বিজয় আমরা অর্জন করেছি, তার জন্য আমাদের একটা গর্ববোধ থাকা দরকার। আমরা এক ভয়াবহ সমস্যার মধ্যে পড়ে আছি, তা হলো দুর্বৃত্তের অর্থনীতি। আমরা এ থেকে কোনোভাবে বের হতে পারছি না। আমাদের দেশে সামাজিক সমস্যাও অনেক। সেগুলো আমাদের চিহ্নিত করতে হবে। জনসাধারণের অংশগ্রহণে যদি কোনো আন্দোলন হয় তবে সেই আন্দোলন অল্প অল্প করে সাফল্যের দিকে যাবে।…
বিজয় দিবস সম্পর্কে নানান জনে নানান কথা বলেন; পত্রিকায় নানান কথা লেখা হয়। বিজয় দিবসকে যদি সত্যই আমরা বিজয়য় দিবস হিসেবে মান্য করি, তাহলে অবশ্যই দিনটি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা উচিত। ওই সময়ে (মহান মুক্তিযুদ্ধে) কী অবস্থায় যুদ্ধ হলো, সংগ্রাম হলো এবং কীভাবে আমরা বিজয় অর্জন করলাম; এসব বিষয়ে সবার স্পষ্ট ধারণা থাকা উচিত। সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ কীভাবে সে মুক্তিসংগ্রামে ভূমিকা রেখেছিলেন, তা আমাদের জানতে হবে।
আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের ৫৪ বছর পার করেছি। আজকে সামাজিক বাস্তবতা কেমন সেদিকও আমাদের ভাবতে হবে। বিজয়ের গৌরব অবলম্বন করে জাতি নতুন কিছু করেছে কি না, ভালো কিছু করেছে কি না, সেটা নিয়ে যখন ভাবব, তখন দেখব আমাদের সীমাবদ্ধতা অনেক।
বিজয় আমরা অর্জন করেছি, তার জন্য আমাদের একটা গর্ববোধ থাকা দরকার। আমরা এক ভয়াবহ সমস্যার মধ্যে পড়ে আছি, তা হলো দুর্বৃত্তের অর্থনীতি। আমরা এ থেকে কোনোভাবে বের হতে পারছি না। আমাদের দেশে সামাজিক সমস্যাও অনেক। সেগুলো আমাদের চিহ্নিত করতে হবে।
স্বাধীনতার ৫৪ বছরে আমাদের অর্জন কিছুই যে হয়নি তা আমি বলছি না। আমাদের অর্জন হয়েছে। এর কিছু অর্থনীতির ক্ষেত্রে, কিছু সামাজিক ক্ষেত্রে আর কিছু আছে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। নানান প্রেক্ষাপটের মধ্যদিয়ে আমাদের ৫৪ বছর পার করতে হয়েছে। এত বছর স্বাধীন জাতি হিসেবে নিজের অস্তিত্ব রক্ষা করতে হয়েছে আমাদের। এতে বাঙালির একটা কৃতিত্ব আছে। এখন যে সমস্যা দেখা দিয়েছে, তাতে সেই কৃতিত্ব ম্লান হতে চলেছে।
রাজনীতি এখন অস্বাভাবিক হয়ে গেছে। সরকার যদি একরোখা আচরণ করতে থাকে আর দেশবাসী যদি সংকটে পড়ে থাকে, তখন দরকার হয় নতুন সংগ্রামের, নতুন লক্ষ্য নির্ধারণের। সংগ্রাম এবং লক্ষ্য- এ দুইয়ে সাফল্য অর্জনে আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। সচেতনভাবে আমাদের নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করা দরকার। আমাদের উচিত অগ্রসর হওয়া, যেন আমরা কোনো ভুল পথে না যাই। আমাদের জাতির সম্ভাবনা আছে। তা বাস্তবায়নে কাজ করা দরকার।
আমাদের দেশে সরকার পরিবর্তন তো স্বাভাবিকভাবে হচ্ছে না। এটা যে শুধু একবারই হয়েছে, তা নয়। সেই ১৯৭২ সাল থেকে এমন ঘটনা স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। যেকোনো ক্ষেত্রে সরকার পরিবর্তন, কোনো নীতি বা কোনো সংস্থার পরিবর্তন স্বাভাবিক উপায়ে হয় না। এর সঙ্গে হত্যাকাণ্ড জড়িত, নানারকম অসহিষ্ণুতা দেখা দেয়। আবার পশ্চিমা বড় শক্তিগুলোর হস্তক্ষেপও দেখা যায়। এসব বিষয় বিবেচনা করে আমাদের কর্তব্য নির্ধারণ করতে হবে।
বিজয় অর্জন করা এবং রক্ষা করা একই অর্থ, একই ব্যাপার। আমাদের বিজয়কে ধরে রাখতে যে ধরনের কাজ করার কথা, তা রাজনীতিবিদরা স্বীকার করছেন না। তারা এমন কাজ করছেন তাতে আমাদের জনগণের ওপর নানান বিদেশি শক্তি ভর করেছে। বিশেষ করে পশ্চিমা পরাশক্তিগুলোর হস্তক্ষেপ দেখতে পাচ্ছি।
আমাদের জনগণ শেখ হাসিনাকে পদত্যাগে বাধ্য করেছে, এটা যেমন সত্য, তেমনি এটাও সত্য যে, বাইরের কিছু শক্তিও এর পেছনে কাজ করেছে। সরকার বদলে বিদেশি শক্তির হস্তক্ষেপ, এটা কিন্তু স্বাভাবিক নয়। এনিয়ে আলোচনা নেই। আমাদের এসব বিষয় সমাধান করতে হবে। এর জন্য যে ধরনের কাজ করা দরকার, উন্নতির দিকে যাত্রার জন্য আমাদের যে ধরনের চিন্তাভাবনা দরকার, তা আমরা করছি না। জাতীয় ইস্যুতে আমাদের চিন্তাভাবনা অত্যন্ত দুর্বল। তাই আমাদের স্বাধীনতা অর্থপূর্ণ হয়ে উঠছে না।
আমাদের দেশে পলিটিক্যাল ফোর্স বলতে বুঝি ছাত্র সংগঠনগুলোকে। তারা তো ঠিকমতো কাজ করতে পারছে না। গত ৫৪ বছরে আমাদের যে অর্জন দরকার ছিল, তা আমরা করতে পারিনি। আমাদের দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই স্বাধীনতা অর্জনের পরে আমাদের যে শক্তি এবং সামর্থ্য আছে তার পরিচয় আমরা দিতে পারিনি। জনগণ চায় দেশ উন্নয়নশীল দেশের কাতারে উন্নীত হবে। সে লক্ষ্যে জনগণের শক্তিকে কাজে লাগানো দরকার, দরকার ছিল নেতৃত্ব। তা আমরা গড়ে তুলতে পারিনি।
এ অবস্থার মধ্যদিয়ে আমরা যেন আর ভ্রান্ত পথে চলে না যাই, তার জন্য রাজনীতিকে স্বাভাবিক করতে হবে। গণতান্ত্রিক ধারায় রাজনৈতিক পথে সমাধান খুঁজতে হবে। অবশ্যই আমাদের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল গঠন করা দরকার। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল ছাড়া নেতৃত্ব গড়ে তোলা অসম্ভব। ১৯৭২ সাল থেকে আমরা এ অসম্ভবের মধ্যেই আছি।
এই যে রাজনীতি চলছে আমাদের দেশে, এটাকে সুষ্ঠু রাজনীতি বলা চলে না। আজকে যদি আমরা কোনো নিরপেক্ষ শক্তির কাছে বলতে চাই যে, আমাদের নেতা আছেন। আমরা কাকে নেতা বলব? এখন কারও মধ্যে নেতা হয়ে ওঠার কোনো লক্ষ্য বা চেষ্টা নেই। যা হচ্ছে, সেটা হলো তারা ক্ষমতায় গিয়ে কিছু টাকাপয়সা কামাই করতে চায়। নেতৃত্ব গড়ে ওঠার কথা রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতর থেকে। কিন্তু পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিগুলো সেভাবে রাজনৈতিক দল গড়ে উঠতে দেবে না। তারা চক্রান্ত করে, তারা ষড়যন্ত্র করে। রাজনৈতিক দলকে তারা নষ্ট করে দেয়।’
যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাতিসংঘ, বিশ্বব্যাংক- ওরা রাজনৈতিক সাফল্যের কথা বলছে। কিন্তু পশ্চিমা বৃহৎ শক্তিগুলোর এই প্রতিনিধিরা তো বাংলাদেশের জনগণের উন্নতির জন্য কথা বলছে না। তারা নানাভাবে তাদের কর্তৃত্ব বিস্তারের কথাই বলছে।
এই যে দুর্বলতার কথা বলছি, এসব থেকে উত্তরণ সম্ভব। জনসাধারণের অংশগ্রহণে যদি কোনো আন্দোলন হয় তবে সেই আন্দোলন অল্প অল্প করে সাফল্যের দিকে যাবে।
আমাদের দেশে নাকি ১৩ কোটি ভোটার আছে। তারা নাকি এখন ভোটের জন্য পাগল হয়ে আছে! এটা আমি মনে করি না। এটা জনগণের মনের কথা নয়। এই রিপোর্ট (জরিপ) দিয়ে কী হবে? যারা ভোটাভোটি পছন্দ করেন তারা কোটি কোটি টাকা খরচ করবেন। তার পর নির্বাচনে জয়ী হয়ে রাষ্ট্রীয় অর্থ তথা জনগণের টাকা আত্মসাৎ করবেন। জনগণ এ রাজনীতির অবসান চায়।
বাংলাদেশে এখন কোনো রাজনৈতিক দল আছে, সে কথা বলা যাবে না। রাজনৈতিক দল হওয়ার জন্য ন্যূনতম যেসব বৈশিষ্ট্য দরকার তা দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে নেই। রাজনৈতিক নেতা বলতে যা বোঝায় সেরকম একজন লোকও নেই। দল নেই, নেতা নেই। এই শূন্যতা উপলব্ধি করতে হবে আমাদের। তার পর জনজীবনের যে বিরাট-বিপুল সম্ভাবনা আছে, এটা কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করতে হবে। কী ধরনের গণতন্ত্র কাম্য, সেটা বোঝতে হবে যারা নেতৃত্ব দিতে চান তাদেরই। এভাবেই জনগণের ভেতর থেকে গড়ে উঠবে নেতৃত্ব। এ নেতৃত্বের সঙ্গে দেশের রাজনীতি, আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটের নিবিড় সম্পর্ক থাকবে।
লেখক: অধ্যাপক, সভাপতি, বাংলা একাডেমি