বহু বছর বাদে পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন আসনে সংসদ সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেমেছেন কোনো নারী। এবারের নির্বাচনে জাতীয় পার্টির মনোনয়ন নিয়ে ২৯৮ নং খাগড়াছড়ি সংসদীয় আসনে লাঙ্গল প্রতীকে লড়ছেন ৩০ বছর বয়সী তরুণী মিথিলা রোয়াজা। খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের ইতিহাসে সংসদ সদস্য পদে প্রার্থী হওয়া দ্বিতীয় নারী তিনি। এর আগে ২০০৮ সালের নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি আসন থেকে বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে প্রথম নারী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য দীপেন দেওয়ানের স্ত্রী মৈত্রী চাকমা।
মিথিলা রোয়াজা রাজনীতির মাঠে একেবারেই নবীন। তবে খাগড়াছড়ি আসনে এবারের প্রতিদ্বন্দ্বী চার প্রার্থীর মধ্যে শিক্ষায় এগিয়ে রয়েছেন তিনি। এ ছাড়া পারিবারিকভাবেও তিনি সম্ভ্রান্ত পরিবারের। মিথিলা রোয়াজা খাগড়াছড়ি থেকে নিম্ন মাধ্যমিক শেষ করার পর ফেনী গার্লস ক্যাডেট কলেজের প্রথম ব্যাচে ভর্তি হন। এরপর সেখান থেকে পড়াশোনা শেষ করে দুই বছরের প্রশিক্ষণ নিয়ে ২০১২ সালে লজিস্টিক অফিসার হিসেবে যোগ দেন বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে। আর ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি কমিশন্ডপ্রাপ্ত হন পাইলট হিসেবে। তিন বছর বাংলাদেশ বিমানে পাইলট হিসেবে ফ্লাইং করার পর পারিবারিক কারণে ২০১৭ সালে মাত্র ২৪ বছর বয়সে স্বেচ্ছায় বিমানবাহিনী থেকে অবসর নেন তিনি।
মিথিলার প্রয়াত পিতামহ (দাদা) বীরেন্দ্র কিশোর রোয়াজাও ছিলেন বরেণ্য একজন রাজনীতিবিদ। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিপুল ভোটে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হয়েছিলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (পিসিজেএসএস) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং ‘ট্রাইবেল কনভেনশন’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন এই পাহাড়ি নেতা। এ ছাড়া বাংলাদেশে বসবাসরত ত্রিপুরা জনগোষ্ঠীর মধ্যে প্রথম গ্র্যাজুয়েট ব্যক্তি বীরেন্দ্র কিশোর রোয়াজা স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে মহকুমার অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
নির্বাচন প্রসঙ্গে মিথিলা রোয়াজা বলেন, ‘গত দেড় দশকে খাগড়াছড়ি জেলা দুর্নীতি ও লুটপাটের স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে সর্বক্ষেত্রে চলছে অনিয়ম, অরাজকতা। এখানকার শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা দিন দিন অবনতি হচ্ছে। মানুষের জীবনমান উন্নয়ন করতে, মৌলিক চাহিদা নিশ্চিত করতে এবং অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ করার তাড়না নিয়ে আমি নির্বাচনে এসেছি। আশা করি, খাগড়াছড়ি আসনের গত দেড় দশকের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে জনগণ আমাকে ভোট দেবে।’
মিথিলা রোয়াজার রাজনীতিতে হাতেখড়ি ২০২০ সালে। জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের হাত ধরে রাজনীতিতে পদার্পণ তার। বর্তমানে জাতীয় পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য ও খাগড়াছড়ি জেলা জাতীয় মহিলা পার্টির সহসভানেত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এই নারী সংসদ সদস্য প্রার্থী। এবারের নির্বাচনে প্রতীক পাওয়ার পর ভোটের ময়দানে নেমেছেন মিথিলা রোয়াজা। ভোটারদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে চাইছেন লাঙ্গল প্রতীকে ভোট। তবে বর্তমানে খাগড়াছড়িতে জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক অবস্থা খুব একটা ভালো নয়।
এই আসনে ১৯৮৬ সালের তৃতীয় ও ১৯৮৮ সালের চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর আর তেমন শক্তভাবে দাঁড়াতে পারেনি দলটি। সেই দুটি নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হয়ে জিতেছিলেন এ কে এম আলীম উল্লাহ। তবে বিগত কয়েকটি সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়িতে জাতীয় পার্টির প্রার্থীকে হারতে হয়েছে সবচেয়ে কম ভোট পেয়ে। সর্বশেষ ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসনে ভোট দিয়েছিলেন ৩ লাখ ৫৭ হাজার ১৫৪ জন ভোটার। তার মধ্যে মাত্র ২ হাজার ৩৪০ ভোট পেয়ে জামানত হারিয়েছিলেন জাতীয় পার্টির প্রার্থী সোলায়মান শেঠ। তাই পরিসংখ্যান বলছে, দলীয় বিবেচনায় নয়, বরং ব্যক্তিগত ও পারিবারিক ইমেজ কাজে লাগাতে হবে মিথিলা রোয়াজাকে এবং এটাই তার জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেননা, তার বিপরীতে রয়েছেন গত দুই মেয়াদে নির্বাচিত সংসদ সদস্য এবং তৃতীয়বারের মতো আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পাওয়া নৌকা প্রতীকের প্রার্থী কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খাগড়াছড়ি আসনে আওয়ামী লীগ এবং জাতীয় পার্টি ছাড়া আরও দুজন প্রার্থী রয়েছেন। তারা হলেন তৃণমূল বিএনপি মনোনীত সোনালি আঁশ প্রতীকের প্রার্থী উশ্যেপ্রু মারমা এবং ন্যাশনাল পিপলস পার্টি মনোনীত আম প্রতীকের প্রার্থী মো. মোস্তফা আল ইহযায।