দীর্ঘদিনের কর্মস্থল বাংলা একাডেমি এবং কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধায় সিক্ত হয়ে মিরপুরের শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে শায়িত হলেন প্রাবন্ধিক, গবেষক, সাহিত্য সমালোচক ও সমাজ বিশ্লেষক আবুল কাসেম ফজলুল হক। গতকাল সোমবার বেলা সোয়া ৩টার দিকে তার দাফন শেষ হয়।
এর আগে সকালে বাংলা একাডেমিতে আবুল কাসেম ফজলুল হকের জানাজা হয়। সেখানে তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সহকর্মী, শিক্ষার্থী, লেখক, সাহিত্যিক ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
কলা ভবনের সামনে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে দুপুর পৌনে ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় জামে মসজিদে আনা হয় মরদেহ। সেখানে বাদ জোহর জানাজা শেষে মরদেহ নেওয়া হয় মিরপুর শহিদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে।
রবিবার বিকেলে মিরপুরের একটি হাসপাতালে মারা যান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান ও বাংলা একাডেমির সভাপতি আবুল কাসেম ফজলুল হক। তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর।
গতকাল বাদ ফজর মিরপুরে পল্লবীর মসজিদুল আমান মসজিদে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর সকাল ১০টায় শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তার কর্মস্থল বাংলা একাডেমিতে নেওয়া হয় মরদেহ। একাডেমির নজরুল মঞ্চে তার কফিন রাখা হলে একে একে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন সহকর্মী, লেখক, সাহিত্যিকসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
এ ছাড়া অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের প্রতি শ্রদ্ধা জানান সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে নিতাই রায় চৌধুরী বলেন, অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হকের অসমাপ্ত কাজ ও স্মৃতি ধরে রাখতে যা যা করণীয় তা সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় করবে। পরে বাংলা একাডেমিতে আবুল কাসেম ফজলুল হকের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেখান থেকে বেলা ১১টায় সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা জানাতে মরদেহ নেওয়া হয় কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারে। সেখানে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চলে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব। জাতীয় কবিতা পরিষদের আয়োজনে অনুষ্ঠিত ওই পর্বে শেষবারের মতো ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংগঠনসহ সর্বস্তরের মানুষ।
শ্রদ্ধা নিবেদন করতে এসে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, মস্তিষ্ক কারও কাছে বন্ধক না রেখে আজকের তরুণ প্রজন্ম যদি স্যারকে অনুসরণ করে, একজন চিন্তাশীল মানুষ হয়, তবে সেটিই হবে স্যারের প্রতি সর্বশ্রেষ্ঠ শ্রদ্ধা।
তার মৃত্যুর শূন্যতা পূরণ হওয়ার না উল্লেখ করে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, যখন দেশ-জাতি কোনো সংকটের মধ্যে পড়েছে, তখনই আবুল কাসেম ফজলুল হক তার বক্তৃতা-লেখনীর মাধ্যমে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। আবুল কাসেমের শিক্ষার্থী এবং বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আজম বলেন, ‘তার একটা চমৎকার জীবনী প্রণয়ন হওয়া উচিত, কেননা তার জীবনী আমাদের জন্য পাথেয় হয়ে থাকবে।’ বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি রেজাউদ্দীন স্টালিন বলেন, তিনি কখনো ভয় পেয়ে কথা বলা বন্ধ করেননি, কোনো শক্তিই তার কণ্ঠকে অবদমিত করতে পারেনি। উগ্রবাদীরা তার সন্তানকে হত্যা করার পরও তিনি দমে যাননি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে বাবার জন্য দোয়া চেয়ে প্রয়াত অধ্যাপকের মেয়ে শুচিতা শারমিন বলেন, ‘সবাইকে নিয়ে আমার বাবা কাজ করতে চেয়েছিলেন। সব সময় চেষ্টা করেছেন সবাইকে সঙ্গে নিয়ে দেশের উন্নয়নের জন্য, দেশের মানুষের যাতে ভালো হয়, সেই লক্ষ্যে কাজ করতে। তিনি সবাইকে অনুপ্রাণিত করেছেন। আমি বিশ্বাস করি, আমরা সবাই তার দেখানো সেই আদর্শের পথেই চলব।’
দুপুর প্রায় ১২টায় শহিদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষ হতে না হতে বৃষ্টি শুরু হয়। এর মধ্যেই শেষ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য দীর্ঘদিনের কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আবুল কাসেম ফজলুল হকের মরদেহ নেওয়া হয়। দুপুর ১২টা ২০ মিনিটে মরদেহবাহী ফ্রিজার ভ্যানগাড়ি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে পৌঁছায়। এ সময় বৃষ্টির বেগ আরও বাড়তে শুরু করে। অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব হওয়ার কথা থাকলেও মুষলধারে বৃষ্টির কারণে কলা ভবনের প্রধান ফটকের সামনে তা করা হয়। শুরুতেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের পক্ষ থেকে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন বিভাগ ও সংগঠন শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম বলেন, ‘এমন একজন মানুষ চলে যাওয়ায় অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। তার জীবন-চিন্তা ও আদর্শ আমরা চর্চা করব, যাতে তিনি তার কর্মের মাধ্যমে বেঁচে থাকেন।’