স্বাধীনতার পর যশোরের জগন্নাথপুরের নামকরণ করা হয় মুক্তিনগর। এই মুক্তিনগর রণাঙ্গন দেখতে আসেন বিভিন্ন দেশের সেনা কর্মকর্তা ছাড়াও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এখানে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে মিত্রবাহিনী লড়েছিল বিমান, ট্যাংক, কামান ও মেশিনগানের সাহায্যে।
এই রণাঙ্গনে মিত্রবাহিনী হানাদার বাহিনীর তিনটি স্যাবার জেট বিমান ও ১৩টি চীনা স্যাফে ট্যাংক ধ্বংস করে দিয়েছিল। একপর্যায়ে উভয় পক্ষের গুলি-গোলা ফুরিয়ে গেলে স্কুল মাঠে শুরু হয় ‘হাতাহাতি যুদ্ধ’।
১৯৭১ সালে আমার বয়স ছিল ১৭-১৮ বছর। তখন মাধ্যমিকে পড়তাম। একাত্তর সালের বৈশাখ মাসে আমাদের জগন্নাথপুর গ্রামে ১৮ জনকে হানাদার বাহিনী লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করে। বাড়িঘর ভাঙচুর করে। দু-একটি বাড়িতে আগুনও ধরিয়ে দেয়। এই বীভৎস ঘটনার পর শরীরের রক্ত গরম হয়ে যায়। এদিন বাড়ির কাউকে কিছু না বলে ৬টি মুরগির বাচ্চা সঙ্গে নিয়ে সীমান্ত পাড়ি দিই।
যুদ্ধ করব বলে বনগাঁয় গিয়ে আওয়ামী লীগ অফিসে ওঠি। ওইখান থেকে আমাকে চাপাবেড়ে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে এক মাস শুধুমাত্র লাঠি দিয়ে ট্রেনিং নিই। এরপর ভারতীয় সেনাবাহিনী মেডিকেল করে বিহারের চাকুলিয়া ক্যাম্পে নিয়ে যায়। এখানে থ্রি নট থ্রি, স্টেনগানসহ বিভিন্ন অস্ত্র চালানোর ট্রেনিং দেওয়া হয়।
আমাদের ২২ ঘণ্টাও ফায়ারিং করতে হয়েছে। ২৯ দিন ট্রেনিং নেওয়ার পর অস্ত্র দিয়ে কলকাতায় পাঠানো হয়। এখান থেকে যুদ্ধের জন্য চুয়াডাঙ্গা দর্শনা সীমান্তের ওই পাশে বানপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে রাখা হয়। মেজর মঞ্জুরের কমান্ডে চুয়াডাঙ্গা ও মেহেরপুর এলাকার ৯টি যুদ্ধে আমরা অংশ নিয়েছি। আমাদের গ্রুপে মোট ৬০ জন গেরিলা সদস্য ছিলেন। আমরা নদী-পুকুরের গলাপানিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে ফায়ার করেছি।
আগস্ট মাস থেকে মেজর মঞ্জুরের নির্দেশে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা দর্শনা, জীবননগর, হাঁসদহ, খালিশপুর, কোটচাঁদপুর, কাপাশডাঙ্গা, কালীগঞ্জসহ কিছু নির্দিষ্ট এলাকায় এত বেশি মাইন পাতি যে, পাকিস্তানি বাহিনীকে ট্রেনের সামনে বালির গাড়ি লাগিয়ে চলাচল করতে হতো। মুক্তিযোদ্ধারা যেন মাইন লাগাতে না পারেন, সেজন্য গ্রামবাসীকে লণ্ঠনসহ রাতে পাহারা দিতে বাধ্য করত পাকিস্তানি বাহিনী।
দর্শনার পাশে হাঁসদহ যুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর চারজন বীর শহিদ হন। তাদের মরদেহ বানপুর মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয়। তাদের পূর্ণ নাম-ঠিকানা আমাদের কারও জানা ছিল না। ক্যাম্পের পাশেই আমরা তাদের দাফন করি। এখনো হয়তো তাদের আত্মীয়স্বজনরা জানেন না এই সমাধির কথা। সেই মর্মান্তিক ঘটনা এখনো আমাকে পীড়া দেয়।
বীর মুক্তিযোদ্ধা
অনুলিখন : এইচ আর তুহিন