দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের সুন্দরবনসংলগ্ন অঞ্চলে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা আর বাঘের ভয়কে সঙ্গী করে প্রতিদিন লড়াই করছেন হাজারও নারী। সংসারের হাল ধরতে জীবিকার সন্ধানে তারা নদীতে, খালে, বিলে বা সুন্দরবনের গভীরে নামেন।
শ্যামনগরের ভেটখালী গ্রামের কল্পনা ধীবরের জীবন সংগ্রামের সেই করুণ প্রতিচ্ছবি। ২০১৭ সালে সুন্দরবনের নদীতে কাঁকড়া ধরতে গিয়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারান তার স্বামী মৃণাল রাজবংশী। একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষকে হারিয়ে তিন কন্যাসন্তান নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েন তিনি। এরপর ভয় উপেক্ষা করে নিজেই নদীতে নেমে মাছ-কাঁকড়া ধরতে শুরু করেন। সেই আয়েই একে একে দুই মেয়ের বিয়ে দেন। ২০২৪ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ছোট মেয়ে সীমাকেও বিয়ে দিয়েছেন। কল্পনা বলেন, ‘বাঘে স্বামীকে নেওয়ার পর আর কোনো ভরসা ছিল না। তবু লড়াই করে বেঁচে আছি–শুধু চাই, আর কোনো মা যেন এভাবে অসহায় না হয়।’
শ্যামনগরের রমজাননগর ইউনিয়নের কালীঞ্চি গ্রামের আছিয়া খাতুনও অনুরূপ সংগ্রামে জড়িয়ে আছেন। এক বছরের শিশুপুত্রকে কোলে নিয়ে প্রথম স্বামীর পরিত্যক্ত হন, পরে দ্বিতীয় বিয়েও স্থায়ী হয়নি। বাধ্য হয়ে দিনমজুরি শুরু করেন। বর্তমানে তিনি সুন্দরবনসংলগ্ন মালঞ্চ নদীতে বাগদা চিংড়ির পোনা ধরে সংসার চালান। তার কথায়, ‘নিজের কষ্ট হলেও ছেলেমেয়েদের কষ্ট দিইনি।’
মুন্সীগঞ্জ জেলেপাড়ার ৪৫ বছর বয়সী বাঘ-বিধবা বুলি দাশীর জীবনও একই সংগ্রামের গল্প বলেন। ২০০২ সালে বাঘের কবলে পড়ে স্বামীর মৃত্যুর পর শ্বশুরবাড়ি থেকে তাকে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে সরকারি জায়গায় ঠাঁই হয়। ওড়না কোমরে গুঁজে, বৈঠা হাতে কাঁকড়ার ফাঁদ নিয়ে সুন্দরবনের পথে যাত্রা শুরু করেন। তিনি বলেন, ‘বাঘে খেয়েছে স্বামীকে, আর এর দায় আমার ওপরেই চাপিয়ে দিল শাশুড়ি, বাড়ি থেকেও তাড়িয়ে দেয়। এরপর ভাইয়ের বাড়িতে জায়গা পেলাম ঠিকই, কিন্তু সেখানে থাকাও ছিল যন্ত্রণার। ভাইয়ের বউয়ের চোখ টানাটানিতে শেষ পর্যন্ত ঠাঁই হয় মুন্সীগঞ্জ জেলেপাড়ায় সরকারি জায়গায়। পরে নদীতে রেণুপোনা ধরেই সন্তানদের বড় করছি।’
শাহানারা বেগম (৫৫) আটুলিয়া ইউনিয়নের বিড়ালক্ষ্মী এলাকার একজন সংগ্রামী নারী। প্রতিদিন খোলপেটুয়া নদীতে নেমে চিংড়ির পোনা ধরেন। স্বামী বহু বছর আগে ছেড়ে যাওয়ার পর দিনমজুরি ও নদীর আয়েই তিন মেয়েকে বড় করে বিয়ে দিয়েছেন। এখনো পরিবারের তিন সদস্য তার ওপর নির্ভরশীল। হাঁটুর ব্যথা ও হাঁপানিতে ভুগলেও থামার সুযোগ নেই। নাতনির পড়াশোনার খরচ জোগাতে প্রায়ই ঋণ নিতে হয় তাকে।
এই গল্পগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সুন্দরবনসংলগ্ন উপকূলীয় অঞ্চলের অধিকাংশ নারীই নদী-খালে মাছ-কাঁকড়া ধরা বা চিংড়ির ঘেরে কাজের সঙ্গে যুক্ত। ভোরের আলো ফোটার আগেই তারা নদীতে নামেন, কোমরসমান লবণাক্ত পানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজ করেন। ঝুঁকি, দারিদ্র্য, শারীরিক যন্ত্রণা ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যেও এই নারীরা প্রতিদিন টিকে থাকার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন, যা উপকূলীয় নারীদের বাস্তবতার এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি।
‘দাঁতিনাখালী বনজীবী নারী উন্নয়ন সংগঠন’ নামের স্থানীয় এক নারী সংগঠনের পরিচালক শেফালী বিবি বলেন, ‘উপকূলের নারীরা প্রতিদিন বিপদ-ঝুঁকি সত্ত্বেও সংসার চালানোর জন্য নদী-খালে নামেন। তাদের সাহস ও দৃঢ় সংকল্প আমাদের সমাজের জীবন্ত উদাহরণ। আমরা চাই, তাদের পাশে দাঁড়িয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বিকল্প আয়মুখী কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো হোক।’
নদী-খালে জীবনযুদ্ধে সীমাবদ্ধ নয় এই নারীদের সম্ভাবনা। মুন্সীগঞ্জ ইউনিয়নের মীরণাং গ্রামের অনিতা রানী (৫৫) ও তার স্বামী বিজয় মণ্ডল (৭২) দীর্ঘদিন কাঁকড়া ধরেই সংসার চালাতেন। নিজস্ব নৌকা না থাকায় আয়ের একটি অংশ নৌকার মালিককে দিতে হতো, ফলে আর্থিক উন্নতি হচ্ছিল না। ২০২২ সালে স্থানীয় একটি এনজিওর সহায়তায় অনিতা রানী একটি নৌকা, একটি ছাগল, হাঁস-মুরগি, সবজির বীজ ও গাছের চারা পান। নিরাপদ পানির জন্য ১ হাজার লিটারের ট্যাংকও দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তিনি বিকল্প আয়ের কার্যক্রমে যুক্ত হন। ফলে তিনি ছাগল পালন, হাঁস-মুরগি পালন ও সবজি চাষ করে আয় বাড়াতে সক্ষম হন। ইতোমধ্যে ছাগল বিক্রি করে ৬০ হাজার, সবজি বিক্রি করে ৭০ হাজার এবং হাঁস-মুরগি বিক্রি করে ১৫ হাজার টাকা আয় করেছেন। বর্তমানে তার ঘরে চারটি ছাগল, সাতটি হাঁস-মুরগি ও একটি নৌকা রয়েছে, যা পরিবারের সম্পদের উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি ঘটিয়েছে।
অনিতা রানী বলেন, ‘আগে সুন্দরবনে কাঁকড়া ধরেই সংসার চালাতাম। এখন ছাগল, হাঁস-মুরগি ও সবজি চাষের মাধ্যমে আয় বাড়ছে। সহায়তার ফলে জীবনে নতুন সম্ভাবনা এসেছে।’
এ বিষয়ে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান বারসিকের সহযোগী আঞ্চলিক সমন্বয়কারী রামকৃষ্ণ জোয়ারদার বলেন, ‘অনিতা রানীর মতো নারীরা যখন নৌকা, ছাগল ও প্রশিক্ষণ পেয়ে আয়ের বিকল্প পদ্ধতি শিখছেন, তখন আমরা দেখি কেবল তাদের জীবনযাত্রাই পরিবর্তিত হচ্ছে না, বরং পুরো পরিবার ও কমিউনিটিতেই ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে। আমাদের লক্ষ্য–এই ধরনের সহায়তা আরও বেশি নারীর কাছে পৌঁছে দেওয়া।’