ঢাকা ১১ বৈশাখ ১৪৩১, বুধবার, ২৪ এপ্রিল ২০২৪
Khaborer Kagoj

দিনাজপুরের দর্শনীয় স্থান

প্রকাশ: ০৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ০১:১৫ পিএম
দিনাজপুরের দর্শনীয় স্থান
কান্তজীর মন্দির

উত্তরাঞ্চলের প্রাচীন জনপদ দিনাজপুর। ঐতিহাসিকদের মতে, দিনাজপুর রাজ পরিবারের প্রতিষ্ঠাতা জনৈক ‘দিনাজ’ অথবা ‘দিনারাজ’-এর নামানুসারে এ জনপদের নামকরণ করা হয়। তার নামানুসারেই রাজবাড়িতে অবস্থিত মৌজার নাম হয় দিনাজপুর। পরবর্তীতে ব্রিটিশ শাসকরা ঘোড়াঘাট সরকার বাতিল করে নতুন জেলা গঠন করেন এবং রাজার সম্মানে জেলার নামকরণ করেন ‘দিনাজপুর’। কৃষিসমৃদ্ধ এই জেলায় রয়েছে ঘুরে দেখার অনেক সুন্দর সুন্দর স্থান। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে রামসাগর, স্বপ্নপূরী, কান্তজীর মন্দির। 

দিনাজপুর রাজবাড়ি

শহরের উত্তর-পুবে রাজারামপুর গ্রামের কাছে রাজবাটিকা এলাকায় অবস্থিত এই দর্শনীয় স্থানটি। রাজবাড়ি বলা হলেও ঐতিহাসিক পটভূমি অনুসারে এটি আসলে একটি জমিদারবাড়ি। দিনাজপুর জেলার ঐতিহ্য ও সমৃদ্ধির প্রতিনিধি বলতেই বোঝানো হয় এই রাজবাড়িকে। তাই সর্বসাকল্যে ভবনের অবস্থা বেশ নাজুক থাকা সত্ত্বেও ইতিহাসপ্রেমীরা বেশ আগ্রহ নিয়ে ঘুরতে আসেন রাজবাড়ি। এখানকার ইতিহাসসমৃদ্ধ ভবন ও জায়গাগুলোর মধ্যে রয়েছে কুমার মহল, আয়না মহল, রানি মহল, লক্ষ্মীর ঘর, আটচালা ঘর, ঠাকুরঘর, কালিয়া জিউমন্দির, আতুরঘর, রানী পুকুর ও চম্পাতলা দিঘি। 

শহর থেকে যেকোনো স্থানীয় গাড়িতে করে ঘুরে আসা যায় রাজবাড়ি। শহর থেকে সর্বোচ্চ ২০ টাকা দিয়ে ইজিবাইক নিয়ে যাওয়া যায় এই দর্শনীয় স্থানে। 

রামসাগর দিঘি

বাংলাদেশের বৃহত্তম দিঘি হিসেবে পরিচিত এই জলাশয়টি মূলত একটি কৃত্রিম দিঘি। পলাশী বিপ্লবের কিছু আগে রাজা রামনাথ রাজ্যের পানির চাহিদা মেটাতে খনন করেছিলেন এই দিঘি। রাজার নামানুসারেই দিঘিটি পরবর্তীতে পরিচিতি পায়। বর্তমানে এটি দিনাজপুর পর্যটন বিভাগের দায়িত্বে আছে।

প্রায় ৪ লাখ ৩৭ হাজার ৪৯২ বর্গমিটার ক্ষেত্রফল এবং ১০ মিটার গভীরতার এই দিঘির আশপাশ বিকালে ঘুরে বেড়ানোর জন্য দারুণ জায়গা। এখানে সাঁতার কাটারও ব্যবস্থা আছে। পূর্ণিমার সময় ক্যাম্পিংয়ের জন্য রামসাগর এখন জনপ্রিয় স্থান।

শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে অটোরিকশা ভাড়া নিয়ে রামসাগর জাতীয় উদ্যানে যেতে ৩০ থেকে ৪০ মিনিট লাগতে পারে। শহর থেকে ইজিবাইকে প্রতিজন ৪০ টাকা ভাড়ায় যাওয়া যাবে। 

কান্তজীর মন্দির

বাংলাদেশের এই বিখ্যাত স্থাপনাটি নির্মিত হয়েছিল ১৮ শতকে, যার আরও একটি নাম নবরত্ন মন্দির। ঢেপা নদীর তীরে কান্তনগর গ্রামের অবস্থান। মন্দিরের শিলালিপি অনুসারে মহারাজা প্রাণনাথ রায় মন্দিরের কাজ শুরু করেছিলেন। ১৭২২ সালে তিনি মারা যাওয়ার পর তার ছেলে মহারাজা রামনাথ রায় ১৭৫২ সালে এর নির্মাণকাজ শেষ করেন।

প্রথমে মন্দিরটির উচ্চতা ছিল ৭০ ফুট। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ক্ষতির কারণে এটি কিছুটা দেবে যায়, ফলে এখন এর উচ্চতা ৫০ ফুট। মহাভারত, রামায়ণ ও অন্যান্য পৌরাণিক কাহিনিগুলো মন্দিরের বাইরের দেয়ালে প্রায় ১৫ হাজার বর্গাকার পোড়ামাটির ফলকে চিত্রিত করা। 

দিনাজপুর শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দক্ষিণ-পুবে অটোরিকশায় করে পৌঁছানো যায় কান্তজীর মন্দিরে।

নয়াবাদ মসজিদ

দিনাজপুর জেলার এই অনন্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটি নির্মিত হয়েছে ১৭৯৩ সালে সম্রাট দ্বিতীয় শাহ আলমের শাসনামলে। সে সময় অনেকগুলো টেরাকোটায় কারুকার্যমণ্ডিত করে বানালেও এখন তার মাত্র ১০৪টি অবশিষ্ট রয়েছে। এগুলোর অধিকাংশই আবার সম্পূর্ণ অক্ষত নয়।

স্থানীয়দের মতে, ১৮ শতকের মাঝামাঝিতে কান্তজীর মন্দির নির্মাণের সময় পশ্চিমের কোনো এক দেশ থেকে আগত মুসলমান স্থপতিরা বসবাস করতে শুরু করেন এই নয়াবাদ গ্রামে। তারাই পরবর্তীতে নিজেদের ব্যবহারের জন্য গড়ে তুলেছেন এই মসজিদটি।

প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে ঘুরে আসুন সুরঞ্জনা-শুভসন্ধ্যায়

প্রকাশ: ১৩ এপ্রিল ২০২৪, ১১:৫২ এএম
প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে ঘুরে আসুন সুরঞ্জনা-শুভসন্ধ্যায়
সুরঞ্জনা ইকোপার্ক

ঘুরতে পছন্দ করে না এমন মানুষ খুব কমই আছে। আর ঈদ এলে তো কথাই নেই। নতুন নতুন জায়গায় ঘুরতে অনেকের পরিকল্পনার শেষ নেই। এই পরিকল্পনা যদি কোলাহলমুক্ত সবুজে ঘেরা কোনো প্রকৃতি, নদী কিংবা স্নিগ্ধ বালুময় সমুদ্রের তীরে অবকাশ যাপনের জন্য না করা যায় তাহলে যেন তৃপ্তি নেই! এবার এমনি দুটি স্থান শুভসন্ধ্যা ও সুরঞ্জনা ভ্রমণের পরিকল্পনা করতে পারেন এবারের ঈদে। 

শুভসন্ধ্যা

বাংলাদেশের সর্ব দক্ষিণের উপকূলীয় বরগুনা জেলার প্রধান তিনটি নদী- পায়রা, বিষখালী ও বলেশ্বরের জল মোহনার সাগরে মিশে যাওয়ার স্নিগ্ধ বেলাভূমির বালুচর শুভসন্ধ্যা। যার একদিকে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট সুন্দরবন অপরদিকে সীমাহীন বঙ্গোপসাগর। 

সাগরঘেঁষা নয়নাভিরাম এই সৈকতটি তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের নলবুনিয়া এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় স্থানীয়দের কাছে এটি নলবুনিয়া চর নামে পরিচিত। এ চরের বনাঞ্চল প্রায় ১০ কিলোমিটার। 

২০০৬ সালে ৫৮ হেক্টর জমিতে এখানে নন ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল গড়ে তোলে বন বিভাগ। ঝাউগাছ, খইয়্যা বাবলা, মাউন্ট, আকাশমনি, অর্জুন, কালি বাবলা, কড়ই, খয়ের ও বাদামসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রয়েছে এখানে। 

বিস্তীর্ণ বেলাভূমির এই বনাঞ্চলের সাগর প্রান্তে দাঁড়িয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দুটোই উপভোগ করা যায়।

সুরঞ্জনা

ইকোট্যুরিজমের উন্নয়নের লক্ষে সম্প্রতি বরগুনা সদর উপজেলার ঢলুয়া ইউনিয়নের বরইতলা সংলগ্ন বিষখালী ও খাকদোন নদীর মোহনায় গড়ে তোলা হয়েছে সুরঞ্জনা নামে একটি ইকোপার্ক। ভ্রমণপিপাসু বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষ কমবেশি প্রতিদিনই এখানে বেড়াতে আসেন।

এখানে রয়েছে প্রাণ-প্রকৃতির অবাধ বিচরণ। ছৈলা, গোলপাতা, কেওড়াসহ নানা ধরনের বনজ বৃক্ষে ঘেরা  দৃষ্টিনন্দন এই ইকোপার্কের মাঝখানে বসানো হয়েছে বিশালাকারের কুমির ও কাঁকড়ার অবয়ব।

বাঘ, সিংহ, হরিণ, বক, জিরাফসহ বেশকিছু জীবজন্তুর অবয়বও বয়েছে এখানে। 

এ ছাড়াও এখানকার জল ও স্থলে পাখি, বেজি, শিয়াল, কাঁঠবিড়ালি, গুইসাপ, কাকড়া, গিরগিটিসহ নানা প্রাণির দেখা মিলবে। 

যেভাবে যাবেন-

পর্যটকরা সাধারণত নৌ ও স্থলপথেই বরগুনা আসেন। ঢাকা থেকে বিকেল ৫টায় বরগুনার উদ্দেশে লঞ্চ ছেড়ে যায়। এ ছাড়া গাবতলী ও সায়েদাবাদ থেকে আসা যাবে বাসেও। সকাল ৮টার মধ্যে লঞ্চ বরগুনা পৌঁছাবে। আর পদ্মা সেতু হয়ে বাসে লাগবে মাত্র ৬ ঘন্টা।  

বরগুনা শহরে স্বল্প খরচে আবাসিক হোটেল, ডাকবাংলো, এনজিওর রেস্টহাউস পাওয়া যায়। তাই বরগুনা পৌর শহরে পৌঁছে যেকোনো একটিতে রুম নিয়ে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে পড়ুন ভ্রমণের উদ্দেশ্যে। 

প্রথমেই বরগুনা পৌরসভার সামনে থেকে আটোরিকশা রিজার্ভ করে কিংবা মোটরসাইকেল ভাড়া নিয়ে চলে যাবেন কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য সুরঞ্জনা ইকোপার্কে। 

সুরঞ্জনায় ঘোরাঘুরির পর শুভসন্ধ্যায় যেতে প্রথমে তালতলীর উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাওয়া যানবাহন ও ট্রলারে যাবেন তালতলী সদরে। সেখান থেকে ভ্যান, রিকশা বা মোটরসাইকেল ভাড়া নিয়ে সোজা কাঙ্খিত শুভসন্ধ্যায়। 

বরগুনায় রাত কাটানোর পরদিন বিকেল ৩টার লঞ্চে কিংবা সন্ধ্যা বা রাতে বাসে ফিরতে পারবেন ঢাকায়। 

মহিউদ্দিন অপু/ইসরাত চৈতী/অমিয়/

ঈদে দর্শনার্থীদের জন্য প্রস্তুত নওগাঁর বিনোদন কেন্দ্রগুলো

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৪, ০৫:২৭ পিএম
ঈদে দর্শনার্থীদের জন্য প্রস্তুত নওগাঁর বিনোদন কেন্দ্রগুলো
নিয়ামতপুরের ঘুঘুডাঙা তালসড়ক। ছবি: খবরের কাগজ

সাজ সাজ রব নওগাঁর ঐতিহাসিক ও প্রকৃতিক নিদর্শন, যাদুঘর, দর্শনীয় ও বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে। জেলার পাহাড়পুরে অবস্থিত যাদুঘর ও ঐহিতাসিক সোমপুর বিহারের আঙ্গিনায় এবার ঈদের ছুটিতে প্রায় আড়াই লাখ মানুষের আগমন ঘটবে বলে আশা করছেন কর্তৃপক্ষ।

এছাড়া কুসুম্বা শাহি মসজিদ, আলতাদিঘি শালবন, পতিসর বরীন্দ্র কাচারি বাড়ি, ঘুঘুডাঙা তাল সড়ক ও জবই বিলে প্রতিদিন লাখো দর্শনার্থীর আগম ঘটবে। বাড়তি চাপ সামাল দিতে প্রস্তুতি গ্রহনের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

পাহাড়পুর:
ধর্মীয় উৎসব বিশেষ করে ঈদ, দূর্গাপূজা এবং সরকারি ছুটির দিনে পাহাড়পুর যাদুঘর ও বৌদ্ধ বিহারে স্বভাবিকের চেয়ে কয়েকগুন দর্শনার্থী বাড়ে। ইতোপূর্বে ঈদুল ফিতরে সবচেয়ে বেশি মানুষের সমাগম দেখা গেছে। আশেপাশের এলাকার মানুষ ছাড়াও দেশের প্রায় সব প্রান্তের বিনোদনপ্রেমীরা ঈদে ছুটে আসেন বিহার ও যাদুঘরে। বিদেশি পর্যটকদের আগমনও বাড়ে। এ জন্য কর্তৃপক্ষকে আগে থেকেই বাড়তি প্রস্তুতি নিতে হয়।

ঈদ সামনে রেখে এবারও যাদুঘরের ভেতরের মূল্যবান ঐতিহাসিক নিদর্শনসমূহ নতুন করে সাজানো হচ্ছে। এছাড়া বিহার ও যাদুঘরের প্রতিটি স্থানে ধোয়া মোছা ও রঙয়ের প্রলেপ দেওয়া হয়েছে। রেস্টহাউস, ফুলের বাগান, পিকনিক ও পার্কিং এরিয়াগুলো আগের চেয়ে আরও গোছানো ও সৌন্দর্য বর্ধন করা হয়েছে। 

প্রত্নত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, এবার ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ১০ থেকে ১৪ তারিখ পর্যন্ত মোট চার দিন সরকারি ছুটি। কিন্তু ঈদের দিন থেকে অন্তত এক সপ্তাহ জুড়ে দর্শনার্থীর আগমনে মুখর থাকবে পাহাড়পুর। আগতদের বিনোদন নির্বিঘ্ন করতে কয়েক দফায় স্থানীয় বাসিন্দা বা অংশীজন, প্রশাসনের কর্মকর্তা, থানা পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ। 

যেহেতু দর্শনার্থীর উপচেপড়া ভিড় হবে তাই নিরাপত্তা জোরদার করতে যাদুঘরের পাশাপাশি বিহার অংশে নতুন করে আরও ৫০টি সিসি ক্যামেরা বসানো হয়েছে। প্রবেশপথগুলো ছাড়াও গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলো ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে। ক্যামেরার ভিডিও ফুটেজ সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ করা হবে। এছাড়া বিহারের প্রতিটি প্রান্তে নিরাপত্তাকর্মীরা আগতদের সহযোগিতা করতে প্রস্তুত থাকবে। 

কুসম্বা শাহি মসজিদ:
ঈদুল ফিতরের নামাজ আদায় করতে হাজারো মুসল্লি সকাল থেকেই ভিড় করেন মান্দা ঐতিহাসিক কুসম্বা শাহি মসজিদে। মসজিদের ভেতরে ও বাইরে মিলিয়ে নামাজ আদায় করা হয়। এখানে তিন থেকে চারটি জামাত অনুষ্ঠিত হয়। 

মুসল্লিরা জানান, প্রায় সাড়ে ৪০০ বছর আগে সুলতানি আমলে নির্মিত কুসুম্বা শাহি মসজিদ। ঈদের ছুটিতে ঐতিহাসিক এই মসজিদে নামাজ আদায় করতে এবং সৌন্দর্য দেখতে প্রতিদিন অন্তত পাঁচ থেকে সাত হাজার মানুষ আসেন। 

স্থানীয় সংসদ সদস্য ব্রুহানী সুলতান গামা বলেন, পাঁচ টাকার নোটে মুদ্রিত কুসুম্বা মসজিদে আগত দর্শনার্থীদের সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। নিরাপত্তা জোড়দার করতে এ বছর নতুন করে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের আনসার সদস্য, পুলিশ ও গ্রামপুলিশ নিয়োজিত রাখা হয়েছে। 

আলতাদিঘি শালবন:
নওগাঁর ধামইরহাট উপজেলায় অবস্থিত বিশাল আকৃতির ঐতিহাসিক দীঘি ও প্রাকৃতিক শালবন ঘিরে বিনোদনকেন্দ্র। সুযোগ পেলেই বিনোদন ও প্রকৃতিপ্রেমীরা ছুটে আসনে এই বন দেখতে। ঈদে মানুষের ভিড় বাড়বে অন্তত ১০ গুন। পাশের জয়পুরহাট, বগুড়া, গাইবান্ধাসহ বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষের আগম ঘটে আলতাদীঘি শালবনে। তাই বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। 

পতিসর:
নওগাঁর আত্রাই উপজেলার মনিয়ারী ইউনিয়নে অবস্থিত বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজস্ব জমিদারি কালী গ্রামের কাচারি বাড়ি পতিসর। এবার ঈদের কদিন পরেই ২৫ বৈশাখ কবির জন্মোৎসব। তাই এখন থেকেই দর্শনার্থীর সামাল দেওয়ার প্রস্ততি চলছে।

তাল সড়ক ও জবই বিল: 
জেলার নিয়ামতপুরের ঘুঘুডাঙা তালসড়ক ও সাপাহার উপজেলার জবই বিলে ঈদের ছুটিতে বিনোদনপ্রেমীদের উপচেপড়া ভিড় থাকে। দেশের নানা প্রান্তের মানুষ ছুটে আসেন বরেন্দ্র অঞ্চলের মুগ্ধতা ছড়ানো ঐতিহাসিক প্রকৃতিক ও দর্শনীয় স্থানগুলোতে। তাই ঈদের দিন ঘনিয়ে আসতেই সাজসাজ রব পড়েছে ওই এলাকাগুলোতে। 

প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের কর্মকর্তা পাহাড়পুর যাদুঘর ও বৌদ্ধ বিহারের কাস্টোডিয়ান ফজলুল হক আরজু খবরের কাগজকে জানান, আবহাওয়া ভাল থাকলে ঈদের দিন থেকেই কুসম্বা মসজিদে প্রচুর মানুষের আগমন ঘটবে। পাহাড়পুরে প্রতিদিন ৩০ থেকে ৩৫ হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটবে। সরকারি ছুটির দিনগুলোতে ভ্রমণপিপাসু ও বিনোদনপ্রেমীদের আগমনে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এসব স্থানে নিযোজিতদের দম ফেলার সময় থাকে না। সপ্তাহ খানেক পর থেকে ভিড় কমতে শুরু করে।

তিনি বলেন, ঈদের মৌসুমে এবার কুসুম্বা মসজিদ, পাহাড়পুর যাদুঘর, বিহার ও অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ দর্শনার্থীর আগম ঘটবে। আর শুধু পাহাড়পুর বিহারের আঙ্গিনাতেই ১৫ দিনে পা পড়বে অন্তত আড়াই লাখ দর্শনার্থীর।

তিনি আরও বলেন, দূরের ও বিদেশি পর্যটকদের জন্য কুসুম্বা মসজিদের পাশে একটি ও পাহাড়পুর বিহার এলাকায় নতুন করে আরও একটি রেস্টহাউস প্রস্তুত করা হয়েছে। ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলোর ইতিহাস ছড়িয়ে দিতে প্রত্ন নিদর্শন ও গবেষকদের লেখা, পত্রিকা, বই ও পুস্তিকা পাহাড়পুর যাদুঘরে সংরক্ষিত আছে। আগতরা বিহারের সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি সহজেই নিদর্শনগুলোর ঐতিহাসিক পটভূমি ও গুরুত্ব জানতে পারবেন। 

নওগাঁর পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রাশিদুল হক বলেন, নওগাঁ জেলা প্রাকৃতিক ও  প্রত্নতত্ত্বসম্পদে ভরপুর। মান্দা কুসুম্বা শাহি মসজিদ, পাহাড়পুর যাদুঘর ও সোমপুর বিহারসহ ঐতিহাসিক নিদর্শন ও বিনোদনকেন্দ্র এলাকাগুলোতে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। ঈদের আগে থেকেই পোশাকধারী থানা পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। সড়কগুলোতেও যাতে কেউ চাঁদাবাজি ও বিশৃঙ্খলা করতে না পারে সেদিকে কড়া নজর দেওয়া হয়েছে। 

নওগাঁর জেলা প্রশাসক মো. গোলাম মওলা জানান, ঈদে বিনোদনকেন্দ্রগুলোতে মানুষের উপস্থিতি কয়েকগুন বাড়বে। সেদিকে খেয়াল রেখে জেলা আইনশৃঙ্খলা ও সমন্বয় সভায় বেশ কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। পদক্ষেপগুলোর মধ্যে সড়কে নিরাপত্তা ও দূর্ঘটনারোধে একাধিক স্থানে চেকপোস্ট বাসানো হবে। বিনোদনকেন্দ্র ও দর্শনীয় স্থানগুলোতে মানুষের নিরাপত্তা দিতে পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সার্বক্ষনিক মাঠে কাজ করবে। 

শফিক ছোটন/অমিয়/

পর্যটক বরণে প্রস্তুত শ্রীমঙ্গল

প্রকাশ: ০৮ এপ্রিল ২০২৪, ০২:৫৩ পিএম
পর্যটক বরণে প্রস্তুত শ্রীমঙ্গল
শ্রীমঙ্গলের বিখ্যাত চা বাগান ও চা কন্যার ভাস্কর্যসহ পুরো শ্রীমঙ্গল প্রস্তুত পর্যটকদের বরণ করে নিতে। ছবি: খবরের কাগজ

টানা ঈদ ও বাংলা নববর্ষের ছুটিতে ভ্রমণপিপাসুরা ছুটে আসবেন চা বাগান, হাওর আর টিলাবেষ্টিত শ্রীমঙ্গলে, এমনটাই প্রত্যাশা করছেন পর্যটনসংশ্লিষ্টরা। তাই পর্যটকদের বরণ করতে সব রকম প্রস্তুতি সম্পন্ন করে রেছেন তারা।

পর্যটন ব্যবসায়ীদের সূত্রে জানা গেছে, ইতোমধ্যে শ্রীমঙ্গলের বেশীরভাগ হোটেল-রিসোর্ট-কটেজের রুমগুলো বুকিং হয়ে গেছে। বাকিগুলোও আগামী ১-২ দিনের মধ্যে বুকিং হয়ে যাবে বলে আশা করছেন তারা।

এদিকে পর্যটকদের নিরাপত্তায় সকল ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল জোন।

ইট-কাঠের যান্ত্রিক শহরের কোলাহল থেকে সবুজে ঘেরা শ্রীমঙ্গলে ক্লান্তি দূর করতে এই ছুটিতে লাখো পর্যটকের সমাগম হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

চা বাগান, হাইল হাওর, বাইক্কা বিল, চা কন্যার ভাস্কর্য, রমেশ রাম গৌড়ের আবিষ্কৃত সাত রঙের চা, বধ্যভূমি ৭১, বাংলাদেশ চা গবেষণা কেন্দ্র, রাবার বাগান, গোল টিলা, হজম টিলা, সীতেশ বাবুর বন্যপ্রাণী সেবাকেন্দ্র, খাসিয়া পুঞ্জি, মনিপুরী সম্প্রদায়ের তাঁতশিল্প, গারোপল্লী, ভাড়াউড়া লেক, শংকর টিলাসহ শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন পর্যটন স্পটগুলো ঘুরে দেখতে প্রতি বছর দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা শ্রীমঙ্গলে আসেন।

এ ছাড়াও শ্রীমঙ্গলের পার্শ্ববর্তী উপজেলা কমলগঞ্জে অবস্থিত লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান এবং মাধবপুর লেকও ঈদের ছুটিতে পর্যটকদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে।

পর্যটনকল্যাণ পরিষদ শ্রীমঙ্গলের আহ্বায়ক কুমকুম হাবিবা বলেন, ‘ঈদ সামনে রেখে পর্যটক বরণে আমরা ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছি। রমজানের বন্ধের সুযোগে কমবেশি সব হোটেল, মোটেল, রিসোর্ট, কটেজের মালিকরা তাদের প্রতিষ্ঠানকে নতুন করে সাজিয়েছেন। রিসোর্টগুলোর উচ্চ বাজেটের রুমগুলো প্রায় সবই ভাড়া হয়ে গেছে। মধ্যম বাজেটের রুমগুলো এখনও কিছু বুকিং বাকি আছে। আশাকরি এগুলোও খালি থাকবে না।’

বাংলাদেশ ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশনের শ্রীমঙ্গল শাখার সাধারণ সম্পাদক রাসেল আলম খবরের কাগজকে বলেন, ‘ঈদকে সামনে রেখে এবার আমাদের ট্যুর অপারেটরদেরও ব্যস্ত বেড়েছে। এবারের ঈদকে সামনে রেখে আমরা বেশ কিছু প্যাকেজ বিক্রি করতে পেরেছি, আশা করছি ঈদের আগে আরও কিছু পর্যটক ভ্রমণ প্যাকেজ নেবে।’

শ্রীমঙ্গল পর্যটন সেবা সংস্থার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সেলিম আহমেদ বলেন, ‘পর্যটকরা প্রতি বছর ঈদের সময়টাতে চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গলে সপরিবারে ঘুরতে আসেন। আমরাও প্রতিবছর সেই মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করি। প্রতি বছরের মত এবারও আমরা পর্যটকদের বরণ করার জন্য মুখিয়ে আছি।’

ট্যুরিস্ট পুলিশ শ্রীমঙ্গল জোনের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন খবরের কাগজকে বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জে ঘুরতে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তায় সকল প্রস্তুতি আমাদের রয়েছে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ও মাধবপুর লেকে আমাদের দুটি দল থাকবে। পাশাপাশি আরও দুটি ভ্রাম্যমাণ দল শহরজুড়ে থাকবে। লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়ও আমরা থাকব। জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে আমরা পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। কোনো পর্যটক যাতে হয়রানির শিকার না হয় সেদিকে আমাদের বিশেষ নজর থাকবে।

হৃদয় শুভ/সাদিয়া নাহার/অমিয়/

ঈদ পর্যটন

প্রকাশ: ০৫ এপ্রিল ২০২৪, ১১:৫৭ এএম
ঈদ পর্যটন

কত উপলক্ষই তো মানুষকে পর্যটন করতে হয়। তবে উপলক্ষটা যদি হয় মুসলমানদের সবচেয়ে আনন্দময় উৎসব ঈদ, তাহলে তো কথাই নেই। ঈদ উপলক্ষে দুই ধরনের পর্যটন ঘটে। এর মধ্যে এক ধরনের পর্যটন হচ্ছে বাড়ি যাওয়া। সামাজিক ও পারিবারিক বন্ধনের কারণে সবাই পরিবার-পরিজন নিয়ে এই আনন্দ একসঙ্গে উপভোগ করতে চায়। আর সে কারণে মানুষ ছুটে যায় কর্মস্থল থেকে নাড়ির টানে, জন্মস্থানে কিংবা প্রিয়জনদের কাছে। আর ঈদের সময় কম দূরত্বের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে মানুষ ছুটে যায় সামান্য বিনোদনের আশায়।

ঈদের সময় আরেক ধরনের পর্যটন ঘটে- ঘুরতে যাওয়া। এই ঘুরতে যাওয়া পর্যটন আবার দুই রকমের। অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক। ঈদকে কেন্দ্র করে দেশের উল্লেখযোগ্য পর্যটন কেন্দ্রগুলো নতুন সাজে সেজে ওঠে পর্যটকদের আশায়। ঈদের আনন্দকে আরও উপভোগ করার জন্য মানুষও এখন দূরের পর্যটন কেন্দ্রগুলোতে ছুটতে শুরু করেছেন। দেশের অভ্যন্তরের কক্সবাজার, রাঙামাটি, সাজেক, কুয়াকাটা, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ইত্যাদি জায়গাগুলোয় পর্যটকদের সমাগম হয় বিপুল পরিমাণে। এই অভ্যন্তরীণ পর্যটনে সাধারণত নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিকেই বেশি দেখা যায়।

বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের পর্যটন আকর্ষণ কেন্দ্রগুলোর নৈসর্গিক সৌন্দর্যের জন্য বিভিন্ন চা বাগানসহ জাফলং, লালাখাল, বিছনাকান্দি, পাংথুমাই ঝরনা, সোয়াফ ফরেস্ট, রাতারগুল, হাকালুকি, কানাইঘাটে ছুটে যান তারা। বগুড়ার মহাস্থানগড়, বৌদ্ধবিহার, ষাটগম্বুজ মসজিদ, লালবাগ কেল্লা, আহসান মঞ্জিল, পানামনগর, সোনারগাঁ, বড় কাটরা, ছোট কাটরাসহ প্রত্নতাত্তিক পর্যটনকেন্দ্রগুলোতেও পর্যটকের সমাগম বাড়ে।

পানাম নগর

আর্থিকভাবে আরেকটু সুবিধাজনক অবস্থায় যারা আছেন, তারা আন্তর্জাতিক পর্যটক হিসেবে নাম লেখান। তাদের গন্তব্য দেশের আশপাশে- ভারত, নেপাল, শ্রীলংকা, ভুটান এসব দেশ। এরপর উচ্চবিত্ত বা ধনীদের জন্য তো পুরো দুনিয়াই খোলা। অনেকেই ঈদ উপলক্ষে ছুটে যান পৃথিবীর নানা প্রান্তে। থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, দুবাই, মালয়েশিয়া, মিসর, ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াসহ ঐতিহাসিক ও গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে ঘুরতে চলে যান তারা।

দেশের পর্যটন খাতে ঈদ মৌসুম একটি বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে নিঃসন্দেহে। এই বাড়তি মাত্রাকে পুরোদস্তুর কাজে লাগানোর ব্যবস্থা করতে হবে। দেশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো নিয়ে মানুষের অভিযোগের কমতি নেই। এ সময় হোটেল ভাড়া থেকে শুরু করে, খাবার, যানবাহনসহ নানান সেবার দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয়। যেটা পর্যটকদের জন্য খুবই অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি করে। এমনকি এটাও দেখা যায়, দেশের সবচেয়ে বড় পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড়ের কারণে ভয়ংকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। হোটেলে থাকার মতো জায়গা নেই, খাবার নেই- পর্যটন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার চিত্র এটি। এরকম দুর্বলতা দেশের পর্যটনে হরহামেশাই চোখে পড়ে। পর্যটন উন্নয়নে, বিশেষ করে ঈদ মৌসুমে পর্যটন থেকে সর্বোচ্চ সুবিধা পেতে পর্যটন ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটানোর বিকল্প নেই। ঈদ মৌসুমে পর্যটকদের আস্থা অর্জন করতে পারলে, দেশের অর্থনীতি যেমন সমৃদ্ধ হবে, তেমনি শৃঙ্খলা তৈরি করতে পারলে আরও বেশি দেশি পর্যটককে অভ্যন্তরীণ পর্যটনে আগ্রহী করে তোলা যাবে। শুধু তাই নয়, বিদেশি পর্যটকরাও তখন বাংলাদেশের প্রতি আরও বেশি আগ্রহী হয়ে এ দেশ ভ্রমণে চলে আসতে পারেন। ট্যুর অপারেটিং প্রতিষ্ঠান, দেশের পর্যটন করপোরেশন, পর্যটন পুলিশসহ সবার সম্মিলিত উদ্যোগ দেশের পর্যটনশিল্পকে এগিয়ে নিতে পারে অনেক দূর। এর পাশাপাশি দেশের উল্লেখযোগ্য পর্যটন আকর্ষণগুলো চিহ্নিত করে, পর্যটনকেন্দ্রগুলোয় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করে, অবকাঠামো উন্নয়ন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে, স্থানীয় প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ও বিষয়কে ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে দেশি ও বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ করা সহজ হবে। আর সেটা ঈদ মৌসুমকে ঘিরে হলে তো কথাই নেই। দেশের মানুষও নিশ্চিন্তে এবং আরও ভালোভাবে ঈদ আনন্দ উপভোগ করার সুযোগ পাবেন।

জাহ্নবী

হঠাৎ কেন জনপ্রিয় লাক্ষা দ্বীপ!

প্রকাশ: ০৩ এপ্রিল ২০২৪, ০১:৫৮ পিএম
হঠাৎ কেন জনপ্রিয় লাক্ষা দ্বীপ!
লাক্ষা দ্বীপের স্বচ্ছ পানিতে নৌকায় ঘুরছেন পর্যটকরা। ছবি: সংগৃহীত

আপনি যখন ভারতের কেরালা রাজ্যের কোচি থেকে ৪৯০ কিলোমিটার পশ্চিমে আরব সাগরের মাঝে লাক্ষা দ্বীপপুঞ্জে অবতরণ করবেন, ঠিক তখন চারপাশে নীল জলরাশি দেখতে পাবেন। সৈকতে শত শত নারিকেল গাছের সারি। সমুদ্রের দিকে একটু এগোলে পানির রঙ হয় ফিরোজা, আবার গভীর সমুদ্রে পানির রঙ পান্না নীল।  
 
সংস্কৃত ভাষায় লাক্ষা দ্বীপ-এর অর্থ এক লাখ দ্বীপ। এটি ভারতের একমাত্র প্রবালপ্রাচীর, যা সমুদ্রপৃষ্ঠের ঠিক ওপরে অবস্থিত। লাক্ষা দ্বীপে মোট ৩৬টি দ্বীপ রয়েছে। এর মধ্যে ১২টি প্রবালপ্রাচীর। এই দ্বীপগুলোতে প্রায় ৭০ হাজার লোক বাস করেন। বাসিন্দাদের বেশির ভাগই মাছ ধরা ও নারিকেল চাষের ওপর নির্ভরশীল। 

প্রবালপ্রাচীরের অগভীর জল, সামুদ্রিক জীবন ও প্রবাল  প্রাচুর্যের কারণে লাক্ষা দ্বীপ ভারতের সাঁতার ও স্কুবা ডাইভের সেরা জায়গাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ ছাড়া দ্বীপের রাতের আকাশ আরেকটি দর্শনীয় বিষয়।

 

২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পরিবারের সঙ্গে লাক্ষা দ্বীপে বেড়াতে আসেন শালিনা সিভি। তিনি বলেন, ‘আমি আমার জীবনে এত তারা, নক্ষত্রমণ্ডল ও ছুটন্ত তারকা দেখিনি-যতটা আমি দ্বীপে তিন দিনের ভ্রমণে দেখেছি। লাক্ষা দ্বীপ হলো একটি সুন্দর, নির্মল দ্বীপ- যেখানে জীবন শ্লথ বলে মনে হয়। কিন্তু সেখানে একটি পরাবাস্তব প্রশান্তি আপনি অনুভব করবেন।’ 

এ দ্বীপের আর একটি মিস না করা অ্যাডভেঞ্চার হলো রাতে মাছ ধরা। এ দ্বীপের পর্যটকরা জেলেদের সঙ্গে মাছ ধরার অভিযানে যোগ দিতে পারেন। চাইলে স্কিপজ্যাক ও ইয়েলোফিন টুনা মাছ ধরার চেষ্টা করতে পারেন। একই সঙ্গে রয়েছে কয়েকটি সরকার পরিচালিত ডাইভ সেন্টার, কায়াকিং, উইন্ড সার্ফিং, প্যারাসেলিং ও অন্যান্য জলক্রীড়া কার্যক্রম।  
 
এ ছাড়াও স্থানীয়দের পরিচালিত অনেক হোমস্টে রয়েছে, যা আপনার ভ্রমণকে করবে আরামদায়ক। পর্যটকদের আনোগোনা বেড়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যে কিছু স্থানীয় ব্যবসায়ী দ্বীপটিতে পর্যটন কোম্পানি গড়ে তোলার কার্যক্রমও শুরু করেছেন।
 
তবে শান্ত, স্নিগ্ধ, নীল জলরাশি পরিবেষ্টিত দ্বীপটি গত বছরও খুব বেশি মানুষের কাছে জনপ্রিয় ছিল না। এ বছরের জানুয়ারি মাসে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লাক্ষা দ্বীপের প্রবাল দ্বীপ ভ্রমণের পর পর্যটকদের আগ্রহ বেড়েছে বহু গুণ।   

ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ভূতাত্ত্বিক শ্রদ্ধা মেনন জানান, এটি সত্যিই চিত্তাকর্ষক একটি স্থান। একটি গবেষণার কাজে গত দুই বছরে তিনবার তিনি এই দ্বীপপুঞ্জে ভ্রমণ করেছেন। প্রতিবার তিনি কোচি থেকে লাক্ষা দ্বীপের উদ্দেশে ছোট প্লেনে চড়ে এসেছেন। প্রতিবারই প্লেনের যাত্রী ছিল হাতেগোনা। যাদের মধ্যে ছিলেন দ্বীপের বাসিন্দা ও সরকারি কর্মকর্তারা।

লাক্ষাদ্বীপের ফ্লাইটগুলো কোচি থেকে ছেড়ে যায় এবং আগত্তি দ্বীপে অবতরণ করে। ছবি: সংগৃহীত

কিন্তু এ বছরের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি লাক্ষা দ্বীপে যাওয়ার পর ভারতীয় পর্যটকদের এই দ্বীপের প্রতি আগ্রহ বেড়েছে বহুগুণ। 

নরেন্দ্র মোদি সৈকতে হাঁটার ও স্ফটিক-স্বচ্ছ জলে সাঁতারের ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশ করে জনসাধারণের উদ্দেশে বলেন, ‘লাক্ষা দ্বীপের সৌন্দর্য কথায় বর্ণনা করা যাবে না। যারা সারাবিশ্বের সমুদ্রসৈকত ও দ্বীপ দেখতে পছন্দ করেন, আমি তাদের লাক্ষা দ্বীপে আসার আহ্বান জানাই।’

সেই থেকে পর্যটকপ্রেমীদের কাছে দ্বীপপুঞ্জটি স্পটলাইটে পরিণত হয়েছে। দ্য ইকোনমিক টাইমস অনুসারে, লাক্ষা দ্বীপের জন্য গুগলে এত বেশিবার অনুসন্ধান করা হয়েছে, যা বিগত ২০ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

ভারতের বৃহত্তম ভ্রমণ বুকিং পোর্টাল মেকমাইট্রিপ দাবি করছে, মোদির সফরের পর লাক্ষা দ্বীপের জন্য ইন-প্ল্যাটফর্ম অনুসন্ধান তিন হাজার ৪০০ শতাংশ বেড়েছে।

লাক্ষা দ্বীপ সোসাইটি ফর প্রমোশন অব ন্যাচার ট্যুরিজম অ্যান্ড স্পোর্টসের (স্পোর্টস) ওয়াটার স্পোর্টস প্রশিক্ষক আব্দুল সামাদ জানান, এই অঞ্চলে পর্যটন পরিচালনা করা হয় স্পোর্টসের ফোনলাইনের মাধ্যমে। এ লাইন এর আগে কখনো এত ব্যস্ত ছিল না। দিনে দুই-একজন পর্যটক অনুসন্ধান করতেন। কিন্তু গত মাস থেকে প্রতিদিন অন্তত ১০টি ফোনকল আসছে। 

এদিকে ২০২১ সাল থেকে মুম্বাই, কোচি ও গোয়া থেকে লাক্ষা দ্বীপে যাতায়াত করা জাহাজ কর্ডেলিয়া ক্রুজ কর্তৃপক্ষ জানায়, মোদির সফরের পর থেকে জাহাজটির বুকিং প্রায় আড়াই হাজার শতাংশ বেড়েছে।

ওয়াটার স্পোর্টস প্রশিক্ষক আব্দুল সামাদ আরও জানান, বাড়তি পর্যটকের চাপ সামলাতে ইতিমধ্যে সুহেলি ও কদমত দ্বীপে নতুন রিসোর্ট তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
 
এমনকি গত ১ ফেব্রুয়ারি ভারতের অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন তার বাজেট বক্তৃতায় দেশটির পর্যটনশিল্পের প্রসার ঘটাতে লাক্ষা দ্বীপের সঙ্গে ভারতের অন্য দ্বীপগুলোর ভালো সংযোগ তৈরির কথা উল্লেখ করেছেন।

কিন্তু দ্বীপের বিনাশশীল পরিবেশ কি পর্যটনের বিকাশ ঘটাতে পারবে? এটা নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে বিশেষজ্ঞদের মাঝে।

১৫ বছর ধরে লাক্ষা দ্বীপে কাজ করা জিভিআইর সংরক্ষণ পরিচালক বর্ধন পাটাঙ্কর জানান, এই প্রবাল প্রাচীরগুলো প্রাচীন আগ্নেয়গিরির অবশিষ্টাংশ যা অগ্ন্যুৎপাতের ফলে ধীরে ধীরে সমুদ্রপৃষ্ঠের ঠিক ওপরে ডুবে গেছে। প্রবাল প্রাচীর দ্বারা সুরক্ষিত লাক্ষা দ্বীপ সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র কয়েক মিটার ওপরে। বিশ্বের বেশির ভাগ দ্বীপের মতো লাক্ষা দ্বীপেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব পড়েছে এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। 

লাক্ষা দ্বীপ রিসার্চ কালেকটিভের মতে, উপকূলীয় ক্ষয়ের কারণে দ্বীপপুঞ্জের ভূমি আস্তে আস্তে সংকুচিত হচ্ছে, এমনকি ২০১৭ সালে একটি দ্বীপ সম্পূর্ণরূপে বিলীন হয়ে গেছে। গত দুই দশকে লাক্ষা দ্বীপে চারটি প্রধান এনএসও-সম্পর্কিত তাপমাত্রার বিচ্যুতি (হাওয়া এবং সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার তারতম্য সৃষ্টিকারী একটি জলবায়ু ঘটনা) দেখা গেছে। এর পাশাপাশি গত কয়েক বছরে তিনটি বিধ্বংসী ঘূর্ণিঝড়ও হয়েছে।

পাটাঙ্কর বলেন, বিজ্ঞানীদের রক্ষণশীল ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে ২০৫০ সালের মধ্যে লাক্ষা দ্বীপ সমুদ্রের নিচে চলে যাবে। যদি পর্যটনসহ অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্প এবং মাছ ধরার কারণে দ্বীপে অতিরিক্ত লোকসমাগম হয়, তবে তা দ্বীপ ও এর পরিবেশের জন্য বিপর্যয়কর হতে পারে।


লাক্ষা দ্বীপের প্রশাসনিক কেন্দ্র কাভারত্তি। ছবি: সংগৃহীত 

স্পোর্টস জানিয়েছে, দ্বীপগুলোতে পর্যটকদের চাপ কমাতে তারা পারমিট সিস্টেম ব্যবহার করবে। ইতিমধ্যে তারা জাহাজগুলোকে দ্বীপে যাতায়াত করার জন্য আমন্ত্রণ জানাচ্ছে। তাদের দাবি, এর মাধ্যমে দ্বীপটিতে রাতে অবস্থান করা মানুষের সংখ্যা কমবে। ফলে উৎপন্ন বর্জ্যের পরিমাণও কমে আসবে। 
 
যদিও বিজ্ঞানীরা বলছেন, বড় জাহাজগুলো নিয়মিত যাতায়াত করলে দ্বীপের সূক্ষ্ম প্রবাল প্রাচীরের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অন্যদিকে ভূতাত্ত্বিক শ্রদ্ধা মেনন বলেন, দ্বীপে পর্যটক আগমন অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত হতে হবে, যেন তা লাক্ষা দ্বীপের বাস্তুসংস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়।
 
নির্জন ও দারুণ সুন্দর এই দ্বীপটি রক্ষা প্রসঙ্গে পাটাঙ্কর বলেন, ‘আমি মনে করি দ্বীপটি স্থানীয়দের হাতেই সবচেয়ে নিরাপদ থাকবে। দ্বীপটি রক্ষায় তাদের ক্ষমতায়ন ও সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে তাদের সঙ্গে কাজ করা দ্বীপ এবং এর পরিবেশের জন্য সেরা হবে।’ সূত্র : বিবিসি

অনুলিখন: ইসরাত জাহান চৈতী