মধ্যে ছাত্রদের একটি ‘ইংলিশ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হতো।  

উপাচার্য হার্টগের কর্মের প্রতিফলন ঘটে অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমের প্রথম দিকেই। উপাচার্য নিয়ম চালু করেন অনার্স ও এমএ পরীক্ষায় প্রত্যেক পেপার দুজন পরীক্ষক দেখবেন। উত্তরপত্রে কোনো নম্বর দেওয়া হতো না। পরীক্ষকের উত্তরপত্রে আলাদা কাগজে নম্বর লিখে বিভাগের প্রধানের কাছে পাঠাতে হতো। পরীক্ষাপদ্ধতি আধুনিকায়ন হলেও মূল কাঠামো পরীক্ষার এখনো অনেকটা এমনি রয়ে গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মর্যাদা ও কৌলিন্যের বিষয়ে ছাত্ররা প্রথম থেকে সজাগ ছিলেন। ১৯২৬-১৯২৭ লর্ড লিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর হিসেবে সমাবর্তন অনুষ্ঠানের সভাপতি হওয়ার কথা ছিল। ঢাকা হলের ছাত্ররা লর্ড লিটনের হাত থেকে ডিপ্লোমা গ্রহণ করতে সম্মত হলো না, কারণ কিছুদিন আগে লাট সাহেব বার্ষিক পুলিশ কনফারেন্সে ভারতীয় নারীদের সম্মন্ধে অসৌজন্যসূচক মন্তব্য করেছিলেন। এর বিরুদ্ধে খবরের কাগজে তীব্র প্রতিবাদ ধ্বনিত হয়েছিল। ঢাকা হলের ছাত্ররা তাদের সংকল্পে অটল থাকল, সমাবর্তন অনুষ্ঠান বয়কট করল।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ছাত্রী নীলা নাগ ১৯২৩ সালে ইংরেজিতে এমএ পাস করেছিলেন। এমএ পাস করার পর তিনি শুরু করেছেন প্রদীপ জ্বালাবার কাজ। লীলা নাগ ‘শ্রীসংঘে’ যোগদান করে সাময়িকভাবে বিপ্লবী জীবনের সঙ্গে পরিচিত হন। এ সময়ে লীলা নাগ গড়ে তোলেন বাংলার প্রথম ছাত্রী সংগঠন, যা ‘দীপালি সংঘ’ নামে পরিচিত। এ সংঘ নারীশিক্ষার ওপর গুরুত্বারোপ করে কয়েকটি বালিকা বিদ্যালয় গড়ে তুলতে সমর্থ হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালায়ের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক ছাত্রী ‘দীপালি সংঘে’র সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এদের মধ্যে সুষমা সেনগুপ্ত (১৯০৩-১৯৮৭), রেনুকা সেনগুপ্ত (১৯০৯-১৯৪১), লতিকা দাশ (১৯১১-১৯৪৯) ফজিলাতুন্নেছা (১৮৯৯-১৯৭৭) উল্লেখযোগ্য। লীলা নাগ জয়শ্রী নামে যে মাসিক পত্রিকা বের করেন তা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের আশীর্বাদধন্য হয়েছিল। 

বলাবাহুল্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনালগ্নের কুশীলবগণ বিশ্ববিদ্যালয়কে বিশ্বজনীন জ্ঞানভাণ্ডার রূপে দেশের ভৌগোলিক সীমা অতিক্রম করে যেন বহির্বিশ্বের সঙ্গে সংযোগ ঘটিয়ে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে জ্ঞানসৃষ্টি ও প্রবাহবিস্তার করতে পারে, সে লক্ষ্যেই কাঠামো বিন্যাস ও কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছিল। 

এ প্রসঙ্গে উল্লেখ্য, ১৯২০ সালের ১১-১২ মার্চ ‘ঢাকা সোশ্যাল সার্ভিস এক্সিবিউশন নর্থব্রুক হলে অনুষ্ঠিত হয়। এ অনুষ্ঠানের মূল আলোচ্য বিষয় ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ইতিবৃত্ত ও কী রকম টিচিং অ্যান্ড রেসিডেন্সিয়াল’ বিশ্ববিদ্যালয় হতে যাচ্ছে তার একটি রূপরেখা। প্রধান আলোচক ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপনের বিশেষ অফিসার এইচ ই স্টেপলটন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো সম্পর্কে বলেন, শিক্ষাদানে লেকচার ও সেমিনার কাজের জন্য থাকবেন অতি উঁচুমাপের সীমিত সংখ্যক প্রফেসর। শিক্ষদের ব্যক্তিত্বের ওপর এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে। তাছাড়া থাকবেন রিডার, যারা হবেন ‘টিচার্স অব নোট’ এবং তাদের মূল্যবান গবেষণা থাকবেই। যোগ্যতা প্রমাণ করতে পারলে একপর্যায়ে তারা প্রফেসরশিপ পাবেন। আরও থাকবেন সুযোগ্য লেকচারার, সহকারী লেকচারার ও ডেমোনেস্ট্রেটর। ক্যাম্পাস অক্সফোর্ডের নিয়মকানুন অনুসারে চলবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

শিক্ষাদানভিত্তিক নাকি গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয় হবে এ বিষয়ে দোলাচল থাকলেও দুইয়ের মিশেলে চলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম সিকি শতাব্দীর কার্যক্রম।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রারম্ভিক শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন ইংরেজ অধ্যাপক জর্জ হ্যারি ল্যাংলি, পরবর্তীতে উপাচার্য ‘মিস্টার জোকিন্স, মিস্টার টমার, এ জি স্টক প্রমুখ একাডেমিক কাজে পারিদর্শিতা দেখাতে সক্ষম হন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে ঢাকা কলেজ ও জগন্নাথ কলেজের ডিগ্রি পর্যায়ের ছাত্রদের এ বিশ্ববিদ্যালয়ে যুক্ত করা হয়। দুটি কলেজের বেশ কিছু বই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে যুক্ত হয়। আজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারের দুর্লভ সম্ভার নিয়ে আমাদের যে গৌরব তা সৃজিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম পর্বে।  

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে প্রারম্ভে চড়াই-উতড়াই পেরোতে হয়েছে। কারণ সমাজে তখন ধর্মকে প্রাধান্য দিয়ে প্রতিষ্ঠা করতে সমাজের ক্রিয়াশীল শ্রেণি নানামাত্রিক চাপ প্রয়োগ করে সামাজিক সংহতি বিনষ্ট করতে তৎপর হয়। একটি বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালনা তৎসময়ের বাস্তবতায় সত্যই দুরূহ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে অসাম্প্রদায়িক সর্বজনীন বিদ্যায়তন হিসেবে গড়তে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গির নৈতিক সমর্থনের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাকালীন উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, রেজিস্ট্রার, ডিন, প্রভোস্টসহ এক্সিকিউটিভ কোর্টের অধিকাংশ সদস্যের ইতিবাচক দৃষ্টি ছিল। সর্বপরি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকমণ্ডলীর অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ধর্মীয় ধোঁয়া তুলে আতর বা ধূপের গন্ধ মাখতে দেননি। 
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তার জ্ঞান অন্বেষ চরিত্রের প্রকাশ ঘটায় প্রথম দশকেই। ১৯২৫ সালে প্রকাশিত হয় রমেশচন্দ্র মজুমদার প্রণীত ‘দ্য আর্লি হিস্ট্রি অব বেঙ্গল’।

রমেশচন্দ্র বাংলার ইতিহাস লেখার কর্মে মনোনিবেশ করেন। এ ইতিহাস রচনার যে কমিটি গঠিত হয় সেই কমিটির সভাপতিও ছিলেন স্বয়ং রমেশচন্দ্র। এ ইতিহাস লেখার কর্মের জন্য আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় এক হাজার টাকা এবং বাংলা সরকার এক হাজার টাকা চাঁদা দেন, আর এভাবেই আরম্ভ হয় বাংলার ইতিহাস লেখার কর্ম। ১৯৪৩ সালে বাংলার ইতিহাসের প্রথম খণ্ড প্রকাশিত হয়। প্রকাশ হওয়ার পরপরই গ্রন্থটি খুব সমাদৃত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সূচনাপর্বে প্রকাশিত হয় নিয়মিতভাবে ‘ঢাকা ইউনির্ভাসিটি বুলেটিন’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতামালার আয়োজন করে ১৯৩০-১৯৩১ শিক্ষাবর্ষে। 

প্রথমার্ধে ব্রিটিশ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র আন্দোলনকে অনুমোদন দেয়নি। এমনকি ছাত্ররা ‘কোনো আন্দোলনে যোগদান করবে না’ এই মর্মে মুচলেকা পর্যন্ত দিতে হয়েছিল। অনিল রায়ের বিপ্লবী ‘শ্রীসংঘ’, ‘অনুশীলন সমিতি’, ‘যুগান্তর পার্টি’ ও ‘বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্স’ ইত্যাদি বিভিন্ন বৈপ্লবিক দলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা গোপনে যোগদান করত। গত শতাব্দীর মধ্য দশকে পূর্ববঙ্গ তথা ভারতীয় উপমহাদেশে রাজনীতির এক কেন্দ্র হয়ে ওঠে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ভারত ও বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলের মতো ঢাকায় ছাত্র ফেডারশনের শাখা প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ঢাকা জেলায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রী এ সংগঠনে নেতৃত্ব দেন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা-পরবর্তী বেশ কিছু দিকদিশারি কর্ম ছিল। যা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিধিবদ্ধ দায়বদ্ধতাকে ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ১৯২৫ সালেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম পিএইচডি অর্জন করেন বিনয় ঘোষ। ১৯২৫ সাল থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাণ্ডুলিপি সংগ্রহের প্রয়াস লক্ষ্য করা যায় এবং ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত এ প্রচেষ্টা থাকে অব্যাহত। এ সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিদগ্ধ পণ্ডিতরা এ সুমহান কাজের সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং এ সময়কালের মধ্যে বহুসংখ্যক পাণ্ডুলিপি সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। যদিও এসব দুষ্পাপ্য পাণ্ডুলিপি, পুথি এখনো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে অনাদরে পড়ে আছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্ঞানমনস্ক চরিত্রের পরিচয় প্রথম দিকেই বিকশিত হয়। এ প্রসঙ্গে ড. অমলেন্দু বসু ১৯২৬-৩০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হলের আবাসিক ছাত্র এবং পরে ইংরেজি বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। তিনি মন্তব্য করেন, 
‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কয়েক সপ্তাহ পড়ার পরেই বুঝতে পারলাম, এই বিশ্ববিদ্যালয় নেহাত গ্রাজুয়েট তৈরির কারখানা নয়, ...ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের সাধনা নিরন্তর অগ্রসরমান। এখানে ব্যক্তিত্বের সংযত বিকাশের অমূল্য সংযোগ, এখানে জ্ঞানপথিক যুবজনচিত্ত ক্রমেই এগিয়ে যায়।’

ঢাকার মুসলিমরা খুব একটা অবস্থাপন্ন না হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের জায়গির হিসেবে রাখতেন। এ যেন তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতি মমত্ববোধ। এমনকি উপাচার্য সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেনও জায়গির থেকে পড়েছেন। ঢাকার গরিবরাই জায়গির রাখত। কিন্তু তারা ছাত্র-মাস্টারসাবদের খুব ইজ্জত করত, খুব খাতির দেখাত। 

আজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বাংলাদেশের মানুষের কাছে এক আশার রাহাবার। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের কলানৈপুণ্যে অংশীজনদের অতৃপ্তি থেকেই যাচ্ছে। তাই বারবার ইতিহাসের খেরোখাতা উল্টিয়ে দেখতে হচ্ছে যাত্রাপথের প্রথম দিকের অর্জনকে।

লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক

বিদ্যুৎসংকটে দিশেহারা শেরপুরবাসী

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:১৮ এএম
আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:৫৭ এএম
বিদ্যুৎসংকটে দিশেহারা শেরপুরবাসী
প্রতীকী ছবি

প্রচণ্ড গরমের মধ্যে শেরপুর জেলাজুড়ে লোডশেডিং ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে দিনের পাশাপাশি রাতেও বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষ চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছে শিশু, বৃদ্ধ আর অসুস্থ রোগীরা। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, জেলার বিভিন্ন এলাকায় দিনে কয়েক দফা বিদ্যুৎ চলে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও টানা এক থেকে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকায় স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। সন্ধ্যার পর লোডশেডিংয়ের কারণে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হচ্ছে। বৈদ্যুতিক পানির পাম্প বন্ধ থাকায় অনেক এলাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। এদিকে সম্প্রতি চলমান বিশ্বকাপ খেলা দেখার সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার অভিযোগে পল্লি বিদ্যুতের দুটি অফিসে হামলার ঘটনা ঘটেছে।  

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা সদর, শ্রীবরদী, ঝিনাইগাতী, নালিতাবাড়ী ও নকলা উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকাগুলোতে প্রতিদিন দীর্ঘ সময় ধরে লোডশেডিং চলছে। কোনো কোনো এলাকায় দিনে ৮ থেকে ১০ বার পর্যন্ত বিদ্যুৎ আসা-যাওয়া করছে। লোডশেডিংয়ের কারণে সেচকাজ ব্যাহত হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন কৃষকরা। অন্যদিকে ফ্রিজে রাখা খাদ্যপণ্য নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। এ ছাড়া অনলাইনভিত্তিক কাজ, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা এবং ইন্টারনেটনির্ভর কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।

ভোগান্তির বর্ণনা দিয়ে জেলা শহরের নারায়ণপুর মহল্লার বাসিন্দা শামীম আহম্মেদ বলেন, ‘গরমের মধ্যে দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় পরিবারের সবাই কষ্টে আছি। বিশেষ করে ছোট শিশু ও বৃদ্ধদের নিয়ে দুর্ভোগের শেষ নেই। আমরা দ্রুত এর সমাধান চাই।’

শ্রীবরদী উপজেলার ভায়াডাঙ্গা এলাকার শিক্ষার্থী আয়েশা বলেন, ‘রাতে বারবার বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ঠিকমতো পড়াশোনা করতে পারছি না। সামনে পরীক্ষা, কিন্তু এ অবস্থায় প্রস্তুতি নেওয়া খুব কঠিন। সন্ধ্যা থেকেই আমাদের এদিকে বিদ্যুৎ থাকে না।’

একই এলাকার বাসিন্দা আব্দুল করিম ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘এইডা কী অবস্থা হইল। দিনেও কারেন্ট থাহে না, রাইতেও না। আমরা এল্লা ঘুমাবারও পাই না। সবজি লাগাইছি পানি দিমু, সেটাও হয়তাছে না। পানি না দিলে সবজির ক্ষতি হবে, আমরা বড় বিপদে আছি।’

ঝিনাইগাতী উপজেলা দিঘীরপাড় এলাকার ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘দোকানে ফ্রিজে রাখা ঠাণ্ডা জিনিস নষ্ট অইয়া যায়। কারেন্টের এই অবস্থা থাকলে ব্যবসা কইরা টিক্যা থাকা মুশকিল অইব।’

পল্লি বিদ্যুৎ সমিতির শেরপুর জেলা শাখার ভারপ্রাপ্ত জেনারেল ম্যানেজার প্রকৌশলী আক্তারুজ্জামান বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের জেলায় বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৭০ মেগাওয়াট। তবে আমরা গড়ে ৩০-৩২ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পাচ্ছি। ফলে প্রায় ৪০-৪২ মেগাওয়াটের ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া প্রতি ঘণ্টায় বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের পরিমাণ ওঠানামা করে। তবু আমরা গ্রাহকদের ভোগান্তি কমিয়ে চাহিদা পূরণের চেষ্টা করছি। সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ চলছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি চলমান বিশ্বকাপ খেলা দেখার সময় বিদ্যুতের লোডশেডিংকে কেন্দ্র করে পল্লি বিদ্যুতের দুটি অফিসে হামলার ঘটনা ঘটে। আমাদের দোষ কোথায়? আমরা তো সরবরাহ কম পাচ্ছি, সে জন্য পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে হচ্ছে।’

জেলা বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘গত দুই দিন ধরে কিছুটা উন্নতি হয়ে বর্তমানে চাহিদার তুলনায় ৭-৮ মেগাওয়াট কম পাওয়া যাচ্ছে। অর্থাৎ জেলায় বিদ্যুতের মোট চাহিদা প্রায় ৫৩ মেগাওয়াটের বিপরীতে পাওয়া যাচ্ছে ৪৪-৪৫ মেগাওয়াট। আবার কখনো কখনো ৩৩-৩৪ মেগাওয়াট পাওয়া যায়।’

তিনি বলেন, ‘মূলত জাতীয় গ্রিড থেকে কম বিদ্যুৎ বরাদ্দ পাওয়ায় আমরা পর্যায়ক্রমে লোডশেডিং করতে বাধ্য হই। সরবরাহ যখন বাড়ে তখন লোডশেডিং অনেকটাই কমে যায়। সাময়িক এই ভোগান্তির জন্য আমরা গ্রাহকদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।’

বাড়ি যেন এক টুকরো আর্জেন্টিনার ক্যানভাস

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
আপডেট: ০৩ জুলাই ২০২৬, ০৯:০৯ এএম
বাড়ি যেন এক টুকরো আর্জেন্টিনার ক্যানভাস
আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে রাঙানো বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে আছেন মেহেদী হাসান। জয়পুরহাট সদর উপজেলার আউশগাড়া গ্রাম থেকে তোলা/ খবরের কাগজ

গ্রামের সড়ক ধরে সামনে এগোতেই দেখা মিলছে সারি সারি আর্জেন্টিনার পতাকা। আরেকটু যেতেই আর্জেন্টিনার পতাকার রঙে রাঙানো একটি বাড়ি। দেয়াল, গেট, বারান্দা সবখানেই আকাশি-সাদা রঙের ছোঁয়া। এটি যেন শুধু একটি ইট-সুরকির বাড়ি নয়, বরং এক ফুটবলপ্রেমীর স্বপ্ন ক্যানভাসে আঁকা গল্প। বাড়িটির এক পাশের দেয়ালে আর্জেন্টাইন ফুটবল কিংবদন্তি লিওনেল মেসির ছবি আঁকা। এসব দেখে মনে হতেই পারে আর্জেন্টিনার কোনো গ্রামের দৃশ্য! ১৭ হাজার কিলোমিটার দূরের দেশ আর্জেন্টিনার ফুটবল আর লিওনেল মেসির প্রতি ভালোবাসা থেকেই নিজের বাড়িটিকে এমন রূপ দিয়েছেন জয়পুরহাটের মেহেদী হাসান।

জয়পুরহাট সদর উপজেলার আউশগাড়া গ্রামের এই তরুণের কাছে আর্জেন্টিনা শুধু একটি ফুটবল দল নয়, বরং এটি আবেগের নাম। সেই আবেগের কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন ‘ফুটবলের জাদুকর’ লিওনেল মেসি। প্রিয় দল আর প্রিয় খেলোয়াড়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই নিজের আট শতক জায়গাজুড়ে থাকা বাড়িটিকে আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে সাজিয়েছেন তিনি। দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ফুটে উঠেছে আর্জেন্টিনার ফুটবল ঐতিহ্যের ছাপ। শুধু বাড়ির রং নয়, গ্রামের সড়কের মোড় থেকে কয়েক শ গজ দূরে তার বাড়ি পর্যন্ত সড়কের দুই পাশে লাগিয়েছেন আর্জেন্টিনার পতাকা।

ছোটবেলা থেকেই মেহেদী আর্জেন্টিনার সমর্থক। সময়ের সঙ্গে সেই ভালোবাসা আরও গভীর হয়েছে। বিশেষ করে মেসির প্রতি ভালোবাসা তাকে সব সময় অনুপ্রাণিত করে। মেসির খেলা ও ব্যক্তিত্ব তাকে এত বিমোহিত করেছে যে, প্রায় ২ লাখ টাকা ব্যয়ে নিজের পুরো বাড়ি আর্জেন্টিনার পতাকার আদলে রং করেছেন। ফুটবল বিশ্বকাপের উন্মাদনায় প্রিয় দলকে ঘিরে এমন আয়োজন নজর কেড়েছে জেলার মানুষের। তাই সেই বাড়ি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসছেন ফুটবলপ্রেমীরা। 

জেলা সদরের খনজনপুর গ্রামের মারজান হোসেন বাড়িটি দেখতে এসে তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন, ‘জয়পুরহাটে এ রকম পতাকার আদলে বাড়িতে রং করা আগে কখনো দেখিনি। তাই মেহেদীর বাড়িটি দেখতে এসেছি। তিনি আর্জেন্টিনার একজন ভক্ত। নিজের জেলায় এমন উদ্যোগ দেখে খুবই আনন্দ লাগছে।’

এলাকাবাসী জানান, এ গ্রামের প্রায় ৮০ শতাংশ মানুষ আর্জেন্টিনার সমর্থক। তাই মেহেদী হাসানের এই কাজ গ্রামবাসীর বিশ্বকাপের আনন্দ আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

সদরের দুর্গাদহ গ্রামের মামুন হোসেন ফেসবুকের মাধ্যমে আর্জেন্টিনার পতাকার মতো বাড়ি রং করার বিষয়টি জানতে পেরে দেখতে আসেন। তিনি বলেন, ‘আর্জেন্টিনার ভক্ত বলে এই বাড়িটি না দেখে থাকতে পারলাম না।’

মেহেদীর এই আয়োজনে খুশি তার পরিবারের সদস্যরাও। তার স্ত্রী পাপড়ী আক্তার বলেন, ‘আমার স্বামীর মতো আমিও আর্জেন্টিনার সমর্থক। আমার স্বামীর এই কাজ আমার ভালোই লাগছে।’

মেহেদী হাসান বলেন, ‘আমি ও আমার পরিবারের সবাই আর্জেন্টিনার সমর্থক। মেসিকে আমার খুবই পছন্দ। এ ছাড়া ম্যারোডোনা ও ডি মারিয়ার মতো খেলোয়াড় আর্জেন্টিনায় খেলেছে। আর্জেন্টিনার খেলোয়াড়রা মার্জিতভাবে ফুটবল খেলে। দূর-দূরান্ত থেকে অনেকেই বাড়িটি দেখতে আসায় আমার অনেক ভালো লাগছে। বিশ্বকাপ উপলক্ষে আমার বাড়িতে বড় পর্দায় খেলা দেখার ব্যবস্থা করেছি, সঙ্গে খাওয়া-দাওয়ার ব্যবস্থাও করা আছে।’

বিশ্বকাপে এবারের আসরে আর্জেন্টিনার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার দিন গুনছেন মেহেদী হাসান। তাই আগেই ঘোষণা দিয়ে রেখেছেন প্রিয় দল বিশ্বকাপ জিতলে খাসি জবাই করে এলাকাবাসীকে আপ্যায়ন করবেন। ফুটবল বিশ্বকাপের আমেজ শেষ হয়ে যাবে কিছুদিন পর, কিন্তু ফুটবলপ্রেম আর মেসির প্রতি ভালোবাসার নীরব সাক্ষী হয়ে থাকবে এই ব্যতিক্রমী বাড়িটি।

ভালোবাসা বটমূলে

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:২২ পিএম
ভালোবাসা বটমূলে
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

ভোর ৫টায় মোবাইল ফোনটা বেজে উঠতেই শমীকের ঘুম ভেঙে গেল। ডানপাশে টেবিলের ওপর থেকে ফোনটা নিয়ে দেখে স্ক্রিনে তার বন্ধু চন্দন রায়ের নাম।
‘কীরে শমীক, ঘুম ভেঙেছে? আজ পয়লা বৈশাখ, মনে আছে তো?’
‘হ্যাঁ, মনে আছে। আমি ৬টার আগেই বটমূলে পৌঁছাতে চাই। তুই সময়মতো রমনা পার্কের প্রধান গেটে গিয়ে অপেক্ষা করবি, আমরা একসঙ্গে ভেতরে যাব।’
‘ঠিক আছে দোস্ত, আজ সারা দিন আমরা একসঙ্গে কাটাব। বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান দেখব, গান শুনব। তার পর যাব চারুকলায়, মঙ্গল শোভাযাত্রা দেখব, ওদের সঙ্গে হাঁটব।’
‘তার পর আমরা যাব ধানমন্ডি লেকের পাড়ে, ওখানে নববর্ষের অনেক অনুষ্ঠান হয়। খাওয়াদাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থাও থাকে। আজ দুপুরের খাওয়া ওখানেই হবে।’
‘সবই ঠিক আছে, সবই হবে। কিন্তু তোর গার্লফ্রেন্ড চৈতি আজকের দিনে আমাদের সঙ্গে থাকবে না, এটা ভাবতেও আমার খারাপ লাগছে। আগে প্রতিটি পয়লা বৈশাখে আমরা তিনজন একসঙ্গে ঘুরে বেড়াতাম, কত আনন্দ করতাম। হঠাৎ তোদের কী হলো? তোরা আড়ি দিলি কেন?’
‘আমি তো আড়ি দিইনি, ওই দিয়েছে। মেয়েটা বড় সেনসিটিভ, ওর আঁকা পেইন্টিং নিয়ে ঠাট্টা করে কিছু একটা বলতেই ও রেগে গেল, কথা বন্ধ করে দিল। তিন মাস হয়ে গেল আমাকে ফোন করে না, ফোন ধরে না। দেখা হলে কথাও বলে না।’
‘ঠিক আছে, আজ যদি চৈতিকে বটমূলে পাই, আমি কথা বলব ওর সঙ্গে। আড়ি ভাঙিয়ে তোদের ভাব করিয়ে দেব। চিন্তা করিস না। এখন তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে যা। ৬টার মধ্যেই বটমূলে পৌঁছতে হবে।’ 

২.
শমীক মাহমুদ ও চন্দন রায় দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা বিভাগের ছাত্র। তৃতীয় বর্ষ অনার্সে ওরা পড়ছে। শমীক থাকে শহীদুল্লাহ হলে, জগন্নাথ হলে থাকে চন্দন। ওরা এইচএসসি পাস করেছে একই সঙ্গে ঢাকা কলেজ থেকে। সেখানে হোস্টেলে থেকেছে একই রুমে। শুরু থেকেই ওদের মধ্যে গভীর বন্ধুত্ব। শমীক কবিতা লেখে স্কুলজীবন থেকেই। এখন তার কবিতা প্রায় প্রতি সপ্তাহেই সংবাদপত্রের সাহিত্য পাতায় ছাপা হয়। কবি হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। বন্ধু চন্দন কবিতা না লিখলেও শমীককে কাব্যচর্চায় উৎসাহ দেয়। 
শমীক ও চন্দন দুজনেই চিত্রশিল্পের অনুরাগী। চারুকলা ইনস্টিটিউটে কোনো প্রদর্শনী থাকলে ওরা যাবেই। এ কারণেই চারুকলায় তাদের যাতায়াত ছিল। এমনি এক চিত্র প্রদর্শনী দেখতে গিয়ে ওদের পরিচয় হয়ে গেল ফাইন আর্টস বিভাগের ছাত্রী চৈতি রহমানের সঙ্গে। চারুকলা চিত্রশিল্প নিয়ে কথা বলতে বলতে ওদের সম্পর্ক, আরও ঘনিষ্ঠ হলো। শমীক কবিতা লেখে জেনে চৈতি খুশি হলো। সেও কবিতা পছন্দ করে, মাঝেমধ্যে লিখেও ফেলে। 
ওদের প্রায়ই দেখা যায় টিএসসি অথবা মধুর রেস্তোরাঁয় একসঙ্গে বসে আড্ডা দিচ্ছে, চা খাচ্ছে। কখনো ওরা বেইলি রোডের কোনো রেস্তোরাঁয় গিয়ে বসে। শিল্পকলা একাডেমির অনুষ্ঠানেও যায়, নাটক দেখে। এভাবে দিন গড়িয়ে যায়, ওদের লেখাপড়াও এগিয়ে চলে। 
চন্দন একদিন বুঝতে পারে শমীক ও চৈতির সম্পর্কটা বন্ধুত্বের পর্যায় ছেড়ে আরও কিছুটা এগিয়ে গেছে। চৈতির প্রতি চন্দনের দুর্বলতা ছিল ঠিকই, কিন্তু সে বাস্তববাদী। বাস্তবকেই মেনে নেয় চন্দন। নিজেকে সে গুটিয়ে নিতে থাকে ওদের কাছ থেকে। মনে মনে বলে, ‘সত্য যে বড়ই কঠিন/ সে কখনো করে না বঞ্চনা/ তাই কঠিনেরে ভালোবাসিলাম।’ 
কিন্তু শমীকের কাছে ধরা পড়ে যায় চন্দন। শমীক তাকে সরাসরি প্রশ্ন করে, ‘কী হয়েছে তোর? তুই আমাদের কাছ থেকে দূরে থাকিস কেন?’
‘দূরে কোথায়, তোদের কাছেই তো থাকি। আমাকে ডাকলেই পাওয়া যায়।’
‘তা পাওয়া যায়, কিন্তু ডাকতে হবে কেন? আমরা তিনজন একসঙ্গে ছিলাম, এক সঙ্গেই থাকতে চাই। কিন্তু তুই একটু দূরে সরে গেছিস। কেন বুঝতে পারছি না। তাই জানতে চেয়েছি কী হয়েছে।’
এবার চন্দন হেসে ফেলে। শমীকের পিঠে হাত রেখে বলে, ‘কিছুই হয়নি দোস্ত, সব ঠিক আছে। আমি তোকে খুব ভালোবাসি, সব সময় তোর ভালোটাই আমি চাই। তাই তোর পথ থেকে একটু সরে দাঁড়ালাম। তোরা দুজন এগিয়ে যা। আমি তোদের পাশে না হলেও ঠিক পেছনে আছি।’ 
‘না, আমি তোকে আমার পাশেই চাই। আমরা তিনজন আগের মতোই একসঙ্গে থাকব, একসঙ্গে ঘুরে বেড়াব। একজনকে পাওয়ার জন্য তোকে আমি হারাতে চাই না চন্দন।’
‘বোকার মতো কথা বলছিস শমীক। আমি তো হারিয়ে যাচ্ছি না। তোদের সঙ্গেই থাকব। আমি শুধু তোদের দুজনকে স্থায়ীভাবে এক করে দিতে চাই। তোর আর চৈতির জুটিটা চমৎকার হবে। একজন কবি, আরেকজন শিল্পী, তোদের দুজনেরই কাজ অনেক সুন্দর হবে, সৃষ্টিশীলতা অনেক বাড়বে।’

৩.
সেদিন বাংলা নববর্ষ-পয়লা বৈশাখ। ২০০১ সালের ১৪ এপ্রিল। ভোর ৬টার মধ্যেই শমীক পৌঁছে যায় রমনা পার্কের প্রধান গেটে। গিয়ে দেখে চন্দন আগেই এসেছে সেখানে।
‘শুভ নববর্ষ শমীক। তোকে অনেক ধন্যবাদ, সময়মতো এসেছিস। হালকা নীল রঙের পাঞ্জাবি পরেছিস, তোকে খুব মানিয়েছে।’
‘শুভ নববর্ষ চন্দন। হ্যাঁ, এই পাঞ্জাবিটা আমার খুব পছন্দের। গত বছর নববর্ষে চৈতি উপহার দিয়েছিল। একবার ভাবলাম এটা আর পরব না। তার পরেই মনটা কেমন হয়ে গেল। এটাই পরে ফেললাম।’
‘খুব ভালো করেছিস। তোকে এই পাঞ্জাবি পরা দেখলে চৈতির মনটাও নরম হয়ে যাবে। তোদের মান-অভিমানের মীমাংসা আজই করে ফেলব। চল বটমূলের দিকে যাই। দেখি চৈতি এসেছে কি না।’
ওরা দুজন মাঠের ওপর দিয়ে হেঁটে যেতে থাকে। তখন ঘড়িতে সোয়া ৬টা। নগরীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু মানুষ এসে গেছে বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে। নবীন-প্রবীণ সব বয়সী মানুষ আসছেন রমনায়, অনেক দম্পতির সঙ্গে তাদের শিশু সন্তানও আছে। 
রমনার প্রাঙ্গণে জনতার ভিড় ক্রমেই বাড়ছে। বেশির ভাগ পুরুষের পরনে পাঞ্জাবি-সাদা অথবা রঙিন। মেয়েরা প্রায় সবাই লালপাড় সাদা শাড়ি পরেছে। চুলে কানের পাশে অথবা খোঁপায় ফুল গুঁজেছে অনেকেই। অল্পবয়সী মেয়েরা ফুলের রিং মাথায় দিয়ে হাসি-উল্লাসে মেতেছে। তরুণ-তরুণীদের জটলা এখানে-ওখানে। সকালের নরম রোদ আর স্নিগ্ধ বাতাস, আনন্দ-মুখর মানুষের সমাবেশ আর বর্ষবরণের গান, রমনার প্রাঙ্গণকে নতুন রূপে সাজিয়েছে। 
‘এটাই বাঙালির বর্ষবরণ। এক সময় পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন হতো শুধু গ্রামাঞ্চলে, এখন এটা এসে গেছে শহরে, নগরে। ঢাকা মহানগরীতে নববর্ষের অনুষ্ঠান বেশি হয়। তাই না শমীক?’
‘ঠিকই বলেছিস চন্দন। পাকিস্তানি শাসনামলে ওরা বলত পয়লা বৈশাখের বর্ষবরণ উদ্‌যাপন এ দেশের সংস্কৃতি নয়, ওটা ভারতীয় সংস্কৃতি। পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী ঘোষণা করলেন, পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপন করতে দেওয়া হবে না। ফলটা কী হলো? বাঙালিরা খেপে গিয়ে আরও বেশি করে নববর্ষ উদ্‌যাপন করতে থাকে। রমনা বটমূলে ছায়ানটের অনুষ্ঠান শুরু হয় ষাটের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। প্রতি পয়লা বৈশাখে ছায়ানটের অনুষ্ঠান এখনো চলছে। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু একবার বন্ধ ছিল।’
চন্দন লক্ষ করে শমীক যখন কথা বলছে, তার চোখ এদিকে-ওদিকে কাকে যেন খুঁজছে। বোঝা গেল শমীকের চোখ খুঁজছে চৈতিকে। চন্দন চুপ করে থাকে, কিছু বলার তো নেই। যে করেই হোক আজ চৈতিকে খুঁজে বের করতেই হবে। 
হঠাৎ চন্দনের সামনে এসে দাঁড়ায় ওদের সহপাঠী অপর্ণা বড়ুয়া। অপর্ণা হেসে বলে, ‘শুভ নববর্ষ। তা তোমরা দুজন কেন, আরেকজন কোথায়?’
‘কার কথা বলছ অপর্ণা?’ শমীক জানতে চায়।
‘ন্যাকা। কিছুই বোঝ না? চৈতি কোথায়? তোমাদের সঙ্গে নেই কেন?’
‘চৈতি এখনো আসেনি, আসবে।’
‘আসবে বলছ কেন? ও তো এসে গেছে। বটমূলে অনুষ্ঠানের ডানদিকে দাঁড়িয়ে গান শুনছে। লালপাড়, সাদা শাড়ি, কপালে লালটিপ, ওকে কী সুন্দরই না লাগছে। বেচারা একা দাঁড়িয়ে আছে। তোমরা ওর কাছে যাও।’
চন্দন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। শমীকের হাত ধরে বলে, ‘চলো দোস্ত বটমূলে যাই। চৈতি তোর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।’
‘তুই যা। ওকে আমার কাছে আসতে বল।’
‘ঢং করিস না তো। ওটা মেয়েদের মানায়, পুরুষদের নয়। চল আমার সঙ্গে।’ 
শমীকের হাত ধরে চন্দন এগিয়ে যায় বটমূলের দিকে। তখন সকাল ৮টা বাজতে কিছু সময় বাকি। বহু মানুষ বিশাল বটগাছের ছায়ায় বসে গান শুনছে-বর্ষবরণের গান। বটমূলে নিচ থেকে ওপরে, সারি সারি কাঠের বেঞ্চ দিয়ে তৈরি বিরাট মঞ্চে বসে ছায়ানটের শিল্পীরা গান গাইছে। শিল্পীদের মধ্যে কিশোর-কিশোরী, তরুণ-তরুণী, সবাই আছে। এরা সবাই ছায়ানটের শিক্ষার্থী। একই রঙের পোশাক পরেছে। 
বটমূলে মঞ্চের ঠিক বিপরীত দিকে এসে দাঁড়ায় শমীক ও চন্দন। ওদের সামনেই বিপুল সংখ্যক শ্রোতা মাঠে বসে গান উপভোগ করছে। মাঠের একপাশে উঁচু প্লাটফর্মে বিটিভির ক্যামেরা দিয়ে অনুষ্ঠানের সরাসরি সম্প্রচার চলছে। 
চন্দনের চোখ হঠাৎ গেল ডানদিকে। সে দেখে চৈতি দাঁড়িয়ে আছে আরও অনেক মানুষের সঙ্গে। তাকিয়ে আছে এই দিকে। লালপাড় সাদা শাড়িতে ওকে অপূর্ব লাগছে। 
‘শমীক, ওই দ্যাখ তোর চৈতি, এদিকেই তাকিয়ে আছে। যা ওর কাছে।’
শমীক যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই বিকট শব্দে একটা বিস্ফোরণ। একটি শক্তিশালী বোমা ফেটেছে বসে থাকা শ্রোতাদের মাঝখানে। ধোঁয়া, বারুদের গন্ধ, আহত মানুষের আর্তনাদ। শিল্পীদের গান থেমে গেছে। মানুষের হুড়োহুড়ি, সবাই ছুটে যাচ্ছে যে যেদিকে পারে। পুলিশ, স্বেচ্ছাসেবী, সবাই যাচ্ছে আহতদের উদ্ধার করতে। 
কিছুক্ষণ পরেই আর একটি বোমা ফাটল একই জায়গায়। শমীক যখন কোনোদিকে যাবে ভাবছে, ঠিক তখনই তাকে কেউ জড়িয়ে ধরল সামনের দিক থেকে। শমীক দেখে একজন নারী তাকে জড়িয়ে ধরেছে। তার চুলের গন্ধ আর দেহের স্পর্শে শমীক বুঝতে পারে এ তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয়বান্ধবী চৈতি। ভয়ে থর থর করে কাঁপছে। শমীক ওকে শক্ত করে ধরে রাখে। 
‘ভয় নেই চৈতি। আমি তো আছি তোমার সঙ্গে। চলো আমরা এখান থেকে অন্যদিকে যাই।’

নববর্ষের উৎসব: উৎস থেকে নিরন্তর

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:১৭ পিএম
নববর্ষের উৎসব: উৎস থেকে নিরন্তর
ছবি: খবরের কাগজ

বাঙালির উৎসবের আয়োজনে সামর্থ্যের চেয়ে অতিশয়োক্তি থাকে বৈকি। জাতি হিসেবে এ ধারা আমাদের উৎসবমুখর বললে বাড়িয়ে বলা হবে না বোধকরি।

উৎসব মানেই আনন্দ, হইহুল্লোর, খাওয়াদাওয়া, বেড়ানো- কত কী। বাঙালির জীবনে ঈদ, পূজা ও বাংলা নববর্ষ বড় উৎসব। ঈদ ও পূজা ধর্মীয় উৎসব হলেও বাংলা নববর্ষ সব ধর্মের মানুষ উদ্‌যাপন করে এ জন্য এ উৎসব সর্বজনীন। একসময় গ্রাম বাংলায় নববর্ষকে ঘিরে গ্রামের মেলা, লাঠিখেলা, নৌকাবাইচ, ঘুড়ি ওড়ানোসহ নানা আয়োজনে নববর্ষকে কেন্দ্র করে আনন্দের ধুম পড়ে যেত। স্মৃতির খাতার পাতা উল্টিয়ে আজও উঁকি দেয় ছোটবেলার গ্রামের মেলার কাঁচাগোল্লা, গরমজিলিপি, খাজা, মাটির পুতুল, ঘোড়াসহ হরেক রকম জিনিস। নাগরদোলার দোল যেন আজও মনে দোলা দেয়। নববর্ষের মেলার মাটির খেলনা ছোটবেলায় যজ্ঞের ধন মনে হতো। সময় বদলে নববর্ষের উৎসব ভিন্ন আঙ্গিকে রূপ নিয়েছে। সরকার বাংলা নববর্ষে সরকারি কর্মচারীদের বাড়তি একটি উৎসব ভাতা প্রদান করায় বাংলা নববর্ষের আয়োজনে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। 

প্রতি বর্ষের সমাপ্তে বাংলা নববর্ষ হাজির হচ্ছে বৃহৎ পরিসরে বাঙালির জীবনে। বাংলা নববর্ষ দিনদিন পরিসর বৃদ্ধি করে রং ছড়াচ্ছে। মানুষের গায়ের জামা থেকে শুরু করে মঙ্গল শোভাযাত্রার পাপেটের রং ও বৈচিত্র্যে ভরপুর। উৎসবের আমেজে বাঙালি নববর্ষে সাজায় নিজেকে নতুন কাপড়ের মোড়কে। নববর্ষকে কেন্দ্র করে বাঙালিয়ানাকে ধারণ করে আমরা জীবনের চলার পথের নতুন আনন্দ খুঁজে পাই। যদিও সারা বছরে নববর্ষের বাঙালিয়ানার রক্ষক আমরা থাকি না। তবু নববর্ষ জাতি-ধর্ম-নির্বিশেষে এক সর্বজনীন উৎসব। বাঙালির মহামিলনের একটি উপলক্ষ। 

বাঙালি সংস্কৃতির ইতিহাস পাঠ মত-মতান্তরে ভরপুর। বাংলা নববর্ষের প্রচলন- এমনকি ছায়ানটের নববর্ষের উদ্‌যাপনের সূচনার ইতিহাস নিয়েও মত-মতান্তর রয়েছে। কবে, কোথায়, কে বা কারা করেছিলেন এরূপ প্রশ্ন ছুড়লে বাংলা নববর্ষের উৎপত্তির ইতিহাস তর্কের বেড়াজালে জড়িয়ে যায়। আর যারা এসব বিষয় নিয়ে চর্চা করেন তারা সমাধানে পৌঁছনোর চেয়ে নিজের শক্ত বা নরম-যুক্তি যাই হোক না কেন- সেই অবস্থানেই থিতু হয়ে থাকতে চান। বাংলা নববর্ষের প্রবর্তনের ইতিহাসে অনেকের নাম এলেও সবচেয়ে আলোচিত ও প্রচলিত নামটি হচ্ছে মুঘল সম্রাট জালাল উদ্দিন মুহাম্মদ আকবরের। মুঘলরা মুসলিম হিসেবে রাজ্য শাসন অনুসরণ করত হিজরি সন অনুযায়ী। হিজরি সন চান্দ্র সন। সমস্যা হচ্ছে হিজরি সন সৌরবর্ষের চেয়ে ১০-১১ দিন ছোট। ফলে গাণিতিক হিসেবে তিন বছর অন্তর সৌর সনের চেয়ে হিজরি সন এক মাস এগিয়ে আসে, এভাবে আকবরের সিংহাসন আরহণের সময় ১৫৫৬ খ্রি. থেকে শুরু করে মোট ২৯ বছর রাজত্বকালে প্রচলিত শতাব্দের সঙ্গে হিজরি সনের সময় তারতম্য ঘটেছিল ৯ মাসের।

আরেকটি বড় সমস্যার সৃষ্টি হয়েছিল খাজনা আদায় নিয়ে। কারণ মুঘলরা হিজরি সনের অনুসারী হয়ে রাজ্য পরিচালনা করলেও হিজরি সনের মাসগুলো মৌসুম ঋতুকেন্দ্রিক ছিল না। এ পরিপ্রেক্ষিতে ফসল কাটার সময় নির্দিষ্ট করে খজনা আদায়ে জটিলতা তৈরি হয়েছিল। সাধারণ মানুষের অর্থনীতি ছিল কৃষিভিত্তিক। তখনকার জনজীবন মূলত কৃষির আবহে চলত। কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ে সুবিধার জন্য আকবর তারিখ-ই-ইলাহি সন বলে নতুন সন চালু করেছিলেন। মূলত আকবরের আদেশে দরবারের সেরা পণ্ডিত জ্যোতিষ শাস্ত্রবিদ আমির ফাতেহ উল্লাহ্ সিরাজি বাংলা সনের উদ্ভাবন করেন। ফাতেহ উল্লাহ সিরাজি আকবরের সিংহাসনে আরোহণের তারিখ, ১৮ ফেব্রুয়ারি ১৫৫৬ খ্রি.-কে ভিত্তি ধরে সন গণনা শুরু করেন। সেই থেকে বাংলা সনের পথচলা। একটি বিষয় বলে রাখা উচিত আকবরের প্রচলিত সর্বজনীন নতুন ধর্ম ‘দ্বিন-ই-ইলাহি’ ও তারিখ-ই-ইলাহির সময়কাল অভিন্ন। কালের আবর্তে দীন-ই-ইলাহি পথ চলতে না পারলেও আকবরের নির্দেশে ফতেহ উল্লাহ্ সিরাজি প্রবর্তিত বাংলা সনকে কার্যকর করেছিলেন আকবরের সজ্ঞা ও প্রজ্ঞায় ঋদ্ধ অর্থ উপদেষ্টা টোডরমল। তিনি ১৫৮৫ খ্রি. ১০ মার্চ ইলাহি সনের কার্যকরণ ঘটান। এ সময় থেকে বাংলায় খাজনা আদায়ে বাংলা সন গণনা করা হয়। উল্লেখ্য, বাংলা সন প্রবর্তনের আগে হিসাব সমন্বয়ের কাজটি জটিল ছিল। কারণ উপমহাদেশে শতাব্দসহ হিসাব ছিল সৌর বর্ষ। কিন্তু হিন্দু-মুসলিম বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি চন্দ্র মাসের হিসাবে মান্য করা হতো। সৌরবর্ষ যেহেতু হিসাবের নিক্তিতে তিন বছর অন্তর এক মাস এগিয়ে যেত তাই হিসাবের সুবিধার্থে প্রতি তিন বছর অন্তর প্রাচীন আরবি রীতির মতো এক মাস নামমন্ত্র হিসাবে সংযোগ করে বাদ দেওয়া হতো। গোঁজামিলের এ পদ্ধতির নাম ছিল ‘সাবনমিতি’। 

চন্দ্রমাস ও সৌরবর্ষের ব্যবহারের প্রাচীন রীতির একটি সমন্বয় ও সরলীকরণের মানসেই আকবর বাংলা সনের প্রচলন করেছিলেন। সৌরবর্ষ ও চন্দ্রবর্ষের সমন্বয়ে বাংলা সন ও মাসে সৌর ও চন্দ্রের রেশ বয়ে যায়। যেমন বিশাখা নক্ষত্রের আদলে নাম বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠা নক্ষত্রের আদলে জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়া নক্ষত্রের আদলে আষাঢ়, শ্রবণা নক্ষত্রের আদলে শ্রাবণ, ভাদ্রপদা নক্ষত্রের নামের আদলে ভাদ্র, অশ্বিনী নক্ষত্রের আদলে আশ্বিন, কৃত্তিকা নক্ষত্র থেকে কার্তিক, আমন থেকে অগ্রহায়ণ, পুষ্য নক্ষত্র থেকে পৌষ, মঘা নক্ষত্রের আদলে মাঘ, ফাগুনী নক্ষত্র থেকে ফাগুন এবং চিত্রা নক্ষত্র থেকে চৈত্র।

ওপরের বর্ণনা তো গেল আকবর অখ্যান। কিন্তু বাংলা সনের ব্যুৎপত্তির উৎসে আকবরের নাম ছাড়া তো আরও কিছু নাম, স্থান ও সময়ের সংযোগ রয়েছে। বাংলা সনের হিসাবের সূত্রপাতে আকবরের পাশে পেরেক ঠুকে নাম আছে- রাজা শশাঙ্ক তিব্বতের রাজা রিস্প্রভ-সন, বাংলার স্বাধীন সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহ্, মুর্শিদ কুলি খাঁসহ আরও অনেকের নাম। তবে বাংলা সন প্রবর্তক হিসেবে মহামতি আকবরের পাল্লাই ভারী। আকবর ছিলেন সুন্নি মুসলিম। তার জাতিসত্তার ঐতিহ্য ছিল তুর্কি আতর মাখা। জাতিক সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারে মুঘলরা ছিল ইন্দো-পারসিক। শাসক হিসেবে আকবর বিচক্ষণ ছিলেন। তার আমলেই মুঘল রাজ্য সর্বাধিক বিস্তৃত হয়েছিল। তিনি সৌর ও চন্দ্রবর্ষের সমন্বয় করে প্রজাদের ফসল তোলার সময় বর্ষের গণনা শুরু করেছিলেন সুদূরপ্রসারী ধ্যান ও ধারণা থেকে। তিনি দিব্যদৃষ্টিতে বুঝেছিলেন প্রজাদের আর্থিক সচ্ছলতার সময় খাজনা আদায় সুবিধাজনক। আকবরের বাংলা সনে প্রজাদের খাজনা নবায়নের পাশাপাশি বাংলায় বাংলা সনের শুরুতে ব্যবসায়ীদের হালখাতা প্রচলন ধীরে ধীরে রেওয়াজে পরিণত হয়। তবে বাঙালি সমাজে নববর্ষকে নাগরিক মোড়কে নানা রঙে উৎসবের ডামাডোলে গ্রহণের রেওয়াজ সাম্প্রতিক। বাঙালির জীবনের বিশেষত ঢাকার নাগরিক সমাজে নববর্ষ বরণের প্রসঙ্গ এলেই প্রভাতে রমনা বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ সংগীতের কথা আসে। ছায়ানটের বর্ষবরণে শুরুর সময়ে ১৯৬৪, ১৯৬৫, ১৯৬৭ সালের দাবি আছে। তবে ড. সন্জিদা খাতুনের লেখার তথ্য হলো, ‘১৯৬৭ সালের ১৫ এপ্রিল শনিবার ছিল পয়লা বৈশাখ। অবজারভার ১৪ তারিখের কাগজে নতুন বছরকে আবাহন করেছে- welcome pahela Baishakh শিরোনামে। সে বছর দেশের নানা অঞ্চল থেকে বর্ষবরণের খবর আসে ঢাকায়। প্রত্যুষে ছায়ানটের অনুষ্ঠান, এ বছরেই প্রথম রমনার বটমূলে। 

অবজারভার পত্রিকা পয়লা বৈশাখ উদ্‌যাপনের ছবি ছাপে। এতে দেখা যায় হার্মোনিয়ামে আছে শাহীন আক্তার, তানপুরা বাজিয়ে গান গাইছেন মাহমুদুর রহমান মাহমুদ (বেনু)। পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন ১৯৬৭ সালের নববর্ষে শহিদ মিনার থেকে প্রভাতফেরি শুরু করেছিল।’

পয়লা বৈশাখে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উৎসবের আয়োজন নগরের গণ্ডি পেরিয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। তবে নববর্ষে যে বাঙালিয়ানা পরিচয়ে প্রকাশিত- আমরা সারা বছর সেই ভাবনা ও চর্চা থেকে দূরে থাকি। ঢাকার চারুকলা ইনস্টিটিউটের মঙ্গল শোভাযাত্রার মঙ্গল কামনায় মানুষের ঢল আমাকেও তাড়িত করে। কিন্তু প্রতিদিন আটপৌঢ়ে বাঙালি জীবনচর্চার মেলবন্ধন থেকে আমাদের সরে যাওয়া কাঙ্ক্ষিত নয়। মাঝে মাঝে সর্বস্তরে বাংলার প্রচলনে সরকার কিছু নির্দেশনাও জারি করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা অনেকটাই দূরে থাকে। আমরা বাংলা দিন তারিখ এমনকি অনেক সময় মাসের নামও মনে রাখি না। 

শুধুই নববর্ষে বাঙালির হাজার বছরের লৌকিক আচারকে প্রতীকীরূপে ধারণ ও পালন করা নববর্ষের তাৎপর্য হতে পারে না। নববর্ষের নানা রঙের সঙ্গে মিশে আছে অসাম্প্রদায়িক বাঙালির হাজার বছরের ঐতিহ্য। ধর্ম ও সংস্কৃতিভেদে আমাদের জাতিগত ইতিহাসের পথ পরিক্রমণের সমন্বয়সূত্র। নববর্ষের নব আভায় আমাদের প্রাচীন ইতিহাসের শিকড়ের অনুসন্ধান প্রয়োজন।

বাংলা নববর্ষের উৎসবের পরিবর্তনে আমাদের গ্রামবাংলার নববর্ষের মেলাগুলোর রূপান্তর সবচেয়ে বেশি। গ্রাম্য নববর্ষের মেলায় কিছুদিন আগেও বাতাসা, কদমা, চিনির সাজ, জিলাপি, তিলের খাজা, গজা, ঝুরি, ইত্যাদি ছিল অন্যতম উপকরণ। এ ছাড়া গ্রামীণ জীবনের প্রয়োজনীয় সব উপকরণ যেমন- চাষের লাঙল, জোঁয়াল, মই, ডালা, ঢেঁকি, চালুন, কুলা, শীতলপাটি ইত্যাদি পাওয়া যেত। এখন গ্রাম্য মেলায় শহরের জিনিসপত্র বেশি দেখা যায়। লোকজ বাংলার গ্রাম্য মেলার উপকরণগুলো আস্তে আস্তে উধাও হয়ে যাচ্ছে।

গ্রাম্য মেলাগুলোর চিরায়ত রূপ পরিবর্তন বৈশাখী নববর্ষের রূপের সঙ্গে বড়ই অপরিচিত। বাঙালির বর্ষবরণের অসাম্প্রদায়িক চেতনার খবর ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে। এখন শুধু চর্চা ও চেতনায় প্রয়োজন বাঙালিয়ানা ধারণ ও লালন করার বছরব্যাপী প্রত্যয়ের। তবেই আমাদের পথচলায় প্রকাশ পাবে নববর্ষের বাঙালির জাতিসত্তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের।

নববর্ষের উৎসবের শেকড়ের সন্ধান যেমন ছিল একই সঙ্গে গ্রামীণ অর্থনীতির নবায়ন ও নিরন্তর যাত্রার উপলক্ষ ছিল আজ নববর্ষের উৎসবের মোড়কি রূপ আরও ঝকমকে হয়েছে- কিন্তু কমেছে ভূমিজ সংস্কৃতির কর্ষণের উত্তাপ। তাই আজও মনোজমিনে হারিয়ে খুঁজি শৈশবের নববর্ষের ‘মদনার মার’ মেলার কাঁচাগোল্লা ও মাটির খেলনা।

লেখক: গবেষক ও প্রাবন্ধিক

রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০২৬, ১২:০৩ পিএম
রবীন্দ্রনাথের বৈশাখ
অলংকরণ: নাজমুল আলম মাসুম

বাংলাদেশ অপূর্ব ঋতুবৈচিত্র্যের দেশ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এ দেশের প্রকৃতির রূপ-রসের বদল ঘটে। হাজার বছর ধরে চক্রাকারে এ বদল ঘটে আসছে। কীভাবে এবং কেমন করে এ বদল ঘটে- তার স্বরূপটি ধরা আছে আমাদের হাজার বছরের সাহিত্য ও সংগীতে। বাংলা সাহিত্যের পাঠক মাত্রই তা জানেন। প্রাচীন বাংলা সাহিত্যে প্রকৃতির চালচিত্র ছিটাফোঁটা থাকলেও মধ্যযুগের সাহিত্যে বিধৃত হয়েছে। কালকেতু উপাখ্যানে ফুল্লরার বারোমাস্যায় সব ঋতুরই বিবরণ আছে। বৈষ্ণব-পদাবলিতে ঋতুবদলের সঙ্গে প্রকৃতির রূপের পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। রাধার প্রেমানুভূতির নানামাত্রিক প্রকাশও অনেকটা ঋতুসাপেক্ষ। বাংলা আধুনিক সাহিত্যে মানব জীবনের অনুষঙ্গে এ দেশের ঋতু ও প্রকৃতির উপস্থিতি কোনো কোনো সাহিত্যিক অবিস্মরণীয় করে রেখেছেন; এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়, জসীম উদদীন, বন্দে আলী মিয়া প্রমুখের নাম উল্লেখ করা যায়। এমনকি তিরিশোত্তর আধুনিক কবিদের মুখ্যজন জীবনানন্দ দাশ হেমন্ত ঋতুকে বাংলা সাহিত্যে চিরস্থায়ী করে গেছেন।

রবীন্দ্রনাথ তার নানাবিধ সৃজনকর্মে- বিশেষত কাব্য, নাটক, ছোটগল্প, সংগীত, চিঠিপত্র ইত্যাদি রচনায় বাংলার ঋতুভিত্তিক প্রকৃতির রূপ-সৌন্দর্য চিত্রিত রেখেছেন। তিনি গীতবিতানের গানগুলোর বিষয়ভিত্তিক যে বিন্যাস করেছেন তাতে প্রকৃতি পর্যায়ের ২৮৩টি গান আছে। এ ছাড়া গীতবিতানের প্রেম ও প্রকৃতি পর্যায়ের গান এবং  গীতিনাট্যের কিছু গানেও প্রকৃতির প্রসঙ্গ লক্ষণীয়। 

রবীন্দ্রনাথ রচিত, আমাদের বাল্যকালে স্কুলপাঠ্য, সেই অবিস্মরণীয় (সহজপাঠ, প্রথম ভাগ, প্রকাশকাল: বৈশাখ ১৩৩৭) কবিতা ‘আমাদের ছোট নদী’। এর প্রথম দুটি পঙ্‌ক্তি বাঙালি-পড়ুয়া মাত্রই স্মরণ করতে পারেন: ‘আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে,/ বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।’ কবিতাটির দ্বিতীয় পঙ্‌ক্তিতেই ‘বৈশাখ’ মাসের উল্লেখ আছে। এ কবিতায় বৈশাখের প্রকৃতি-পরিবেশ কবি পঙ্‌ক্তিবদ্ধ করেছেন। বৈশাখের রুক্ষতা, দাবদাহ, প্রায় জলশূন্য হাঁটুজলের নদী এবং এরকম অনুষঙ্গে যে জঙ্গম মানবজীবন তারই চালচিত্র রয়েছে রচনাটিতে। বাঙালি কিশোর-কিশোরীর চিরকালীন দুরন্ত ছেলেবেলার চিত্র পাই বৈশাখের হাঁটুজলের নদীর বিবরণে: ‘তীরে তীরে ছেলেমেয়ে নাহিবার কালে/ গামছায় জল ভরি গায়ে তারা ঢালে।/ সকালে বিকালে কভু নাওয়া হলে পরে/ আঁচলে ছাঁকিয়া তারা ছোটো মাছ ধরে।’

বাংলা নববর্ষ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের বিখ্যাত কবিতা ‘নববর্ষে’। কবিতাটি চিত্রা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত। এর রচনাকাল পয়লা বৈশাখ ১৩০১। প্রত্যক্ষভাবে বৈশাখের কথা উল্লেখ না করলেও মূলত বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে (বৈশাখের প্রথম দিন) কবির উপলব্ধি কী তা অভিব্যক্ত হয়েছে এভাবে: ‘আমি আজি ধূলিতলে এ জীর্ণ জীবন/ করিলাম নত।/ বন্ধু হও, শত্রু হও,/ যেখানে যে কেহ রও,/ ক্ষমা করো আজিকার মতো/ পুরাতন বর্ষের সাথে/ পুরাতন অপরাধ যত।’ কিন্তু নববর্ষের শুভলগ্নটি কবির কাছে আনন্দবেদনা মিশ্রিত: ‘এসো এসো নতুন দিবস/ ভরিলাম পুণ্য অশ্রুজলে/ আজিকার মঙ্গলকলস।’ 

রবীন্দ্রনাথের কল্পনা কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘বৈশাখ’ শিরোনামের কবিতাটি বেশ জনপ্রিয়। রচনাকাল ১৩০৬। বাংলা নববর্ষের অনুষ্ঠান এ কবিতাপাঠ ছাড়া যেন সম্পন্ন হয় না। বাংলা মাসগুলোর মধ্যে বৈশাখ মাসের যে স্বতন্ত্রতা রয়েছে তা এ কবিতা পাঠে সুস্পষ্ট হয়। বৈশাখ দিয়ে বাংলা নববর্ষের সূচনা। এ মাসটির বৈশিষ্ট্য নির্দেশ করে রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন: ‘হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।/ ধুলায় ধূসর রুক্ষ উড্ডীন পিঙ্গল জটাজাল,/ তপ্তঃক্লিষ্ট তপ্ত তনু, মুখে তুলি বিষাণ ভয়াল/ কারে দাও ডাক/ হে ভৈরব, হে রুদ্র বৈশাখ।’ বৈশাখ যে রুদ্র কালবৈশাখী নিয়ে আসে তার ভয়ংকর রুদ্ররূপ রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেন: ‘কী ভীষ্ম অদৃশ্য নৃত্যে মাতি উঠে মধ্যাহ্ন-আকাশে/ নিঃশব্দ প্রখর/ ছায়ামূর্তি তব অনুচর!’ কেবল তো ঝড়ঝঞ্ঝা নয়, বৈশাখের তীব্র দাবদাহও রয়েছে। কবি বৈশাখের মধ্যে প্রবল শক্তির উন্মত্ততাও প্রত্যক্ষ করেছেন এবং তাকে আবাহন করছেন: ‘দুঃখ সুখ আশা ও নৈরাশ/ তোমার ফুৎকারক্ষুব্ধ ধুলা-সম উড়ুক গগনে...।’ বৈশাখের শুধু শক্তিমত্ততা প্রত্যক্ষণ নয়, কবির প্রত্যাশা: ‘হে বৈরাগী করো শান্তি পাঠ/ উদার উদাস কণ্ঠ যাক ছুটে দক্ষিণে ও বামে,/... পূর্ণ করি মাঠ।/ হে বৈরাগী করো শান্তি পাঠ।’

বৈশাখ কেবল ‘ভৈরব’ ও ‘রুদ্র’ রূপের জন্য কবির কাছে আগ্রহের মাস নয়। এ মাসেই তার জন্মের শুভক্ষণ। তাই পঁচিশে বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যেমন কবিতা লিখেছেন তেমনি অবিস্মরণীয় গানও রচনা করেন। কবিতাটি পূরবী কাব্যের অন্তর্ভুক্ত ‘পঁচিশে বৈশাখ’ (রচনা ২৫ বৈশাখ ১৩২৯)। জন্মদিন নিয়ে কবির উচ্ছ্বাস-আনন্দ এবং কৌতূহল: ‘রাত্রি হল ভোর।/ আজি মোর/ জন্মের স্মরণপূর্ণ বাণী,/ প্রভাতের রৌদ্রে-লেখা লিপিখানি/ হাতে করে আনি/ দ্বারে আসি দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।’  কবি উপলব্ধি করেন তার জন্ম দিবসটি ‘নানা বেশে ফিরে আসে ধরণীর পরে’। তাই দিবসটির একটিমাত্র তাৎপর্য নয়। প্রতি বছর ফিরে আসা ‘পঁচিশে বৈশাখ’ চির এক নতুনকে নিয়ে এসে কবির জন্মদিনকে ভিন্নতর তাৎপর্য দেয়। তিনি লক্ষ করেন: ‘এই দিন এলো আজ প্রাতে/ যে অনন্ত সমুদ্রের শঙ্খ নিয়ে হাতে,/ তাহার নির্ঘোষ বাজে/ ঘন ঘন মোর বক্ষোমাঝে।/ জন্ম-মরণের দিগ্বলয়-চক্ররেখা জীবনেরে দিয়েছিল ঘের,/ সে আজি মিলাল।’ জন্ম-মৃত্যুর অনিবার্যতা জীবনকে রুদ্ধ করেছিল- তা নতুন জন্মদিনের কাছে পরাভূত হলো। আর তখন নতুন এক পঁচিশে বৈশাখ ‘শুভ্র আলো/ কালের বাঁশরি হতে উচ্ছ্বসি যেন রে/ শূন্য দিল ভরে।’ প্রতিবার পঁচিশে বৈশাখ কবির কাছে ফিরে এসে কেবল তার শূন্যতা দূর করে তা নয়, পূর্ণতাও দান করে ‘শুভ্র আলো’ দিয়ে। জন্মদিনে কবির উপলব্ধি: ‘আলোকের অসীম সঙ্গীতে/ চিত্ত মোর ঝংকারিছে সুরে সুরে রণিত তন্ত্রীতে।’

বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথ বেশকিছু গানও রচনা করেছেন। সবচেয়ে জনপ্রিয় গানটি হলো: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো।’ বৈশাখকে আবাহন করে এ গান রচনা করেন ২০ ফাল্গুন ১৩৩৩ শান্তিনিকেতনে। মূলত শান্তিনিকেতনে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই কবি ঋতুভিত্তিক আনুষ্ঠানিক-সংগীত রচনা শুরু করেন। সারা বছরজুড়ে শান্তিনিকেতনে ঋতুভিত্তিক উৎসবের সূচনা হয়। এর মধ্যে নববর্ষবরণ, বর্ষামঙ্গল, পৌষ মেলা ও উৎসব, শারদোৎসব এবং বসন্ত উৎসব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বৃক্ষরোপণ ও হলকর্ষণ উৎসব এবং কবির জন্মদিন উপলক্ষে পঁচিশে বৈশাখ উদ্‌যাপনও ছিল। ঋতু-অনুষ্ঠানের জন্যই রবীন্দ্রনাথ বৈশাখ নিয়ে কিছু গান রচনা করেন। ‘এসো হে বৈশাখ’ গানে বৈশাখকে মঙ্গলসূচক বার্তা নিয়ে আসার আহ্বান কবির: ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো/ তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।’ বৈশাখের যে রুদ্রতা, রুক্ষতা এবং শক্তির উগ্রতা- তার মধ্যেও কবি কল্যাণ লক্ষ করেন: ‘মুছে যাক গ্লানি, ঘুচে যাক জ্বরা,/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ বৈশাখ প্রলয়ের শাঁখ বাজিয়ে জীবনের ‘মায়ার কুজ্ঝটিজাল’কে ছিন্ন করবে- তবেই তো আসবে জীবনে নতুন ও শুভ বার্তা।

বৈশাখ নিয়ে রবীন্দ্রনাথের আরও কয়েকটি গান যেমন: ‘ওই বুঝি কালবৈশাখী’, ‘বৈশাখ হে মৌনী তাপস কোন অতলের বাণী’, ‘নমো নমো হে বৈরাগী’, ‘হৃদয় আমার, ওই বুঝি তোর বৈশাখী ঝড় আসে’, ‘বৈশাখের এই ভোরের হাওয়া আসে মৃদুমন্দ’, ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে’ ইত্যাদি। এ ছাড়া বৈশাখ বা গ্রীষ্ম ঋতুর বিশেষত্ব নিয়ে কিছু গান রচিত হয়েছে; এতে বৈশাখের প্রখরতা, শুষ্কতা, ‘দুঃসহ তাপ বহ্নি’, ‘রুদ্রবাণী’ ইত্যাদি প্রকাশ পেয়েছে। ‘চক্ষে আমার তৃষ্ণা ওগো, তৃষ্ণা আমার বক্ষ জুড়ে’ গানটিতে কবি নিজেকে ‘বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন’-এর সঙ্গে উপমায়িত করেন। এরকম আরেকটি গান: ‘প্রখর তপনতাপে, আকাশ তৃষায় কাঁপে, বায়ু করে হাহাকার।’ প্রকৃতির মধ্যে আকাশের তৃষ্ণা, বায়ুর হাহাকার ইত্যাদি বিদ্যমান। কিন্তু এই তৃষ্ণা ও হাহাকার কবির নিজেরই- তা তিনি প্রকৃতির সঙ্গে মিলিয়ে তবেই উপলব্ধি করতে পারেন।

রবীন্দ্রনাথ যেমনটি নিজের জন্মদিন ‘পঁচিশে বৈশাখ’ উপলক্ষে কবিতা রচনা করেন, তেমনই নিজের জন্মদিনের গানও লিখেছেন। বিখ্যাত গানটি: ‘হে নূতন,/ দেখা দিক আর-বার জন্মের প্রথম শুভক্ষণ।’ কবির মৃত্যুর কয়েক মাস আগে ২৩ বৈশাখ ১৩৪৮-এ গানটি রচিত। তার জীবদ্দশায় শেষ জন্মদিনে গানটি গাওয়া হয়। দেশ-বিদেশে উদ্‌যাপিত রবীন্দ্রনাথের জন্মদিন এ গান ছাড়া সম্পূর্ণতা পায় না। এ গানের অবিস্মরণীয় ভাবৈশ্বর্য লক্ষণীয়। নিজের জন্মদিনের প্রসঙ্গ গানটিতে উল্লেখ থাকলেও তা রচনাকৌশলের কারণে ব্যক্তি প্রসঙ্গ ছাপিয়ে নৈর্ব্যক্তিক হয়ে উঠেছে: ‘ব্যক্ত হোক জীবনের জয়/ ব্যক্ত হোক তোমামাঝে অসীমের চিরবিস্ময়।... চির নূতনেরে দিল ডাক/ পঁচিশে বৈশাখ।’ এ গানে প্রতিটি মানবশিশুর জন্মকে স্বাগত জানানো হয়েছে। এভাবে সসীম জীবনের মধ্যে অসীমের প্রকাশঘটান কবি। নিজের জন্মদিনের শুভক্ষণের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ প্রতিটি মানবশিশুর জন্মের চির নতুনত্ব খুঁজে পেয়েছেন। 

রবীন্দ্রনাথ বাংলার ষড়ঋতু ও বারো মাসের অনুষঙ্গ নিয়ে কিছু না কিছু লিখেছেন। সঙ্গত কারণেই বৈশাখ নিয়েও কবির সবিশেষ কৌতূহল ছিল। মানবচরিত্র এবং মানস গঠনে প্রকৃতি-প্রতিবেশ ও পরিবেশের ভূমিকা প্রশ্নাতীত। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রতিবেশ ও পরিবেশের যে পরিবর্তন ঘটে তার প্রভাব কোনো সংবেদনশীল মানুষ এড়িয়ে যেতে পারে না। রবীন্দ্রনাথও তা এড়াতে পারেননি। আমরা তার বিবিধ রচনায় প্রতিবেশ-পরিবেশের অনুষঙ্গে নানা তাৎপর্যে ঋতুকথন লক্ষ করি। তেমনি ‘বৃষ্টিবিহীন বৈশাখী দিন’ অথবা ‘বৈশাখ হে মৌন তাপস’ এমন শিল্পিত করে বৈশাখ-বন্দনা আমাদের প্রকৃতির আরও নৈকট্যে নিয়ে যায়।

লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া