ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা সংগ্রহে অব্যবস্থাপনার কারণে দেশে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। গত মার্চের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও এর উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে ৩৯ হাজার ৩২৫ জন শিশু। এর মধ্যে ২৮৪ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে, যাদের বেশিরভাগই শিশু।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী সায়েন্সের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের টিকা সংগ্রহ নীতিতে পরিবর্তনের ফলে দেশজুড়ে টিকার তীব্র সংকট তৈরি হয়, যা বর্তমান পরিস্থিতিকে মহামারির রূপ দিয়েছে।
হাসপাতালগুলোর করুণ চিত্র
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, হামের প্রাদুর্ভাবে ঢাকার হাসপাতালগুলোতে চরম সংকট তৈরি হয়েছে। সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালগুলো রোগীতে উপচে পড়ছে। শয্যা সংকটের কারণে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হামের প্রকোপে অন্য রোগের চিকিৎসা নিতে আসা শিশুরাও সংক্রমিত হয়েছে এবং অনেকেই মৃত্যুবরণ করেছে।
গত ৭ এপ্রিল ঢাকা শিশু হাসপাতালে কণিকা আক্তারের ছয় মাস বয়সি যমজ কন্যা রিসা হামে মারা যায়। একই আইসিইউ বেডে তার আরেক কন্যা রুহি এখনও মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে এ ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে। সারা দেশে তখন সরকারের অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমালোচনার ঝড় ওঠে।
সংকটের সূত্রপাত
বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে শিশু টিকাদানে ঈর্ষণীয় সাফল্যের জন্য বিশ্বব্যাপী প্রশংসিত হয়ে আসছিল। ইউনিসেফ এবং গাভি (Gavi)-এর সহায়তায় নিয়মিত হাম-রুবেলা (MR) টিকা দেওয়া হতো। কিন্তু সায়েন্স ম্যাগাজিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে উন্মুক্ত দরপত্র (ওপেন টেন্ডার) পদ্ধতিতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়।
ইউনিসেফ সে সময় এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে সতর্ক করেছিল যে, এর ফলে টিকাদান ব্যবস্থা ভেঙে পড়তে পারে এবং বড় ধরনের প্রাদুর্ভাব দেখা দিতে পারে।
নতুন দরপত্র প্রক্রিয়ায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে টিকার সরবরাহ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। ফলে দেশজুড়ে রুটিন টিকাদান মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।
প্রাদুর্ভাবের বিস্তার ও ঝুঁকি
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, এই প্রাদুর্ভাব শুরু হয় চলতি বছরের জানুয়ারিতে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এবং দ্রুতই তা দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৫৮টিতে ছড়িয়ে পড়ে।
আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা এ.এস.এম. আলমগীর জানান, ২০২৪ সাল থেকে দেশে ভিটামিন-এ বিতরণের তিনটি ক্যাম্পেইন বন্ধ ছিল। শিশুদের অপুষ্টি ও ভিটামিন-এ-এর ঘাটতি হামের মৃত্যুহার আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
জবাবদিহিতা ও আইনি পদক্ষেপ
এই ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণে সরকারের বিরুদ্ধে সমালোচনা ও ক্ষোভ বাড়ছে। ১২ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী বিপ্লব কুমার দাস দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ দায়ের করেন, যেখানে টিকা সংগ্রহে ব্যর্থতা ও দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. সায়েদুর রহমান সায়েন্সকে দেওয়া এক ইমেইলে বলেন, স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই তারা জরুরি আইনের পরিবর্তে প্রচলিত নিয়মে টিকা কেনার উদ্যোগ নেন। তবে কোথায় ভুল হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
বর্তমান নির্বাচিত সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানানো হয়েছে। ৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সি শিশুদের জন্য জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, সংক্রমণের দ্রুত বিস্তারের কারণে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সময় লাগতে পারে।
রাজু/রিফাত/