সেই ঐতিহাসিক ১৬ ডিসেম্বর। এ কথা ঠিক, বাংলাদেশ তাদের প্রতিনিধি না পাঠালেও, ভারতের পক্ষ থেকে বিজয় দিবস উদ্যাপন হবে ফোর্ট উইলিয়ামে। তিন দিন ধরে। এটা বিজয় দিবস, বিজয়ের ইতিহাস রাবার দিয়ে শত চেষ্টা করেও মুছে ফেলা যায় না। ৫৪ বছর আগের এই দিনটি হাজার হাজার বছর মানুষ মনে রাখবে, যতই বিদেশি চক্রান্ত চলুক না কেন, মানুষের মন থেকে মুছিয়ে দেওয়ার জন্য।…
আজ সেই দিন, ১৬ ডিসেম্বর। পৃথিবীর সামনে একটি নতুন রাষ্ট্রের মানচিত্র দেখাল বিবিসি। ভারতীয় সময় তখন বিকেল সাড়ে ৪টা। দিল্লিতে বসে সেই মানচিত্র দেখছিলেন ভারতীয়রা। শুধু ভারতীয় নয়, পৃথিবীর যেখানে যত বাঙালি ছিলেন, সবাই উল্লাসে ফেটে পড়েন। কলকাতায় মানুষের সে কী বাঁধভাঙা আনন্দ! যুব কংগ্রেসের মিছিলে স্লোগান উঠল, ‘বঙ্গবন্ধুর মুক্তি চাই।’ কলকাতায় মুহুর্মুহু আওয়াজ উঠেছে ‘এশিয়ার মুক্তিসূর্য ইন্দিরা গান্ধী যুগ যুগ জিও’।
এদিনে ১৯৭১-এর সেই ঘটনা আজও আমার চোখের সামনে ভাসছে। সমর-সংবাদদাতা হিসেবে আমিও বাংলাদেশের বহু সীমান্ত জেলা ঘুরেছি, কিন্তু একটাই আপসোস। এ ঘটনার দিন আমি সেখানে উপস্থিত থাকতে পারিনি।
আজকের দিনে, অর্থাৎ ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১-এ পাকিস্তানের পূর্ব অংশের লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজি ভারতের পূর্বাঞ্চলের ইস্টার্ন কমান্ড লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিংহ অরোরার কাছে তার ৯১ হাজার সৈন্য নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। ৫৪ বছর আগের ঘটনা, মনে রাখা কঠিন হলেও সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল সে কথা তুলে ধরার চেষ্টা করছি। ১৯৭১ এর ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান পশ্চিম রণাঙ্গনে ভারতকে আক্রমণ করে। তারও সাত দিন আগে পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব সীমান্তে বয়রায় পাকিস্তানি এয়ারফোর্স এসে বোমা ফেলে চলে যায়। শুধু তাই নয়, একই দিনে পাকিস্তানের ছয়টি প্যাটন ট্যাংক পশ্চিমবঙ্গের দিকে ধেয়ে আসে। বনগাঁ অতিক্রম করার মুহূর্তে তাদের আটকে দেয় ভারতীয় সেনারা। তার পর ৩ ডিসেম্বর পশ্চিম ভারতের দিল্লিসহ বহু এলাকায় তারা একতরফা বোমা মেরে যায়। তখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে সভা করছিলেন। সভা শেষে তিনি রাজভবনের দিকে ঢুকতেই চিফ সেক্রেটারি নির্মল সেনগুপ্ত ইন্দিরাজীর হাতে একগুচ্ছ টেলেক্সের কাগজ ধরিয়ে দেন, যেখানে ছিল পাকিস্তানের ভারত আক্রমণের খবর। ইন্দিরাজী তাকে সেগুলো পড়তে বলেন। শুনে ইন্দিরাজী উত্তেজিত হয়ে পড়েন। তিনি সময় নষ্ট না করে সোজা বিমানবন্দরে চলে যান। আমি উনার কাছে প্রতিক্রিয়া জানতে চাই। তিনি ৩ ঘণ্টা সময় চান এবং কথা দিয়ে যান, রাত ১১টায় তিনি বিবৃতি দেবেন। সে কথা তিনি রেখেছিলেন।
টানা ১৩ দিন যুদ্ধ চলে পশ্চিম এবং পূর্ব রণাঙ্গনে। কিন্তু দুই দিন পর নিয়াজি ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধানের সঙ্গে ফোন করে কথা বলতে চান। নিয়াজির ফোন পাওয়ার পর পূর্বাঞ্চলের জেনারেল জ্যাকব, জেনারেল ভোলা সরকার এবং জেনারেল সৌগত সিং ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে গিয়ে নিয়াজিকে জিজ্ঞেস করেন, তিনি কী কথা বলতে চান? নিয়াজি ‘সিজ ফায়ারের’ প্রস্তাব দেন। কিন্তু ভারতীয় কমান্ডাররা ‘সারেন্ডার’ ছাড়া আর কোনো শর্তে রাজি ছিলেন না। এনিয়ে অনেকক্ষণ বাদানুবাদ চলে। কিন্তু জ্যাকব সারেন্ডার থেকে এক চুলও নড়তে রাজি হন না। ‘সারেন্ডার’ কথাটি নিজের নামাঙ্কিত প্যাডে লিখে সই করে দিতে বলা হলো নিয়াজিকে। এ কথা আমার জ্যাকবের মুখেই শোনা। সেখানেই ঠিক হলো, আজকের দিনেই অর্থাৎ, ১৬ ডিসেম্বর ভারতের জেনারেলরা ঢাকার রমনা ময়দানে যাবেন, সেখানে সর্বসমক্ষে পাকফৌজসহ এ কে নিয়াজি আত্মসমর্পণ করবেন। কথা মতো বিকেল ৩টার মধ্যে অরোরা ঢাকায় পৌঁছে যান। এ খবর গোটা পৃথিবীতে ছড়িয়ে যায়। ১৬ তারিখ বিকেলে ৪টার সময় ডকুমেন্টে সই করেন নিয়াজি। সেখানে তখন গোটা বিশ্বের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। কাজেই দ্রুত সারা বিশ্বে খবর ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে যত বাঙালি ছিলেন, লন্ডন থেকে লসঅ্যাঞ্জেলস, সবাই রাস্তায় বেরিয়ে উল্লাস করেন। কলকাতাতেও উন্মাদনা তুঙ্গে। কলকাতা এবং পার্শ্ববর্তী এলাকার হাজার হাজার উদ্বাস্তু ক্যাম্পের বাঙালি থিয়েটার রোডে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের সদর দপ্তরে দেখা করতে ছুটে যান। যদিও তাদের আটকে দেওয়া হয় সরকারের তরফে।
হ্যাঁ, ৫৪ বছর আগে, আজকের দিনে এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী ছিল লাখ লাখ বাঙালি পৃথিবীর সব প্রান্তে। কিন্তু এতদিন সংবাদদাতা হিসেবে কাজ করেও আসল ঘটনার সময় আমি ঢাকায় ছিলাম না। তার কারণ, আমাকে ও যুগান্তর পত্রিকার প্রয়াত চিফ রিপোর্টার অনিল ভট্টাচার্যকে ফোর্ট উইলিয়াম ক্লাবে বসিয়ে রাখা হয়। আমরা দেখছি বিভিন্ন সংবাদদাতাকে হেলিকপ্টারে করে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এদিকে বিকেল ৪টা গড়িয়ে যাওয়ার পর জানা গেল, সেদিন আর হেলিকপ্টার যাবে না, কুয়াশার জন্য। তাই আমাদেরও যাওয়া হবে না। আমি তখন এ কথা ভাবতেই পারছি না। মন খুব খারাপ। হেঁটে অফিসে ফিরে এলাম। অফিসের নিয়ম, আমি অফিসে ঢুকেই এডিটরের ঘরে দেখা করতে যাই। সেদিনও এডিটর অপেক্ষা করছেন আমার জন্য। ফিরতেই জানতে চাইলেন বাংলাদেশের খবর। কিন্তু আমরা যে যেতে পারিনি, সে কথা তার কাছে বলতেই তিনি রেগে গেলেন! তৎক্ষণাৎ তিনি দিল্লিতে তার সহপাঠী ও তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী বাবু জগজীবন রামকে ফোন করে যেভাবেই হোক আমাকে ঢাকায় যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে বললেন। পরদিনই আমার ঢাকায় যাওয়ার ব্যবস্থা হয়ে গেল। ঢাকায় পৌঁছানোর পর সেদিন আমাকে দারুণভাবে সহযোগিতা করেছিলেন ‘পাকিস্তান অবজার্ভার’ পত্রিকার সাংবাদিক বন্ধু লুৎফর রহমান। সেদিনই অফিস থেকে বেরিয়ে অস্থায়ী সরকারের অফিসে গেলাম। সেখানেও সবাই আমাকে খবর জানার জন্য ঘিরে ধরলেন। কিন্তু তাদেরও দুঃসংবাদ দিতে হলো যে, সেদিন আমার ঢাকা যাওয়া হয়নি। ফেরার পথে দেখলাম নিয়াজি ও তার পরিবার ফোর্ট উইলিয়ামে ঢুকছেন, আমিও ঢুকে পড়লাম তার পেছন পেছন। জেনারেল জ্যাকব সামনে বসে আছেন। এদিকে আমার নিয়াজির ইন্টারভিউ চাই। কিন্তু জানা গেল নিয়াজির খুব মাথা ধরেছে। তিনি কথা বলবেন না। এমনকি জ্যাকবও চেষ্টা করে আমার ইন্টারভিউয়ের ব্যবস্থা করতে পারলেন না। রাত সাড়ে ৯টা অবধি ছিলাম। সেদিন ইন্টারভিউ পাইনি। পরের দিনই তাকে নিয়ে যাওয়া হয় রাঁচিতে। পরে কয়েকটি ট্রেনে ৯১ হাজার পাকসৈন্যকে নিয়ে আসা হয় এবং তাদের রাঁচিতে স্টেডিয়ামে রাখা হয়।
তখন দিল্লির কী প্রতিক্রিয়া? সংক্ষেপে উল্লেখ করি। সেখানে বিকেল ৫টার মধ্যে সংসদ ভবনে সদস্যরা এসে গেছেন। স্পিকার উপস্থিত। কিন্তু লোকসভার নেত্রী, অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী তখনো আসেননি। কারণ তিনি তখন জেনারেল মানেকশ ও বিরোধী নেতাদের সঙ্গে কথা বলছিলেন যুদ্ধে জয়লাভ প্রসঙ্গে। বিভিন্ন দেশ থেকে তার কাছে শুভেচ্ছা বার্তা আসছে। এসব কারণেই দেরি হচ্ছে তার আসতে। অবশেষে তিনি ঢুকলেন। সেদিন সভায় ৫৪২ জন সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তিনি প্রবেশ করা মাত্র গোটা লোকসভা তার জয়ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে উঠল। তৎকালীন বিরোধী দলনেতা অটল বিহারি বাজপেয়ি ইন্দিরাজীকে ‘দেবী দুর্গা’ বলে অভিহিত করলেন। আরএসপি নেতা ত্রিদিব চৌধুরী বললেন, এ সংসদে ইন্দিরাই একমাত্র পুরুষ। দীর্ঘ ৪৫ মিনিট ইন্দিরাজী বক্তৃতা করলেন। তার ভাই মুজিবকে পাকিস্তান জেল থেকে ছাড়িয়ে আনার জন্য সাহায্য প্রার্থনা করলেন দল-মতনির্বিশেষে সবার কাছে। সংসদের এ বক্তৃতার মাধ্যমে তিনি বিশ্বের সব রাষ্ট্রের কাছেও একই আবেদন রাখলেন।
সেদিনই মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সনের বিদেশমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের বিবৃতি পাওয়া গেল, তিনি বললেন, ‘American foreign policy has been defeated by an Indian lady. But we shall take revenge.’ হ্যাঁ, প্রতিশোধ মার্কিনিরা নিয়েছিল, আজও নিয়ে চলেছে।
১৬ ডিসেম্বর আবার ঘুরে এল। কিন্তু বাংলাদেশের মাটিতে সেই আনন্দ উল্লাস নেই। কেন নেই, সেটা পাঠকরা বলতে পারবেন। ১৯৭১-এর ৭ মার্চ সাড়ে ১৭ মিনিটের বিখ্যাত বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন: ‘এই-ই হয়তো আপনাদের জন্য আমার শেষ বাণী হতে পারে। আজকে থেকে বাংলাদেশ একটি স্বাধীন দেশ। আমি আপনাদের আহ্বান জানাচ্ছি- যে যেখানেই থাকুন, যে অবস্থাতেই থাকুন এবং হতে যার যা আছে তাই নিয়ে দখলদার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে শেষনিঃশ্বাস পর্যন্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলুন। ততদিন পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যান- যতদিন না দখলদার পাকিস্তানি বাহিনীর শেষ সৈনিকটি বাংলাদেশের মাটি থেকে বহিষ্কৃত হচ্ছে এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হচ্ছে।’ ১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর, এই ৯ মাসে ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা করেছে পাক ফৌজ। সেই বাঙালি-নিধনযজ্ঞের উদ্যোক্তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পাকিস্তানের আরও দুই লেফটেন্যান্ট জেনারেল টিক্কা খান ও রাও ফরমান আলি।
সেই ঐতিহাসিক ১৬ ডিসেম্বর। কয়েক বছর ধরে এদিনে বাংলাদেশ থেকে ১৫০-২০০ মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবার ভারতের প্রতিরক্ষা দপ্তরের আমন্ত্রণে কলকাতায় আসতেন এবং দিনকয়েক থাকতেন। কিন্তু গত বছর তারা আসেননি এবং এ বছরও আসার কোনো খবর নেই, অন্তত এ লেখা শেষ হওয়া পর্যন্ত। এ কথা ঠিক, বাংলাদেশ তাদের প্রতিনিধি না পাঠালেও, ভারতের পক্ষ থেকে বিজয় দিবস উদ্যাপন হবে ফোর্ট উইলিয়ামে। তিন দিন ধরে। এটা বিজয় দিবস, বিজয়ের ইতিহাস রাবার দিয়ে শত চেষ্টা করেও মুছে ফেলা যায় না। ৫৪ বছর আগের এই দিনটি হাজার হাজার বছর মানুষ মনে রাখবে, যতই বিদেশি চক্রান্ত চলুক না কেন, মানুষের মন থেকে মুছিয়ে দেওয়ার জন্য।
বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জানাই সব পাঠককে। নতুন দিনের অপেক্ষায় আমরা সবাই।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক