১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধে যারা বেঁচে আছে তাদের স্মৃতিতে অনেক কিছু রয়ে গেছে। পরবর্তী প্রজন্ম তাদের নিয়ে অনেক কিছু জানার চেষ্টা করছে। উভয়ই দেশের মানুষ তাদের দেশের ভেতরে ও বাইরে মানুষের মধ্যে স্মৃতি শেয়ার করেছিল। কেবল তাদের বীরত্ব এবং অধ্যবসায়ের গল্পই নয়, বরং তাদের ব্যথা, যন্ত্রণা এবং মৃত্যুর করুন গল্পও শোনানোর জন্য। ভয়াবহ যুদ্ধের ৮০তম বার্ষিকীতে তাদের সেই স্মৃতিগুলো মানুষের মধ্যে শেয়ার করার উপযুক্ত সময় এসেছে।
এ ধরনের স্মৃতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মর্মান্তিক হলো ইতিহাসে রেকর্ডসংখ্যক মৃত্যুর সংখ্যা। সেই যুদ্ধে ৩৫ মিলিয়ন চীনা, ২৭ মিলিয়ন রাশিয়ান, ৬০ লাখ ইহুদি এবং মোট ৬ কোটি ৮০ লাখেরও বেশি মানুষ ছয় বছরে নিহত হয়েছে। বছরে প্রায় ১ কোটি ১০ লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। এখানেই শেষ নয়। ১৯৩৭ সালের ডিসেম্বরে নানজিংয়ে ২ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিল। ১৯৪৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ড্রেসডেনে ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছিল। মনে হয়েছিল ঐশ্বরিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করে ১৯৪৫ সালের আগস্টে হিরোশিমা এবং নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল এবং ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষের প্রাণহানি হয়েছিল।
আইজেনহাওয়ারের সতর্কবাণীতে যুক্তরাষ্ট্র মনোযোগ দিতে এবং কাজ করতে পারবে কি না তা কেবল ভবিষ্যৎই বলে দিতে পারবে। কিন্তু, বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধ থেকে যদি কোনো শিক্ষা থাকে তা হলো: প্রযুক্তি তা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনে মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে কখনই দমন করা যায় না। মানুষের জীবন গেলেও সবাই শান্তি চায়। প্রযুক্তির একচেটিয়াকরণ ক্রমশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। কারণ বিশ্ব এবং এর অর্থনীতি এখন একক বা একমেরু নয় বরং বহুমেরু হওয়ার পথে।...
তার পর কিছু লোকের জন্য যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ে। বিশেষ করে চীনের জন্য যুদ্ধটি আরও আগেই শুরু হয়েছিল। ১৯৩১ সালে যখন জাপান চীন আক্রমণ করেছিল, তখন এ বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধে একটি দেশের সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষ মৃত্যুবরণ করেছিল। চীনা কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে পরে এটি গণযুদ্ধে পরিণত হয়েছিল।
হত্যাকাণ্ডের সবচেয়ে দুঃখজনক পরিণতিগুলোর মধ্যে একটি হলো বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তানের হত্যাকাণ্ড যা প্রিয়জনদের কাছে বেদনাদায়ক। পারমাণবিক বোমার ব্যবহার যা এখন পর্যন্ত মানুষের তৈরি সব অস্ত্র থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। আমি এটি বলছি কারণ আমেরিকান পারমাণবিক বোমার জনক রবার্ট ওপেনহাইমারের চেয়ে কোনো অংশে কম ছিল না। তিনি ১৯৪৫ সালের ১৬ জুলাই নিউ মেক্সিকোয় আলামোগর্ডো পরীক্ষাস্থলে বিস্ফোরণ দেখে ভাগবত গীতা থেকে উদ্ধৃত করে মন্তব্য করেছিলেন, ‘আমি মরে গেছি, বিশ্ব ধ্বংসকারী। দুঃখের বিষয় হলো, জাপানি শহরগুলোতে বোমা ফেলার উদ্দেশ্য যুদ্ধ বন্ধ করা ছিল না। অথচ যুদ্ধ শেষের পথে ছিল। বরং ‘জাপানি, সোভিয়েত এবং সমগ্র বিশ্বকে দেখানো ছিল, এই নতুন অস্ত্রের সম্ভাবনা কী।’ এটাই ছিল সবচেয়ে দুঃখজনক। কারণ এ ভয়াবহ কাজটি ১৮৮৬ সালে দার্শনিক ফ্রিডরিখ নিৎশে যেভাবে মানুষকে সতর্ক করেছিলেন তা থেকে কোনো শিক্ষা নেয়নি: ‘দানবের সঙ্গে লড়াই করে তার লক্ষ্য রাখা উচিত যে সে নিজে দানবে পরিণত না হয়।’
নতুন এই পারমাণবিক অস্ত্রটি কী এক ভয়ানক ‘দানব’ হয়ে উঠেছিল যা প্রায় ১ লাখ ৫০ হাজার মানুষের শুধু প্রাণহানি করেনি, বরং এক সপ্তাহের মধ্যে হিরোশিমা এবং নাগাসাকির আশপাশে তেজস্ক্রিয়তার প্রভাবে প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল।
তখনকার মানুষ কিছু হিংসাত্মক মতাদর্শ যেমন- ফ্যাসিবাদ, নাৎসিবাদ এবং সামরিকবাদের প্রভাবে মোহিত হয়েছিল। মানুষকে একটা ঘোড়ের মধ্যে আবদ্ধ করে রেখেছিল। তখন মানুষকে কারারুদ্ধ করা এবং তাদের ওপর এমন নির্যাতন চালানো হতো। ফলে মানুষ থমাস হবসের সপ্তদশ শতাব্দীর ‘একাকী, দরিদ্র, কদর্য, পাশবিক এবং নিচু’ নৈরাজ্যবাদী বিশ্বের দিকে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে সতর্ক করা হয়েছিল ‘পশ্চিমা জাতীয়তাবাদ’কে সংকুচিত এবং সংশোধন না করা হলে এমন পৃথিবী তৈরি হবে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৬ সালে জাপান সফরকালে তার বক্তৃতায় অংশগ্রহণকারীদের সতর্ক করেছিলেন:
জাপানের জন্য যা বিপজ্জনক তা হলো পশ্চিমাদের বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যের অনুকরণ নয় বরং পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের চালিকা শক্তিকে তার নিজের হিসেবে গ্রহণ করা। যেখানে পশ্চিমা জাতীয়তাবাদের চেতনা বিরাজ করছে, সেখানে শৈশব থেকেই জনগণকে শেখানো হচ্ছে তারা সব ধরনের উপায়ে ঘৃণা এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষা পোষণ করবে। ইতিহাসে অর্ধ-সত্য এবং মিথ্যা তৈরি করে। অন্যান্য জাতি এবং তাদের প্রতি প্রতিকূল অনুভূতির সংস্কৃতির ক্রমাগতভাবে ভুল উপস্থাপনা করে এবং ঘটনাগুলোর স্মারক স্থাপন করে। মিথ্যাকে মানবতার স্বার্থে দ্রুত ভুলে যাওয়া উচিত। এভাবে প্রতিবেশী এবং তাদের নিজেদের জাতি ছাড়া অন্য জাতির প্রতি অশুভ হুমকি তৈরি করছে। এটি মানবতার উৎসকে বিষাক্ত করে তুলেছে।
অবাক হওয়ার কিছু নেই যে, বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধ শেষ কেবল পরাজিত শক্তির জন্যই নয়, বরং বিজয়ী শক্তির জন্যও অনুপযুক্ত বলে মনে হয়েছিল। তখন স্মৃতি মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছিল। যেমন, ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ ভারতের বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সৈন্যের সংখ্যা মুছে ফেলা হয়েছে।
বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধে প্রায় ২৫ লাখ ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্য অংশগ্রহণ করেছিল, যাদের কম মূল্যায়ন করা হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুদ্ধের সময় ৮৯ হাজার ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্য নিহত হয়েছিল, যার মধ্যে বাংলাদেশের সৈন্যরাও ছিল। প্রতি বছর যখন ঔপনিবেশিক দেশগুলো বিশেষ করে ইউরোপের লোকেরা ফ্যাসিবাদ এবং নাৎসিবাদের বিরুদ্ধে বিজয় উদ্যাপন করে, তখন ব্রিটিশ ভারতীয় সৈন্যদের আত্মত্যাগের কথা কম স্মরণ করে।
আরও কিছু বেদনাদায়ক ঘটনা ও ঐতিহাসিক স্মতি মুছে ফেলার ঘটনাও রয়েছে। বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধে ব্রিটেনের অংশগ্রহণের কোনো আলোচনাই ১৯৪৩ সালের বাংলার দুর্ভিক্ষের কথা উল্লেখ না করে সম্পূর্ণ হবে না। কারণ তখন বাংলায় ৩৫ থেকে ৫০ লাখ মানুষ মারা গিয়েছিল।
সমালোচকরা এখন উইনস্টন চার্চিলের যুদ্ধকালীন মন্ত্রিসভাকে দোষারোপ করছেন। যখন তার বাংলা এবং ব্রিটিশ ভারতের অন্যান্য অংশ থেকে খুব বেশি পরিমাণে চালের মজুত করেছিল। যুদ্ধে নিযুক্ত ব্রিটিশ সৈন্যদের ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য খাদ্য সংরক্ষণের জন্য সরিয়ে রাখা হয়েছিল। চার্চিল ভারতীয়দের ‘খরগোশের মতো বংশবৃদ্ধি’কে দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, যদি অভাব এত ভয়াবহ হতো, তাহলে মহাত্মা গান্ধী কীভাবে বেঁচে থাকলেন?
সুযোগ পেলেই কেবল এ ধরনের কাব্যিক পঙ্ক্তিগুলো স্মরণ করা এবং আবৃত্তি করা যেতে পারে। জার্মান নাট্যকার বার্টোল্ট ব্রেচট ১৯৩৯ সালে কিছু স্মরণীয় পঙ্ক্তি লিখেছিলেন:
অন্ধকার সময়ে
গান কী হবে?
গান হবে।
অন্ধকার সময়ের।
এ ধরনের লাইনগুলো পড়া এবং শেয়ার করা বেদনাদায়ক হলেও অনেককেই ভাবতে বাধ্য করে যে, যদি কেউ গাজায় বা অন্য কোথাও অন্যায় দেখতে পায় তাহলে তার কী করা উচিত। গাজার ঘটনাটি ভয়াবহ এবং মর্মান্তিক। কারণ ২১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে গাজায় মৃতের সংখ্যা ৬২ হাজারে পৌঁছেছে এবং আহতের সংখ্যা ১ লাখ ৫৭ হাজারেরও বেশি। তাদের বেশির ভাগই শিশু এবং বেসামরিক নাগরিক। অনুমান প্রায় ৫০ হাজারেরও বেশি শিশু নিহত বা আহত হয়েছে। যদিও ইসরায়েল এখন লজ্জার নিয়ে স্বীকার করছে যে, মৃতদের ৮৭ শতাংশই বেসামরিক নাগরিক। এটি দুর্ভাগ্যজনক এবং মর্মান্তিক, কারণ গাজা এবং ফিলিস্তিনে যা ঘটছে তা বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধের সঙ্গে সম্পর্কিত। কারণ, সেখানে জার্মানরা একসময় লাখ লাখ ইহুদির ওপর নির্যাতন চালিয়ে হত্যা করেছিল। এ কারণেই সেখানে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েল প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। তবুও, কিছু পশ্চিমা দেশের সহযোগিতায় যারা বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধের শিকার হয়েছিল, তারা এখন ইহুদিবাদের নামে গাজায় গণহত্যা চালাচ্ছে। নিঃসন্দেহে, আমেরিকান কবি অনিতা ব্যারোস ২১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে তার কাব্যিক পঙ্ক্তিতে এ প্রশ্নটি উত্থাপন করেছেন:
ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রামে চিত্রশিল্পীরাও তাদের ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাদের অবদান সমানভাবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছিল। তাদের অবদান শত্রু অঞ্চলে অস্ত্র হাতে নিয়ে যুদ্ধ করা ব্যক্তিদের মতোই প্রাণবন্ত ও গুরুত্বপূর্ণ। যদি এমন এক চিত্রকর্ম থেকে থাকে যা পাবলো পিকাসোকে অমর করে তুলেছে তা হলো তার গুয়ের্নিকা। ১৯৩৭ সালে আঁকা পিকাসো স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় ফ্যাসিবাদী-জাতীয়তাবাদী শক্তির সঙ্গে মিত্র জার্মানের গুয়ের্নিকায় বোমাবর্ষণের চিত্র তুলে ধরেছিলেন। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যুদ্ধবিরোধী চিত্রকর্মগুলোর মধ্যে একটি।
বাংলাদেশের চিত্রশিল্পী জয়নুল আবেদিন ১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষের সময় অসাধারণ দক্ষতার পরিচয় দিয়েছিলেন। ১৯৪৪ সালে সস্তা ও সাধারণ কাগজ ব্যবহার করে কাঠকয়লা দিয়ে আঁকা তার দুর্ভিক্ষের স্কেচগুলো তাকে খ্যাতি এনে দিয়েছিল। এটি তাকে দুর্ভিক্ষের দুর্দশার চিত্রটি লিপিবদ্ধ করার সুযোগ করে দিয়েছিল। আজও জয়নুলের চিত্রকর্মের মাধ্যমে বাংলার দুর্ভিক্ষ এবং ঔপনিবেশিক শক্তির অমানবিক চিত্র স্মরণ করা হয়। মার্টিন নিমোলার, বার্টল্ট ব্রেখ্ট, অনিতা ব্যারোস, পাবলো পিকাসো এবং আরও অনেকের ক্ষেত্রে যেমন ঘটেছে, জয়নুলের চিত্রকর্মগুলোও যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মানবিক দুর্ভোগ চিত্রিত হয়েছে। সেগুলো মানুষের সৃজনশীল প্রচেষ্টার সাক্ষ্য হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে।
কিন্তু কেন লেখক, কবি, চিত্রশিল্পী এবং আরও অনেকে আমাদের যুদ্ধের কথা অবিরাম এবং আবেগের সঙ্গে স্মরণ করিয়ে দেয়। এমনকি সুযোগ পেলেই তাদের সম্পর্কে ভয়াবহ চিত্র শেয়ার করতে মানুষ বাধ্য হয়। এটি ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধের ক্ষেত্রেও সত্য, যার মধ্যে গণহত্যা এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ অন্তর্ভুক্ত। দক্ষিণ আফ্রিকার ধর্মতত্ত্ববিদ এবং বর্ণবাদবিরোধী কর্মী ডেসমন্ড টুটু কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। তিনি যুদ্ধ এবং গণহত্যার স্মৃতি স্মরণ করার উদ্দেশ্য সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন:
হলোকাস্ট এবং অন্যান্য জাতির বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা সম্পর্কে আমাদের কেন জানা উচিত। তার কারণ হলো- যা ঘটেছিল তাতে আমরা বিতৃষ্ণায় ভরে যেতে পারি এবং এভাবে অনুপ্রাণিত হতে পারি। প্রকৃতপক্ষে উৎসাহিত হতে পারি যাতে এ ধরনের নৃশংসতা আর কখনো না ঘটে।
৮০ বছর পর বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধ স্মরণ করার উদ্দেশ্যও আলাদা নয়। যদি লক্ষ্য হয় আরেকটি ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধ বা অন্য কোনো যুদ্ধ বন্ধ করা, তাহলে কেউ কেবল স্মৃতিচারণের মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখতে পারে না। সমসাময়িক সময়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা এ কারণেই বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছে। আজ বিশ্বকে যে অনিশ্চয়তা এবং বিশৃঙ্খলা গ্রাস করেছে তা সত্ত্বেও শান্তি প্রতিষ্ঠার বিষয়ে আমরা আশাবাদী। সান জু এবং আলবার্ট আইনস্টাইন বিভিন্ন ঐতিহাসিক সময়ে জোর দিয়ে বলেছেন, ‘প্রতিটি সংকটের মাঝেই বিরাট সুযোগ লুকিয়ে থাকে’। এ প্রসঙ্গে তিনটি উন্নয়ন বিবেচনা করার মতো।
প্রথমত, ‘তরল’ বহুমেরু বিশ্বের উত্থান সংঘাতের ভূ-রাজনীতিকে সহযোগিতার ভূ-রাজনীতিতে রূপান্তরিত করার জন্য জায়গা তৈরি করেছে। বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধের বেশির ভাগই ভূ-রাজনীতির সংঘাতের জন্য হয়েছিল। এটি এমন একটি সময় ছিল যখন বিশ্বের একটি বৃহত্তর অংশ উপনিবেশবাদের অধীনে ছিল এবং স্থানীয়রা পূর্ববর্তী ঔপনিবেশিক বিশেষ করে ইউরোপীয়দের অধীনে ছিল।
সেই যুগ চলে গেছে। উপনিবেশবাদের অবসান এবং পুঁজিবাদের বিশ্বায়নে বিকাশ উভয়ই বহুমেরু বিশ্বের জন্য পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এই প্রবণতাকে বিপরীত করার কোনো উপায় নেই। সহযোগিতার ভূ-রাজনীতি কাঠামোগতভাবে শান্তিপূর্ণ বিশ্বের সূচনা করে।
দ্বিতীয়ত, সামরিক প্রযুক্তির ওপর প্রবেশাধিকারের কারনেই বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধ এত নৃশংস হয়ে উঠেছিল। জার্মানির ব্লিটজক্রিগ রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং জাপানের দুটি শহরে যুক্তরাষ্ট্রের পারমাণবিক বোমা ফেলা সম্ভব হয়েছিল। কারণ তখন সামরিক প্রযুক্তি এক বা দুটি শক্তির হাতে ছিল। সেই যুগও চলে গেছে। তার পর কিছু শক্তি সামরিক প্রযুক্তি এবং এর উৎপাদনকে তাদের মধ্যে রাখতে চায়। সেই কারণেই প্রেসিডেন্ট ডোয়াইট আইজেনহাওয়ার ১৭ জানুয়ারি ১৯৬১ সালে তার বিদায়ী ভাষণে আমেরিকানদের সতর্ক করেছিলেন: আমাদের বিশাল আকারের স্থায়ী অস্ত্র শিল্প তৈরি করতে বাধ্য করা হয়েছে...। তবুও এর গুরুতর প্রভাব বুঝতে আমাদের ব্যর্থ হওয়া উচিত না। সরকারিভাবে সামরিক সরঞ্জাম অপ্রত্যাশিতভাবে চাওয়া এবং অযাচিত প্রভাব অর্জনের বিরুদ্ধে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে।
আইজেনহাওয়ারের সতর্কবাণীতে যুক্তরাষ্ট্র মনোযোগ দিতে এবং কাজ করতে পারবে কি না তা কেবল ভবিষ্যৎই বলে দিতে পারবে। কিন্তু, বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধ থেকে যদি কোনো শিক্ষা থাকে তা হলো: প্রযুক্তি তা যতই শক্তিশালী হোক না কেন, শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনে মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে কখনই দমন করা যায় না। মানুষের জীবন গেলেও সবাই শান্তি চায়। প্রযুক্তির একচেটিয়াকরণ ক্রমশ চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠছে। কারণ বিশ্ব এবং এর অর্থনীতি এখন একক বা একমেরু নয় বরং বহুমেরু হওয়ার পথে। বেশ কয়েকটি দেশ প্রযুক্তিগত শক্তি এবং কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন উপভোগ করছে।
অবশেষে, পশ্চিমা জাতীয়তাবাদ ফ্যাসিবাদে রূপান্তরিত হয়েছিল। এতে বিশ্ব ফ্যাসিবাদবিরোধী যুদ্ধ আরও মারাত্মক হয়ে ওঠে এবং বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তার পর এটি ধ্বংসযজ্ঞ তৈরি করেছিল। ফলে এশিয়া এবং আফ্রিকার উপনিবেশবিরোধী আন্দোলন হয়। বিশেষ করে ১৯৬০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এ আন্দোলন উত্থান ঘটে। কিছু অর্থনীতির উত্থান এবং পুনরুত্থান এখন এশিয়ার দিকে দৃষ্টিপাত করেছে যা একসময় মহাদেশের সভ্যতাগত সত্তা ছিল। আফ্রিকা আরেকটি সভ্যতাগত সত্তা যার ইতিহাস পশ্চিমাদের হাতে করুণভাবে বিলুপ্ত হয়েছে। এটি দেশগুলোর একে অপরের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্ক স্থাপন করে তার মৌলিক পরিবর্তনের জন্য জায়গা তৈরি করেছে। প্রকৃতপক্ষে, আধিপত্য এবং আত্মসমর্পণের অমীমাংসিত দ্বিমুখিতার পরিবর্তে মানুষ স্বাধীনভাবে এবং সম্মিলিতভাবে একটি অনুশীলন গড়ে তুলছে। বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ভবিষ্যতের জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের আদর্শ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমাদের আশা সেখানেই নিহিত আছে।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক