অন্তর্বর্তী সরকার পার করল এক বছর। তবে শিক্ষায় এখনো ক্ষত রয়ে গেছে। অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে শিক্ষা খাতে অস্থিরতা ছিল, যার মূল কারণ ছিল বিভিন্ন দাবি ও আন্দোলন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমদিকে ছিল চরম অস্থিরতা। পরীক্ষায় অটোপাসের দাবিতে নেমেছিল পরীক্ষার্থীরা। বন্যা পরিস্থিতিও শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একাধিক বিষয়ে সংস্কার কমিশন গঠন করা হলেও শিক্ষাকে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। সব মিলিয়ে শিক্ষায় বড় ঘাটতি আছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) অধ্যাপক ড. এস এম হাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিক্ষায় আসলে সবচেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রেজিমের ট্রান্সজিশনের প্রভাব (শাসনব্যবস্থার রূপান্তর) সামাল দিতে হয়েছে। আগের শাসনের প্রভাব হিসেবে অনেকের প্রমোশন না হওয়াসহ নানা ইস্যু দেখতে হয়েছে। এগুলো সামলানো একটা বড় কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদের আচরণেও পরিবর্তন এসেছে। এটাকে এক ধরনের সফলতা বলা যায়, একটা নিয়ন্ত্রিত পদ্ধতিতে এ ইস্যুগুলোর মোকাবিলা করতে পেরেছে। সবাই মনে করছে ১৫ বছরে আমার কিছু হয়নি। এখনই সময়। এসব বিষয় নিয়ে প্রচুর সময় দিতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘কারিকুলাম নিয়ে একটা বিতর্ক ছিল। সেটি স্থগিত করা ভালো সিদ্ধান্ত ছিল। পাশাপাশি আমাদের কারিকুলাম নিয়ে কাজ করতে হবে। আমার ব্যক্তিগত মতামত হচ্ছে, নির্বাচনের পরে নতুন সরকার এলে কারিকুলামে একটা প্রভাব পড়বে। সেই জায়গা থেকে অন্তর্বর্তী সরকার হয়তো বড় পরিবর্তনে যায়নি।’
অন্তর্বর্তী সরকারে শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন অধ্যাপক ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ। সচিবালয়ে প্রথম সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নযোগ্য নয় বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। যত দূর পারি আমরা আগের শিক্ষাক্রমে ফিরে যাব। কিন্তু এমনভাবে যাব, যেন শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় কোনো অস্বস্তি না হয়।’
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় নতুন শিক্ষাক্রম চালু করা হয়। তবে চালুর আগে প্রস্তুতির ঘাটতি ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন ছিল সব মহলে। তাই শিক্ষার্থী, অভিভাবকদের একটি অংশ এটি বাতিলের দাবিও জানিয়ে আসছিলেন। দায়িত্ব নিয়েই শিক্ষাক্রম বাতিল না করলেও বার্ষিক মূল্যায়নে পরিবর্তন আনা হয়। অন্যদিকে জুলাইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে চলমান এইচএসসি পরীক্ষার বেশ কয়েকটি বিষয়ের পরীক্ষা স্থগিত করা হয়। এরই মধ্যে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে। পরীক্ষার বিষয়ে নানা মতও আসতে থাকে। ১৫ আগস্ট শিক্ষা বোর্ড ১১ সেপ্টেম্বর থেকে স্থগিত পরীক্ষার সময়সূচি প্রকাশ করে। কিন্তু ২০ আগস্ট পরীক্ষা বাতিলের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে একদল পরীক্ষার্থী। তারা পুলিশি বাধা উপেক্ষা করে সচিবালয়ে প্রবেশ করে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দিতে গিয়ে এক ধরনের জিম্মি করার পরিবেশ তৈরি করে। শিক্ষা উপদেষ্টা অবশিষ্ট পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করতে বাধ্য হন। ২০২৪ সালে এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছিল সাড়ে ১৪ লাখ। তার মধ্যে গুটিকয়েক পরীক্ষার্থীর আন্দোলনে পরীক্ষা বাতিলের ঘোষণাটি ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। সিলেট বোর্ডে মাত্র চারটি এবং অন্যান্য বোর্ডে মাত্র ছয়টি বিষয়ের পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। সাবজেক্ট ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে ফল প্রস্তুত করা হয়। এতে তৈরি হয় শিখন ঘাটতি। শুধু তাই নয়, ১৫ অক্টোবর ফল প্রকাশের পরে ফেল করা শিক্ষার্থীরা পাসের দাবিতে সচিবালয়ে আবারও অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করে। এর আগে তারা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে ৮ ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখে। এই অবাস্তব দাবি দেখা যায়, পরবর্তী সময়ে এসএসসিতে ফেল করা শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রেও। শিক্ষার্থীদের মধ্যে এ ধরনের অন্যায় প্রবণতা তৈরি হওয়াকে অশনি সংকেত বলছেন শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। তবে সর্বশেষ প্রকাশিত এসএসসির ফলকে প্রকৃত চিত্র বলছেন শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা। সেই ফলাফলে ১৬ বছরের আগের ধারা লক্ষ করা গেছে।
বিগত সময়ে ফ্যাসিবাদের সহযোগী ইস্যুকে কেন্দ্র করে উত্তাল ছিল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। জুলাই আন্দোলনের বিপক্ষে ভূমিকা রাখা শিক্ষকদের বয়কট করেন শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনের শীর্ষ পদধারীদের পদত্যাগে বাধ্য করার ঘটনাও ঘটে। ছাত্ররাজনীতি ইস্যু নিয়েও টালমাটাল অবস্থা। অতীতে ছাত্রলীগের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে (বর্তমানে নিষিদ্ধ) অতিষ্ঠ হয়ে অনেকে ক্যাম্পাসে ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি তোলেন। তবে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীরা ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের চেয়ে লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানান। এরই মধ্যে গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদ গঠন ও ছাত্রশিবিরের আত্মপ্রকাশে পাল্টে যায় ছাত্ররাজনীতি নিয়ে এসব দাবি-দাওয়া। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের বড় অংশই ছাত্ররাজনীতির নামে জোর করে কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের বিপক্ষে।
অন্যদিকে কলেজকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের দাবিতে আন্দোলনে বেশ কিছু দিন জিম্মিদশায় ছিল ঢাকাবাসী। সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা আলাদা বিশ্ববিদ্যালয় আবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অধিভুক্ত সাত কলেজ সমন্বিত বিশ্ববিদ্যালয়ের দাবি নিয়ে সরব ছিল। তবে সরকার একটা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছে। কারিগরি শিক্ষার্থীরাও আন্দোলন করে। কুয়েটসহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে। বিভিন্ন আন্দোলনের কারণে শিক্ষার্থীদের মনোজগতেও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।
তবে সরকার পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে অধিকতর যোগ্য লোকদের নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা করে। সম্প্রতি সিভি আহ্বান করে কুয়েটে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও আন্দোলনে ছিল। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের বেতন গ্রেডে পরিবর্তন আনা হয়েছে।
অন্যদিকে নতুন বছরে পাঠ্যবই পরিমার্জন করা হয়। ২০১২ সালের সৃজনশীল পদ্ধতির বই দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের। তবে নির্ধারিত সময়ে সব বই পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। চলতি বছরের মার্চে শিক্ষা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব নেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক সি আর আবরার।
আর শিক্ষায় সংস্কার কমিশন না হওয়াটা নিয়ে আলোচনা ছিল সর্বত্র। সবাই ধারণা করেছিলেন, অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষায় বড় সংস্কার করবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইআর) সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. ছিদ্দিকুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিক্ষা নিয়েই তো প্রথম সংস্কার কমিশন হওয়া উচিত। যত কমিশনই হোক, মানুষ যদি সুশিক্ষিত না হয় কোনো সিস্টেমে কাজ হবে না।’