চব্বিশের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান-পরবর্তী অন্তর্বর্তী সরকারের বিগত প্রায় ১৪ মাস মোটেও দীর্ঘ সময় নয়, এ সময়ে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে সংস্কার বা বড় মাপের পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত হলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে তার দৃশ্যমান বাস্তবায়ন তেমন সম্ভব ছিল না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে অগ্রগতি যে হয়নি তা নয়। কিছু তো অবশ্যই হয়েছে। যে কারণে সরকার স্বীকৃতি দাবি করতেই পারে। দেশের একটি নেতৃস্থানীয় ‘থিংক ট্যাংক’ তো দেখলাম ঘোষণাই দিয়েছে, তারা এখন সংস্কার তদারকি (‘রিফর্ম ওয়াচ’) করতে থাকবে। নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় উদ্যোগ, তার মানে সংস্কার কিছু না কিছু হচ্ছে।
আমার দীর্ঘ শিক্ষকতা ও পেশাগত জীবনে উন্নয়নের যেসব ক্ষেত্রে কিছু না কিছু গবেষণা করেছি বা খোঁজখবর নিয়েছি, তার মধ্যে রয়েছে দেশের উচ্চশিক্ষার নীতিনির্ধারণ ও প্রয়োগ, পরিবেশ পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও নীতিমালা প্রণয়নের ভূমিকা রাখা, দেশের আঞ্চলিক উন্নয়নে বৈষম্য হ্রাসের চিন্তা ও বিশেষ করে গ্রাম ও শহরের মধ্যে ঐতিহাসিক বৈষম্য কমিয়ে আনার কথা ভাবা ও জাতীয় উন্নয়নে সুষম নগরায়ণের যে অসীম সম্ভাবনা, সে কথা তুলে ধরা। নগর বিশেষের সুসমন্বিত সার্বিক আদর্শ উন্নয়ন চিন্তাও ছিল আমার পেশাগত দায়িত্ব। সৌভাগ্য যে, উপরোক্ত ক্ষেত্রগুলোর অধিকাংশের সঙ্গেই আমার ব্যক্তিগত সংশ্লিষ্টতা ছিল, তবে অভিজ্ঞতা অনেক ক্ষেত্রেই ছিল হতাশাজনক।
উচ্চশিক্ষা বা সামগ্রিকভাবে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার বিশেষ কোনো সংস্কার কমিশন গঠন করেনি, একথা যেমন ঠিক তেমনি প্রশ্ন করা যায়- বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় কমিশন বা অন্য কোনো সংস্থা কি নিজ উদ্যোগে উচ্চশিক্ষার বাস্তব সংস্কার (বা অধিকতর উন্নয়ন) চিন্তার জোরালো উদ্যোগ নিতে পারত না?
আমাদের নগরগুলোর অসংখ্য সমস্যা, কোনোটির চেয়ে কোনোটি কম জটিল নয়। তবে সব সমস্যার মূলে রয়েছে নগরের পরিচালনগত (‘গভর্নেন্স’) সমস্যা বা ব্যবস্থাপনার সমস্যা। যদি কোনো নগর সংস্কার চিন্তা করতে হয় তাহলে নগর-পরিচালন সংস্কার সবার আগে এবং সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। এরকম একটি ভাবনার সময় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে নেই। পরবর্তী কোনো দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচিত সরকার সে দায়িত্ব নিতে পারে।...
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে পরিবেশ নিয়ে বেশ কিছু প্রশংসনীয় উদ্যোগ চোখে পড়েছে। একই সঙ্গে কিছু বিষয় জনমনে গভীর প্রশ্ন তৈরি করেছে, অগ্রগণ্য গণবুদ্ধিজীবীদের কেউ কেউ শক্ত সমালোচনা করেছেন।
দেশে আঞ্চলিক বৈষম্য দূরীকরণের বিষয়টি খুবই দীর্ঘমেয়াদি। বিভাগীয় পর্যায়ে, জেলা পর্যায়ে, এমনকি উপজেলা পর্যায়ে সুষম উন্নয়ন ভাবনা খুবই জরুরি। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক দর্শন। ইতোমধ্যে প্রদেশ গঠনের চিন্তা মাথাচাড়া দিচ্ছিল। উত্তম যে, বর্তমান সরকার এ ভাবনাকে গুরুত্ব দেয়নি। গ্রাম-শহরবৈষম্য বিগত ৫৪ বছরে সম্ভবত অনেকটা কমেছে। অতি সম্প্রতি দেশের একটি সুপরিচিত বেসরকারি গবেষণা সংস্থা একটি প্রশংসনীয় জরিপ সম্পাদন করেছে। তাতে দেখা যায়, পল্লি এলাকায় মানুষের পারিবারিক আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, পাশাপাশি শহর ও গ্রাম উভয় এলাকায় দারিদ্র্যের মাত্রা অনেক বেড়েছে, বিদ্যুৎপ্রাপ্তি খুবই প্রশংসনীয়, গ্রাম ও শহর উভয় এলাকায় ৯৮ শতাংশের ওপর। আবাসন মানও আগের তুলনায় যথেষ্ট ভালো। প্রসঙ্গত, বাংলাদেশের সংবিধানের ১৬ নম্বর ধারা- যেখানে বলা হয়েছিল ‘নগর ও গ্রামাঞ্চলের জীবনযাত্রার মানের বৈষম্য ক্রমাগতভাবে দূর করিবার উদ্দেশ্যে কৃষিবিপ্লবের বিকাশ, গ্রামাঞ্চলের বিদ্যুতিকরণের ব্যবস্থা, কুটির শিল্প ও অন্যান্য শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা ও জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামাঞ্চলের আমূল রূপান্তর সাধনের জন্য রাষ্ট্র কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিবেন’।
আমার পড়াশোনা ও গবেষণা ইত্যাদির অনেকটাজুড়ে ছিল নগরায়ণ ও নগর উন্নয়ন বিশ্লেষণ। জাতীয় নগরনীতি প্রণয়ন নিয়ে অনেকদিন কাজ করেছি। বর্তমানে এ কাজে দায়িত্বপালন করছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। পাশাপাশি এখন একই সঙ্গে নগরায়ণ নীতি-২০২৫ এর খসড়া প্রণয়ন করেছে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। এক দেশে একই বিষয়ে একই সময়ে দুটো নীতি রচনা খুবই অবিবেচনাপ্রসূত, মেধা ও সময়ক্ষেপী। তবে, দুটোতেই সাধারণ একটি বিষয় হলো ‘বিকেন্দ্রীভূত নগরায়ণ’। এনিয়ে কোনো বিতর্ক নেই। বিশেষ করে বলা হয়, রাজধানী ঢাকার ‘প্রাইমেসি’ বা অতিকায় ‘নিয়ন্তা’ চরিত্র বদলাতেই হবে। ঢাকা মহানগর এখন ‘মেগাসিটি’, এর কেন্দ্রীয় এলাকাতেই (দুই ঢাকা সিটি করপোরেশন মিলে) জনসংখ্যা (আনুমানিক) ১৩ মিলিয়ন, বৃহত্তর ঢাকার (রাজউক সীমানার ঢাকা) প্রায় ২০ মিলিয়ন (২ কোটি) বা তারও বেশি। বাংলাদেশ এক অসাধারণ দেশ। মাত্র ১ লাখ ৪৭ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় ১৮০ মিলিয়ন (বা ১৮ কোটি) মানুষের বাস, এক কঠিন ভৌগোলিক বাস্তবতা। সঙ্গে আছে নানা জটিল পরিবেশগত সমস্যা ও প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা।
এ দেশের নগরায়ণ হতেই হবে বিকেন্দ্রীভূত, যার এক ধরনের ব্যবস্থা হবে শ্রেণিবিন্যস্ত নগর বণ্টন, একটি বা দুটি মেগাসিটি, ৭ থেকে ১০টি মহানগর, ৬০-৮০টি মাঝারি শহর ও অসংখ্য ছোট শহর বা বৃদ্ধি কেন্দ্র (গ্রোথ সেন্টার)। শহর বা নগর বলতে আমরা অবশ্যই বুঝতে চাইব- সুপরিকল্পিত ও সুপরিচালিত নগর।
আমাদের নগরগুলোর অসংখ্য সমস্যা, কোনোটির চেয়ে কোনোটি কম জটিল নয়। তবে সব সমস্যার মূলে রয়েছে নগরের পরিচালনগত (‘গভর্নেন্স’) সমস্যা বা ব্যবস্থাপনার সমস্যা। যদি কোনো নগর সংস্কার চিন্তা করতে হয় তাহলে নগর-পরিচালন সংস্কার সবার আগে এবং সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে। এরকম একটি ভাবনার সময় বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের হাতে নেই। পরবর্তী কোনো দীর্ঘমেয়াদি নির্বাচিত সরকার সে দায়িত্ব নিতে পারে।
নিবন্ধের কলেবর আর বৃদ্ধি করার সুযোগ নেই, তবু একটি প্রসঙ্গ উত্থাপন করতে চাইছি- সম্প্রতি রাজধানীতে ঢাকা নিয়ে একটি আলোচনা সভায় এক বিশেষজ্ঞ বলেছেন, ‘ঢাকা এখন একটি মৃত শহর’। মোটেও তা নয়। ঢাকা অতিমাত্রায় জীবন্ত শহর। অসুস্থ, তবু ভীষণ রকম কর্মচঞ্চল। এ শহর ভয়ানকরকম বিশৃঙ্খল, অনিরাপদ, আইন না মানা, অস্বাস্থ্যকর, দূষিত, যানজটে নাকাল, চরম বৈষম্যপূর্ণ, তবে ‘মৃত’ নয়। ঢাকা আসলেই একটি পরাবাস্তব (স্যুররিয়ালিস্ট) শহর, মৃত শহর নয়। সবচেয়ে কর্মচঞ্চল এর লাখ লাখ শ্রমজীবী দরিদ্র মানুষ, শিল্পশ্রমিক, গৃহকর্মী, সিকিউরিটি/পাহারাদার, রিকশাচালক, অটো ও বাইকচালক বা স্বনিয়োজিত খুদে ব্যবসায়ী ও সড়কে হকার, দোকানদার। যথাযথ সংস্কার কার্যকর করা গেলে ঢাকা একটি (মোটামুটি) বসবাসযোগ্য ও আনন্দময় নগর হতেই পারে। আর এ কথা তো বলার অপেক্ষাই রাখে না যে, এ শহরের হাজার লাখ লাখ তরুণ জাতীয় রাষ্ট্রব্যবস্থা বা শাসনব্যবস্থা বদলাতে পেরেছে। অতঃপর প্রধানত প্রবীণরা দায়িত্ব নিয়েছেন দেশ সংস্কারের। দেখা যাক কীভাবে তারা তা করেন। তরুণরা কি শহর সংস্কারে হাত দেবেন?
প্রথাবিরোধী লেখক অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ (প্রয়াত) আজ থেকে প্রায় ৩০ বছর আগে এক সম্পূর্ণ নষ্ট হতে যাওয়া ‘আমাদের শহর’ ঢাকাকে ধ্বংস করে নতুন করে (শুধু সংস্কার নয়) গড়বার দায়িত্বের স্বপ্ন দেখেছিলেন একদল ‘দেবদূতে’র। সেই নতুন ঢাকা হবে একটি সুপরিকল্পিত মানবিক শহর, সব মানুষের জন্য কার্যকর শহর। যে ঢাকা শহর বর্তমানে দেশের জিডিপির অন্যূন ৩৫ শতাংশের জোগান দেয়। শহরটি মৃত হলে কি তা সম্ভব হতো? বলার অপেক্ষা রাখে না যে, শহরটি যদি সুপরিকল্পিত, সুশৃঙ্খল ও সুপরিচালিত হতো তাহলে এর অর্থনৈতিক অবদান আরও বেশি হতে পারত, শহরটি প্রকৃত অর্থে বসবাসযোগ্য হতে পারত। বর্তমানে পরিকল্পিত রাজধানী ঢাকা বাস্তবায়নের জন্য বিস্তারিত এলাকা পরিকল্পনা বা ড্যাপ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের মধ্যে অমীমাংসিত দ্বন্দ্ব অব্যাহত রয়েছে। তাতে করে কার্যকর ঢাকা গড়ার সুযোগ কি দেখা যায়?
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও সাম্মানিক চেয়ারম্যান, নগর গবেষণা কেন্দ্র, ঢাকা
[email protected]