চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় পাহাড়, টিলা ও কৃষিজমির মাটি কাটার অভিযোগে গত দুই মাসে ৩৭টি এক্সক্যাভেটর (ভেকু) এবং ২৯টি ডাম্প ট্রাক বিকল করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। পরিবেশের স্বার্থে পরিচালিত এসব অভিযানে স্থানীয় প্রশাসনও সহায়তা করেছে।
উপজেলার কেঁওচিয়া, ঢেমশা, নলুয়া, এওচিয়া ও কাঞ্চনা ইউনিয়নে শুষ্ক মৌসুম এলেই পাহাড়, টিলা ও কৃষিজমির মাটি কেটে ইটভাটা এবং জায়গা ভরাটের জন্য সরবরাহ করা হয়। বিশেষ করে ইট তৈরির জন্য ফসলি জমির উর্বর মাটি কেটে নেওয়ায় কৃষি উৎপাদন হুমকির মুখে পড়ছিল। তবে সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে জনমনে স্বস্তি ফিরেছে।
সেনাবাহিনী সূত্রে জানা যায়, অভিযানের খবর পেয়ে মাটিখেকোরা পালিয়ে গেলেও উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অভিযান চালিয়ে গত ৪ জানুয়ারি ৩টি, ১৬ জানুয়ারি ২টি, ২৫ জানুয়ারি ২টি, ২৬ জানুয়ারি ৫টি, ৩০ জানুয়ারি ২টি, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১২টি, ২০ ফেব্রুয়ারি একটি, ২১ ফেব্রুয়ারি ৫টি, ২৩ ফেব্রুয়ারি ২৪টি, ২৭ ফেব্রুয়ারি ৮টি এবং সর্বশেষ ২৮ ফেব্রুয়ারি ২টি এক্সক্যাভেটর (ভেকু) ও ডাম্প ট্রাক বিকল করা হয়েছে।
স্থানীয় কৃষক ও এলাকাবাসী মাটিখেকোদের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর এই ধারাবাহিক অভিযানে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। আমির হোসেন নামে এক কৃষক বলেন, ‘অনেক কৃষক অতিরিক্ত অর্থের লোভে পড়ে কৃষিজমির উর্বর মাটি বিক্রি করে দিচ্ছেন। আবার কোনো কোনো জায়গায় মাটিখেকোরা রাতের আঁধারে কৃষকের অজান্তে জমির মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। এতে দিনশেষে আমাদের মতো সাধারণ কৃষকরাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। তবে সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানে সাধারণ কৃষকদের মনে স্বস্তি ফিরেছে।’
স্থানীয় বাসিন্দা লোকমান আহমদ বলেন, ‘এওচিয়া ইউনিয়নের বেশিরভাগ ইটভাটা পাহাড় ঘেঁষে গড়ে তোলা হয়েছে। সেখানে বছরের পর বছর ধরে ইট তৈরির জন্য নির্বিচারে পাহাড় কাটা হচ্ছে। সম্প্রতি সেনাবাহিনীর ধারাবাহিক অভিযানের পর কিছু চিহ্নিত মাটিখেকো এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে। এর পরও কিছু ইটভাটার মালিক রাতের আঁধারে পাহাড় কেটেই যাচ্ছে। সেনাবাহিনীর টহল ও অভিযান অব্যাহত থাকলে হয়তো পাহাড়গুলো রক্ষা করা সম্ভব হবে।’
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘কৃষিজমির উপরের স্তর হলো সবচেয়ে উর্বর। এই স্তরে জৈব ও পুষ্টি উপাদান সবচেয়ে বেশি থাকে। এটি কেটে ফেললে জমির উৎপাদন ক্ষমতা মারাত্মকভাবে কমে যায়। পরে তা পুনরুদ্ধারে দীর্ঘসময় লাগে। ফলে ফসল উৎপাদন ব্যাহত হয়।’
পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ধরিত্রী রক্ষায় আমরা’র (ধরা) কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য সানজিদা রহমান বলেন, ‘পাহাড় ও টিলা কাটার ফলে ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব এলাকা মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। এ ছাড়াও মাটি কাটার ফলে প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়, জীববৈচিত্র্য হুমকির মুখে পড়ে এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তরেও প্রভাব পড়ে। তাই বলা যায়, পরিবেশের স্বার্থে সেনাবাহিনীর এমন ধারাবাহিক অভিযান অবশ্যই প্রশংসার দাবি করে।’
সাতকানিয়া সেনাক্যাম্পের কমান্ডার মেজর এস এম সাকিবুজ্জামান শামীম পারভেজ বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি না নিয়ে পাহাড়, টিলা ও কৃষিজমির মাটি কাটা সম্পূর্ণ বেআইনি। আমরা স্থানীয়দের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনা করছি। তারই ধারাবাহিকতায় বিগত দুই মাসে ৩৭টি এক্সক্যাভেটর (ভেকু) ও ২৯টি ডাম্প ট্রাক বিকল করা হয়েছে। এ সমস্ত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সেনাবাহিনীর নিয়মিত অভিযান অব্যাহত থাকবে।’