দেশের জ্বালানি খাতে নবদিগন্তের সূচনা হতে চলেছে আজ (২১ অক্টোবর)। মধ্যরাত থেকে পুরোদমে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাচ্ছে বাঁশখালীর কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। ১৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষম এই কেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হবে ১২২৪ মেগাওয়াট। দেশের ক্রমবর্ধমান বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বিদেশি ব্যাংকের অর্থায়ন এবং বেসরকারি খাতের যৌথ বিনিয়োগে বড় কয়লা বিদ্যুৎকেন্দ্র দেশে এটাই প্রথম। দেশের শতভাগ বিদ্যুতায়ন ও শিল্পায়নের ক্ষেত্রে এই কেন্দ্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
অপরদিকে বাঁশখালীর গণ্ডামারা এলাকায় এই প্রকল্প ঘিরে আশপাশের এলাকার মানুষের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ব্যাপক পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগতে শুরু করেছে। অনেকেই অপরাধমূলক পেশা থেকে ফিরে এসে করছেন চাকরি ও ব্যবসা।
বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসএস পাওয়ার ওয়ান লিমিটেডের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসার (সিএফও) এবাদত হোসেন ভূঁইয়া খবরের কাগজকে জানান, যেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হয়েছে সেই এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মান একসময় খুবই খারাপ ছিল। তাদের আয়ের পথ তেমন খোলা ছিল না। সড়ক যোগাযোগ অনুন্নত ছিল বলে উৎপাদিত ফসলও বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে পারতেন না। এ কারণে অনেকেই নানা অপরাধমূলক পেশায় জড়িয়ে পড়তেন। এখন সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন ঘটতে যাচ্ছে। অপরদিকে এলাকার মানুষের আয়ের নানামুখী পথ খুলে গেছে। এক বিদ্যুৎকেন্দ্র শত শত মানুষকে নেতিবাচক পেশা থেকে ফিরিয়ে এনেছে। অনেকেই বিদ্যুৎ প্রকল্পের সঙ্গে ব্যবসা করে লাভবান। পাল্টে গেছে তাদের জীবনের গল্প। এখন তারা পাকা বাড়ি নির্মাণ করে ভাড়া দিয়েছেন। সড়কের মোড়ে রেস্টুরেন্ট নির্মাণ করে ব্যবসা করছেন। বাঁশখালীর অনেকেই বিদ্যুৎ প্ল্যান্টে কর্মকর্তা হিসেবে চাকরি পেয়েছেন। নিজের এলাকায় চাকরি করে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করছেন।
গত বৃহস্পতিবার সরেজমিন পরিদর্শনকালে স্থানীয় মাইক্রোবাস চালক আবদুস সোবহান খবরের কাগজকে জানান, বাঁশখালীর টাইম বাজার থেকে সাগরপাড়ের (যেখানে বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপিত হয়েছে) দূরত্ব প্রায় পৌনে সাত কিলোমিটার। এই সামান্য পথ পাড়ি দিতে তার প্রায় দেড় ঘণ্টা সময় লাগত। অনেকেই হেঁটে গাড়ির আগে গন্তব্যে পৌঁছে যেতেন। যারা গাড়িতে যেতেন তাদের হাড়গোড় সব এক হয়ে যেত। একজন রোগীকে হাসপাতালে নিতে হলে তার পরিবারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতো। সেই চিত্র পাল্টে যাচ্ছে। এখন সড়কটি সংস্কার ও প্রশস্ত হচ্ছে। বিশাল বিনিয়োগের কারণেই এখানকার সড়ক যোগাযোগব্যবস্থার চিত্র পাল্টে যাচ্ছে। যার সুফল ভোগ করবে এলাকার জনগণ।
গন্ডামারা এলাকার বাসিন্দা নূর হোসেন জানান, তাদের এলাকায় এত বিশাল বিনিয়োগের বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন হয়েছে, এটা আল্লাহর বিশেষ রহমত। বিদ্যুৎসংকটে এই কেন্দ্র সারা দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ করে অবদান রাখছে। এটি তাদের গর্বের বিষয়। অপরদিকে এলাকাবাসী হিসেবে তারাও লাভবান হয়েছেন। অনেকের দুঃখ ঘুচে গেছে। তিনি নিজেও আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন।
প্রকল্প এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্রটির ২৭৫ মিটার উচ্চ চিমনি অনেক দূর থেকে দেখা যায়। বিদ্যুৎকেন্দ্রসংলগ্ন সাগর মোহনায় বিশেষায়িত জেটি নির্মাণ করা হয়েছে। কয়লা ইয়ার্ডের সঙ্গে দুটি ঢাকনাযুক্ত কনভেয়ার বেল্ট বসানো হয়েছে। সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এই বিদ্যুৎকেন্দ্রটি দূর থেকে দেখতে অপরূপ লাগে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ১৭ সেপ্টেম্বর রাত ১২টায় ৬৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন প্রথম ইউনিট বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করে। আজ শনিবার ৬৬০ মেগাওয়াট উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দ্বিতীয় ইউনিট উৎপাদনে যাচ্ছে। এটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প হলেও সুপার ক্রিটিক্যাল প্রযুক্তির কারণে পরিবেশ দূষণের আশঙ্কা নেই। এই প্রযুক্তিতে কম কয়লা পুড়িয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। ২০১৬ সালে বেসরকারি খাতের সবচেয়ে বড় এই বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও এসএস পাওয়ারের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। চুক্তিতে বলা হয়, ২৫ বছর ধরে পিডিবি এই কেন্দ্রে উৎপাদিত সব বিদ্যুৎ কিনবে।
বঙ্গোপসাগরের কূলে স্থাপিত এই বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানায় রয়েছে দেশীয় খ্যাতনামা প্রতিষ্ঠান এস আলম গ্রুপ ৭০ শতাংশ এবং চীনা কোম্পানি সেপকো-থ্রি ৩০ শতাংশ।
সালমান