পটুয়াখালীর কলাপাড়ায় খেপুপাড়া সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের রেকর্ডভুক্ত জমি দখল করে রাস্তা নির্মানের অভিযোগ উঠেছে আলোচিত কন্টেন্ট ক্রিয়েটর ও এনসিপি নেতা নুরুজ্জামান কাফির বিরুদ্ধে।
অবৈধভাবে রাস্তা নির্মাণে বাধা দিলে কাফি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আবদুর রহিমকে বিভিন্নভাবে হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রায় এক সপ্তাহ আগে কাফি তার ক্রয়কৃত জমিতে প্রবেশের জন্য ওই রাস্তাটি নির্মান করেন।
কাফি ২০২৬ সালের ২৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে জাতীয় নাগরিক পার্টিতে (এনসিপি) যোগদান করেছেন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ১৯৫৪ সালে রজপাড়া মৌজার খঞ্জন আলী হাওলাদারের কাছ থেকে ৩ একর ৩৩ শতাংশ, ১৯৫৯ সালে মোবারক আলীর কাছ থেকে ৩ একর ৩৩ শতাংশ, ১৯৬৭ সালে এডিএফসি ব্যাংকের নিলাম থেকে ২৯ একর ১৮ শতাংশ এবং এরপরে বিভিন্ন সময়ে আরও কয়েকজন মালিকের কাছ থেকে ৪ একর ৮০ শতাংশ জমি ক্রয় করে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। এ সব জমি বছরের পর বছর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ভোগ দখল করে আসছে। সর্বমোট ৪০ একর ৬৪ শতাংশ জমির মধ্যে রজপাড়া মৌজার জেএল নং-৯ এর বিএস ১২নং খতিয়ানের ২১ একর ৭৬ শতাংশ জমির খাজনা বঙ্গাব্দ ১৪৩২ সাল পর্যন্ত পরিশোধ করা।
বিদ্যালয়টি ২০১৮ সালে জাতীয়করনের পর পরই সরকারী বিধি অনুযায়ী এসব জমি শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের সচিবের নামে দলিল করে দেওয়া হয়েছে। গত সপ্তাহে এ জমির মধ্য থেকে সিক্সলেন সড়কের উত্তর পাশের ৬ শতাংশ জমি দখল করে নুরুজ্জামান কাফি সড়ক নির্মান করে। বিদ্যালয়ে ওই জমির পাশে কাফির রেকর্ডকৃত জমি রয়েছে। তার জমিতে প্রবেশের পথ না থাকার কারনে তিনি সড়ক নির্মান করেছেন বলে জানা গেছে।
তিনি বলেন, গত এক সপ্তাহ আগে রাতের আঁধারে কন্টেন্ট ক্রিকেটার নুরুজ্জামান কাফি সিক্সলেনের পাশে অবস্থিত ২১ একর ৭৬ শতাংশ জমির মধ্য থেকে ৬ শতাংশের মতো জমি দখল করে রাস্তা নির্মান করে। আমরা বিষয়টি জেনে রাস্তা নির্মাণে বাধা দিলে উল্টো আমাদের জীবননাশের হুমকি দেন। জমি উদ্ধারে প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
সংবাদ সম্মেলনে কাফি জানান, সম্প্রতি একটি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত সংবাদে তাকে এবং তার রাজনৈতিক দল এনসিপিকে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। তিনি ওই সংবাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
তিনি বলেন, প্রচারিত সংবাদে বলা হয়েছে আমি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহিমকে বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়েছি। এটি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমার জীবনে সম্ভবত দুই থেকে তিনবারের বেশি প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা হয়নি। আমি সবসময় অন্যায় ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বলেছি। একজন শিক্ষকের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করার প্রশ্নই আসে না।
কাফির দাবি, প্রায় এক বছর আগে তিনি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের কাছে নিজের ছয় শতাংশ জমিতে যাতায়াতের জন্য একটি রাস্তার ব্যবস্থা করে দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। তখন প্রধান শিক্ষক তাকে জানান, এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার এখতিয়ার তার নেই।
তিনি আরও জানান, আমি যাদের কাছ থেকে জমি কিনেছি, তাদের সঙ্গে বিদ্যালয়ের ৩০ থেকে ৪০ বছরের একটি মামলা চলমান ছিল। প্রায় এক বছর আগে তারা মামলায় রায় পান। সেই রায়ের ভিত্তিতেই তারা আমাকে চলাচলের জন্য রাস্তার জায়গা বুঝিয়ে দিয়েছেন। আমি তাদের বুঝিয়ে দেওয়া জায়গাতেই রাস্তা নির্মাণ করেছি, বিদ্যালয়ের কোনো জমিতে নয়।
জমির মালিক মো. সালাউদ্দিন নয়নও কাফির বক্তব্যের সমর্থন করে বলেন, আমরা কাফিকে ছয় শতাংশ জমি রাস্তা নির্মাণের জন্য দিয়েছি। বিদ্যালয়ের সঙ্গে আমাদের দীর্ঘদিন মামলা চলেছে। সুপ্রিমকোর্ট থেকে আমরা আমাদের পক্ষে রায় পেয়েছি। এটি আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি। আগে বিদ্যালয় জমিটি ভোগদখলে রাখলেও মামলার রায়ের পর বর্তমানে আমরা দখলে আছি এবং সেখানে চাষাবাদ করছি। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দাবি, গত সপ্তাহে তাদের রেকর্ডভুক্ত জমির সিক্স লেন সড়কের উত্তর পাশের প্রায় ছয় শতাংশ জমি দখল করে নুরুজ্জামান কাফি রাস্তা নির্মাণ করেছেন। যদিও ওই জমির পাশেই কাফির রেকর্ডভুক্ত ব্যক্তিগত জমি রয়েছে।
খেপুপাড়া সরকারি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রহিম জানিয়েছেন, বিতর্কিত জমিটি বিদ্যালয়ের ক্রয়কৃত সম্পত্তি এবং দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের ভোগদখলে রয়েছে। জমিটির মালিকানা নিয়ে বিষয়টি বর্তমানে আদালতে বিচারাধীন। এর মধ্যেই নুরুজ্জামান কাফি জোরপূর্বক ওই জমি দখল করে রাস্তা নির্মাণ করেছেন বলে বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে।
প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে তিনি আদালতেই বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। এ মুহূর্তে এ বিষয়ে আর কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. আরিফুজ্জামান বলেছেন, কনটেন্ট ক্রিয়েটর কাফি একটি জমি ক্রয় করেছেন। সেখানে স্কুলের দাবি করা জায়গায় রাস্তা নির্মাণের বিষয়ে আমরা অভিযোগ পেয়েছি। একই জমির মালিকানা স্কুল এবং স্থানীয় একটি পরিবার উভয়েই দাবি করছে। বিষয়টি নিয়ে মামলা চলমান রয়েছে এবং এখনো চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি যাতে না ঘটে, সেদিকে প্রশাসন নজর রাখছে।
হাসিবুর রহমান/রিফাত/