ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ২০২৪ সালে একুশে পদক পেয়েছেন বাংলাদেশের অন্যতম জনপ্রিয় ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন। সুকুমার বড়ুয়ার পরেই দ্বিতীয় শিশুসাহিত্যিক ও ছড়াকার হিসেবে তিনি এ সম্মানে ভূষিত হলেন। একুশে পদক প্রাপ্তি ও শিশুসাহিত্য নিয়ে তাঁর সঙ্গে আলাপচারিতার গল্প শোনাচ্ছেন আহমেদ রিয়াজ
বাংলাদেশের শিশুসাহিত্য ও আপনার একুশে পদক প্রাপ্তি-দুটো বিষয়কে কীভাবে মূল্যায়ণ করেন
বাংলাদেশের ছড়া এবং বাংলাসাহিত্যের ছড়া নিয়ে আমার উচ্চাশা আগেও ছিল এখনও আছে। একটা জীবন আমি ছড়া ও শিশুসাহিত্য নিয়ে কাজ করেছি। যে কোনো স্বীকৃতি একজন লেখকের জন্য আনন্দের এবং অনুপ্রেরণার। আমার এই একুশে পদকপ্রাপ্তি আমার জন্যও অনেক আনন্দের এবং অনুপ্রেরণার এবং গৌরবের নি:সন্দেহে। কারণ এই পদকটি রাষ্ট্রের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সম্মান। এই সম্মানটি যাকে দেওয়া হয় এটা তার সারা জীবনের অর্জন।
ছড়া লিখে শিশুসাহিত্য করে একটা জীবন পার করেছি। আমার প্রথম লেখা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭২ সালে দৈনিক ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরে। সেই হিসেবে আমার লেখালেখির বয়স পঞ্চাশ ছাড়িয়ে বায়ান্ন তিপ্পান্ন বছর। এর আগে আমি ২০০৭ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সাহিত্য সম্মাননা বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছি। এটা তার চেয়েও বড় কিছু, অনেক বড় প্রাপ্তি। আমি খুব গৌরব বোধ করছি। আমার রাষ্ট্র আমার সরকার আমাকে স্বীকৃতি দিয়েছে।
আমাদের ছড়া অনেক বেশি উন্নতমানের। আমাদের প্রচুর ছড়াকার রয়েছেন যারা নিরলশভাবে ছড়াচর্চা করে যাচ্ছেন। নিজেকে দিয়েই যদি বলি, আমার ছড়ার প্রধান উপজীব্য হচ্ছে- বাংলাদেশ, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ। আমার মতো আমাদের সব ছড়াকার এসব নিয়ে প্রচুর লেখালেখি করছেন। আমাদের জীবনের ব খুব গুরুত্বপূর্ণ। ব-তে বাংলাদেশ, ব-তে বাংলা ভাষা, ব-তে বাংলা সংস্কৃতি, ব-তে বঙ্গবন্ধু। ভাষা কেন্দ্রীক একটি রাষ্ট্র হয়েছে আমাদের। রাষ্ট্রের ভাষা আন্দোলনকে কেন্দ্র করে আমরা স্বাধীনতায় পৌঁছেছি। সুতরাং একুশ আমাদের চেতনার শেকড়ের প্রধানতম অনুষঙ্গ। আমাদের শিশুসাহিত্যিকরা এ বিষয়গুলো মাথায় রেখে গভীর মমতায় সেই বিষয়গুলো লেখেন। আমি বঙ্গবন্ধু, বাংলাদেশ, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা, স্বাধীনতা বিরোধী, বঙ্গবন্ধু বিরোধী, বঙ্গবন্ধুবিদ্বেষীদের চিত্রিত করি ছড়ায়।
বাংলাদেশে বহুদিন ইতিহাস বিকৃতি হয়েছে, তার বিরুদ্ধে আমরা ছড়াকাররা লিখেছি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের পর প্রথম প্রতিবাদ এসেছিল ছড়াকারদের কাছ থেকে। বঙ্গবন্ধু হত্যার পর প্রথম ছড়া সংকলনটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৭৮ সালের ২১ ফেব্রæয়ারি। ‘এ লাশ আমরা রাখব কোথায়?’ শিরোনামের সে সংকলনে বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে ২৮ জন ছড়াকারের ছড়া প্রকাশিত হয়েছিল। ছাড়া লিখেছিলেন, অন্নদাশংকর রায় থেকে শুরু করে কিশোর ছড়াকার লুৎফর রহমান রিটন পর্যন্ত। সেই ইতিহাসের অগ্রযাত্রায় আমিও সামিল ছিলাম। এবং সময়ের সাহসী সন্তানেরা পরিস্থিতি পাল্টে দিয়েছি। এক সময় বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করা যেত না, সে অবস্থায় প্রথম প্রতিবাদ করেছিল ছড়াকাররা। আমি তাদেরই একজন।
আমি ছেলেবেলায় ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে দুবার বঙ্গবন্ধুর স্নেহের পরশ পেয়েছি আমার চিবুকে, আমার গালে, আমার মাথায়, আমার হাতে। আজ এত বছর পরে ২০২৪ সালে তাঁরই সুযোগ্য কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তাঁর হাত থেকে আজ আমি স্মারকটি গ্রহণ করেছি এটা একটা বিরল সৌভাগ্যের ব্যাপার। আমি সেই গৌরবের অধিকারী। কাজ করলে স্বীকৃতি পেলে ভালো লাগে। আমি আনন্দে টইটম্বুর।এর মাধ্যমে আমি মনে করি ছড়ার জয় ঘোষিত হলো। জয় হোক ছড়ার।
বাংলাদেশের শিশুসাহিত্যিকরা রাষ্ট্রীয় সম্মানে কম মূল্যায়িত হওয়ার কারণ কী
বাংলাদেশে শিশুসাহিত্যিকেরা মূল্যায়িত হন না। আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ সাধারণত শিশুসাহিত্যিকদের মূল্যায়ণ করে না। যে কারণে রাষ্ট্রীয় এসব সম্মানের জায়গায় শিশুসাহিত্য খুব একটা থাকে না। শিশুসাহিত্যিকরা এক ধরনের অপাঙক্তেয় হয়ে থাকে সবার কাছে। সর্বত্র শিশুসাহিত্যিকদের মূল্যায়ণ হওয়া দরকার। কারণ শিশুসাহিত্যের মাধ্যমেই শিশুরা বিকশিত হয়।
বাংলাদেশে ছড়াকে জনপ্রিয় করার পেছনে আপনার অনেক অবদান রয়েছে। সেই অবদানগুলো কী কী
ছড়া ছোট মাধ্যম কিন্তু ভীষণ লক্ষ্যভেদী। তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা-এটা কিন্তু একটা ছড়া। যদিও একসময় বড়দের সাহিত্যপাতায় ছড়ার স্থান ছিল না। আমি অনেক কষ্টে সেই জায়গা অর্জন করেছি। বড়দের সাহিত্য পাতায় আমার প্রচুর ছড়া প্রকাশিত হয়েছে। ছড়া শুধু ছোটদের নয়। সমসাময়িক বিষয় নিয়ে আমি ছড়া লিখেছি। দেশের যে কোনো দুর্যোগে আমি ছড়া লিখেছি। আমাদের ছড়া দেয়াল লিখন হয়েছে, ফেস্টুন হয়েছে। আমি ছড়াকে মানুষের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছি। এমন কোনো মাধ্যম নেই আমি যেখানে ছড়া লিখিনি। আমি বেতার, টিভি নাটক, জিঙ্গেল-সবকিছুতেই ছড়া ব্যবহার করেছি। ইলিশ মাছের পোনা মানে জাটকা ধরার বিরুদ্ধে আমি বিটিভিতে বিজ্ঞাপন লিখেছিলাম- মাছের পোনা, দেশের সোনা। যে ধরে জাটকা, তারে ধরে আটকা। এরকম অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।
আমার ছড়াসমগ্রের ভ‚মিকায় অন্নদাশংকর রায় লিখেছিলেন, লুৎফর রহমান রিটন ছড়াকে ড্রইংরুম থেকে রাজপথে নিয়ে গেছেন।
এটা আমার দায়িত্ব। ছড়াকে আমি মানুষের কাছে নিয়ে যেতে চেয়েছি এবং নিয়ে যেতে পেরেছি।
ছড়াকার কিংবা শিশুসাহিত্য নিয়ে আপনার পরামর্শ
ফুলপাখি নদী নিয়েই লিখলে শুধু হবে না, লিখতে হবে সমাজের অবকাঠামোগত বিষয়, অন্যায় অবিচার নিয়ে, মানবিকতার পক্ষে, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে, অসাম্প্রদায়িকতার পক্ষে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, স্বাধীনতার শত্রুদের বিরুদ্ধে। আমি আমার সারাজীবন সেই কাজটাই একাগ্রচিত্তে করেছি।
২০২৪ সালের অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আপনার প্রকাশিত বইগুলো সম্পর্কে জানতে চাই
এ বছর অমর একুশে গ্রন্থমেলায় আমার তিনটি ছড়ার বই প্রকাশিত হয়েছে। ‘খরগোশটা গিটার বাজায়’ নামক বইটি প্রকাশ করেছে চন্দ্রাবতী একাডেমি। ছবি এঁকেছে বাংলাদেশের বিখ্যাত কার্টুনিস্ট কাউছার মাহমুদ।
‘আধখানা ভূত’ নামের বইতে রয়েছে একটি আধখানা ভূতের কাহিনিসহ বিচিত্র সব ভূতের কাহিনি। বইটি প্রকাশ করেছে কিন্ডারবুকস। ছবি এঁকেছে রাজীব দত্ত। রাজীব দত্তের ছবি অবলম্বনে অসাধারণ প্রচ্ছদ করেছেন আজহার ফরহাদ।
একেবারে ছোটদের জন্য ছড়ার বই, ‘বেড়ালছানা ফোন করেছে কুকুরছানার মাকে’। প্রকাশ করেছে খুশবু প্রকাশনী। ছবি এঁকেছেন উদয়।
জাহ্নবী