কুমিল্লা জেলার প্রধান নদী গোমতী। ভারতের ত্রিপুরা থেকে উৎপন্ন নদীটি জেলার কটকবাজার সীমান্ত দিয়ে কুমিল্লায় প্রবেশ করে। এরপর সদর, বুড়িচং, ব্রাহ্মণপাড়া, দেবিদ্বার, মুরাদনগর এবং তিতাস উপজেলা হয়ে দাউদকান্দির সাপটা এলাকায় মেঘনা নদীর সঙ্গে মেশে। গোমতী নদীর দুই তীরে রয়েছে বিস্তীর্ণ চরাঞ্চল। সেই চরে কৃষকরা সারা বছর চাষাবাদ করে বারোমাসি ফসল উৎপাদন করেন।
কিন্তু কৃষকের আয়ের পথে হানা দিয়েছে অসাধু মাটিখেকো চক্র। সাম্প্রতিক সময়ে চক্রটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। রাতের আঁধারে তারা এক্সকাভেটর দিয়ে অবাধে মাটি কেটে ডাম্প ট্রাকে করে বিক্রির জন্য নিয়ে যাচ্ছে। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে চর, ব্যাহত হচ্ছে ফসল উৎপাদন। পাশাপাশি ভারী ডাম্প ট্রাকে মাটি পরিবহনের কারণে গোমতীর প্রতিরক্ষা বাঁধও বিভিন্ন স্থানে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
কৃষকদের স্বার্থ এবং প্রতিরক্ষা বাঁধ রক্ষায় গোমতীর চরাঞ্চল থেকে মাটি কাটা ও নদী থেকে বালু উত্তোলনে নিষেধাজ্ঞা জারি করে প্রশাসন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার মাঝেও বালুখেকোরা থেমে নেই। দিনে মাটি কাটা বন্ধ রাখলেও সন্ধ্যার পর থেকে সকাল পর্যন্ত তা অব্যাহত থাকছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কুমিল্লা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আলী আকবর বলেন, ‘গোমতী নদী থেকে অবাধে মাটি কাটা, অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে আমরা গত ১০ বছর ধরে দাবি জানিয়ে আসছি। কিন্তু প্রশাসন এ বিষয়ে সঠিক কোনো উদ্যোগ নেয়নি। মাঝে মধ্যে যে অভিযান চালানো হয়, তা লোক দেখানো।’
‘কুমিল্লাবাসীর পক্ষ থেকে আমরা চাই- অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা হোক, শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। সবচেয়ে বড় কথা গোমতী রক্ষায় স্থায়ী পদক্ষেপ নেওয়া দরকার। তা না হলে গোমতীকে বাঁচানো যাবে না’, বলেন আলী আকবর।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কুমিল্লার পাঁচ উপজেলার অন্তত অর্ধশতাধিক জায়গা থেকে অবাধে গোমতীর মাটি কেটে, বালু উত্তোলন করে কয়েকটি চক্র নিয়ে যাচ্ছে। আদর্শ সদর উপজেলার দুর্গাপুর (উত্তর) ইউনিয়নের আমতলী এলাকা, বুড়িচংয়ের ময়নামতি ইউনিয়নের বাগিলারা, ষোলনল ইউনিয়নের মিথিলাপুর, একই উপজেলার কাহেতরা, সদর উপজেলার আলেখারচর, পালপাড়া, বুড়িচংয়ের মীরপুর ও গোবিন্দপুর অংশসহ দেবিদ্বারের কয়েকটি অংশে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে একাধিক চক্র রাতের আঁধারে অবাধে মাটি কাটা অব্যাহত রেখেছে।
অন্যদিকে অবাধে মাটি কাটার কারণে হুমকির মুখে পড়েছে আদর্শ সদর উপজেলার চাঁনপুর এলাকার বেইলি সেতু, টিক্কাচর এলাকার শালধর সেতু এবং পালপাড়া সেতু। এ তিনটি সেতুর দুই পাশ ঘেঁষে সমানতালে মাটি কাটা হচ্ছে। রাতে মেশিন দিয়ে মাটি কাটা হয়। এরপর ট্রাক ও ট্রাক্টর দিয়ে মাটি নিয়ে যাওয়া হয়।
কুমিল্লা শহরতলির চানপুর এলাকার বাসিন্দা মফিজ সরকার বলেন, ‘প্রশাসন দিনে অভিযান চালালে তারা রাতে মাটি কাটে। জোর করে জমি দখল করে মাটি কাটছে। এগুলো নাকি ইটভাটায় নিয়ে যায়। কিছু বললেই হুমকি দেয়। ইটভাটার জন্য শেষ হয়ে যাচ্ছে গোমতীর চর।’
পালপাড়া এলাকার বাসিন্দা মাহবুব আলম বলেন, ‘কয়েক বছর আগে পালপাড়া এলাকায় নতুন সেতুটি নির্মাণ করা হয়েছে। কিন্তু সেতুটির আশপাশ থেকে অবাধে মাটি কাটা ও বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আমরা এর প্রতিকার চাই।’
গোমতী থেকে অবাধে মাটি কাটা, বালু উত্তোলনের বিষয়টি উঠে এসেছে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায়। জেলা প্রশাসন থেকে জানানো হয়, মাটি ও বালু উত্তোলন বন্ধে ব্যাপক অভিযান চালানো হয়েছে। অভিযান অব্যাহত আছে। চলতি বছরের প্রথম দুই মাসে শুধু বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইনেই সবচেয়ে বেশি অভিযান চালানো হয়েছে। এ সময় বেশ কয়েকজনকে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়েছে।
কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী খান মোহাম্মদ ওয়ালিউজ্জামান বলেন, ‘বিগত সময়ে একাধিকবার মাটি কাটায় জড়িতদের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছি। বিশেষ করে তিনটি সেতুর নিচে মাস দুয়েক আগে মাটি কাটা হয়েছিল, আমরা একটি মামলা দিয়েছি। আবারও অভিযান চালানো হবে।’
জেলা প্রশাসক খন্দকার মু. মুশফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা নিয়মিত অভিযান চালাচ্ছি, যারা এই কাজ করছে আমরা তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেব। এক্ষেত্রে সবার সহযোগিতা প্রয়োজন।’