২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থান আবার প্রমাণ করল বাংলাদেশ এক অর্থে আন্দোলন আর অভ্যুত্থানের দেশ। অধিকার ও মর্যাদার জন্য এ উপমহাদেশে আর কোনো দেশ কি মানুষ এত সংগ্রাম দেখেছে? ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল স্বাধীনতার জন্য, পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে লড়াই ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা আর সামাজিক সুবিচারের জন্য। ব্রিটিশ গেছে স্বাধীনতা আসেনি, জনগণকে ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত করা হয়েছে, ভাষার অধিকার কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে, শিক্ষার অধিকার সংকুচিত করা হয়েছে। বাইরের এ আক্রমণের অন্তরালে শক্তিশালী হয়েছে শোষণ। ফলে শোষণমুক্তি, অসাম্প্রদায়িকতার আন্দোলন স্বাধীনতার আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। পাকিস্তান ছিল ২২ পরিবারের শোষণ, সামরিক শাসন, ধর্মীয় নিপীড়ন আর সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে গাঁটছড়া বাধা রাষ্ট্র। এ শোষণের তীব্র রূপ প্রত্যক্ষ করেছে বাংলার মানুষ। ফলে ছয় দফা এবং ১১ দফা জনগণের আন্দোলনের দাবিনামায় রূপান্তরিত হয়েছিল। ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ’৭০ সালের নির্বাচনের ধারাবাহিকতায় মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত হয়েছিল।
স্বাধীনতার পর ৫৩ বছরে দেশের জিডিপি বেড়ে ৯ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪৫০ বিলিয়ন ডলার হয়েছে, বাজেট বড় হয়ে ৭৮৬ কোটি টাকা থেকে ৭ লাখ ৯০ টাকায় উন্নীত হয়েছে, মাথাপিছু আয় বেড়ে ১১০ ডলার থেকে ২৫৯৩ ডলারে উন্নীত হয়েছে। কোটিপতির সংখ্যা বেড়ে দুজন থেকে দেড় লাখ হয়েছে। কিন্তু কমেছে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার, মানুষের মর্যাদা। শিক্ষার খরচ, চিকিৎসার খরচ, দ্রব্যমূল্য সবই বাড়ছে, সবচেয়ে বেড়েছে বৈষম্য। এ বৈষম্য যেমন আয় বৈষম্য তেমনি অধিকারের বৈষম্য, সুযোগের বৈষম্য, ধর্মীয় বৈষম্য, জাতিগত বৈষম্য সব ক্ষেত্রেই। পুঁজিবাদী সমাজে সবই পণ্য। এখানে টাকা যার শিক্ষা, চিকিৎসাসহ জীবনের সব অধিকার তার। নারীর নিরাপত্তা, সংখ্যালঘু এবং আদিবাসীদের জীবন ও জমি সবই বিপন্ন, বেকারত্বের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে নিয়োগবাণিজ্য, পুলিশের গ্রেপ্তার বাণিজ্য, বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, খুন মিলে দেশে এক দুর্বিষহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। নির্বাচন গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অঙ্গ কিন্তু সেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে বারবার। বিশেষ করে ২০১৪ সালে দলীয় সরকারের অধীনে একদলীয় নির্বাচন, ২০১৮ সালে রাতের ভোটের নির্বাচন, ২০২৪ সালে আমি ডামির নির্বাচন নির্বাচনিব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দিয়েছিল। নির্বাচনে পুলিশ, প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনকে ন্যক্কারজনকভাবে কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন অপকৌশলের মাধ্যমে নির্বাচনি ব্যবস্থাকেই ধ্বংস করে দিয়েছিল। ফলে এটা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে, আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করলে কোনোদিনই হারবে না, ক্ষমতা ছাড়বে না। শুধু ক্ষমতা কুক্ষিগত করাই নয়, ক্ষমতার দাপটে বিরোধী দল ও মতের ওপর চূড়ান্ত নিপীড়ন চালিয়েছিল। দেশের সম্পদ বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া, বিদেশিদের সঙ্গে দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করা আর নতজানু পররাষ্ট্রনীতি দেশের সম্পদ ও সম্মান দুটোই ধ্বংস করছিল। এসবের বিরুদ্ধে মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে লাখ লাখ ছাত্র, শ্রমিক, নারীকে রাজপথে নামিয়ে এনেছিল। ছাত্র-শ্রমিক-জনতার এ বিক্ষোভের মুখে পদত্যাগ ও দেশত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল স্বৈরাচারী সরকার। সফল হয়েছিল অভ্যুত্থান।
অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে ক্ষমতা ছাড়বেন, কখন ছাড়বেন, নির্বাচন কখন হবে এবং নির্বাচন পরবর্তীকালে যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে তারা অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে কি না, এ ধরনের জল্পনা-কল্পনার মধ্যে আটকে আছে দেশের মানুষের আলোচনা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশ চলবে জনমতের ভিত্তিতে, জনগণের স্বার্থে। যে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে, যে জনগণ ঋণ পরিশোধ করবে, তারা কিছুই জানবে না। তাহলে গণতান্ত্রিক সংস্কার কোথায় হলো? ক্ষমতায় যারা থাকবে সবকিছু তাদের মর্জিতেই চলবে, জনগণ হবে আজ্ঞাবাহক, ট্যাক্সের বোঝা বহনকারী আর দুর্নীতির বিষময় ফল ভোগকারী। গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত জবাবদিহি, সেটা কথা এবং কাজে প্রতিফলিত হতে হবে। তা এখনো দৃশ্যমান নয়।…
’৯০-এর অভ্যুত্থানের অভিজ্ঞতা থেকেই প্রত্যাশা ছিল অভ্যুত্থানের পর পুরোনো পথে যেন ফিরে না যায় দেশ। সংস্কার কথাটা যত উচ্চারিত হচ্ছে ততটা সংস্কার কি রাজনীতিতে দেখা যাচ্ছে? গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত সবার মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। ইনক্লুসিভ শব্দটার যত ব্যবহার হয়েছে, মানুষ তার ততটা প্রতিফলন দেখতে না পেয়ে হতাশ।
কেন এমন হলো- এ প্রশ্ন সবার। অভ্যুত্থানের এক বছর যেতে না যেতেই আকাঙ্ক্ষা ও চেতনাকে পদদলিত করা শুরু হয়েছে। সারা দেশে জোরপূর্বক চাঁদাবাজি, মব সৃষ্টি করে হামলা ও হত্যা, নারীর সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ, ধর্ষণ, সংখ্যালঘু নির্যাতন, প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা দখল, দুর্নীতির নানা খবরে দেশের মানুষ বেদনাহত ও ক্ষুব্ধ। অন্তরবর্তী সরকারের নানা পদক্ষেপ জনগণের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের জন্ম দিচ্ছে। স্বৈরাচার অবসানে এমনটা হবে, মানুষ সেটা চায়নি। একটা ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের পর গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা ঘটবে, এটাই তো স্বাভাবিক। অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা এবং দায়হীন ক্ষমতা গণতন্ত্রের সবচেয়ে বড় অন্তরায়। সে কারণেই ক্ষমতা এবং দুর্নীতির মেলবন্ধনের অবসান দেখতে চায় জনগণ। কিন্তু মানুষের চাওয়া কি ক্ষমতাসীন এবং ক্ষমতাপ্রত্যাশীদের স্পর্শ করছে? কারণ চলছে তো সব আগের মতোই। যে বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে তা তো অতীতের ধারাবাহিকতা মাত্র। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, প্রশাসনে, ব্যাংকে কি গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা প্রচলিত হয়েছে বা তার চর্চা হচ্ছে? যেভাবে গায়ের জোরের চর্চা হচ্ছে তাতে পুরোনো আমলের চাইতে কী পার্থক্য ঘটল? এ প্রশ্ন কি অমূলক হবে? বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্রদের লড়াই শত-সহস্র মানুষকে পথে নামিয়েছিল। মানুষ ভুলতে চেয়েছিল নারী-পুরুষের বৈষম্য, ধর্মীয় সংখ্যালঘুর অপমানের বেদনা, আদিবাসীর অবহেলা। প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিল মানবিক মর্যাদা। কিন্তু সাম্প্রদায়িক নিপীড়ন ও উন্মাদনা, নারীর লাঞ্ছনা, আদিবাসীর ভীতি, নির্বাচনবিহীন ও দায়হীন রাষ্ট্র পরিচালনা, নানা ধরনের চুক্তি যা জনগণ জানে না এবং মব সৃষ্টি করে ভীতির পরিবেশ তৈরি- এসব কি জুলাইকে ভুলিয়ে দিচ্ছে না?
মানুষের ওপর মানুষের ভরসা এবং বিপরীতে মানুষের প্রতি মানুষের ভয়ের চূড়ান্ত রূপ দেখা গেছে অভ্যুত্থানে। কীভাবে রাষ্ট্র শক্তিকে কাজে লাগিয়ে মানুষের আন্দোলনকে দমন করা যায় এবং আন্দোলনকারী মানুষ মানুষের ওপর ভরসা রেখে পথে নেমে এলে কীভাবে শাসকের নিষ্ঠুর আক্রমণকে প্রতিহত ও পরাস্ত করতে পারে তা জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানে দেখেছে বাংলাদেশ। শাসকদের পতন ও পলায়নের পর প্রশ্ন এল- এরপর কী? ক্ষোভের আগুনকে কাজে লাগিয়ে লুটপাট যেমন হয়েছে তেমনি প্রতিহিংসা চরিতার্থ করার ঘটনাও ঘটেছে। এসব ছাপিয়ে মানুষ চেয়েছে একটা গণতান্ত্রিক পরিবেশ আসুক, যেখানে অন্তত স্বস্তি আসবে। তাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সবচেয়ে বেশি আলোচিত শব্দ ছিল সংস্কার। সংস্কার দরকার, সেটা সবাই মানলেও কতটুকু সংস্কার এবং কোথায় সংস্কার হবে তা নিয়ে বিতর্ক ছিল তুঙ্গে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সংস্কার যে মানুষের চেতনার, যার ফলে গড়ে উঠবে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সে বিষয়টাই আড়ালে থেকে গেল। ফলে কথায় এবং আচরণে উগ্রতা দেখে ভয় তৈরি হচ্ছে।
গণপরিষদ করতে হবে, স্বাধীনতার পর সংবিধান বিধান মেনে তৈরি হয়নি, এ যুক্তি জোরেশোরে তোলার চেষ্টা হচ্ছে। কিন্তু ইতিহাস কী বলে? ’৭০-এর নির্বাচনে বিপুল ভোটে বিজয়ীরাই তো সংবিধান প্রণয়নের কাজ করেছিলেন। যারা এটা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা তো জানেন, পাকিস্তানের সংবিধান তৈরি করার গণপরিষদ গঠিত হয়েছিল ১৯৪৭ সালের ৩ জুন। পাকিস্তান হওয়ার আগেই ব্রিটিশের অধীনে ১৯৪৬ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে। সেই নির্বাচনে কংগ্রেস ২০৮ এবং মুসলিম লীগ ৭৩ আসনে জয়ী হয়। ১৯৪৭ সালের ১০ আগস্ট করাচির সিন্ধু বিধানসভায় বসে গণপরিষদ। এ গণপরিষদ ছিল ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত, পাকিস্তানের সংবিধান প্রণয়ন পর্যন্ত, অর্থাৎ ৯ বছর। ভারতের গণপরিষদ গঠিত হয় ১৯৪৬ সালের নভেম্বরে প্রথম অধিবেশন বসে ৯ ডিসেম্বর ১৯৪৬ সালে আর সমাপ্ত হয় ১৯৫৩ সালে। অর্থাৎ সংবিধান প্রণয়নে সময় লেগেছে প্রায় ৭ বছর। নেপালে প্রথম গণপরিষদ গঠিত হয় ২০০৮ সালে। গণপরিষদ টিকে ছিল ২০১২ সাল পর্যন্ত। এই গণপরিষদে ২৪০ বছরের রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয়। দ্বিতীয় গণপরিষদ ২০১৩ সাল থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত। তাহলে দেখা গেল গণপরিষদ করতে গেলে নির্বাচন করতে হবে এবং সংবিধান প্রণয়ন কোনো শর্টকাট পদ্ধতিতে হবে না। ঐকমত্য কমিশনের অভিজ্ঞতা থেকে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, সংবিধান প্রণয়নের কাজ অত সহজ হবে না।
জুলাই সনদ এখন বিতর্কের কেন্দ্র। সরকার বলছে, ২০২৬-এর ফেব্রুয়ারিতেই নির্বাচন হবে কিন্তু নির্বাচনকে শর্তসাপেক্ষ করে তুলছে কোনো কোনো রাজনৈতিক দল। যদি সনদে সবাই স্বাক্ষর না দেয় তাহলে কী হবে? সনদ কি সংবিধানের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ? অভ্যুত্থানকে আইনি সুরক্ষা দেওয়া হবে কীভাবে? গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপগুলো কী হবে? শুধু লিখেই কি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা যাবে? নির্বাচনকে কালো টাকা, পেশিশক্তি, প্রশাসন পুলিশের হস্তক্ষেপমুক্ত ও ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার বন্ধ করতে না পারলে সুষ্ঠু নির্বাচন কি হবে? এসব প্রশ্ন ঘুরে-ফিরে আসছে বারবার।
অন্তর্বর্তী সরকার কীভাবে ক্ষমতা ছাড়বেন, কখন ছাড়বেন, নির্বাচন কখন হবে এবং নির্বাচন পরবর্তীকালে যে সরকার ক্ষমতায় থাকবে তারা অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে কি না, এ ধরনের জল্পনা-কল্পনার মধ্যে আটকে আছে দেশের মানুষের আলোচনা। ঐকমত্য কমিশন দিনের পর দিন সভা করে নানা বিষয়ে ঐকমত্য করে মূল বিষয়ে বিরোধ তৈরি করে দিয়েছে। সংবিধান নাকি ফ্যাসিবাদ তৈরি করেছে, এ কথা বলে সংবিধান পুনর্লিখন, নতুন সংবিধান তৈরির দারি যেমন আছে আবার এ যুক্তিও করা হচ্ছে যে সংবিধান উপেক্ষা করেই তো স্বৈরাচারী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদে তা পাস করিয়ে নেওয়াটাই ভালো সমাধান।
সবকিছুকে টাকার মাপে মাপতে শেখায় পুঁজিবাদ। কিন্তু টাকার কাছে সব ছোট হয়ে গেলে, বিনিময়যোগ্য হয়ে গেলে সবচেয়ে বিপন্ন হয় মানুষ। রাজনীতি শেখায় দায়বোধ, সেই রাজনীতি টাকাওয়ালাদের কাছে পরাজিত হয়ে যাচ্ছে, এর বিষময় ফল শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ববাসী ভোগ করছে।
যেকোনো আন্দোলনেই নেতা লাগে, ডাক দেওয়ার এবং ঐক্যবদ্ধ করার ক্ষেত্রে নেতাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু ডাক দেওয়া এবং ডাকে সাড়া দেওয়া এই দুই বিষয় এক বিন্দুতে না মিললে আন্দোলন সফল হয় না। নাম না জানা লাখ লাখ মানুষ যার যার ক্ষেত্রে সাহসের সঙ্গে নায়কের ভূমিকায় নামলেই কেবলমাত্র কোনো আন্দোলন তার সফল পরিণতি পায়। এরাই অজানা বীর আর অচিহ্নিত নায়ক। অভ্যুত্থান ঐক্যবদ্ধ করেছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিন্তু অভ্যুত্থানের নায়ক বলে অতিরঞ্জিত করা হলো যাদের, তারা এর মর্যাদা রক্ষা করতে পারলেন না। স্বাধীনতা যুদ্ধে মূল নায়ক ছিলেন শ্রমিক-কৃষক, যারা জীবন বিপন্ন করে লড়াই করেছেন, অকাতরে জীবন দিয়েছেন, নেতাদের ডাকে ছিনিয়ে এনেছেন স্বাধীনতার লাল সূর্য। যুদ্ধের পর তাদের ঠেলে দেওয়া হয়েছিল আড়ালে। তেমনি এবারও অসীম সাহসে লড়েছে ছাত্ররা, শ্রমিকরা, শিশুরা, শিশুদের মায়েরা। জীবন, রক্ত, অশ্রু দিয়ে গড়ে তোলা প্রতিরোধের সামনে টিকতে না পেরে পালিয়ে গেল স্বৈরাচারী শাসক। সেই রক্তের দাগ শুকাতে না শুকাতে বিতর্কের নামে বিভক্তি, মুক্তিযুদ্ধকে আড়াল করা আর এতদিনের সংগ্রামকে অস্বীকার করার কারণে মানুষ ভুলেই যেতে বসেছে কী আকাঙ্ক্ষা ছিল তাদের।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশ চলবে জনমতের ভিত্তিতে, জনগণের স্বার্থে। জনগণ জানবে দেশের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। কিন্তু দেশের প্রধান বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে বিদেশি কোম্পানিকে। এতে ব্যয় বাড়বে, দেশের নিয়ন্ত্রণ কমবে এবং দুর্নীতি ঠেকানো যাবে না। সবচেয়ে বড় কথা- এনিয়ে কি আলোচনা হয়েছে কোথাও? বিশাল বিশাল ক্রয়চুক্তি করা হচ্ছে, মেগা প্রকল্প নেওয়া হচ্ছে বলে খবর প্রকাশিত হচ্ছে। এসব সিদ্ধান্ত কোথায় নেওয়া হচ্ছে তা জানা যাচ্ছে না। যে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে, যে জনগণ ঋণ পরিশোধ করবে, তারা কিছুই জানবে না। তাহলে গণতান্ত্রিক সংস্কার কোথায় হলো? ক্ষমতায় যারা থাকবে সবকিছু তাদের মর্জিতেই চলবে, জনগণ হবে আজ্ঞাবাহক, ট্যাক্সের বোঝা বহনকারী আর দুর্নীতির বিষময় ফল ভোগকারী। গণতন্ত্রের অন্যতম শর্ত জবাবদিহি, সেটা কথা এবং কাজে প্রতিফলিত হতে হবে। তা এখনো দৃশ্যমান নয়। ফলে অভ্যুত্থান আশা জাগিয়েছে পরিবর্তনের কিন্তু সম্ভাবনাগুলো যেন সংশয়ের মেঘে ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।
লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]