চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার বাজালিয়া ইউনিয়নের বুক চিরে পাঁচটি ছোট-বড় খাল প্রবাহিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে মাহালিয়া খাল অন্যতম। এ খালটি এখানকার সহস্রাধিক একর জমিতে সেচের প্রধান উৎস। খালটি দিয়ে বর্ষা মৌসুমে পাড় উপচে পানি প্রবাহিত হলেও বর্তমানে প্রায় শুকিয়ে গেছে। ফলে সেচ বিড়ম্বনায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক পর্যায়ের কৃষকরা এখন চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা এবং কিছু সুবিধাভোগী কৃষক উপরে বাঁধ দিয়ে পানি আটকে রাখায় নিচে পানির প্রবাহ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে চাষাবাদ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। তবে কৃষি কর্মকর্তার দাবি, পার্শ্ববর্তী আরেকটি খাল থেকে পাইপের মাধ্যমে পানি এনে প্রতিটি ফসলি জমিতে সেচ প্রক্রিয়া নিরবচ্ছিন্ন করা হয়েছে।
জানা যায়, কাটাখালী, রামদা, গরল, মাহালিয়া ও মরা খালকে কেন্দ্র করে বাজালিয়া ইউনিয়নে বিশালাকৃতির সেচব্যবস্থা গড়ে উঠেছে। এখানকার কয়েকশ কৃষক শুষ্ক মৌসুমে এসব খালের পানি ব্যবহার করে চাষাবাদ করেন। কাটাখালী, রামদা ও মরা খাল প্রথমে মাহালিয়া খালে গিয়ে মেশে। এর পর সেগুলো গরল খাল হয়ে সরাসরি সাঙ্গু নদীতে পতিত হয়। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢল ও বৃষ্টির পানি মাহালিয়া খালের দুপাড় উপচে প্রবাহিত হয়। তবে চলতি বছর শুষ্ক মৌসুম দীর্ঘায়িত এবং কাটাখালী ও রামদা খালের পানি সেখানকার জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য আটকে রাখা হয়েছে। এতে মাহালিয়া খাল পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে বোরো ধান, শাকসবজি ও বিভিন্ন মৌসুমি ফসলের আবাদ ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে মাহালিয়া খালের পাড় হয়ে প্রায় দুই কিলোমিটার পথ হেঁটে দেখা যায়, খালের উপরের দিকে কিছু কিছু অংশে পানি জমে আছে। তবে সেগুলো জমিতে সেচ দেওয়ার জন্য কৃষকরা বাঁধ দিয়ে আটকে রেখেছেন। অন্যদিকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং পানি সংরক্ষণের স্থায়ী পরিকল্পনা না থাকায় খালের নিচের অংশ পানিশূন্য হয়ে পড়েছে। এ ছাড়াও পানিস্বল্পতার কারণে কয়েকটি ডিঙি নৌকা আটকে আছে। খালে অনেক কৃষক ধানের আবাদও করেছেন।
স্থানীয় কৃষক নুরুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা মাহালিয়া খালের পানির ওপর নির্ভর করে ধানচাষ এবং রবি মৌসুমে বিভিন্ন প্রকার শাকসবজির আবাদ করে থাকি। এখানকার জমিগুলোতে এই খালটি ছাড়া সেচের আর কোনো উৎস নেই বললেই চলে। এমনকি গভীর নলকূপ না থাকায় বর্তমানে খেতে সেচ দেওয়ার মতো পানি নেই। তাই ফসল উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক কৃষক সেচ সংকটে পড়ে জমি পতিত রাখতে বাধ্য হচ্ছেন।’
বিপ্লব বিশ্বাস নামে আরেক কৃষক বলেন, ‘আগে খালে সারা বছর পানি থাকত। কিন্তু চলতি মৌসুমে খালটি আকস্মিক পানিশূন্য হয়ে পড়ে। সেচের অভাবে চাষাবাদ বন্ধ হয়ে গেলে আমাদের সংসার চলবে কীভাবে? কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে অধিকাংশ পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস ফসল উৎপাদন। ফলে খাল শুকিয়ে যাওয়ায় শুধু জমির ক্ষতি হবে না, বরং পুরো এলাকার অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
স্থানীয় বাসিন্দা আনিছুর রহমান সিকদার বলেন, ‘মাহালিয়া খাল পানিশূন্য হয়ে পড়ায় শত শত একর জমি সেচ সংকটে পড়েছে। এতে ফসল উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। খালটি গত বছর বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) পুনঃখনন করে। কিন্তু পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। দ্রুত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে আগামী মৌসুমেও একই পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ইদ্রিছ খান বলেন, ‘ছোট ছোট খাল ও জলাশয় গ্রামীণ কৃষির প্রাণ। বর্ষার পানি দ্রুত নেমে গেলেও তা সংরক্ষণের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় সেচ জটিলতা দেখা দিয়েছে। এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য খাল দখলমুক্ত রাখা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং পানি সংরক্ষণে স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি। পাশাপাশি স্থানীয় কৃষকদের নিয়ে পানি ব্যবস্থাপনা কমিটি গঠন করা হলে টেকসই সমাধান সম্ভব।’
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, ‘মাহালিয়া খালের বর্তমান পরিস্থিতি আমরা গুরুত্বসহকারে পর্যবেক্ষণ করছি। ফসলি জমিতে সেচব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে পার্শ্ববর্তী রামদা খাল থেকে বিএডিসির সহায়তায় পাইপের মাধ্যমে মাহালিয়া খালে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে। এতে কৃষকরা জমিতে নিরবচ্ছিন্নভাবে সেচ দিতে পারছেন। এ ছাড়া এ খালে পানি সংরক্ষণের জন্য একটি নতুন প্রকল্প গ্রহণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।’