ডাকপিয়নের হাত থেকে হলুদ খামের চিঠিটা হাতে নিয়ে গুটি গুটি অক্ষরে লেখা দেখেই রিফাতের বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, চিঠিটা কার কাছ থেকে এসেছে। চিঠি দিয়েছে নিলা আপু। নিলা আপুর চিঠি পেলে সত্যিই রিফাতের খুব ভালো লাগে। তাই দেরি না করে রিফাত চিঠি খুলে পড়তে লাগল। নিলা আপুর সঙ্গে রিফাতের পরিচয় মাত্র এক বছরের, কিন্তু এই এক বছরে নিলা আপু রিফাতের অনেক কাছাকাছি চলে এসেছেন। নিলা আপু রিফাতের এক বন্ধুর বড়ো বোন, ওদের বাড়ি সিলেট। গত বছর যখন রিফাত সিলেটে বেড়াতে গিয়েছিল, তখনই নিলা আপুর সঙ্গে তার প্রথম পরিচয় হয়।
নিলা আপুকে প্রথম দেখাতেই রিফাতের খুব ভালো লেগে গেল। মনে মনে ভাবল- ইস, এ রকম যদি আমারও একটা আপু থাকত, তা হলে কী মজাই না হতো!
কিন্তু নিলা আপু যে তাকে এত তাড়াতাড়ি আপন করে নেবেন, সে ভাবতেও পারেনি। প্রথম দেখাতেই নিলা আপু রিফাতকে একেবারে আপন করে নিলেন। ওর বড় বোন নেই শুনে নিলা আপু বললেন, কেনরে আমি তো আছি। সত্যি সেদিন থেকেই নিলা আপু রিফাতের বোন হয়ে গেলেন।
রিফাত যে ক’টা দিন সিলেটে ছিল, সারা দিন নিলা আপুর সঙ্গে বসে বসে গল্প করত আর বিকেলে শান্ত-নির্জন সবুজ চা-বাগানের সরু পথ ধরে হাঁটত, আর দুই চোখ ভোরে আশপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য উপভোগ করত।
মাঝে মাঝে নিলা আপুকে জড়িয়ে ধরে বলত, আপু তুমি আমাকে ভুলে যাবে না তো?
নিলা আপু রিফাতের চিবুক ধরে বলতেন, ধুর পাগল তোকে ভুলব কেন? তুই না আমার ভাই।
নিলা আপুর কথা শুনে রিফাতের বুকে জমে থাকা কষ্টের পাহাড়টা অনেক হাল্কা হয়ে গেল।
নিলা আপুর সঙ্গে ঘুরে বেড়াবার দিন ফুরিয়ে একদিন রিফাতের বাড়ি ফেরার পালা। নিলা আপুকে ছেড়ে যাওয়ার কষ্টে রিফাতের হালকা বুক ভারী হয়ে গেল। সে ভাবছে, ইস নিলা আপু কেন আমার আপন বোন হলো না?
এক সোনালি বিকেলে রিফাতকে বিদায় জানাতে সবাই এল স্টেশনে। রিফাত কাঁপা গলায় নিলা আপুর গলা জড়িয়ে ধরে বলল- আপু চিঠি লিখ। নিলা আপু বলল- তুইও লিখিস।
বিকেলের সোনাঝরা রোদ্দুর নিলা আপুর চোখে-মুখে ছড়িয়ে পড়তেই রিফাত দেখল নিলা আপুর চোখ আষাঢ়ের আকাশের মতো বৃষ্টিতে ভরে গেছে। চোখাচোখি হতেই দুজনের চোখেই বৃষ্টি নামল। এর মাঝে ট্রেনটা ছেড়ে দিল। এক বুক কষ্ট নিয়ে রিফাত ফিরে এলো মায়ের কোলে ঢাকায়।
বাড়ি এসে সবার সঙ্গে শুধু নিলা আপুর গল্প। এর পর প্রতি সপ্তাহে রিফাতের হাতে আসতে লাগল নিলা আপুর হলুদ খামে ভরা মিষ্টি চিঠি।
২.
নিলা আপুর মতো এত সুন্দর করে আর কেউ রিফাতের কাছে চিঠি লেখেনি। চিঠিতে যেমন থাকে আদর ও ভালোবাসা, তেমনি থাকে শাসনও। তাই তো নিলা আপুর চিঠি রিফাতের বারবার পড়েও তৃষ্ণা মেটে না। নিলা আপুর চিঠি পড়তে গেলে রিফাতের মন ছুটে যায় সেই পাহাড়ি ঝরনা ঘেরা সবুজ শ্যামল চা-বাগানের সরু পথে। যেখানে রিফাত প্রতিদিন বিকেলে নিলা আপুর সঙ্গে ঘুরে বেড়াত।
আজও নিলা আপুর চিঠি পড়তে গিয়ে রিফাতের মন ছুটে গেছে সেখানে, যেখানে একদিন নিলা আপু আদর করে রিফাতকে বলেছিল, ধুর পাগল তোকে ভুলব কেন, তুই না আমার ভাই...।