মাইন উদ্দিন পেশায় পল্লী চিকিৎসক। এর আড়ালে গড়ে তুলেছেন বিশাল অস্ত্র ব্যবসার সিন্ডিকেট। তার তত্বাবধানে অস্ত্র যায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী, রাজনৈতিক সশস্ত্র গ্রুপ, মাছের ঘের দখল ও ডাকাতদের কাছে। নতুন করে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে আবারও সক্রিয় হয়েছে রামু উপজেলার ঈদগড়ের মাইন উদ্দিন সিন্ডিকেট। তৈরি করছে নতুন নতুন সব অস্ত্র। চাহিদা থাকায় অগ্রিম অর্ডার নিয়ে বসেছেন এই পল্লী চিকিৎসক।
ধারণা করা হচ্ছে- চিকিৎসা পেশার আড়ালে পেশাদার অস্ত্র ব্যবসায়ী মাইন উদ্দিন। এই চিকিৎসক অস্ত্র সম্পর্কে বিস্তর জ্ঞান রাখেন। বিভিন্ন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি, মেরামতেও তিনি পারদর্শী। চট্টগ্রামের বড় বড় অস্ত্র ব্যবসায়ীদের সঙ্গে এই চিকিৎসকের যোগাযোগ ছিল। সে নিজেও পেশাদার কারিগর হওয়ার পাশাপাশি অস্ত্র বেচাকেনায় জড়িত বলে প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে।
এ ছাড়াও, আরাকান রোহিঙ্গা স্যালুভেশন আর্মি (আরসা) ছাড়াও আরও চারটি রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ, গরু পাচারচক্র, মাছের ঘের দখলে বেশি অস্ত্র সরবারহ করতেন তিনি।
বুধবার (১৩ ডিসেম্বর) ভোররাতে ঈদগড় ইউনিয়নের ছগিরাকাটা তুলাতলী পাহাড়ে অস্ত্র কারখানার সন্ধান পান র্যাবের একটি আভিযানিক দল। এ সময় দুইজন অস্ত্র তৈরির কারিগর ও পল্লী চিকিৎসক মাইন উদ্দিনসহ চারজনকে আটক করা হয়। উদ্ধার করা হয় বিপুল সংখ্যক অস্ত্র ও অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম।
মাঈন উদ্দিন ছাড়াও আটক হয় জাফর আলম, লাল মিয়া ও সাহাবউদ্দিন। উদ্ধার করা হয় অস্ত্র তৈরির সরঞ্জামসহ ১০টি অস্ত্র ও ২২ রাউন্ড গুলি।
তবে র্যাবের অভিযান টের পেয়ে পালিয়ে যায় কারখানাটির মালিক ও প্রধান কারিগর মনিরুল হক।
নির্বাচনকালীন অস্ত্রের চাহিদা বেড়েছে জানিয়ে র্যাব কর্মকর্তারা বলছেন- আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে উত্তাপ ছড়াতে দুর্বৃত্তরা নতুন অস্ত্র সংগ্রহ করতে শুরু করেছে। এই কারখানায় তৈরি অস্ত্রের অর্ডার বেশি হয়েছে। যা ব্যবহার হতো নির্বাচনের সহিংসতায়। গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে র্যাব এ তথ্য জানতে পারে।
বেশ কয়েকদিন ধরে দুগর্ম পাহাড়ে নজরদারি রাখার পর দীর্ঘ ২৪ ঘন্টার বেশি সময় পাহাড়ে অভিযান চালিয়ে এসব অস্ত্রসহ তাদের আটক করা হয়। এ ছাড়াও রোহিঙ্গা ক্যাম্পভিত্তিক সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আরসা, নবী হোসাইন গ্রুপসহ বিভিন্ন ডাকাত, অপহরণের সাথে জড়িত গ্রুপের কাছে অস্ত্র সরবরাহ করতো তারা।
কক্সবাজার র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচএম সাজ্জাদ হোসেন জানান, দীর্ঘদিন ধরে কারখানা গড়ে তুলে অস্ত্র তৈরি করে আসছিলো একটি চক্র। পরে গোপন সংবাদের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে কারখানা থেকে দুইজন এবং বাড়ি থেকে দুইজনকে আটক করা হয়।
তিনি জানান, মনিরুল হকের পৈতৃক পেশা অস্ত্র তৈরি। পৈতৃক সূত্রেই তিনি অস্ত্র ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। চট্টগ্রাম এবং ঢাকা থেকে অস্ত্র তৈরির সরঞ্জাম এনে গহীন পাহাড়ে অস্ত্র তৈরি করতেন। তারা অস্ত্র তৈরি করতে করতে এক্সপার্ট হয়ে গেছেন। কারখানাটির মালিক ও প্রধান কারিগর মনিরুল হক সবচেয়ে দক্ষ।
র্যাব-১৫-এর অধিনায়ক জানান, মাঈন উদ্দিন পেশায় একজন পল্লী চিকিৎসক। তিনিই মিডিয়াম্যান হিসেবে কাজ করতো। মাঈন উদ্দিন এবং জাফর সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর কাছ থেকে ডিমান্ড নিয়ে মনিরুল হককে জানাতো। তারপর চাহিদা অনুযায়ি অস্ত্র তৈরি করে সরবরাহ করতো। প্রতিটি অস্ত্রের দাম পড়তো ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা।
সন্ত্রাস নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত এমন অভিযান অব্যাহত রাখার ঘোষণা দেন র্যাব-১৫ এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচএম সাজ্জাদ হোসেন।
ঈদগর সড়ক অপহরণ এবং ডাকাতির জন্য সবসময় আলোচনায় থাকে। সেখানকার মানুষ আতঙ্কে চলাচল করে সড়কটি দিয়ে। এমন অভিযানকে স্বাগত জানিয়েছেন এলাকাবাসী। তারা চান এমন অভিযান অব্যাহত থাকুক।
ঈদগড়ের বাসিন্দা মৌলভী ইলিয়াছ বলেন, এসব অপরাধীর হাতে প্রাণ দিতে হয়েছিলো এক পুলিশ সদস্যেরও। সাধারন মানুষ তো প্রতিনিয়ত অপহরণ ও খুন হচ্ছেই। তাদের সিন্ডিকেটকে কোনভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। যার ফলে এ অঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা এখন চরম হুমকিতে। র্যাবের এ অভিযানটি মানুষের মধ্যে একটি সাহস তৈরি করবে।
আরেক বাসিন্দা জসিম উদ্দিন বলেন- ‘মাইন উদ্দিন পেশায় চিকিৎসক। কখনো বুঝতেই পারিনি সে অপকর্ম করে যাচ্ছে। আমরা তো অবাক হয়েছি। আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে গেছে অল্পদিনে।’
র্যাব-১৫ এর সহকারী পরিচালক এএসপি জামিলুল হক বলেন, ‘গত এক বছরে প্রায় ১৩৫টি দেশি-বিদেশি অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। আর গুলি উদ্ধার হয়েছে ৬০০ রাউন্ড মতো। যার বেশিরভাগ যাচ্ছিলো রোহিঙ্গা ক্যাম্পের সন্ত্রাসীদের কাছে। নির্বাচন আসায় এখন চাহিদা আরও বাড়ছে।’
মুহিববুল্লাহ/অমিয়/