টুক টুক টুক দরজায় শব্দ। কেউ এসেছে। এত সকালে কে এল। ফাহাদ অবশ্য আজ সকালেই উঠেছে। বন্ধের দিন সে ইচ্ছেমতো ঘুমাতে পারে, কিন্তু সেই দিনই সকাল সকাল ঘুম ভেঙে যায়।
- ফাহাদ দেখ কে এল। মা রান্নাঘর থেকে চেচালেন।
- দেখি। ফাহাদ একটা বই পড়ছিল। বই রেখে গেল দরজা খুলতে।
দরজা খুলে অবাক হল। একটা বেশ বুড়ো লোক দাঁড়িয়ে আছে দরজায়। চেহারাটা দেখলে মায়া লাগে কাঁধে বিশাল একটা বস্তার মতো কিছু।
- কাকে চান?
- কেউরে চাই না বাবা, আমি একজন ফেরিওয়ালা।
- কি ফেরি করেন?
- বাতাস
- মানে?
- বাতাস ফেরি করি বাবা বাতাস। এই যেমন ধর আমাদের ঢাকা শহরটার বাতাস দূষিত হয়া গেছে। ভালো বাতাস নাই। আমি ভালো বাতাস ফেরি করি। আমার কাছে আছে সমুদ্রের বাতাস, নদীর পারের বাতাস, অনেক উঁচু পাহাড়ের বাতাস, গভীর জঙ্গলের বাতাস ... দাম বেশি না। তুমি ছোড মানুষ তোমারে আরও কমে দিমু। তোমার এখন বারন্ত বয়াস তোমার ফ্রেশ বাতাস দরকার.. ফাহাদের লোকটাকে পাগল মনে হলো। বাতাস কেউ আবার কিনে নাকি। বলেই ফেলল
- বাতাস আবার কেউ কিনে নাকি?
- এক সময় কেউ ভাবছিল পানি কিইনা খাইব। এখন একটা পানির বোতল বিশ টাকা। আমার বাতাসের বোতলও বিশ টাকা।
- আচ্ছা আপনার কাছে সেন্টমার্টিনের বাতাস আছে?
- আছে, দাম একটু বেশি পরব এই ধর ত্রিশ টাকা। সেই জাহাজে কইরা সেন্টমার্টিনের গিয়া আনতে হয়তো খরচে পোষায় না। আমার কাছে সাজেকের বাতাসও আছে। আজকালতো অনেকে সাজেক যায় বেড়াতে।
ফাহাদের বেস্ট ফ্রেন্ড অমলরা সেন্টমার্টিনের বেড়াতে গেছে। সে মেসেজ করেছে সে মার্টিনের বাতাস নাকি দারুণ ফ্রেশ।
- আচ্ছা আমি একটা সেন্টমার্টিনের বাতাস কিনব।
লোকটা তখন তার কাঁধের উপর থেকে বিশাল ব্যাগটা নামায়। মা ভেতর থেকে চেচান।
- ফাহাদ কার সঙ্গে কথা বলিস? কে এসেছে?
- একজন ফেরিওয়ালা মা
- বলে দাও আমাদের কিছু লাগবে না।
- এই যে নেও লোকটা দুটো লম্বা ধরনের বোতল বের করল। তার বস্তা থেকে। ‘এইখানে চাপ দিবা বাতাস বাইরাতে থাকবে মুখের কাছে নিবা দেখবা কি মজা। একদম ফ্রেশ সেন্টমার্টিনের সমুদ্রের বাতাস।
- আমি একটা বোতল নিব
- দুইটা নেও বিশ টাকা কইরাই দিও। বেচা-বিক্রি নাই। মানুষ বাতাস কিনতে চায় না।
শেষ পর্যন্ত সত্যি সত্যিই দুটো বোতল কিনে ফেলল চল্লিশ টাকায়। ফাহাদের জমানো এক শ টাকা আছে। লোকটাকে বিদায় দিয়ে দুই বোতল নিয়ে ঘরে ঢুকছে ফাহাদ। মা খেয়াল করলেন ব্যাপারটা। ভ্রু কুচকে গেল মা’র।
- কি কিনলি?
- বাতাস, সেন্টমার্টিনের বাতাস।
- মানে??
- এই বোতল দুটায় সেন্টমার্টিনের সমুদ্রের বাতাস ভরা আছে। মাত্র বিশ টাকা করে দু বোতল কিনলাম। এই যে এখানে চাপ দিলে বাতাস বেরুবে মুখের কাছে ধরতে হবে। একদম সেন্টমার্টিনের ফ্রেশ বাতাস। মা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলেন কিছুক্ষণ। তারপর একটু ছোটখাটো হুঙ্কার দিলেন ‘টাকা বেশি হয়েছে না? টাকা কামড়ায়? বাতাস কিন...??’ মা গজ গজ করতেই থাকলেন। ফাহাদ অবশ্য গুরুত্ব দিল না তার মা এমনই। কিছুক্ষণ গজ গজ করবেন তারপর ভুলে যাবেন, হয়ত রাতে এস উলেআা বলবেন ‘দেখি তোর সেন্টমার্টিনের বাতাস কেমন?’
ফাহাদ রুমে ঢুকে গিয়ে বিছানায় বসে একটা বোতল মুখের কাছে যেখানটায় চাপ দেওয়ার কথা সেখানে চাপ দিল। আর কি আশ্চর্য আচমকা একটা অদ্ভুত সুন্দর বাতাসের ধাক্কা এসে তার মুখ শরীরের চারপাশটায় ছড়িয়ে গেল। বেশ অনেকক্ষণ ধরে অনুভূতিটা রইল। ফাহাদের মনে হলো এই বোতলটার দাম মাত্র বিশ টাকা না, এর দাম ২০০ টাকা হওয়া উচিত ছিল। সে সঙ্গে সঙ্গে অমলকে মেসেজ করল-
- আমিও সেন্টমার্টিনের বাতাস অনুভব করলাম এই মাত্র।
- কিভাবে?
- সেন্টমার্টিনের বাতাসের বোতল কিনেছি দুটো।
অমল একটা রাগের ইমো দিল। সে কি ভেবেছে তার সঙ্গে ইয়ার্কি মারছে ফাহাদ। হো হো করে হাসল ফাহাদ। মা উঁকি দিলেন ‘কিরে পাগলের মতো হাসছিস কেন একা একা? তোর হয়েছেটা কি আজ ??’
ফাহাদ মা’র কথার উত্তর দিল না। মা’দের সব কথার উত্তর না দিলেই বা কি? মা’রা সব জানে অবার অনেক কিছু জানেও না। যেমন এই সমুদ্রের বাতাস ভরা বোতলটার কথা।
কলি