ঈদের নামাজ আল্লাহর এক বিশেষ নিআমত। এই নামাজের প্রতিটি বিধান মেনে, প্রতিটি সুন্নত আঁকড়ে ধরে যে মুমিন ঈদগাহে দাঁড়ান—তার সেই দাঁড়ানো শুধু নামাজ নয়, এটি আল্লাহর সামনে পূর্ণ আনুগত্যের এক নীরব ঘোষণা। এই নামাজে যোগ দিতে পারা মানে লক্ষ কোটি মুসলমানের সাথে এক কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর শুকরিয়া জানানোর সুযোগ পাওয়া। তাই এই নামাজের প্রতিটি মাসআলা জানা এবং মেনে চলা প্রতিটি মুমিনের জন্য জরুরি। ঈদের নামাজ বছরে মাত্র দুইবার আসে। এই নামাজের প্রতিটি তাকবির, প্রতিটি সুন্নত—সবকিছু সঠিকভাবে আদায় করা প্রতিটি মুমিনের জন্য জরুরি। কারণ এই নামাজের মাধ্যমে একজন মুসলমান পুরো উম্মাহর সাথে একই কাতারে দাঁড়িয়ে আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করেন।
নিয়ত মুখে উচ্চারণ করা কি জরুরি—ঈদ বা যেকোনো নামাজ, রোজা বা অন্যান্য আমলের ক্ষেত্রে অন্তরের সংকল্পই নিয়ত হিসেবে যথেষ্ট। মুখে উচ্চারণ করা জরুরি নয়, তবে নিষেধও নয়। কেউ ইচ্ছার দৃঢ়তার জন্য মুখেও উচ্চারণ করতে চাইলে নিজের মাতৃভাষায় করবেন—প্রচলিত আরবি নিয়তের পেছনে পড়ার প্রয়োজন নেই। (উমদাতুল কারি: ১/৩৩; শরহুল মুনইয়া, পৃষ্ঠা: ২৫৪; আদ্দুররুল মুখতার: ১/৪১৫)
ঈদের নামাজের পরিপূর্ণ নিয়ম ঈদের নামাজ দুই রাকাত। নিয়ত করে তাকবিরে তাহরিমা বলে নামাজ শুরু করবেন। এরপর ছানা পড়বেন। ছানা পড়ার পর পরপর তিনটি তাকবির বলবেন—’আল্লাহু আকবার’, ‘আল্লাহু আকবার’, ‘আল্লাহু আকবার’। প্রথম দুটি তাকবিরে উভয় হাত কানের লতি পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দেবেন—বাঁধবেন না। তৃতীয় তাকবিরে হাত উঠিয়ে বেঁধে নেবেন। এরপর সুরা-কেরাত পড়ে রুকুতে যাবেন। দ্বিতীয় রাকাতে সুরা-কেরাত পড়ার পর রুকুতে যাওয়ার আগে একইভাবে তিনটি তাকবির বলবেন। তবে এবার তৃতীয় তাকবিরেও হাত বাঁধবেন না। এরপর চতুর্থ তাকবির বলে রুকুতে যাবেন। বাকি নামাজ অন্যান্য নামাজের মতোই শেষ করবেন। (কিতাবুল আসল: ১/৩১৯; আলহাবিল কুদসি: ১/২৪৩)
নামাজে সুন্নত কেরাত—রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদের নামাজে প্রথম রাকাতে সুরা আলা এবং দ্বিতীয় রাকাতে সুরা গাশিয়াহ পড়তেন। অথবা প্রথম রাকাতে সুরা কাফ এবং দ্বিতীয় রাকাতে সুরা কামার পড়তেন। (মুসলিম, হাদিস: ৮৭৮; নাসায়ি, হাদিস: ১৫৬৭)
এই সুরাগুলো পড়া সুন্নত। তবে অন্য যেকোনো সুরাও পড়া যাবে। জুমার নামাজের মতো ঈদের নামাজেও কেরাত উচ্চৈঃস্বরে পড়া ওয়াজিব। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত—
كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَجْهَرُ بِالْقِرَاءَةِ فِي الْعِيدَيْنِ وَفِي الِاسْتِسْقَاءِ
‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঈদ ও ইস্তেসকার নামাজে কেরাত উচ্চৈঃস্বরে পড়তেন।’ (সুনানে দারাকুতনি, হাদিস: ১৮০৩)
তাই ইমাম উভয় রাকাতেই উচ্চৈঃস্বরে কেরাত পড়বেন।
তাকবিরের সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তি নয়—ঈদের নামাজে অতিরিক্ত তাকবিরের সংখ্যা নিয়ে হাদিস ও আছারে একাধিক বর্ণনা এসেছে। কোনো বর্ণনায় দুই রাকাতে মোট বারোটি তাকবিরের কথা আছে, কোনো বর্ণনায় ছয়টির কথা। এই প্রতিটি সংখ্যাই সহিহ ও আমলযোগ্য।
ইমাম আহমাদ (রহ.) বলেছেন—
اخْتَلَفَ أَصْحَابُ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي التّكْبِيرِ وَكُلّهُ جَائِزٌ
‘তাকবিরের সংখ্যা নিয়ে সাহাবায়ে কেরামের মধ্যে মতভেদ রয়েছে—তবে সবগুলোই জায়েজ ও আমলযোগ্য।’ (আলফুরু, মাকদিসি: ৩/২০১)
সুতরাং বাংলাদেশে হানাফি মাজহাব অনুযায়ী যে ছয় তাকবিরে ঈদের নামাজ পড়া হয়—এটি পূর্ণ সুন্নতসম্মত। এ নিয়ে বিভ্রান্তি বা বিতর্কে না জড়ানোই উচিত।
তাকবির নিয়ে সন্দেহ হলে করণীয়—অতিরিক্ত তাকবিরের সংখ্যা নিয়ে সন্দেহ হলে কম সংখ্যা ধরে বাকি তাকবির আদায় করবেন। যেমন—দুই না তিন তাকবির হয়েছে সন্দেহ হলে দুই ধরে বাকি একটি বলে নেবেন।
ভুলে তাকবির না বলে কেরাত শুরু করলে করণীয়—ইমাম যদি প্রথম রাকাতে ভুলে অতিরিক্ত তাকবির না বলে কেরাত শুরু করে দেন, তাহলে কেরাত অবস্থায় মনে পড়লে কেরাত থামিয়ে তাকবিরগুলো বলে নেবেন। এরপর পুনরায় কেরাত পড়বেন। কেরাত শেষে মনে পড়লে তাকবির বলে রুকুতে চলে যাবেন। (আততাজরিদ, কুদুরি: ২/৯৮৪; শরহুল মুনইয়া, পৃষ্ঠা: ৫৭২)
ভুলে তাকবির ছাড়া রুকুতে চলে গেলে করণীয়—ইমাম অতিরিক্ত তাকবির ভুলে রুকুতে চলে গেলে তাকবির বলার জন্য রুকু থেকে ফিরে আসবেন না। রুকুতেও তাকবির বলবেন না। নামাজ শেষে সিজদায়ে সাহু করে নেবেন—তবে কেবল ছোট জামাতের ক্ষেত্রে। (আততাজরিদ, কুদুরি: ২/৯৮৬; রদ্দুল মুহতার: ২/১৭৪)
কেউ ভুলে রুকু থেকে ফিরে এলে কোনো কোনো ফকিহ নামাজ ফাসেদ হওয়ার কথা বললেও বিশুদ্ধ মত হলো—কাজটি ভুল হলেও এ কারণে নামাজ নষ্ট হবে না। (রদ্দুল মুহতার: ২/১৭৪)
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক