ঢাকা ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩, শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬

সর্বশেষ
চট্টগ্রামে অনারের ব্র্যান্ডশপ উদ্বোধনে হিউম্যানয়েড রোবটের চমক খাবারের স্বাদেই খুঁজে পেয়েছি জীবনের আনন্দ আমরা কখনো চাপের কথা ভাবি না: মেসি শিশুদের হাতে মানসম্মত বই দিতে ব্যবস্থা নিন নীলফামারীতে কনে নিয়ে ফেরার পথে মাইক্রোবাস খাদে, প্রাণ গেল ২ জনের খুলে দেওয়া হলো কাপ্তাই হ্রদের ১৬ জলকপাট বৈশ্বিক সংকটে এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর আহ্বান বাণিজ্যমন্ত্রীর ঘুরে আসুন কালাপানি নিউইয়র্ক, টরেন্টো এবং সিডনিতে ফ্লাইট পরিচালনা করবে ইউএস-বাংলা রাশিয়ায় ইউক্রেনের ড্রোন হামলায় ৭ জনের মৃত্যু কুয়েতের বিদ্যুৎ ও পানি শোধন কেন্দ্রে ইরানের হামলা, বিমান চলাচল স্থগিত মস্কোয় ৩৭০টির বেশি ড্রোন হামলা, নিহত ৭ কলকাতায় বিশ্ব শ্রবণ দিবস উপলক্ষে শরৎ সমিতির উদ্যোগে আলোচনা সভা ফুলেল শাড়িতে অনন্যা ২৭ ক্রীড়া ফেডারেশনে নতুন অ্যাডহক কমিটি স্পেন-আর্জেন্টিনা ফাইনাল যেন বার্সেলোনারই প্রতিচ্ছবি! কাশিমপুর মহিলা কারাগার থেকে আসামি পলায়ন, বরখাস্ত ৭ মাধবদীতে ডাকাতদের হামলায় ব্যবসায়ী নিহত নওগাঁ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম উদ্বোধন করলেন শিক্ষামন্ত্রী বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপ: চার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্কসংকেত বেলুচিস্তানে ৪৫ পাক সেনার মৃত্যুর পর কী পরিস্থিতি? মেসিকে থামানোই স্পেনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ: মেরিনো ভিয়েতনামে বন্যায় ৪ জনের মৃত্যু, নিখোঁজ আরও ৪ কুষ্টিয়ায় এক রাতে ৫টি বৈদ্যুতিক মিটার চুরি, বিকাশে টাকা দাবি অস্ত্র দেখাতেই নিজের মোবাইল ছিনতাইকারীকে তুলে দিলেন তরুণী বিশ্ব এআই সম্মেলনে যোগ দিলেন আইসিটি মন্ত্রী শেরপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় অটোচালকসহ নিহত ২ মাগুরায় ট্রান্সফরমার চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে যুবকের মৃত্যু দিনাজপুরে স্মার্ট উদ্যোক্তা ফোরামের আয়োজনে বৃক্ষরোপণ ফরিদপুরে নিখোঁজের দুই দিন পর ব্যবসায়ীর মরদেহ উদ্ধার

নজরদারিতে অনেক মন্ত্রী-এমপি

প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৪, ১২:১৫ পিএম
আপডেট: ০১ জুলাই ২০২৪, ১২:১৬ পিএম
নজরদারিতে অনেক মন্ত্রী-এমপি
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

কয়েকজন সাবেক ও বর্তমান শীর্ষ কর্মকর্তার দুর্নীতির তথ্য জনসমক্ষে আসার পর সরকারের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে অস্বস্তি তৈরি হয়েছে।

রবিবার (৩০ জুলাই) ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও সরকারের একাধিক নীতিনির্ধারক খবরের কাগজকে বলেছেন, ব্যক্তির দায় সরকার কোনোভাবেই বহন করবে না। যারা দুর্নীতি ও অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে তার সরকারের দৃঢ় অবস্থানের বিষয়টি ইতোমধ্যে স্পষ্ট করেছেন। এ অবস্থায় আতঙ্কে রয়েছেন মন্ত্রী-এমপিরাও।

জানা গেছে, তাদের অনেকেই সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার নজরদারিতে রয়েছেন।

নির্ভরযোগ্য একটি সূত্র দাবি করেছে, প্রধানমন্ত্রী নিজেই তার নিজস্ব মাধ্যমে দুর্নীতিবাজদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন, তথ্য সংগ্রহ করছেন।

বিশেষ করে দুর্নীতিবাজ হিসেবে ‘পাবলিক পারসেপশন’ রয়েছে, এমন কর্মকর্তা ও মন্ত্রী-এমপিদের বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন তিনি।

ঘনিষ্ঠদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, কারও ব্যক্তিগত দুর্নীতির জন্য সরকারের ভাবমূর্তি খারাপ হোক- তা হতে দেবেন না তিনি।

সূত্রমতে, দুর্নীতির বিষয়ে সাম্প্রতিক কালে গণমাধ্যমে উঠে আসা চিত্র দেখে সরকারের নীতিনির্ধারকদের অনেকেই বিব্রত হয়েছেন।

ঘরোয়া আলোচনায় তাদের কেউ কেউ বলছেন, এভাবে দেশ চলতে পারে না। সরকারের শুভাকাঙ্ক্ষীরা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ইতিবাচক পরামর্শ দিয়েছেন। এর পরই প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের নীতিনির্ধারকরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান জানান দিয়ে বক্তৃতা করছেন।

সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার জাতীয় সংসদে বলেছেন, ‘দুর্নীতি করলে কারও রক্ষা নেই। আমরা দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছি। সে যে-ই হোক, দুর্নীতি করলে কারও রক্ষা নেই। যারাই দুর্নীতি করবে, ধরা হবে।’ 

দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি স্মরণ করিয়ে দিয়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের শনিবার বলেন, ‘দুর্নীতিবাজদের কারও ছাড় নেই। আমি সবার উদ্দেশে বলছি, বাড়াবাড়ি করবেন না। ক্ষমতার দাপট কেউ দেখাবেন না। কাউকে ক্ষমা করা হবে না। এটা শেখের (শেখ মুজিবুর রহমানের) বেটি। শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে দেখিয়ে দেবেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তিনি কতটা কঠোর হতে পারেন।’

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী আবদুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দলের সভাপতি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে সব সময় সোচ্চার রয়েছেন। তিনি (প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা) জিরো টলারেন্স নীতি নিয়ে এই সামাজিক ব্যাধির বিরুদ্ধে লড়াই করে যাচ্ছেন। আর এ কারণেই বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে।’

সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন এমপি রবিবার তার ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লিখেছেন, ‘দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্তদের এক দপ্তর থেকে আরেক দপ্তরে বদলি কোনো কার্যকর শাস্তি হতে পারে না। বরং দুর্নীতিতে অভিযুক্ত ব্যক্তির সম্পদের সঠিক হিসাব বের করতে হবে এবং তার সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে নিলামে বিক্রি করে দেওয়া দরকার। অবশ্যই তাকে তড়িৎবেগে চাকরিচ্যুত করতে হবে। বদলি কোনো শাস্তি হতে পারে না। মনে রাখতে হবে, সরকারি চাকরিজীবীর সবচেয়ে বড় হাতিয়ার ও সম্পদ হচ্ছে তার চাকরিটি। দুর্নীতিপরায়ণরা জনগণের শত্রু, দেশের শত্রু।’

সম্প্রতি সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, ডিআইজি শেখ রফিকুল ইসলাম শিমুল, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সদ্য অব্যাহতি পাওয়া সদস্য মতিউর রহমান, প্রথম সচিব (কর) কাজী আবু মাহমুদ ফয়সাল, সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদের দুই ভাইসহ বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান শুরু করে এবং সম্পদ জব্দ ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেয়।

দুদক একের পর এক প্রভাবশালী ব্যক্তির বিরুদ্ধে অনুসন্ধানে নেমে তাদের বিপুল সম্পদ জব্দ ও বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের শক্ত অবস্থানের বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। এতে একদিকে যেমন দুর্নীতিবাজদের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে প্রশংসিত হচ্ছে সরকারের দুর্নীতিবিরোধী অভিযান।

সরকারের একাধিক বিশ্বস্ত সূত্র খবরের কাগজকে জানিয়েছে, গত সরকারের (টানা তৃতীয় মেয়াদের) শুরুর দিকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এবং থানা-পুলিশের মাধ্যমে মন্ত্রী-এমপিদের কর্মকাণ্ড মনিটরিং করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে এই ধারা অব্যাহত না থাকলেও নিজস্ব মাধ্যমে মন্ত্রী-এমপিদের বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। মাঠপর্যায় থেকে সংগ্রহ করা এসব তথ্যের ভিত্তিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করেন তিনি। টানা চতুর্থ মেয়াদের সরকারের মন্ত্রিসভা গঠনের আগে সংগ্রহ করা তথ্য কাজে লাগান প্রধানমন্ত্রী। আর সে কারণেই আগের সরকারের একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপমন্ত্রী বাদ পড়েন, এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্যও রয়েছেন।

সূত্র জানিয়েছে, সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তাদের দুর্নীতির চিত্র গণমাধ্যমে আসার পর সংশ্লিষ্টরা নড়েচড়ে বসেছেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো আবার বিপুল উদ্যমে শুরু করেছে তথ্য সংগ্রহ। তারা সচিবালয়ে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের খোঁজখবর রাখছে। এমনকি মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তরে কারা আসছেন- তাদের সঙ্গে সম্পর্ক কী, এসব দর্শনার্থী কী কাজ নিয়ে মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের দপ্তরে ঘুরছেন- সেই খোঁজখবরও নিচ্ছেন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন।

সরকারের এক প্রতিমন্ত্রীর দুর্নীতিসংক্রান্ত একটি সংবাদ গণমাধ্যমে আসার পর তার সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে বলে জানা গেছে। দক্ষিণাঞ্চলের একটি জেলা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য ও প্রতিমন্ত্রী বর্তমানে এ নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন পার করছেন। খবরের কাগজকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন প্রতিমন্ত্রীর এক ঘনিষ্ঠজন।

তিনি বলেন, ‘নির্বাচনি এলাকার পাশাপাশি ঢাকায় প্রতিমন্ত্রীর বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। এমনকি সচিবালয়ে তার (প্রতিমন্ত্রীর) দপ্তরেও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার লোকজনকে দেখা যাচ্ছে। তারা এলাকা থেকে আসা নেতা-কর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন।’

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সচিব গতকাল রবিবার খবরের কাগজের এই প্রতিবেদককে জানিয়েছেন, সরকারের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা এসেছে তার মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি ফাইল যেন ভালোভাবে পড়ে-দেখে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে পারলে তা-ও সরকারের উচ্চপর্যায়কে জানাতে বলা হয়েছে।

ঝুঁকিতে দেশের জ্বালানি ও পোশাক খাত

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৫৬ এএম
আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৯:১১ এএম
ঝুঁকিতে দেশের জ্বালানি ও পোশাক খাত
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

ইয়েমেনের হুতি গোষ্ঠীকে লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালির জলপথ বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছে ইরান। সমঝোতা চুক্তি থেকে বেরিয়ে এসে হরমুজ প্রণালিতে অবরোধ জারির পর তেহরানের এই নির্দেশের ফলে ইরান যুদ্ধ নতুন মোড় নিচ্ছে। মার্কিন বাহিনী গত বৃহস্পতিবার রাতে ইরানের বেসামরিক ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা করেছে। ফলে পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে হুতিকে দিয়ে গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে পারে তেহরান। এই পরিকল্পনার কথা ইতোমধ্যেই কূটনৈতিক সূত্রে সৌদি আরবের কাছে পৌঁছেছে, যা রিয়াদকে চরম উদ্বেগে ফেলেছে।

লোহিত সাগর ও হরমুজ প্রণালি- উভয় গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নৌপথ একসঙ্গে বন্ধ হলে তা বিশ্বজুড়ে এক জ্বালানিসংকট তৈরি করবে। এই সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের ওপর। দেশের অভ্যন্তরীণ জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মক ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ইউরোপগামী পণ্যবাহী জাহাজের যাতায়াত খরচ ও সময় অস্বাভাবিক বেড়ে যাবে। এর ফলে বাংলাদেশের প্রধান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী তৈরি পোশাকশিল্প খাত এক চরম ও দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির মুখে পড়তে যাচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের হামলা ও ইরানের প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি

বিশ্বের তেল ও গ্যাস পরিবহনের অন্যতম প্রধান ধমনি হরমুজ প্রণালিতে ইরান ইতোমধ্যে অবরোধ আরোপ করেছে। ওই প্রণালি এখন পুরোপুরি ইরানের নিয়ন্ত্রণে। অন্যদিকে ওই প্রণালি খুলে দিতে মার্কিন বাহিনী গত বৃহস্পতিবার টানা ষষ্ঠ রাতের মতো ইরানে বিমান হামলা চালায়। ইরানি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন হামলায় ইরানের বন্দর খামিরের পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু, উপকূলীয় অঞ্চলের রেলওয়ে স্টেশন এবং দক্ষিণ-পূর্বের ইরানশাহর বিমানবন্দর লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।

বন্দর খামিরে মার্কিন হামলায় অন্তত সাতজন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন বলে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা আইআরএনএ জানিয়েছে। তবে সংবাদ সংস্থা রয়টার্স তাৎক্ষণিকভাবে নিহতের সংখ্যার সত্যতা যাচাই করতে পারেনি। 

এদিকে এই প্রথম ইরানের অবকাঠামোতে হামলা করল যুক্তরাষ্ট্র। এখন ইরান যদি তার মিত্র হুতিকে দিয়ে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন শুরু করে, অর্থাৎ লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালির প্রবেশপথ পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য নির্দেশ দেয়, তাহলে যুদ্ধের মোড় ঘুরে যাবে। 

অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে ইরানও গতকাল ভোরে বাহরাইন, কুয়েত ও সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালিয়েছে। চূড়ান্ত সময়সীমা দেওয়া হয়েছে।

হুতিদের যুদ্ধ প্রস্তুতি ও সৌদি আরবের উদ্বেগ

রয়টার্সের এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, তেহরানের দুটি উচ্চপর্যায়ের এবং একটি আঞ্চলিক সামরিক সূত্র ইরানের এই গোপন পরিকল্পনার তথ্য নিশ্চিত করেছে। ইরান ও হুতি গোষ্ঠীর সরকারি মুখপাত্ররা এ বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। তবে হুতিসংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, তেহরান থেকে চূড়ান্ত সবুজ সংকেত পাওয়ার পর তারা লোহিত সাগরের প্রবেশপথে সব ধরনের সামরিক প্রস্তুতি শেষ করেছে। বাব এল-মান্দেব প্রণালির কৌশলগত অবস্থানগুলোতে আধুনিক ড্রোন ও দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা হয়েছে।

কূটনৈতিক সূত্রে এ তথ্য সৌদি আরবের কাছে পৌঁছানোর পর রিয়াদ এই হুমকিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করছে। বাব এল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ হলে সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়বে সৌদি আরব। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তেল উৎপাদনকারী এই দেশটির মোট তেল রপ্তানির ৭০ শতাংশই লোহিত সাগরের ইয়ানবু বন্দর থেকে বিশ্ববাজারে পাঠানো হয়। এর আগে সানা বিমানবন্দরে হামলার জের ধরে হুতিরা সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলে বেশ কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছিল। ২০১৫ সাল থেকে ইয়েমেনে সৌদি সামরিক অভিযানের কারণে হুতিরা সৌদি আরবকে তাদের প্রধান শত্রু মনে করে। বর্তমানে ইয়েমেনের অর্ধেক ভূখণ্ড হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং বাকি অংশ সৌদি-সমর্থিত সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে।

বিশ্ব জ্বালানি বাজার ও সরবরাহ লাইনের অবরুদ্ধ দশা

আন্তর্জাতিক জ্বালানি খাতের জন্য হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগর অত্যন্ত সংবেদনশীল রুট। বিশ্বের মোট জ্বালানি পণ্যের ২৫ শতাংশ পরিবাহিত হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে এবং প্রায় ৭ শতাংশ যায় লোহিত সাগর দিয়ে। এই দুটি পথ বন্ধ হয়ে গেলে তা বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ভয়াবহ মন্দা ও মুদ্রাস্ফীতি ডেকে আনবে।

ইতোমধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে। ওয়াশিংটন গত বুধবার থেকে ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা কঠোর করার পর পরিস্থিতি আরও জটিল রূপ নিয়েছে। যদি হুতিরা লোহিত সাগরের প্রবেশপথও সফলভাবে অবরুদ্ধ করে ফেলে, তবে তা হবে বৈশ্বিক জ্বালানি খাতের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিপর্যয়। এর ফলে এশিয়া ও পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে সমুদ্রপথে বাণিজ্য যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।

বাংলাদেশের জ্বালানি ও তৈরি পোশাকশিল্পে আসতে পারে ভয়াবহ আঘাত

মধ্যপ্রাচ্যের এই সর্বাত্মক যুদ্ধ পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় শিকার হতে পারে বাংলাদেশের অর্থনীতি। প্রথমত, বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের তীব্র সংকট দেখা দিতে পারে। জ্বালানি আমদানির খরচ অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেলে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ও শিল্পকারখানা সচল রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। দ্বিতীয়ত, এবং সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়বে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্প খাতে। বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসে এই খাত থেকে এবং এই পোশাকের প্রধান গন্তব্য ইউরোপ ও আমেরিকার দেশগুলো।

এই পণ্যবাহী জাহাজগুলো লোহিত সাগরের বাব এল-মান্দেব প্রণালি ও সুয়েজ খাল হয়ে পশ্চিমা দেশগুলোতে পৌঁছায়। লোহিত সাগর বন্ধ হলে পণ্যবাহী জাহাজগুলোকে পুরো আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে উত্তমাশা অন্তরীপ হয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। এতে জাহাজ ভাড়া ও পরিবহন খরচ অস্বাভাবিক বেড়ে যাবে। তা ছাড়া স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে পণ্য পৌঁছাতে ১৫ থেকে ২০ দিন বেশি সময় লাগবে। এর ফলে একদিকে যেমন পরিবহন খরচ বাড়বে, অন্যদিকে পশ্চিমা ক্রেতাদের কাছে সময়মতো পণ্য পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়বে। ফলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশি পোশাকের দীর্ঘদিনের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও ক্রেতাদের আস্থা মারাত্মকভাবে ধসে পড়ার ঝুঁকিতে পড়বে।

জ্বালানি তেলের দাম বাড়তে পারে, পর্যাপ্ত মজুতের আশ্বাস বিপিসির

ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সামরিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় আন্তর্জাতিক বাজারে বেড়েছে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম। যার প্রভাব পড়তে পারে বাংলাদেশেও। দেশের তেলের বড় অংশই আমদানিনির্ভর। তাই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে দেশে জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হতে পারে বলে ধারণা করছে সরকারও। 

গতকাল আল-জাজিরার এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ শতাংশের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ ডলারের ওপরে উঠেছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম বেড়ে প্রায় ৮০ ডলারে পৌঁছেছে। চলতি সপ্তাহে ব্রেন্ট ও ডব্লিউটিআই–উভয় ধরনের তেলের দামই প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে।

এদিকে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার ৩৩ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ২৮ ডলারে এবং ডব্লিউটিআই ফিউচার ৪২ সেন্ট বা শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮০ দশমিক ২ ডলারে লেনদেন হয়েছে।

তবে বৈশ্বিক অস্থিরতার মধ্যেও বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি)। বিপিসি চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমান সাংবাদিকদের জানান, বর্তমানে দেশে ৬০ দিনের বেশি জ্বালানি তেল মজুত রাখার সক্ষমতা রয়েছে। তিনি বলেন, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে মজুত সক্ষমতা ৭১ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ ছাড়া ২০২৭ সালের মধ্যে ৯০ দিনের জ্বালানি মজুত নিশ্চিত করতে বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন ও সংরক্ষণ প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

মো. রেজানুর রহমান আরও জানান, প্রচলিত সরকার-টু-সরকার (জিটুজি) চুক্তির পাশাপাশি আরও ১১টি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জ্বালানি আমদানির ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এতে সরবরাহব্যবস্থা আরও বহুমুখী ও শক্তিশালী হবে এবং বৈশ্বিক সংকটের মধ্যেও দেশের জ্বালানি-নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সহজ হবে।

জ্বালানি বিভাগের তথ্য বলছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে সব ধরনের জ্বালানি তেলের মোট চাহিদা ৮৪ লাখ ২৬ হাজার ৪০০ মেট্রিক টন হতে পারে। এর মধ্যে ডিজেলের চাহিদাই সর্বোচ্চ, ৪৪ লাখ ৭৩ হাজার মেট্রিক টন। মাসভিত্তিক হিসাবে ডিজেলের গড় চাহিদা প্রায় ৩ লাখ ৭২ হাজার ৭৫০ টন। এ ছাড়া ফার্নেস অয়েলের চাহিদা ৭ লাখ ৩৫ হাজার টন, জেট ফুয়েলের ৬ লাখ ৬৩ হাজার টন, পেট্রলের ৪ লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ টন এবং অকটেনের চাহিদা ৪ লাখ ৩৯ হাজার ৯০০ টন নির্ধারণ করা হয়েছে।

বিপিসির আওতাধীন পদ্মা, মেঘনা, যমুনাসহ ছয়টি বিপণন ও সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বর্তমানে মোট ১৫ লাখ ৪৪ হাজার ৬৬ টন জ্বালানি তেল সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে। এর মধ্যে ৬৭ হাজার ৬৩২ টন ধারণক্ষমতার সংরক্ষণ অবকাঠামো সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ চলমান রয়েছে।

বর্তমানে বিপিসির মজুত সক্ষমতা অনুযায়ী ডিজেল ৫৭ দিন, ফার্নেস অয়েল ৭৮ দিন, অকটেন ৪৬ দিন এবং পেট্রল ২৯ দিনের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। ভবিষ্যতে দেশের জ্বালানি-নিরাপত্তা আরও জোরদার করতে এই সংরক্ষণ সক্ষমতা ধাপে ধাপে বাড়িয়ে ৯০ দিনে উন্নীত করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে সংস্থাটি।

উন্মোচনের অপেক্ষায় অমীমাংসিত ইতিহাস

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৩৭ এএম
আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:৪৫ এএম
উন্মোচনের অপেক্ষায় অমীমাংসিত ইতিহাস
মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন

রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত হিসেবে অভিযুক্ত মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন গ্রেপ্তার হওয়ায় দীর্ঘ ৪৫ বছর পর আবারও সামনে এসেছে ইতিহাসের ‘অমীমাংসিত’ নানা প্রশ্ন। তবে মূল আলোচনায় রয়েছে মেজর মোজাফফর এতদিন কোথায়-কীভাবে আত্মগোপনে ছিলেন। তিনি কি দেশেই ছিলেন, না কি বিদেশে পলাতক ছিলেন? কীভাবে তিনি গোয়েন্দাদের জালে ধরা পড়লেন, এমন নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে অনেকের মনে। তবে এসব প্রশ্নের বেশ কিছু জবাব বা ‘ক্লু’ পেয়েছে খবরের কাগজ।

  • ৪৫ বছর পর গ্রেপ্তার হওয়া মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেন দীর্ঘদিন ভারতসহ বিভিন্ন স্থানে ‘বিপ্লব সরকার’ ও ‘জয় ব্যানার্জি’ ছদ্মনামে আত্মগোপনে ছিলেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
  • বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জীবিত একমাত্র অভিযুক্ত হওয়ায় তার জিজ্ঞাসাবাদে ১৯৮১ সালের বহু অমীমাংসিত ঘটনার তথ্য সামনে আসতে পারে।
  • ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ তথ্যপ্রযুক্তি ও গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বনানীর একটি বাসা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করে পরে সামরিক পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেছে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, প্রতিবেশী দেশ ভারত ও থাইল্যান্ডে বিভিন্ন সময়ে মেজর মোজাফফরের অবস্থান বা যাতায়াত ছিল। ভারতে তিনি ‘বিপ্লব সরকার’ ও ‘জয় ব্যানার্জি’ নামে দুটি পরিচয় ব্যবহার করেন। রাজধানী ঢাকার বনানীতে মেয়ের বাসায় তার ‘অনিয়মিত’ যাতায়াত ছিল। তবে দীর্ঘদিন ধরে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছিলেন কি না, সে বিষয়ে এখনো নিশ্চিত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা বা সংশ্লিষ্টরা এসব বিষয়ে বিস্তারিত জানার চেষ্টা চালাচ্ছেন। 

অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যাসহ ওই সময়ের বেশ কিছু ঘটনায় সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের দিক থেকেও মেজর মোজাফফর গ্রেপ্তারের বিষয়টি বেশ গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যায় জড়িত হিসেবে যে কয়েকজনের নাম বিভিন্ন মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত, তাদের মধ্যে একমাত্র জীবিত ব্যক্তি এই মেজর মোজাফফর। ফলে তার গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে ১৯৮১ সালে ৩০ মে চট্টগ্রামে সংঘটিত তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড এবং পরে সেনা বিদ্রোহ, ক্যুসহ ওই সময়ের বিভিন্ন ‘অমীমাংসিত’ সত্য উন্মোচনের নতুন সম্ভাবনা দেখছেন বিশ্লেষকরা। 

১৯৮১ সালের অমীমাংসিত ইতিহাস উন্মোচনের সম্ভাবনা

ইতিহাসের কলঙ্কিত এক অধ্যায় রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ড, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা-পরবর্তী রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামের সার্কিট হাউসে সংঘটিত হয়। 

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জেনারেল জিয়াউর রহমানের (বীর উত্তম) হত্যাকাণ্ড এবং তৎপরবর্তী সেনা বিদ্রোহ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অমীমাংসিত অধ্যায়। ওই সময়ের বিভিন্ন সামরিক অভ্যুত্থান, মেজর জেনারেল এম এ মঞ্জুরকে হত্যা, জেনারেল এরশাদের ক্ষমতা গ্রহণ এবং এসব ঘটনায় দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের ভূমিকা আলোচনাসংক্রান্ত বিষয়গুলো দেশের ইতিহাসে আজও এক ধূসর অংশ হিসেবে রয়ে গেছে। এ ছাড়া সে সময়ে রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যার বিচারকাজ অতি দ্রুততার সঙ্গে শেষ করায় প্রকৃত কুশীলবদের ভূমিকা নিয়েও দীর্ঘস্থায়ী বিতর্কের সৃষ্টি হয়, যার ফলে আজও অনেক প্রশ্নের সঠিক উত্তর মেলেনি। 

বিভিন্ন নথিপত্র অনুসারে, মেজর মোজাফফর ১৯৮১ সালের ওই ঘটনাগুলোর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। তাছাড়া এ ঘটনায় সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিই বর্তমানে একমাত্র জীবিত রয়েছেন। ফলে মোজাফফরের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি জিয়া হত্যাসহ ওই সময়ের বেশ কিছু সামরিক-রাজনৈতিক অপতৎপরতার তথ্য-উপাত্ত যাচাইয়ের মাধ্যমে জাতির সামনে প্রকৃত ইতিহাস তুলে ধরার এক সুবর্ণ সুযোগ তৈরি হয়েছে।

রক্ষীবাহিনীতে কমিশন লাভ ও ভারতে ছদ্মনাম 

সংশ্লিষ্টরা জানান, মেজর মোজাফফর প্রথম জাতীয় রক্ষীবাহিনীতে (জেআরবি) কমিশন পেয়েছিলেন। ১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর রক্ষীবাহিনীর সদস্যদের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৮১ সালে তিনি চট্টগ্রামে ২৪ পদাতিক ডিভিশনে কর্মরত ছিলেন। রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতায় আত্মগোপন করে থাকেন। সে সময় তিনি নিজেকে ‘বিপ্লব সরকার’ এবং ‘জয় ব্যানার্জি’–এই দুটি ছদ্মনামে পরিচয় দিতেন। পরে ১৯৯৬ সালে তিনি একবার দেশে ফিরে এসেছিলেন। এরপর স্থায়ীভাবে দেশে ছিলেন বা বিদেশে ছিলেন কি না, সেগুলো এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে ঢাকায় তার মেয়ের বাসায় ‘অনিয়মিত’ যাতায়াত ছিল বলেও একটি সূত্র থেকে জানা যায়। 

শুক্রবার (১৭ জুলাই) এ বিষয়ে একাধিক ঊর্ধ্বতন সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা হয় এ প্রতিবেদকের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সাবেক ওই সেনা কর্মকর্তারা খবরের কাগজকে বলেন, রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তথা ওই ঘটনার বিশালতা ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে মোজাফফরকে সমন্বিতভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। সে ক্ষেত্রে সব বাহিনীর সমন্বয়ে একটি গ্রহণযোগ্য বা যথাযথ তদন্ত সেল গঠন করা যেতে পারে। তাদের মতে, কোনো ধরনের প্রতিশোধমূলক উদ্দেশ্যে নয়, বরং ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, জাতীয় আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি সঠিক ইতিহাস সংরক্ষণের স্বার্থেই নির্মোহ তদন্ত হওয়া উচিত। মোজাফফরের কাছ থেকে অমীমাংসিত অনেক সত্য বা প্রকৃত ইতিহাস জানা সম্ভব বলেও মনে করেন তারা।

বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে ঢাকা থেকে মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তারের তথ্য জানায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। পরের দিন বৃহস্পতিবার ডিএমপির আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে শুধু বলা হয়, ‘জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডের পর থেকে তিনি বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপনে ছিলেন। বিশ্বস্ত সোর্স ও তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষণপূর্বক ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ তার অবস্থান শনাক্তের মাধ্যমে বনানীর একটি বাসা থেকে মোজাফফরকে গ্রেপ্তার করা হয়।’ এ ছাড়া আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ঢাকা সেনানিবাসের মিলিটারি পুলিশের (এমপি) কাছে যথাযথ আইনানুগ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে তাকে হস্তান্তর করা হয়েছে বলেও জানায় ডিএমপি।

ক্লাসরুমে এসি নেই তবু মাসে ৫০০

প্রকাশ: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০৮:১৮ এএম
আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২৬, ০১:১৪ পিএম
ক্লাসরুমে এসি নেই তবু মাসে ৫০০
ছবি: সংগৃহীত

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজে সন্তান ভর্তি করে বিপাকে পড়েছেন শত শত অভিভাবক। প্রথম শ্রেণিতে নির্ধারিত বেতন ১ হাজার ৩০০ টাকা। তবে প্রতি মাসেই বেতন ও অন্য ফি বাবদ প্রায় ৩ হাজার টাকা দিতে হচ্ছে অভিভাবকদের। এতে শিক্ষার্থীদের পরিবারগুলো চরম আর্থিক চাপের মুখে পড়ছে। অবাক করা ব্যাপার হলো, শিক্ষার্থীদের ক্লাসরুমে এসি নেই। এর পরও শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে প্রতি মাসে ৫০০ টাকা ফি নেওয়া হচ্ছে। অনুপস্থিতির জন্য নিয়মিত জরিমানা গুনে ক্ষুব্ধ হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা। তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপিসহ মানববন্ধন ও আইনি পথে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

  • নির্ধারিত বেতনের বাইরে নানা খাতে অতিরিক্ত ফি ও অনুপস্থিতির জরিমানায় ক্ষুব্ধ ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের শত শত অভিভাবক।
  • অভিভাবকদের অভিযোগ, এসি না থাকলেও এসি ফি আদায় এবং অ্যাডহক কমিটির মাধ্যমে অবৈধভাবে জরিমানা চালু করা হয়েছে।
  • অতিরিক্ত ফি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ ও অনিয়মের প্রতিবাদে অভিভাবকরা স্মারকলিপি, মানববন্ধন ও আইনি পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

অন্তত ১০ জন অভিভাবকের সঙ্গে কথা হয় খবরের কাগজের। তারা জানান, এ বছরই তারা সন্তানকে ভিকারুননিসায় ভর্তি করেছেন। বছরের শুরু থেকে অভিভাবকরা নানা অজুহাতে প্রতিষ্ঠানটিতে বাড়তি টাকা দিতে বাধ্য হচ্ছেন। এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে ফেস্টিভ্যাল ফি ৫০০ টাকা, ম্যাগাজিন ফি ২৫০ টাকা, পূজা ফি ১৫০ টাকা অতিরিক্ত আদায় করেছে কর্তৃপক্ষ। একজন অভিভাবক বলেন, ‘আমাদের কাছ থেকে মার্চ মাসে জেনারেটর ফি বাবদ ৫০০ টাকা, ক্যালেন্ডার ও সিলেবাসের জন্য ১৫০ টাকা আদায় করা হয়েছে। এপ্রিল মাসে স্পোর্টস ফি ২০০ টাকা দিতে হয়েছে। মে মাসে ডায়েরির নামে ২০০ টাকা আবার অর্ধবার্ষিক পরীক্ষার নামে ৭০০ টাকা নেওয়া হয়েছে। জুলাইয়ে অনুপস্থিত ফি ও সেশন চার্জ যুক্ত করা হয়েছে ১ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া এসি ফি হিসেবেও ৫০০ টাকা আদায় করেছে প্রতিষ্ঠানটি। নামে-বেনামে আরও অনেক ফি আছে। এ বিষয়ে অভিভাবকরা বলছেন, এত ফির পরও শিক্ষার্থী অনুপস্থিত হলেই ৫০ টাকা জরিমানা গুনতে হচ্ছে। এসবের কারণ জানতে চাওয়া হলে কর্তৃপক্ষের লোকজন বলেন, দেশের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানে সন্তান পড়বে, টাকা তো বেশি লাগবেই। এ নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যে তীব্র প্রতিক্রিয়া শুরু হয়েছে।

অভিভাবক কাজল কর্মকার খবরের কাগজকে বলেন, ঝড়, বন্যা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসুস্থতা কোনো বিষয়েই অনুপস্থিতির জরিমানা মওকুফ করছে না স্কুল কর্তৃপক্ষ। এটি চরম অমানবিক ও আইনবহির্ভূত। শিক্ষা প্রশাসনের নজরদারি নেই।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের একজন শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে খবরের কাগজকে বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী কোনো শিক্ষার্থী ৮০ শতাংশ ক্লাসরুমে উপস্থিত হলে তাকে নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে গণ্য করা হয়। পরীক্ষায় বসতেও কোনো বাধা থাকে না। কিন্তু ভিকারুননিসায় যা শুরু হয়েছে তা সম্পূর্ণ অবৈধ। কারণ একজন শিক্ষার্থী ৯৬ শতাংশ দিন ক্লাস করলেও তাকে জরিমানা দিতে হচ্ছে।

২০১৭ সালে প্রতিষ্ঠানটিতে অনুপস্থিতির জরিমানা চালু করা হয়। ২০১৮ সালে এ বিষয়ে আদালতে একটি রিট দায়ের হয়। পরে ২০১৯ সালে কর্তৃপক্ষ রেজল্যুশনের মাধ্যমে জরিমানা প্রথা বাতিল করে। আশ্চর্যের বিষয়, বাতিলের সিদ্ধান্তটি নিয়েছিল কলেজের গভর্নিং বডি। ২০২৬ সালে এসে জরিমানার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অ্যাডহক কমিটি, যাদের এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া ও বাস্তবায়নের কোনো সুযোগই নেই। অথচ এই কমিটি প্রচুর শিক্ষার্থী ভর্তি করেছে ও অসংখ্য শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এর পেছনে কলকাঠি নেড়েছেন কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মাজেদা বেগম। অথচ ঢাকা শিক্ষা বোর্ড বলছে, অ্যাডহক কমিটির কাজ শুধু নিয়মিত কমিটির নির্বাচনের ব্যবস্থা করা। এর বাইরে তাদের কোনো কাজ নেই।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক এক অধ্যক্ষ জানান, ভিকারুননিসায় অনিয়মের ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু সব সময় গভর্নিং বডির প্রধান হন প্রচণ্ড ক্ষমতাবান। সেখানে শিক্ষা মন্ত্রণালয়েরও কিছুই করার থাকে না। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), ঢাকা বোর্ড কী করবে? এর আগেও একবার বিদ্যালয়ে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া বাবদ জরিমানা ও মামলা হয়েছিল। সেবারও শিক্ষার্থীদের পক্ষ থেকে আইনি ফির নামে অর্থ আদায় করে বিল পরিশোধ করা হয়। এটি ছিল চরম অনৈতিক, এখন যা আবার শুরু হয়েছে।

অভিভাবক হুমায়ুন কবীর খবরের কাগজকে অভিযোগ করে বলেন, ‘ভিকারুননিসা বিদ্যালয়ের ভেতরের ক্যানটিন ও দোকানে অত্যন্ত নিম্নমানের ও অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রি করা হয়, যা আমাদের সন্তানদের মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ফেলছে। শিক্ষার্থীরা দীর্ঘ সময় বিদ্যালয়ে অবস্থান করে, ক্যানটিনের খাবার খায়। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের টয়লেটগুলোর অবস্থা অত্যন্ত নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর। এর ফলে শিশুরা দীর্ঘ সময় মূত্র চেপে রাখছে, যা তাদের কিডনিসহ নানাবিধ জটিল রোগের কারণ হতে পারে। এ ছাড়া নোংরা পরিবেশ থেকে ছোঁয়াচে রোগ ছড়ানোর আশঙ্কা রয়েছে। 

মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক (বিদ্যালয়) প্রফেসর মো. সাখাওয়াত হোসেন খান খবরের কাগজকে গতকাল বলেন, ‘এই ঘটনা আমার জানা নেই। আমি অবশ্যই রবিবার খবর নেব। সেই সঙ্গে ব্যবস্থাও নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি পরিচালক পদে নতুন যোগদান করেছি। আমাকে একটু সময় দেন।’

সংসদে বাজেট আলোচনাকে হার মানিয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১০:৩১ এএম
সংসদে বাজেট আলোচনাকে হার মানিয়েছে রাজনৈতিক বিতর্ক
ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় তথা বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের প্রথম বাজেট অধিবেশন শেষ হয় গত বুধবার (১৫ জুলাই)। গত ৭ জুন শুরু হওয়া ৩৯ দিনের এই অধিবেশন চলে মোট ২৬ কার্যদিবস। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা হিসেবে জাতীয় বাজেট পাসই ছিল অধিবেশনের প্রধান উদ্দেশ্য। তবে বাজেটের পাশাপাশি সংবিধান সংশোধন না সংস্কার করা হবে, জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, লোডশেডিং, শিক্ষাব্যবস্থা, টেলিটক, আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সংসদীয় ভাষা ও শিষ্টাচার–এসব বিষয়েই সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিতর্ক ও রাজনৈতিক বাগ্‌যুদ্ধ হয়েছে। সংসদের ভেতরের বহু বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে। একই সঙ্গে সংসদীয় ভাষা ও শিষ্টাচার নিয়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের একাধিক পর্যবেক্ষণ নিয়ে চলেছে নানা আলোচনা।
 
অধিবেশনের কেন্দ্রবিন্দু ছিল ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট। গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট উত্থাপন করেন, যা দেশের ইতিহাসে সর্ববৃহৎ। বাজেটে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বেসরকারি বিনিয়োগ, রাজস্ব আহরণ, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, কৃষি, সামাজিক সুরক্ষা ও অবকাঠামো উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী অর্থনীতিতে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি এবং সরকারি ব্যয়ে দক্ষতা বৃদ্ধিকে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরেন।
 
বাজেটের ওপর টানা ১৪ কার্যদিবস সাধারণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। মোট ৪৮ ঘণ্টা ৫১ মিনিটের আলোচনায় ৩১৬ জন সংসদ সদস্য অংশ নেন। 
 
সরকারি দলের ২০০ এবং বিরোধী দলের ৯১ সদস্য ছাড়াও ২৫ জন সংরক্ষিত আসনের ও স্বতন্ত্র সদস্যরা আলোচনায় বক্তব্য রাখেন। সরকারি দল বাজেটকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সংস্কারের রূপরেখা হিসেবে তুলে ধরলেও বিরোধী সদস্যরা মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব আহরণ, বাজেট ঘাটতির অর্থায়ন, কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ নিয়ে সমালোচনা করেন। প্রায় ২০ দিনের আলোচনা শেষে ৩০ জুন অধিবেশনে কণ্ঠভোটে এই বাজেট পাস হয়।
 
আইন প্রণয়নেও অধিবেশন ছিল সক্রিয়। ২৬ কার্যদিবসে মোট ১০টি সরকারি বিল পাস হয়। সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনায় অংশ নেন ২৫ জন সদস্য। কার্যপ্রণালি বিধির ৭১ ধারায় ৭১৫টি নোটিশ জমা পড়ে; এর মধ্যে ২৪টি গৃহীত এবং ২২টির ওপর আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। ৭১(ক) বিধিতে ১২৫টি দুই মিনিটের নোটিশ উত্থাপিত হয়। এ ছাড়া ১৩১ বিধির আওতায় চারটি সিদ্ধান্ত প্রস্তাব নিষ্পত্তি করা হয়।
 
প্রশ্নোত্তর পর্বেও সদস্যদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল লক্ষণীয়। প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে ২৭৮টি প্রশ্ন জমা পড়লেও ৩৫টির উত্তর টেবিলে উপস্থাপন করা হয়। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশে জমা পড়া ৫ হাজার ৩১টি প্রশ্নের মধ্যে ৩ হাজার ৪৭৪টির উত্তর দেওয়া হয়। সম্পূরক প্রশ্নোত্তর পর্বে বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আইনশৃঙ্খলা, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি, স্থানীয় সরকারসহ বিভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে মন্ত্রীদের জবাব সংসদে প্রাণবন্ত বিতর্কের জন্ম দেয়।
 
অধিবেশনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ সাংগঠনিক সিদ্ধান্ত ছিল সংসদীয় কমিটি গঠন ও পুনর্গঠন। দ্বিতীয় অধিবেশনে সংবিধান সংশোধনসংক্রান্ত বিশেষ কমিটিসহ মোট ১১টি কমিটি গঠন বা পুনর্গঠন করা হয়। এর আগে প্রথম অধিবেশনে গঠিত আটটি কমিটিসহ দুই অধিবেশনে মোট ১৯টি সংসদীয় ও বিশেষ কমিটি গঠনের মাধ্যমে সংসদীয় তদারকি কাঠামো আরও সম্প্রসারিত হয়।
 
সংবিধান নিয়ে বিতর্ক, রাজনৈতিক উত্তাপ
বাজেট অধিবেশনে সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক বিতর্কের সূচনা হয় সংবিধান সংশোধন প্রশ্নে। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি। বিরোধী দল প্রতিনিধি না দেওয়ায় গত ১৪ জুন ৫টি পদ শূন্য রেখে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে সভাপতি করে গঠিত এ কমিটির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদের আলোকে প্রয়োজনীয় সংবিধান সংশোধনী বিলের খসড়া প্রস্তুত করা। সরকার এটিকে জুলাই সনদের সাংবিধানিক বাস্তবায়নের পথ হিসেবে তুলে ধরলেও বিরোধী দল ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের দাবিতে অনড় থেকে কমিটি প্রত্যাখ্যান করে এবং অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করে। 
 
সংবিধান সংশোধন-সংক্রান্ত বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব সংসদে উঠলে বিরোধী দল তা প্রত্যাখ্যান করে। তবে সরকারের যুক্তি ছিল, জুলাই জাতীয় সনদের সাংবিধানিক বিষয়গুলো বাস্তবায়নের একমাত্র পথ সংসদের মাধ্যমে সংবিধান সংশোধন। অন্যদিকে বিরোধী দল দাবি করে, গণভোটে জনগণ সংবিধানের ‘সংশোধন’-এর নয়, বরং মৌলিক ‘সংস্কার’-এর পক্ষে রায় দিয়েছে। ফলে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন ছাড়া অন্য কোনো প্রক্রিয়ায় তারা অংশ নেবে না। পরে বিরোধী দলকে ছাড়াই ১২ সদস্যের বিশেষ কমিটি গঠন করা হয়। 
 
বাজেট আলোচনার শুরুতেই বিদ্যুৎ ও লোডশেডিং নিয়ে রুমিন ফারহানার বক্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। তিনি দাবি করেন, গ্রামাঞ্চলের মানুষ এখনো প্রতিদিন ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎহীন থাকছে। জবাবে বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী বলেন, দেশে কোনো নির্ধারিত লোডশেডিং নেই। দুই পক্ষের বক্তব্যের পর স্পিকার তথ্যভিত্তিক আলোচনা এবং বাস্তবতা যাচাই করে বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানান। বিষয়টি সংসদের বাইরেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।
 
মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই গণ-অভ্যুত্থান এবং ইতিহাসের বয়ান নিয়েও একাধিক দিন সংসদ উত্তপ্ত ছিল। মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বক্তব্যকে ঘিরে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয়। একপক্ষ জুলাই আন্দোলনকে নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সূচনা হিসেবে তুলে ধরে, অন্য পক্ষ মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সঙ্গে তার সম্পর্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলে। কয়েকজন সদস্যের বক্তব্যে তীব্র রাজনৈতিক ভাষা ব্যবহৃত হলে স্পিকার তা সংযত রাখার নির্দেশ দেন এবং কিছু বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে এক্সপাঞ্জ করার নির্দেশ দেওয়া হয়।
 
টেলিটক নিয়ে তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রীর বক্তব্যও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। সংসদে তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল অপারেটর টেলিটক বিক্রির কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই; বরং নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও সেবার মানোন্নয়নের জন্য প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিকায়ন করা হচ্ছে। বিরোধী সদস্যরা টেলিটকের দীর্ঘদিনের লোকসান, গ্রাহকসেবা এবং প্রতিযোগিতার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সরকার এটিকে কৌশলগত রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে ধরে রাখার পক্ষে অবস্থান নেয়।
 
এইচএসসি পরীক্ষা নিয়েও সংসদে উল্লেখযোগ্য আলোচনা হয়। শিক্ষামন্ত্রী ঘোষণা দেন, যেসব পরীক্ষার্থী অনিবার্য কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি, তাদের জন্য বিশেষ সুযোগ দেওয়া হবে। পাশাপাশি পদার্থবিজ্ঞান বিষয়ের ভুল প্রশ্নের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পরীক্ষার্থীদের পূর্ণ নম্বর দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথাও জানান তিনি। শিক্ষামন্ত্রীর এ ঘোষণা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করলেও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়ে কয়েকজন সদস্য প্রশ্ন তোলেন।
 
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর একাধিক বক্তব্যও আলোচনায় আসে। ধর্ষণের মামলা বৃদ্ধি মানেই অপরাধ বৃদ্ধি নয়–তার এই মন্তব্য সংসদের ভেতরে-বাইরে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তিনি ব্যাখ্যা করেন, মানুষ এখন অভিযোগ করতে বেশি উৎসাহিত হচ্ছে বলেই মামলার সংখ্যা বেড়েছে। বিরোধী সদস্যরা অবশ্য এ ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট না হয়ে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
 
অধিবেশনের শেষ ভাগে ‘গুপ্ত’ শব্দ ব্যবহারকে কেন্দ্র করেও সংসদে হইচই সৃষ্টি হয়। কয়েকজন সদস্যের বক্তব্যে ব্যক্তিগত ইঙ্গিতপূর্ণ শব্দচয়ন ও কটাক্ষের অভিযোগ ওঠে। স্পিকার তাৎক্ষণিকভাবে সদস্যদের সতর্ক করে সংসদীয় ভাষা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। একইভাবে বিভিন্ন সময়ে ‘অশোভন’, ‘অসংসদীয়’ ও ব্যক্তিগত আক্রমণাত্মক শব্দ ব্যবহার করায় একাধিক বক্তব্য কার্যবিবরণী থেকে বাদ দেওয়া হয়। সংসদের শুরু থেকেই স্পিকার বারবার সতর্ক করলেও এমন ঘটনা পুরো অধিবেশনজুড়েই ঘটেছে।
 
এ প্রসঙ্গে সংসদীয় শালীনতা নিয়ে নতুন করে আলোচনায় আসে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) পুরোনো একটি গবেষণা। ২০১৭ সালের পাঁচটি অধিবেশন বিশ্লেষণ করে সংস্থাটি জানিয়েছিল, মোট অধিবেশন সময়ের প্রায় ১৩ ঘণ্টা অশালীন ভাষা ব্যবহারে ব্যয় হয়েছিল। এবারের অধিবেশনেও ভাষা ও শব্দচয়ন নিয়ে পুনরাবৃত্ত বিতর্ক সেই গবেষণার পর্যবেক্ষণকে আবারও আলোচনায় নিয়ে আসে।
 
সংসদীয় সংস্কৃতি, স্পিকারের পর্যবেক্ষণ
বাজেট অধিবেশনজুড়ে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পর্যবেক্ষণ ছিল একটি উল্লেখযোগ্য দিক। প্রশ্নোত্তর পর্বে মন্ত্রীদের অনুপস্থিতি, লিখিত বক্তব্য হুবহু পড়ে শোনানো, সম্পূরক প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দেওয়া এবং আলোচনার সময় অপ্রয়োজনীয়ভাবে অধিবেশন কক্ষ ত্যাগ করার প্রবণতা নিয়ে তারা একাধিকবার অসন্তোষ প্রকাশ করেন। বিশেষ করে সম্পূরক প্রশ্নের সময় প্রস্তুত লিখিত বক্তব্যের বাইরে এসে সদস্যদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়।
 
একই সঙ্গে সংসদীয় শিষ্টাচার রক্ষা, প্রতিপক্ষকে সম্মান দেখানো এবং ব্যক্তিগত আক্রমণ পরিহারের ওপরও বারবার জোর দেওয়া হয়। বক্তব্যের সময় কটূক্তি, বিদ্রূপ, ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্য ও অশোভন শব্দ ব্যবহার থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন স্পিকার। কয়েকটি ক্ষেত্রে কার্যবিবরণী থেকে বক্তব্য বাদ দেওয়ার ঘটনাও সংসদের শৃঙ্খলা রক্ষায় স্পিকারের কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়।
 
অধিবেশনের আরেকটি বৈশিষ্ট্য ছিল সংসদের ভেতরের বক্তব্য দ্রুত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া। রুমিন ফারহানার লোডশেডিং প্রসঙ্গ, টেলিটক নিয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য, এইচএসসি পরীক্ষার বিশেষ সুযোগ, সংবিধান সংশোধন বিতর্ক, মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই প্রসঙ্গ, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যসহ বিভিন্ন আলোচনার ভিডিও ক্লিপ ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। ফলে সংসদের বিতর্ক শুধু অধিবেশন কক্ষেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; জনপরিসরেও তাৎক্ষণিক আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে।

সংসদে কুস্তি ভাইয়ে দোস্তি

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১০:১২ এএম
আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২৬, ১০:১৩ এএম
সংসদে কুস্তি ভাইয়ে দোস্তি
ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের রাজনীতিতে বহুল ব্যবহৃত একটি প্রবাদ কুস্তি ভাইয়ে দোস্তি। এর অর্থ হলো লড়াইয়ের ময়দানে একে অপরকে কাবু করার তীব্র চেষ্টা থাকলেও, কুস্তির শেষে বা বাইরে তাদের মধ্যে পারস্পরিক গভীর শ্রদ্ধা ও ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় থাকা। প্রকাশ্যে তীব্র বিরোধিতা, কঠিন ভাষায় সমালোচনা ও রাজনৈতিক সংঘাত থাকলেও জাতীয় বা কৌশলগত প্রয়োজনে প্রতিদ্বন্দ্বী দলগুলোর মধ্যে সমঝোতার নজির নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক জোট, আন্দোলন ও ক্ষমতার সমীকরণে সেই বাস্তবতা দেখা গেছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এসে প্রবাদটি যেন নতুন করে আলোচনায় উঠেছে।

সংসদের ভেতরে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন দলের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ, জুলাই সনদ, নির্বাচন পদ্ধতি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও বিভিন্ন নীতিগত প্রশ্নে তীব্র বাগ্‌যুদ্ধ চলছে। একই সময়ে জাতীয় স্বার্থের কিছু ইস্যুতে পারস্পরিক সহযোগিতা, যৌথ উদ্যোগের আহ্বান এবং উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে একসঙ্গে উপস্থিতির ঘটনাও দেখা যাচ্ছে। ফলে রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ আলোচনা হচ্ছে, এটি কি কেবল সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিণত নতুন সংস্কৃতি, নাকি পর্দার আড়ালে রাজনৈতিক সমঝোতার ইঙ্গিত। এই সৌহার্দ্যকে কেউ গণতন্ত্রের ইতিবাচক দিক হিসেবে দেখছেন। তবে জুলাই অভ্যুত্থানে পরাজিত রাজনৈতিক শক্তির বিরুদ্ধে মোটাদাগে এখনো ক্ষমতাসীন বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে বোঝাপড়া বেশ শক্তিশালী। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের কেউ কেউ মনে করছেন এটি জুলাই-পরবর্তী নতুন বাংলাদেশের চিত্র। আবার কেউ কেউ মনে করছেন, অতিরিক্ত সমঝোতা কার্যকর বিরোধী দলের ভূমিকা দুর্বল করে দিতে পারে। সংসদের সাম্প্রতিক এসব ঘটনাপ্রবাহ ঘিরে তাই কুস্তি ভাইয়ে দোস্তি আবারও আলোচনার কেন্দ্রে।

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে প্রকাশ্য রাজনৈতিক দূরত্ব স্পষ্ট। নানা বিষয়ে দুই দলের মধ্যে তীব্র মতবিরোধ দেখা গেছে। তবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ইস্যুতে দল দুটির অবস্থান অভিন্ন। বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমান সংসদে বিএনপির সমালোচনা করে বলেছেন, জুলাই সনদ নিয়ে বিএনপি জাতির সঙ্গে প্রতারণা করেছে। শুধু তাই নয়, সংবিধান সংশোধন-সংস্কার ইস্যুতে সরকারি ও বিরোধী দল এক মঞ্চে আসতে পারেনি। এ বিষয়ে একটি সংসদীয় কমিটি গঠন করা হয়েছে। সেখানে সরকারি দলের অনুরোধ সত্ত্বেও বিরোধী দল কোনো সদস্য দেয়নি।

তবে একই সংসদে ভিন্ন চিত্রও দেখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের কারণে জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় সরকার ও বিরোধী দলের যৌথ কমিটি গঠনের বিষয়ে উভয় পক্ষ ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছিল। শিক্ষাঙ্গনের অস্থিরতা নিরসনেও সমন্বিত উদ্যোগের আহ্বান এসেছিল।

কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ইস্যুতেও বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি ও গণতন্ত্র মঞ্চের নেতাদের বক্তব্যে ঐক্যের সুর পাওয়া গেছে। শুধু সংসদেই নয়, মাঠের রাজনীতিতেও সহযোগিতার কিছু উদাহরণ সামনে এসেছে। ঢাকা-১৫ আসনে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম মিল্টন এবং বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান একই উন্নয়নমূলক কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে জনস্বার্থে একসঙ্গে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

এ ছাড়া বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যদের নির্বাচনি এলাকায় মসজিদ, গোরস্তান ও ঈদগাহ উন্নয়নের জন্য প্রধানমন্ত্রীর ঐচ্ছিক তহবিল থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার ঘটনাও রাজনৈতিক অঙ্গনে নজিরবিহীন বলে মনে করা হচ্ছে। জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদও এ প্রসঙ্গে মন্তব্য করে বলেছেন, তার দীর্ঘ সংসদীয় জীবনে এমন বরাদ্দ পাওয়ার অভিজ্ঞতা ছিল না।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গণতন্ত্রের জন্য ইতিবাচক। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) এর সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার খবরের কাগজকে বলেন, অতীতে সংসদে অশালীন ভাষা ও চরম বৈরিতা ছিল স্বাভাবিক দৃশ্য। এবার সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তুলনামূলক সহনশীল আচরণ দেখা যাচ্ছে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের সৌন্দর্য এবং জনগণ ও গণতন্ত্রের জন্যও ইতিবাচক।

সিনিয়র সাংবাদিক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. মারুফ মল্লিক খবরের কাগজকে বলেন, সরকারি দল ও বিরোধীদলের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান ও সংলাপের সম্পর্কই গণতন্ত্রের সুস্থ চর্চার অন্যতম ভিত্তি। তিনি যুক্তরাজ্যের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর উদাহরণ তুলে ধরে বলেন, সংসদে বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তিনির্ভর আলোচনা, সমালোচনা ও মতবিনিময়ের মধ্য দিয়েই কার্যকর সিদ্ধান্তের পথ তৈরি হয়। এতে ভালো ও জনকল্যাণমূলক বিষয়গুলো সামনে আসে। অতীতে দেশে বিরোধীদলকে অনেক সময় প্রতিপক্ষ নয়, বরং শত্রু হিসেবে দেখার প্রবণতা ছিল। এমনকি একপর্যায়ে মুখ দেখাদেখিও হতো না। 

ড. মল্লিকের মতে, সেই সংকীর্ণতা থেকে বেরিয়ে এসে সংসদে সৌহার্দ্যপূর্ণ ও গঠনমূলক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হলে রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়ই উপকৃত হয়। এ ধরনের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে আরও পরিণত, অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর করে তোলে।

তবে সবাই বিষয়টিকে একইভাবে দেখছেন না। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের দেশে রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত সম্পর্ক আগে থেকেই ছিল, এখনো আছে। এই রাজনৈতিক সংস্কৃতি ধরে রাখা উচিত। তবে নীতিগত বিরোধ ও মতপার্থক্য যদি দুর্বল হয়ে যায়, তাহলে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ইস্যু আলোচনার বাইরে থেকে যেতে পারে, যা সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য শুভ নয়।’

তিনি বলেন, বর্তমানে বিরোধী দল অনেক ক্ষেত্রে কারণ থাকুক বা না থাকুক, সরকারের বিরোধিতা করছে। নির্বাচনে পরাজয়ের হতাশা থেকে এমন আচরণের প্রবণতাও দেখা যায়। আবার সরকার ও বিরোধী দল যদি নীতিগতভাবে এক অবস্থানে চলে আসে, তা হলে কার্যকর বিরোধিতার জায়গা সংকুচিত হবে। সে ক্ষেত্রে সংসদ জনগণের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়ে ‘মামুদের সংসদ’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এস এম আলী রেজা খবরের কাগজকে বলেন, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পারস্পরিক সম্মান সংসদীয় পরিবেশের জন্য জরুরি। তার ভাষায়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সংঘাতের পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চান, যা গণতন্ত্রের নতুন বার্তা বহন করে। 

অন্যদিকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আজাদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘১৯৯১ সালে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে। সরকার জনস্বার্থবিরোধী কোনো কাজ করলে আমরা তার তীব্র সমালোচনা করছি। একই সঙ্গে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে ইতিবাচক বিষয়গুলোও সামনে আনার চেষ্টা করছি।’

হামিদুর রহমান বলেন, ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদসহ বিভিন্ন বিষয়ে আমরা সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছি। আবার প্রয়োজন হলে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করেছি এবং কর্মসূচিও দিচ্ছি। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অতীতের রাজনৈতিক সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে নতুন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায়। সরকার বিদেশ সফরে গিয়ে দেশের স্বার্থে কোনো ইতিবাচক উদ্যোগ নিলে আমরা সেটিকে স্বাগত জানিয়েছি ও ধন্যবাদ জানিয়েছি। এতে মানুষের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এমন একটি গণতান্ত্রিক সংসদীয় সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা এবং ভুলের সমালোচনা– দুটিই দায়িত্বশীলভাবে করা হবে।’

সম্প্রতি বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও বলেছেন, সরকার সবাইকে নিয়ে দেশ গড়তে চায়। ফলে রাজনৈতিক বিরোধিতার পাশাপাশি জাতীয় স্বার্থে সীমিত সহযোগিতার বার্তাও সামনে এসেছে।

বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল খবরের কাগজকে বলেন, সংসদ ও সংসদের বাইরে এখন এমন কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দৃশ্যমান, যা অতীতে দেখা যায়নি।

বরিশাল সফরের উদাহরণ তুলে ধরে আলাল বলেন, সাধারণ মানুষ বলছেন, একজন প্রধানমন্ত্রী বিআরটিসির বাসে সফর করছেন। এর আগে কোনো প্রধানমন্ত্রীকে এভাবে বিআরটিসির বাসে যাতায়াত করতে দেখা যায়নি। একই সঙ্গে তার সফরকে কেন্দ্র করে জনগণের চলাচলে কোনো ধরনের ভোগান্তি সৃষ্টি হয়নি। সড়কে যানবাহন চলাচল বন্ধ রাখা কিংবা অতিরিক্ত নিরাপত্তাজনিত বিধিনিষেধও ছিল না।

তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে মানুষ যে গণতান্ত্রিক, জনবান্ধব ও মানবিক রাষ্ট্রের প্রত্যাশা করেছিল, প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে দেশ ধীরে ধীরে সেই পথেই এগিয়ে যাচ্ছে।

বিএনপি ও জামায়াতের সম্পর্ক নতুন নয়। এরশাদ সরকারের পতনের পর দল দুটি একসঙ্গে নির্বাচন করে জয়লাভ করে। ২০০১ সালে চারদলীয় জোট গঠন করে তারা সরকার পরিচালনা করেছে। পরবর্তী সময়ে নানা কারণে সেই সম্পর্কের ধরন বদলেছে। এখন উভয় দলই নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়, সংসদে দেখা যাওয়া এই সৌহার্দ্য কি কেবল গণতান্ত্রিক শিষ্টাচার, জুলাই শহিদদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশ, নাকি ভবিষ্যতের এক নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি। এর উত্তর নির্ভর করছে সময়, রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আগামী রাজনৈতিক সমীকরণের ওপর।